জিজ্ঞাসা-১২৪৭৯: হজ ও ওমরাতে তালবিয়া পাঠের হুকুম কি?
জিজ্ঞাসা-১২৪৭৯:
মোয়া'জ্জাজ, মোহতারামে সমীপে আমার একটি আবেদন হচ্ছে, - হজের ফরজ,ওয়াজিব, ছুন্নাতের মধ্যে তালবিয়া পড়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি, তাহলে তালবিয়া পড়ার বিধান সম্পর্কে জানার জন্য জনাব সমীপে নিবেদন পেশ করছি। তারিখ: ২৭/০২/২৩ ঈসায়ি/ইংরেজি
হাফেজ মাওলানা
জবাব: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
نحمده ونصل على رسوله الكريم اما بعد بسم الله الرحمن الرحيم
তাসলিম ও হামদ-সানার পর কথা হলো, প্রথমে আপনাকে জাযাকাল্লাহ খায়ের। কেননা আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
দ্বিতীয় কথা হলো, - ‘লাব্বাইকা’। এই শব্দটি আরবি- ‘ইলবাব’ ও ‘তালবিয়াতুন’ হতে গৃহীত। তালবিয়াতুন-এর অর্থ হলো- হে আল্লাহ! আমি তোমারই সমীপে যথাযথভাবে একবারের পর আর একবার বারবার উপস্থিত হয়েছি। আর ইলবাব শব্দের অর্থ বিভিন্নভাবে করা হয়ে থাকে। যথা : (ক) ইলবাব অর্থ কোনো স্থানে দণ্ডায়মান হওয়া। (খ) এর অর্থ হে আল্লাহ! আমি তোমার আনুগত্য ও হুকুম পালনের কাজে একবারের পর আর একবার, বারবার দণ্ডায়মান হয়েছি, দাঁড়িয়েছি। (গ) এর অর্থ- হে আল্লাহ! আমি তোমার আহ্বানে একবারের পর একবার বারবার সাড়া দিয়েছি।
প্রশ্ন ক। তালবিয়া পাঠের হুকুম কি?
উত্তর: ক। তালবিয়া পাঠের ব্যাপারে সম্মানিত ইমামদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। যেমন,
حُكم التلبية:
اختلف العلماء في حكم التلبية:
فذهب الشافعي وأحمد إلى أنها سنَّة.
وحكى الخطَّابي عن مالك وأبي حنيفة الوجوب[9]، وهذا هو الراجح؛ لحديث السائب السابق، وفيه الأمر برفع الصوت بالتلبية.
المَطْلَبُ الثَّاني: حُكْمُ التَّلْبِيَة
التَّلْبِيَةُ سُنَّةٌ في الإحرامِ، وهذا مَذْهَبُ الشَّافِعِيَّة، والحَنابِلَة،مغني المحتاج)) للشربيني (1/481)، ويُنظر: ((الحاوي الكبير)) للماوردي (4/88).
قال ابن حزم: "وهو فرض، ولو مرة"[10].
অর্থাৎ তালবিয়া পাঠের ব্যাপারে ওলামা কেরাম মধ্যে মতভেদ রয়েছে,
ইমাম শাফি এবং হাম্বল রহ. এর মতে সুন্নত।
আর ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম মালেক রহ. এর মতে ওয়াজিব।
আর ইমাম ইবনে হাযম রহ. বলেন, তালবিয়া পাঠ করা ফরজ এবং যদিও তা একবার হয়। সূত্র: নায়লুল আওতার-৫/৫৩; আলমুহল্লি-৭/১০৪
প্রশ্ন: খ। ইমাম মালেক এবং ইমাম আবু হানিফার রহ. এর দলিল কি?
উত্তর: খ। ইমাম মালেক এবং ইমাম আবু হানিফার রহ. এর দলিল নিম্নের হাদিস শরিফ
حَدَّثَنَا الْقَعْنَبِيُّ، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي بَكْرِ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ عَمْرِو بْنِ حَزْمٍ، عَنْ عَبْدِ الْمَلِكِ بْنِ أَبِي بَكْرِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ هِشَامٍ، عَنْ خَلاَّدِ بْنِ السَّائِبِ الأَنْصَارِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ " أَتَانِي جِبْرِيلُ صلى الله عليه وسلم فَأَمَرَنِي أَنْ آمُرَ أَصْحَابِي وَمَنْ مَعِي أَنْ يَرْفَعُوا أَصْوَاتَهُمْ بِالإِهْلاَلِ - أَوْ قَالَ - بِالتَّلْبِيَةِ " . يُرِيدُ أَحَدَهُمَا .
অর্থ: আল কা‘নবী (রাহঃ) ..... খাল্লাদ ইবনুস সায়িব আল আনসারী (রাযিঃ) থেকে তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন, জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) আমার নিকট এসে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন আমার সাথী ও সাহাবীদের নির্দেশ দেই, তারা যেন উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করে।
তাখরিজ: সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৮১৪, মুসনাদে আহমদ -৪/৫৫; তিরমিজি -৮২৯; ইবনে মাজাহ -২৯২২
তাহকীক: বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)
প্রশ্ন: গ। হজ এবং ওমরাতে বেশি বেশি তালবিয়া পাঠ করার হুকুম কি?
উত্তর: গ। এ বিষয়ে
اتفق العلماء على أنه يستحب للمحرم بالحج أو العمرة أن يكثر من التلبية ( لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ ، لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ ، لاَ شَرِيكَ لَكَ) ثم إذا فرغ منها صلى
হজ ও ওমরাতে বেশি বেশি তালবিয়া পাঠ করার ব্যাপারে ওলামায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন। সূত্র: হুকমুদ দুআ বাদাত তালবিয়া ফিল হজ্জি ওয়াল ওমরাতি- ২২১১৩৫ (ফাতওয়া নাম্বার)
সারকথা হলো, মৌলিকভাবে হজের ওয়াজিব ছয়টি। তাছাড়া আরও কয়েকটি আনুসাঙ্গিক ওয়াজিব রয়েছে। যেমন, মীকাতের পূর্বে ইহরাম বাঁধা, তালবিয়া পাঠ করা, সায়ি সাফা পাহাড় থেকে শুরু করা ইত্যাদি ইত্যাদি।
সুতরাং তালবিয়া পাঠের অংশ আলাদাভাবে জিজ্ঞাসা -১২৪৭৮ শিরোনামে মাসয়ালাটিতে আলোচনা আসেনি।
- والله اعلم بالصواب
উত্তর প্রদানে, মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুর রাজ্জাক
জিজ্ঞাসা-১২৪৭৮: ফিকহি হানাফির অনুসারে ওমরা হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতসমূহ কি কি? জানালে উপকৃত হবো।
জিজ্ঞাসা-১২৪৭৮:
আসসালামু আলাইকুম। ফিকহি হানাফির অনুসারে ওমরা হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতসমূহ কি কি? জানালে উপকৃত হবো। তারিখ: ২৭/০২/২৩ ঈসায়ি/ইংরেজি
হাফেজ মাওলানা সিরাজুল হক ঢাকা থেকে
জবাব: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
نحمده ونصل على رسوله الكريم اما بعد بسم الله الرحمن الرحيم
তাসলিম ও হামদ-সানার পর প্রথম কথা হলো, পবিত্র কুরআন-হাদিসে কোথায় হজ ও ওমরার ফরজ, ওয়াজিব
সংখ্যা নির্ধারণ নেই। তবে গুরুত্ব এর কথা এসেছে। তাই এর সংখ্যা নির্ণয়ে সমআনিত ইমামদের
মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
হানাফি মাজহাবের মতে, হজের ফরজ ৩টি। ইমাম শাফেয়ীর নিকট অতিরিক্ত আরও একটি রয়েছে। তাহলো সাফা ও মারওয়াতে সায়ী করা।
ركان الحج عند المالكية إن للحجِّ أربعة أركان في المذهب المالكي، وهي: الإحرام، والوقوف بعرفة، والطواف، والسعي، وفيما يأتي بيان هذه الأركان:
ইমাম মালেক ও শাফেয়ীর আরেক মত মতে মুজদালিফায় অবস্থানও ফরয। সূত্র: কিতাবুল ফিকহি আলাল মাজাহিবিল আরবা-১ম খণ্ড; ৫৭৭ পৃ.
এক. ইহরাম বাঁধা। দুই. উ’কুফে আ’রাফা
(বা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা)। তিন. তাওয়াফুয জিয়ারাত।
হজের ওয়াজিব ৬টি
মৌলিক ভাবে হজের ওয়াজিব ৬টি
এক. ‘সাফা ও মারওয়া’ পাহাড়গুলো মধ্যে ৭ বার সায়ি করা।
দুই. অকুফে মুযদালিফায় (৯ই জিলহজ)
অর্থাৎ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যদয় পর্যন্ত একমুহূর্তের জন্য হলেও অবস্থান করা।
তিন. মিনায় তিন শয়তান (জামারাত)
সমূহকে পাথর নিক্ষেপ করা।
চার. ‘হজে তামাত্তু’ ও ‘কিবরান’ কারীরা ‘হজ’ সমাপনের জন্য দমে শোকর করা।
পাঁচ. ইহরাম খোলার পূর্বে মাথার
চুল কাটা।
ছয়. মক্কার বাইরের লোকদের জন্য
তাওয়াফে বিদা অর্থাৎ মক্কা থেকে বিদায়কালে তাওয়াফ করা।
হজের সুন্নতসমূহ:
হজের সুন্নত ১০টি। যথা: ১. তাওয়াফ
করা (ইফরাদ ও কিরান হজকারীর জন্য)। ২. তাওয়াফের সময় প্রথম তিন চক্কর সৈনিকের মতো বীরদর্পে
চলা। ৩. খলিফা অথবা তাঁর প্রতিনিধি তিন দিন তিন জায়গায় খুতবা প্রদান করা বা ভাষণ দেওয়া।
৭ জিলহজ কাবা শরিফের হারাম শরিফে, ৯ জিলহজ আরাফাতে মসজিদে নামিরাতে, ১১ জিলহজ
মিনায়। ৪. ৮ জিলহজ মক্কা শরিফ থেকে মিনায় গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা এবং রাতে
সেখানে অবস্থান করা। ৫. ৯ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে আরাফাতের দিকে রওনা হওয়া।
৬. অকুফে আরাফা বা আরাফাতে অবস্থানের জন্য সকালে গোসল করা। ৭. ৯ জিলহজ আরাফাতে অবস্থান
করে সূর্যাস্তের পর মুজদালিফার দিকে রওনা করা। ৯. ১০, ১১ ও ১২
জিলহজ মিনায় রাত্রি যাপন করা। ১০. মিনা থেকে মক্কা শরিফ প্রত্যাবর্তনের সময় ‘মুহাচ্ছার’ নামক জায়গায় কিছু সময় অবস্থান করা।
ফিকহি হানাফির মতে, ওমরার ফরয দুটি
১। ওমরার ইহরাম করা। অর্থাৎ উমরার নিয়তে
তালবিয়া পাঠ করা।
২। বাইতুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ
করা ।
ওমরার ওয়াজিব দুটি
১। সাফা-মারওয়ার মাঝে সায়ী
করা।
২। মাথার চুল মুণ্ডানো বা কটা। দলিল:
আমরা হযরত উসমান (রা.)-এর সঙ্গে
মক্কায় এসেছি। তাঁকে দেখেছি, তিনি মক্কা থেকে বের হওয়ার আগে
ইহরাম খুলতেন না। তিনি শুধু বাইতুল্লাহ শরিফের তাওয়াফ করতেন এবং সাফা-মারওয়ার মাঝে
সাঈ করতেন। এরপর মাথা মুণ্ডিয়ে ফেলতেন।’ [মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস:
১৩৭৮৬]
ওমরার সুন্নতসমূহ:
উল্লিখিত রুকন ও ওয়াজিবসমূহ ব্যতীত
উমরার অন্য আমলসমূহ সুন্নত, যেমন:
১ - ইহরামের সময় গোসল করা।
২- একটি চাদর ও একটি সেলাইবিহীন
লুঙ্গিতে ইহরাম করা।
৩ - তালবিয়া পাঠ করা ও তা উঁচু
স্বরে পাঠ করা।
৪- তাওয়াফের সময় ইযতিবা করা।
ইযতিবা হলো ডানবগলের নিচ দিয়ে চাদর পেঁচিয়ে ডানকাঁধ উন্মুক্ত রাখা।
- والله اعلم بالصواب
উত্তর প্রদানে, মুফতি মুহাম্মাদ
আব্দুর রাজ্জাক
মাদরাসার সম্পদের ব্যাপারে সতর্কতা কাম্য: মুফতি তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ
আলেম উদ্যোক্তাদের সোনালি অতীত; ইতিহাসের আয়নায় আলেমদের ব্যবসা বাণিজ্য*
*আলেম উদ্যোক্তাদের সোনালি অতীত; ইতিহাসের আয়নায় আলেমদের ব্যবসা বাণিজ্য*
একটি গল্প দিয়ে শুরু করি। গল্পটি একজন নারী ব্যবসায়ীর। ইতিহাসের খোলা আয়নায় ফুটে উঠবে আমাদের দেড় হাজার বছরের যাপিত জীবনের স্বনির্ভরতার এক অব্যক্ত ছায়া। আত্মনির্ভরশীলতার অজানা ইতিহাস।
নারী উদ্যোক্তা মাখ বিনতে হারেস রহ.। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও মুহাদ্দিস। প্রখ্যাত বুযুর্গ বিশিরহাফি বাগদাদি রহ. এর আপন বোন। তাকওয়া ও দুনিয়াবিমুখতা এতটাই ছিল যে, খোদ বিশিরহাফি বলেন- আমি তাকওয়া ও দিয়ানতদারিতা আমার এ বোন থেকেই শিখেছি। এ বোন সূতা কেটে হালাল রিযিক উপার্জন করতেন। ইমাম বিশিরহাফির তিন বোন ছিল। মিদগা, মাখ ও যুবদাহ। সবার বড় মাখ। এ মহীয়সী নারী তার ভাইর জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর ছেলে আবদুল্লাহ বলেন, এক মহিলা একদিন আমার বাবার কাছে এসে বলল, হে আবু আবদুল্লাহ! আমি রাতে প্রদীপের আলোতে সূতা কাঁটি। কখনো প্রদীপ নিভে গেলে চাঁদের আলোতে কাটি। এমতাবস্থায় প্রদীপে কাটা সূতা ও চাঁদের আলোতে কাটা সূতা কি আলাদা করে বিক্রি করবো? তখন বাবা বললেন- তোমার দেখার মধ্যে পার্থক্য অনুভব হলে তা বলে দিবে। এরপর মহিলা আরেকটি প্রশ্ন করলেন, অসুস্থ ব্যক্তি প্রচন্ড অসুস্থতায় ‘হায় হায়’ করা কিংবা আহ ধ্বনি প্রকাশ করা কি অবান্তর ‘অভিযোগ’ হবে? আল্লাহর সিদ্ধান্তে ভরসা না করে অভিযোগ করার নামান্তর হবে?
