জিজ্ঞাসা-১২৯: আসসালামু
আলাইকুম। গোয়েন্দা দায়িত্বকে কি গীবত ও চোগলখোরী হিসেবে গণ্য করা
যায়?
মাওলানা শরীফুল ইসলাম থেকে বগুড়া
উত্তর: উত্তর: ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ ও বারাকাতুহ। আপনার প্রশ্নকে বুঝার জন্য কয়েক ভাগে ভাগ করেছি।
প্রশ্ন: ক। ইসলামে কোন গিবত ও চোগলখুরি হারাম ?
উত্তর: ক। মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত গুনাহ ও দোষত্রুটি অনুসন্ধান করা, কারও ক্ষতি করা,
নিজের ব্যক্তিগত আক্রশ/স্বার্থ হাসিল ইত্যাদি
উদ্দেশ্যে কারও জন্য পিছে লেগে থাকা ও গিবত করা তথা গোয়েন্দাগিরি করা
ইসলামে নিষিদ্ধ।
দলিল:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ
آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ ۖ
وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ
অর্থ: হে ঈমানদারগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে
বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা পাপ। এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ
যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা
পছন্দ করবে? বস্তুত: তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয়
কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুল কারী, পরম দয়ালু। সূরা হুজুরাত-১২
তাফসিরে
ত্ববারিতে এ আয়াতে মহান আল্লাহর বাণী: وَلَا تَجَسَّسُوا “এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না” এর ব্যাখ্যায় বলা
হয়েছে,
ولا يتتبع بعضكم عورة بعض, ولا يبحث عن سرائره, يبتغي بذلك الظهور
على عيوبه ، ولكن اقنعوا بما ظهر لكم من أمره ، وبه فحمدوا أو ذموا ، لا على ما لا
تعلمونه من سرائره
“তোমাদের কেউ
যেন কারও দোষত্রুটি জানার উদ্দেশ্য তার গোপনীয় বিষয়ের পেছনে লেগে না থাকে এবং তার
লুকায়িত বিষয়গুলো অনুসন্ধান না করে। বরং তোমরা তার বাহ্যিক বিষয়ে তুষ্ট থাকবে।
বাহ্যিক অবস্থার উপর ভিত্তি করেই মানুষ প্রশংসা অথবা নিন্দার পাত্র হবে; তোমরা তাদের গোপনীয় বিষয় সম্পর্কে যা জান তার উপর ভিত্তি করে নয়।
আব্দুল্লাহ্ বিন্আববাস্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (ﷺ) ইরশাদ
করেন:
مَنِ اسْتَمَعَ إِلَى حَدِيْثِ قَوْمٍ وَهُمْ لَهُ كَارِهُوْنَ، أَوْ
يَفِرُّوْنَ مِنْهُ صُبَّ فِيْ أُذُنِهِ الْآنُكُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
‘‘যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের কথা গুপ্তভাবে শুনলো; অথচ সে তাদের কথাগুলো শুনুক তারা তা পছন্দ করছে না অথবা তারা তার অবস্থান
টের পেয়ে তার থেকে দূরে পালিয়ে যাচ্ছে কিয়ামতের দিন এ জন্য তার কানে সিসা ঢেলে
দেয়া হবে’’। বুখারী-৭০৪২
সুতরাং এ আয়াতের উপর ভিত্তি করে বলা যায়, বর্তমানে , ফেসবুক/ইমু/হোয়াটসআপ আইডি হ্যাক করা, পাসওয়ার্ড চুরি করা, তার অজান্তে তার ইনবক্স চেক করা, গোপন ক্যামেরার সাহায্যে তার আভ্যন্তরীণ অবস্থার ভিডিও ধারণ করা, বিভিন্ন ডিভাইসের সাহায্য কথোপকথন রেকর্ড করা ইত্যাদি সব হারাম
কোন মুসলমানের দোষ গোপন করার ফায়দা:
যেমন, রাসূল (ﷺ) বলেন,
مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ গোপন রাখে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। তাখরিজ: তিরমিজী-১৭/পরিচ্ছেদ:
মুসলিমের দোষ ঢেকে রাখা প্রসঙ্গে
প্রশ্ন: খ। চোগলখোর কাকে বলে, এটা কোন অবস্থায় জায়েজ?