আমার পিতা বললেন, আমার দৃষ্টিতে এমনটি করা অভিযোগ না বরং আল্লাহর কাছে রুগির ফরিয়াদ প্রকাশ পাচ্ছে। এ জবাব শুনে মহিলা চলে গেল। এরপর পিতা আমাকে বললেন, এ ধরণের প্রশ্ন করতে আমি আমার জীবনে কাউকে দেখিনি। তুমি এ মহিলার ঠিকানা খোঁজ কর। যাইহোক, আমি মহিলার পেছনে পেছনে চললাম। মহিলা বিশিরহাফির ঘরে প্রবেশ করায় বুঝতে পারলাম তিনি বিশিরহাফির বোন হবেন হয়তো। আমার বাবাকে বিষয়টি বললে তিনি বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ। বিশিরহাফির বোন মাখ ছাড়া ও প্রশ্ন কেউ করতে পারে না।
হৃদয় নাড়া দেয়া আরেকটি গল্প আমাদের পাশের। শায়েখ আহমদ নহরওয়ালি (পাটনা, গুজরাট, ভারত)। এ মনীষী কাযি হামিদুদ্দীন ঘুরির মুরিদ ছিলেন। কাযি হামিদুদ্দিন তাকে নিয়ে গর্ব করতেন। তার সাথে দেখা করার জন্য তার বাসায় নিয়মিত যেতেন। এ শায়েখ আহমদ হালাল উপার্জনের জন্য কাপড় বুননের কাজ করতেন। টেক্সটাইল কারখানার পাশাপাশি নিজ ঘরেও কাপড় বুনতেন।
একদিন কাযি হামিদুদ্দিন তাঁর এ মুরিদের ঘরে মুলাকাতের জন্য গিয়ে তাকে বললেন- আহমদ! তুমি কতদিন একাজ করবে? দ্বিতীয় দিন শায়েখ আহমদ কাপড় বুনার জন্য চরকি ঠিক করছিলেন। এমন সময় হাতে প্রচন্ড চোঁট পেলেন এবং সে দিন থেকে কাপড় বুননের কাজ বাদ দিয়ে ইবাদত সাধানায় আত্মনিয়োগ করেন। একরাত এক চোর তার ঘরে প্রবেশ করে কিছু না পেয়ে শূন্য হাতে ফিরে গেল। চোরের এ আসহায়ত্ব অনুভব করে তিনি একটি কাপড় রাস্তায় রেখে দিলেন যেন কোন চোর কাপড় থেকে বঞ্চিত না হয়। এ দৃশ্য দেখে চোর সকাল বেলা তার সন্তানাদিসহ শায়খের খেদমতে এসে তওবা করলেন এবং শায়খের হাতে বাইয়াত হয়ে পাক্কা আবেদ বনে গেলেন। বাদায়ুনে এ মনীষীকে দাফন করা হয়। পাটনার নহরওয়ালা এলাকায় তিনি জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।
ব্যবসা বাণিজ্য ও লেনদেনের ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও আমানতহীনতার এ সময়ে ইতিহাসের ছোট ছোট এ গল্পগুলো আশাজাগানিয়া। এমন অসংখ্য গল্প রয়েছে আমাদের দীর্ঘ ইতিহাসে। মুয়ামালাত ও মুয়াশারাত তথা সামাজিক শিষ্টাচার ও লেনদেনের ক্ষেত্রে আমাদের আদর্শের চরিত্রগুলো হারিয়ে যাওয়ায় ব্যবসা বাণিজ্যে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা কারো অজানা নয়। অথচ এখনও উলামায়ে কেরামের ব্যবসা বাণিজ্যে যুক্ত হওয়া নিজ বেরাদরীতে অচ্ছ্যুত অস্পৃশ্য হয়ে থাকার মত। এ দায় কার?
২. উলামায়ে কেরাম কুরআন হাদিসের শিক্ষা অনুযায়ী ইলমে দীনের হেফাজত, আত্মনির্ভরশীলতা ও স্বাধীনভাবে দীনের কাজ করার জন্য যুগে যুগে উপার্জনের বিভিন্ন মাধ্যম অবলম্বন করেছেন। দুনিয়াদারদের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা, নিজেদের পরিবার পরিজনের চাহিদা পূরণ করে তারা নিশ্চিন্তে দীনের খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন।
হযরত উমর রা. উলামায়ে কেরামদের বলতেন, হে উলামায়ে কেরাম! দীনি কাজে সংযুক্ত থেকে আল্লাহর দেয়া রুজি তালাশ করতে থাক। পরনির্ভরশীল হয়ো না। আবু যিবইয়ান বলেন, হযরত উমর রা. একবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু যিবইয়ান! তোমার আয় কত? আমি বললাম, আমার বেতন আড়াই হাজার। জবাব শুনে হযরত উমর বললেন, চাকরির সাথে সাথে তুমি কিছু গবাদি পশুও লালন পালন কর।
হতে পারে, কুরাইশের অনভিজ্ঞ যুবক পর্যায়ের কেউ খেলাফতের দায়িত্বে আসলে তোমার বেতন বন্ধ করে দিতে পারে। প্রসিদ্ধ তাবেঈ ইমাম আবু কিলাবা তার শিস্য আইয়ুব সাখতিয়ানিকে বলেছেন, তুমি বাজারে গিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য কর। ব্যবসা বাণিজ্য করলে মানুষের কাছে হাত পাতা লাগে না। অমুখাপেক্ষি থাকা যায়। দীনদারিও ভালোভাবে আদায় হয়। আইয়ুব সাখতিয়ানি উস্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ট্যানারি ব্যবসা শুরু করেন। এবং এ ব্যবসার লাভ দিয়ে পরিবার পরিজনের চাহিদা পূরণ করতেন। তিনি তার ছাত্রদের বলতেন, আমার পরিবার যদি এক মুষ্ঠি সবজির মুখাপেক্ষি হত তাহলে আমি তোমাদের সামনে বসে দরস দিতাম না।
এমন উক্তি একটি দুটি নয় অসংখ্য। নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির দায়রায় না গিয়ে সরল বাক্যে বলি, এমন হাজারো ঘটনা রয়েছে আমাদের হারানো সোনালী ইতিহাসে। আত্মনির্ভরশীলতায় উন্নীত হওয়ার গল্প। হালাল, বৈধ সমস্ত পেশায় দীনের আলো নিয়ে ছড়িয়ে দেয়ার গল্প।
৩. ইতিহাসের ইতিহাস সৃষ্টি করা এ গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় প্রথম। উর্দু ভাষাতেও আমাদের জানামতে প্রথম। আলোচ্য বিষয়ের গুরুত্ব ও নতুনত্ব নিয়ে বিদগ্ধ মনীষীগণ যে অভিব্যক্তি পেশ করেছেন তা সময়ের বিদ্যানদের চোখ আরো খুলে দিবে। কাযি আতহার মুবারকপরি রহ.’র জীবনের সেরা রচনাকর্ম হিসেবে এ গ্রন্থ হাজার বছর প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।
হাজার হাজার আলেম উলামা, মুহাদ্দিস, ফকিহ, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, পেশাজীবি, চাকুরিজীবি, ইতিহাসের ছাত্র শিক্ষক ও গবেষকসহ সবার জন্য এক অমূল্য পাথেয় এ গ্রন্থ। গ্রন্থটি প্রকাশের সাথে যারা যেভাবে যুক্ত ছিলেন সবার কর্মফলকে আল্লাহ তাআলা কবুল করুন। উলামায়ে কেরামের ব্যবসা বাণিজ্যের পথকে আল্লাহ তাআলা আরো সুগম করুন। এ গ্রন্থ পড়ে আলেম উলামা ও দীনদার ব্যবসায়ীসহ পাঠকের মধ্যে নতুন চেতনা জাগ্রত করবে। মূল গ্রন্থটি ভারতের প্রখ্যাত লেখক, গবেষক ও ইতিহাসবীদ মাওলানা কাজি আতহার মুবারকপুরির। গ্রন্থটি অনুবাদ করেছেন লেখক, অনুবাদক আবুল ফাতাহ কাসেমি।
ধরন: ব্যবসা-বাণিজ্য, উদ্যোক্তা। পৃষ্ঠা: ২৭২। মুদ্রিত মূল্য: -৪৮০ টাকা। প্রি অর্ডার মূল্য: ৩১০ টাকা। ডেলিভারি চার্জ: ৪০ টাকা। গ্রন্থটি নন্দন প্রকাশনী ও কওমি উদ্যোক্তার যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত হচ্ছে। অনলাইন বুকশপ রকমারিসহ সব ই প্লাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে ইতোমধ্যে। ইসলামে জীবিকা অন্বেষণে ব্যবসার তাগিদ এসেছে সর্বাগ্রে। সৎ ব্যবসায়ীদের হাশর নবি-সাহাবিদের সঙ্গে হবে বলেও প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন স্বয়ং আমাদের প্রিয় নবি হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
নবি, সাহাবি, তাবেঈ, তাবে-তাবেঈ থেকে নিয়ে হাজার বছরের ইতিহাসে সোনালি একটা অধ্যায় ছিল। যেখানে ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের সাফল্যের গল্প ছিল। তবে কালের পরিক্রমায় বলি কিংবা সামাজিক বিস্মৃতিতে আমরা সেই ইতিহাস হারিয়ে ফেলেছিলাম। এ বইটি আমাদের সেই হারানো ইতিহাস খুঁজে পাওয়ার একটি সূত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। বইটি সম্পর্কে ভারতের প্রখ্যাত লেখক, বিদগ্ধ মনীষী মাওলানা আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদি বলেন, ‘এ বইটি সব মানুষের চোখ খুলে দেবে।’ আশা করি গ্রন্থটি উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী তৈরিতে দারুণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: আওয়ার ইসলাম
জিজ্ঞাসা-১২৪৭৭: বাস্তব আর ছবির হুকুম একি রকম কিনা,বাস্তবে দেখা আর ছবিতে দেখা একি রকম অপরাধ মোবাইলে আমরা নানা রকম ছবি দেখে থাকি,এগুলো দেখা কি ধরনের অপরাধ ,জানতে চাই।
জিজ্ঞাসা-১২৪৭৭:
বাস্তব আর ছবির হুকুম একি রকম কিনা, বাস্তবে দেখা আর ছবিতে দেখা একি রকম অপরাধ মোবাইলে আমরা নানা রকম ছবি দেখে থাকি,এগুলো দেখা কি ধরনের অপরাধ ,জানতে চাই। তারিখ:
২৫/০২/২৩
ঈসায়ি/ইংরেজি
মাওলানা আব্দুস সালাম সাভার, ঢাকা থেকে
জবাব: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
نحمده ونصل على رسوله الكريم اما بعد بسم الله الرحمن الرحيم
তাসলিম ও হামদ-সানার পর প্রথম কথা হলো, নজর হিফাজত করা। দলিল:
আয়াত
নং-০১
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ
وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا
يَصْنَعُونَ (30) وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ
وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ الخ
অর্থ: “মুমিনদেরকে বলুন, তারা
যেন তাদের চক্ষুকে অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। এটাই তাদের জন্য পবিত্রতম
পন্থা। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত। আর মুমিন নারীদের বলুন তারা
যেন তাদের চক্ষুকে অবনত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানকে হিফাযত করে। সূরা নূর-৩০,৩১
আয়াত
নং-০২
إِنَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ
كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا
“নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদর প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে”। সূরা
ইসরা: ৩৬
দ্বিতীয় কথা হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে আধুনিক ছবি,ভিডিও ছিল না।
হজরতে ফোকাহায়ে কেরাম পর্দার বিধানকে কিয়াস করে হুকুম দিয়েছেন যে, যাদের সঙ্গে
পর্দা করা তথা দেখা জায়েজ নেই, তাদের ছবি/ভিডিও দেখাও জায়েজ নেই। দলিল:
أن ما لا يجوز النظر إليه، لا يجوز النظر إلى صورته،
سواء في ذلك الأشخاص أو العورات. وأن النظر المحرم إنما منع منه خشية الفتنة
والشهوة، وهذا موجود في النظر إلى الصور أيضا. وراجع في ذلك الفتوى رقم: 352300.
অর্থাৎ যে জিনিসের দিকে বা যাকে দেখা/তাকানো জায়েয নয়,
তার
প্রতিচ্ছবি দেখাও জায়েয নয়, তা সে মানুষ হোক বা গোপনাঙ্গে।
আর যে নিষিদ্ধ তাকানো শুধুমাত্র ফিতনা ও লালসার ভয়ে তা থেকে বিরত থাকে এবং এটি ছবি দেখার ক্ষেত্রেও
বিদ্যমান। সূত্র: হুকমুন
নজরি ইলা ছুরিল আওরাত, ফাতওয়া নং-৩৫২৩০০
আর
তৃতীয় কথা হলো, অশ্লীল, (পরে্নাগ্রাফি) ছবি/ভিডিও দেখা হারাম। দলিল:
আয়াত
নং-০১
Surah
Al-Araf, Verse 33:
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ
مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا
بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا
لَا تَعْلَمُونَ
আপনি বলে দিন, আমার পালনকর্তা কেবলমাত্র অশ্লীল
বিষয়সমূহ হারাম করেছেন যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গোনাহ। সূরা
ইসরা -৩৩
আয়াত
নং-০২
Surah
Al-Isra, Verse 32:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً
وَسَاءَ سَبِيلًا
আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল
কাজ এবং মন্দ পথ। সূরা ইসরা -৩২
এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোন জিনিস নিজস্বভাবে নিষিদ্ধ না হলেও তাতে যদি কোন নিষিদ্ধ বস্তুর কারণ
বা মাধ্যম হওয়ার আশংকা থাকে, তবে তাও নিষিদ্ধ হয়ে যায়। সুতরাং যে কাজ/কর্ম/দেখা হারামের দিকে নিয়ে
যাবে তা হারাম।
সারকথা হলো, সাধারণ অবস্থায় যাকে দেখা জায়েজ নেই (চৌদ্দ
শ্রেণীর লোক ব্যতিত), তার ছবি/ভিডিও দেখা জায়েজ নেই। যাকে দেখা জায়েজ , তার ছবি/ভিডিও
দেখাও জায়েজ। বর্তমান নেটের জগতে খুবই
সতর্কতার সাথে ব্যবহার করা, অবাঞ্চিত, ভীননারী-পুরুষের ছবি/ভিডিও অনিচ্ছায় আসলে
এড়িয়ে চলা কর্তব্য।
ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ مَا رَأَيْتُ شَيْئًا أَشْبَهَ
بِاللَّمَمِ مِمَّا قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم
" إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ حَظَّهُ مِنَ الزِّنَا، أَدْرَكَ
ذَلِكَ لاَ مَحَالَةَ، فَزِنَا الْعَيْنِ النَّظَرُ، وَزِنَا اللِّسَانِ الْمَنْطِقُ،
وَالنَّفْسُ تَمَنَّى وَتَشْتَهِي، وَالْفَرْجُ يُصَدِّقُ ذَلِكَ كُلَّهُ
وَيُكَذِّبُهُ ".
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বানী আদমের জন্য যিনার একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে
অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের যিনা হলো দেখা,
জিহবার
যিনা হলো কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খাহেশ সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ
তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে। তাখরিজ: মুসলিম ৪৬/৫, হাঃ
২৬৫৭, আহমাদ ৮২২২; (আধুনিক ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৬৯৬)
- والله اعلم بالصواب
উত্তর প্রদানে, মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুর রাজ্জাক