উত্তর: খ। ফেতনা-ফাসাদ
ও অসন্তষ্টি সৃষ্টির লক্ষে একজনের কথা অন্যজনের কাছে বলে বেড়ানোই হচ্ছে চোগলখুরি।
ইসলামে চোগলখুরিকে গোনাহের কাজ এবং হারাম। চোখলখোর
কোন অবস্থায়ই জায়েজ নেই। দলিল:
বনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ
مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
بِحَائِطٍ مِنْ حِيطَانِ الْمَدِينَةِ أَوْ مَكَّةَ فَسَمِعَ صَوْتَ إِنْسَانَيْنِ
يُعَذَّبَانِ فِي قُبُورِهِمَا فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ يُعَذَّبَانِ وَمَا يُعَذَّبَانِ فِي كَبِيرٍ ثُمَّ قَالَ بَلَى كَانَ
أَحَدُهُمَا لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ وَكَانَ الْآخَرُ يَمْشِي
بِالنَّمِيمَةِ ثُمَّ دَعَا بِجَرِيدَةٍ فَكَسَرَهَا كِسْرَتَيْنِ فَوَضَعَ عَلَى
كُلِّ قَبْرٍ مِنْهُمَا كِسْرَةً فَقِيلَ لَهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ لِمَ فَعَلْتَ
هَذَا قَالَ لَعَلَّهُ أَنْ يُخَفَّفَ عَنْهُمَا مَا لَمْ تَيْبَسَا أَوْ إِلَى
أَنْ يَيْبَسَا
একদা রাসূল (ﷺ) মদীনা বা মক্কার কোন একটি বাগানের পাশদিয়ে
অতিক্রম করছিলেন। তথায় তিনি দু'জন এমন মানুষের আওয়াজ শুনতে পেলেন, যাদেরকে
কবরে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। রাসূল (ﷺ) বললেন, তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে অথচ বড় কোন
অপরাধের কারণে আজাব দেয়া হচ্ছে না। অতঃপর তিনি বললেন, তাদের
একজন পেশাব করার সময় আড়াল করতনা। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি একজনের কথা অন্যজনের কাছে
লাগাত। এরপর নবী (ﷺ) একটি কাঁচা খেজুরের শাখা আনতে বললেন। অতঃপর
উক্ত খেজুরের শাখাটিকে দু'ভাগে বিভক্ত করে প্রত্যেক কবরের উপর একটি করে রেখে দিলেন। রাসূল (ﷺ) কে
জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কেন এরকম করলেন? উত্তরে
তিনি বললেন, হয়ত খেজুরের শাখা দু'টি
জীবিত থাকা পর্যন্ত তাদের কবরের আজাব হালকা করা হবে। তাখরিজ: বুখারী
প্রশ্ন: গ। কোন গিবত/গোয়েন্দাগিরি জায়েজ ?
উত্তর: গ। কখনও কখনও গীবত করা জরুরি। যেমন- কারও ভ্রান্ত আকিদা দ্বারা যদি সাধারণ মুসলমানের। ঈমান-আমল নষ্ট করে।
দেশ-জাতি, ইসলাম, সমাজ ও মানুষের
নিরাপত্তা বিধান, শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, চোর-ডাকাত, খুনি, সন্ত্রাসী,
জঙ্গি ও দুর্নীতিবাজ, প্রতারক ইত্যাদি অপরাধী
ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে জড়িত লোকদেরকে খুঁজে বের করা, সরকারের
বিভিন্ন পদে নিযুক্ত অযোগ্য ও ফাঁকিবাজ লোকদেরকে চিহ্নিত করা, যুদ্ধ ক্ষেত্রে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা, তাদের
সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা এবং তাদেরকে নানাভাবে নজরদারিতে রাখা ইত্যাদি উদ্দেশ্যে
সরকারি গোয়েন্দা বিভাগে (National Security Intelligence) কাজ
করা এর আওতাভুক্ত নয়। কেননা এগুলো রাষ্ট্রের উপর অপরিহার্য দায়িত্ব। সূত্র: তাফসিরে বয়ানুল
কুরআন, তাফসিরে রুহুল মাআনি সূরা হুজুরাতের ১২ নং আয়াত
এর তাফসির।
এবং তা সওয়াবের কাজ। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে-
عَنْ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ أَبِي
حَفْصٍ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ
اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم يَقُولُ : " إنَّمَا الْأَعْمَالُ
بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ
إلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ فَهِجْرَتُهُ إلَى اللَّهِ
অর্থাৎ . আমীরুল মুমিনীন আবু
হাফস্ উমার ইবন আল-খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, আমি (ﷺ) কে বলতে শুনেছি— “সমস্ত কাজের ফলাফল নির্ভর করে নিয়তের উপর, আর
প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়ত করেছে, তাই পাবে। ----------।
বুখারি শরিফ-০১, মুসলিম
শরিফ: ১৯০৭
সারকথা: যদি কোন লোকের
ব্যক্তিগত পাপাচার ও ত্রুটি-বিচ্যুতি কারও সামনে ধরা পড়ে, তাহলে প্রথমে
তাকে বুঝানো, নছিহত করা, তারপরও যদি সে না ফিরে,তখন কর্তৃপক্ষেরে নজরে আনা। তবে
সতর্কতা হলো ব্যক্তি স্বার্থ যেন না থাকে।
উপরোক্ত আপনার প্রশ্নের আলোকে বলা যায়, ব্যক্তি স্বার্থ না থাকলে সেনাবাহিনীতে আরপির কিছু দায়িত্বকে গীবত হিসেবে গণ্য করা হবে না। আর চোগলখোরী তো সর্বাবস্থায় হারাম।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দিচ্ছেন, মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুর
রাজ্জাক (বগুড়া),
0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন