মহান আল্লাহর
নিকট একজন মুমিন-মুসলমানের মর্যাদা-মূল্য
লেখক
মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রাজ্জাক (এম.এ কামিল ফিকাহ ও তাফসির, দাওরায়ে হাদিস, আততাখাস্সুস লিলআদব) ধর্ম শিক্ষক, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
মোবাইল
০১৭৩৫-৭৯১৩৮২
গ্রন্থস্বত্ব
লেখক
কর্তৃক সংরক্ষিত
কম্পিউটার
কম্পোজ
মুহাম্মাদ আব্দুর রাজ্জাক (লেখক নিজে)
লেখকের ভূমিকা
সকল প্রশংসা মহান দাতা
রব্বুল আলামিনের জন্য, যিনি আপন বান্দার
প্রতি অজস্র নিআমতের বারিধারা
বর্ষণ করে তাকে মহাসম্মান-মর্যাদায়
ভূষিত করেছেন। তারপর
লাখো-কোটি দরুদ ও সালাম
শাফিউল মুজনিবিন হজরত মুহাম্মাদ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের
প্রতি, যিনি স্বীয় জবানে মুমিন-মুসলমানের
জান-মাল-ইজ্জত
নষ্ট করা অপরের জন্য
হারাম ঘোষণা করেছেন এবং উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ জামাত তথা সকল সাহাবায়ে কেরামের প্রতি, যাঁদের ওপর পবিত্র কুরআনে মহান রবের সন্তুষ্টি ঘোষিত হয়েছে।
কুরআন কারিমের আয়াত সরাসরি আল্লাহ তাআলার কথা। আর হাদিস শরিফের বাণী প্রকৃতপক্ষে (ইনডাইরেক্ট) আল্লাহরই কথা। সুতরাং অত্র কিতাবে মুমিনের সম্মান-মর্যাদা-দামের প্রমাণার্থে হাদিস উল্লেখ করা মানে আল্লাহরই কথা। তাই এই কিতাবের নাম রাখলাম ‘মহান
আল্লাহর নিকট একজন মুমিন-মুসলমানের
মর্যাদা -মূল্য’।
প্রকৃত প্রস্তাবে সকল প্রশংসা-স্তুতি-আরাধনা,সম্মান-মর্যাদার একক হকদার মহান রাব্বুল আলামিন। কিন্তু তিনি তাঁর অফুরন্ত দয়াপরবশে মুমিন বান্দাকে সম্মান-ইজ্জত দান করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ অর্থাৎ যাবতীয় সম্মান তো শুধু আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর অনুসারী মুমিনদের জন্যেই। (সূরা মুনাফিকুন-০৮) শুধু তাই নয়, মহান রব মুমিনদেরকে নিজ দোস্ত বলে ঘোষণা
করেছেন। যেমন তিনি
ইরশাদ করেন,وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُؤْمِنِينَ অর্থ: “আর আল্লাহ হলেন
মুমিনদের বন্ধু।” সূরা আলে-ইমরান-৬৮
কিন্তু
হায়! মুমিনরা আজ শত বিভক্ত,
পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ-দ্বন্দ্ব,
ঝগড়া-ফ্যাসাদ, মারামারি-কাটাকাটিতে লিপ্ত। শাখাগত মাসয়ালা
নিয়ে দলাদলি,পরস্পরকে
গালিগালাজ, কাফের-মুশরেক ফতওয়া দিচ্ছে,
বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, একে অন্যের প্রতি কুধারণা
পোষণ করছে। খোদার দেওয়া সেই ইজ্জত আজ ভুলণ্ঠিত, পরস্পরকে অবমূল্যায়ন। ইসলামের ভ্রাতৃত্বের সেই বন্ধন যদি আমরা উপলব্ধি করতাম; হৃদয়ে জাগ্রত করতাম, তাহলে
আমরা অনেক লাভবান হতাম। কবি বলেন-
কাম্য ভাণ্ডারের চিহ্ন তোমাকে দিলাম বাতলে, আমি পৌঁছতে না পারলেও তুমি হয়ত পারবে।
উসূলে হাদিস তথা হাদিস যাচাই-বাচাই করার মানদণ্ডলব্ধ জ্ঞান যা আলেমদের আবিষ্কৃত একটি শাস্ত্র। একটি হাদিস শাস্ত্রবিদদের কারও নিকট ছহিহ বলে বিবেচিত হলেও অপর জনের কাছে তা ছহিহ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। কারও নিকট হাসান আবার কারো নিকট জয়িফ ইত্যাদি ইত্যাদি।
একটি বিষয় জ্ঞাতব্য, হাদিস কখনও জয়িফ বা দুর্বল হয় না; বর্ণনাকারীর বিভিন্ন ত্রুটি-দুর্বলতার কারণে হাদিসটিকে দুর্বল হিসেবে গণ্য করা হয়। ইসলামি কোনো বিধান ফরজ-ওয়াজিব-সুন্নাত সাব্যস্ত করতে হলে; অবশ্যই শক্তিশালী দলিল আবাশ্যক। তবে ফজিলত বর্ণনা-আমলের ক্ষেত্রে জয়িফ/দুর্বল হাদিস গৃহীত-গ্রহণীয় যা আহলে এলমেদের নিকট স্বীকৃত। যেমন, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) বলেন, “হালাল-হারামের বিষয়ে আমরা কঠোর অবস্থানে থাকি। তবে ফজিলতের ক্ষেত্রে নমনীয়তা অবল্বমন করি।” ইমাম নববি(রহ.) বলেন, “ফজিলত, উৎসাহ বা ভীতি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে জয়িফ (দুর্বল) হাদিসের আমল করা উত্তম। কিন্তু জাল হাদিস থেকে পারবে না।” তিনি আরও বলেন, “এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরাম ঐকমত্য পোষণ করেছেন।” (সূত্র : আল-আজকার,১১-১২) সুতরাং জয়িফ/দুর্বল হাদিস আর মাওজু/জাল হাদিস এক নয়। অনেকে এক বলে ভুয়া প্রপাগাণ্ডা চালাচ্ছে।
হাদিসের নাম্বারের ক্ষেত্রে “আল-জামেউল কুতুবিত তিসআ ” অ্যাপস এবং মাকতাবুশ শামেলার অনুসরণ করেছি, অনুসন্ধানকামীরা দেখে নিতে পারেন। আর যেসব বিদেশি শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে; বাংলায় রূপ কেমন হবে। এসব ক্ষেত্রে “বাংলা একাডেমি”, “ইসলামিক ফাউন্ডেশন”, মাওলানা শেখ মুহিউদ্দীনের “বাংলাভাষা ও বানানরীতি” এবং মুহাম্মাদ মুহিউদ্দীন কাসেমির-বানানচর্চা বইগুলোর অনুসরণ করেছি।
যেসব হাদিসের মান-নির্ণয় বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই; সেসব হাদিসের পর শুধু তাখরিজ বা সূত্র উল্লেখ করেছি আর যেসব হাদিসের বিষয়ে মতভেদ আছে অথবা উৎসগুলো বর্ণনা করা জরুরি মনে করেছি; সেসব ক্ষেত্রে নোট লিখে মতামত উল্লেখ করেছি।
পাঠকবৃন্দের কাছে অনুরোধ রইল। আমার এ গ্রন্থে যে কোনো ধরণের ভুল-ত্রুটি দৃষ্টিগোচর হলে অব্যশই অবগত করবেন। এ কিতাব রচনা-প্রকাশ করার ক্ষেত্রে যারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছে; আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দুনিয়া-আখেরাতে মহাসম্মানে ভূষিত করুন। আমিন!! পরিশেষে কবি ভাষায়-
ওফাতের পরে আমি, জাহানের একক স্বামী,
তোমারি আদালতে, হাজির হব যবে। হিসেবের খাতায় লিখে, রোখো গো যতন করে, অধমের গ্রন্থখানি, হে দয়ায়ম! তবে।
মুহাম্মাদ আব্দুর রাজ্জাক
১৩/০৫/২১ইং
সূচীপত্র
বিষয়
পৃষ্ঠা
ইজ্জত শুধুই আল্লাহ, তাঁর রসূল ও মুমিনদের
স্বাধীন কাফের-মুশরেক হতে মুমিন গোলাম-দাস উত্তম
একজন মুমিন বেঁচে থাকতে কিয়ামত হবে না
মুমিন আল্লাহ তাআলার নিকট কাবা ও
ফেরেশতার চেয়েও সম্মানিত
একজন মুসলমানের জন্য জিহাদের বায়আত গ্রহণ
হজরত ওমর (রা.)-এর নিকট একজন মুমিন-মুসলমানের মর্যাদা
যে কাফের ব্যক্তি কালেমা লা
ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলল, তাকে হত্যা করা হারাম
যে ব্যক্তি সালাম দিবে তাকে হত্যা করা যাবে না
ঈমান ব্যতিত
যত ভাল কাজেই হোক না কেন তা কবুলযোগ্য নয়
কোনো মুসলমানকে শরিয়তসম্মত কারণ ব্যতিরেকে কষ্ট দেওয়া হারাম
মুমিনকে কষ্ট দেওয়ার দরুন আল্লাহ তাআলার প্রতিশোধ
যে মুসলমানের ক্ষতি করবে, তার ওপর অভিশাপ
মুসলমানদের কল্যাণকামিতার উপর বায়আত গ্রহণ
মুসলমানের রাস্তা পরিষ্কার লাভজনক ব্যবসা
মুসলিম ভাইকে আনন্দদানের জন্য মুচকি হাসিও সদকা
মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না
মুসলিম ভাইয়ের তাই পছন্দ করা, যা নিজের জন্য পছন্দীয় ঈমানের অংশ
মুমিন সত্তাগত পবিত্র আর মুশরিক অপবিত্র
মুমিন বান্দার আলোচনা আসমানে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা
বান্দাকে ভালবাসার কথা আসমানে প্রচার
জিকিরের মজলিস নিয়ে আল্লাহ তাআলা
ফিরিশতাদের সামনে গর্ববোধ
বৃদ্ধ মুসলমানের সম্মান-মর্যাদা
মুমিনের উপাধিতে অন্যকিছুকে ডাকা নিষেধ
আল্লাহর ওলির (কামেল মোমিন) সাথে যে শত্রুতা করে তার বিরুব্ধে যুদ্ধের ঘোষণা
আল্লাহর নিকট রোজাদের মুখের গন্ধের মূল্য
মুমিনদের
পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ, সহমর্মিতা, সহানুভূতি
ও সহযোগিতা
মুসলমানের মাঝে মীমাংসার নিমিত্তে মিথ্যা বলা শুধু জায়েজ নয়; বরং কাম্য
মুমিন তার ভাইয়ের দামের ওপর দাম এবং বিবাহের প্রস্তাবের ওপর প্রস্তাব দিবে না
মুসলমানের প্রতি
বিদ্বেষ না রাখা বড় আমল, জান্নাতি ব্যক্তির আলামত
সব মুমিনকে ক্ষমা করা হয় তবে যারা পরস্পরে বিদ্বেষ রয়েছে তারা ব্যতিত
যে মুমিনের কষ্ট দূর
করবে, আল্লাহ তার কষ্টসমূহ দূর করবেন
যে মুসলমানের দোষ খুঁজবে আল্লাহ তাকে
লাঞ্ছিত করবেন
মুসলমানের জান-মাল-ইজ্জত সম্মানিত এবং তা নষ্ট করা হারাম
মুসলমানদের জান-মালের ক্ষতির আশঙ্কায় যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়নি
কাবার চেয়েও মুসলমানের জান-মাল ও ইজ্জত সম্মানিত
ওসমান রা.এর নিকট মুসলমানের রক্তের দাম
ইমাম হাসান(রা.) মুসলমানদের মাঝে রক্তপাত বন্ধ করার নিমিত্তে নিজ ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন
পাপ থেকে তওবার পর কোন মুসলিমকে লজ্জা না দেওয়া
যে
মুসলমানের ইজ্জতের
উপর আঘাত প্রতিরোধ করবে,আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন
কোন
মুসলিমের বিপদে আনন্দ প্রকাশ নিষিদ্ধ
যে
মুসলিম ভাইয়ের শুশ্রূষা নিয়োজিত সে জান্নাতের ফল আহরণে রত
মুসলমানের জন্য ব্যয় করার ফজিলত
দুনিয়াতে
যে মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে আল্লাহ আখেরাতে তার দোষ রাখবে
সকোন
মুসলিমের প্রতি অস্ত্র দিয়ে ইঙ্গিত করা নিষিদ্ধ
মুমিন এক গর্তে দু’বার পতিত হয় না
মুমিনের অন্তর্দৃষ্টিকে ভয় করা, কেননা সে আল্লাহ তাআলার নুর দ্বারা দেখে
ইচ্ছাকৃতভাবে
কোন মুমিনকে হত্যা করার শাস্তি
মুসলিম
জনগণের সাথে খেয়ানতকারীর জন্য জান্নাত হারাম
মুমিনের
স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ
মুমিনের জন্য নিষ্পাপ ফেরেশতারা ক্ষমা প্রার্থনা-দোআ করে
ঈমান ও তওবা আল্লাহর আজাবকে হঠিয়ে দেয়
মুমিন যত বড়ই পাপ করুক না কেন ? কাফের হয় না
সাত আসমান-জমিন থেকেও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ওজন বেশি
মুমিন যে ঈমান লালন-ধারণ করে তার দাম
নেককার মুমিনগণকে রসূলুল্লাহ (ﷺ) বন্ধু বলে সম্বোধন
মুসলমান ভাইয়ের প্রয়োজন পূর্ণ করার বা
চেষ্টা করার ফজিলত
মুমিনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার লাভ
কোন মুসলমানকে ঠাট্রা-বিদ্রুপ দ্বারা হয়রানি না করা
মুমিন মুমিনের প্রতি কুধারণা করবে না
মুমিন সম্পর্কে কোন মন্দ-খারাপ কথা শুনলে করণীয় কি ?
মুসলিম ভাইয়ের দোষ দেখলে করণীয় কী
আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মর্যাদা
আম্বিয়া-কিরামের সম্মান-মর্যাদা
ইসলামে আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের সম্মান-ইজ্জত
রসূল (ﷺ)-এর
দৃষ্টিতে ওমর (রা.)-এর মর্যাদা
রসূল
(ﷺ)-এর
দৃষ্টিতে ওসমান(রা.)-এর মর্যাদা
গরিব-নিঃস্ব সাহাবিদের সঙ্গে রসূলুল্লাহ
(ﷺ)কে অবস্থান করার নির্দেশ
অন্ধ সাহাবির পক্ষে আল্লাহ তাআলার সুপারিশ
তুমি সস্তা নও, মহান রবের নিকট তোমার অনেক দাম-ইজ্জত
আখেরাতে উচ্চমর্যাদা কেবল মুত্তাকিদের(কামেল মুমিনদের)জন্যে
অসংখ্য নিয়ামতরাজি শুধু মুমিনের জন্য বিশেষ করে আখেরাতের নিয়ামত
দুনিয়াতে জীবনোপকরণের বাহুল্য ও স্বল্পতা আল্লাহর কাছে প্রিয়পাত্র ও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আলামত নয়
মৃত্যুলগ্নে মুমিন ব্যক্তির ইজ্জত ও সুসংবাদ
মুমিন বান্দার জন্য আসমান-জমিনের ক্রন্দন
মুমিনকে সাদরে গ্রহণের জন্য কবরের প্রস্তুতি
ফেরেশতাদের একটি বিশেষ কাফেলার জানাযার সঙ্গে গমন
মৃত্যুপ্রাপ্ত মুমিনের প্রতি কবরের মহব্বত ও অভ্যর্থনা
জন্মলগ্ন-মৃত্যুকালে-পরকালে মুমিনকে আল্লাহ তাআলা ও ফেরেশতার সালাম
কিয়ামত দিবসে মুমিন-মুত্তাকিদের আল্লাহ তাআলা অতিথি হিসেবে সমবেত করবেন এবং ফেরেশতারা অভ্যর্থনা জানাবে
হাশরের ময়দানে মুমিদের চেহারা উজ্জ্বল হবে
জান্নাতে মুমিনের সুউচ্চ মর্যাদা
মুমিনকে আল্লাহ তাআলা তাঁর দোস্ত বলে ঘোষণা
মান-মর্যাদা একমাত্র আল্লাহ তাআলার সমীপে কামনা করা বাঞ্ছনীয়
মুমিন নারীদের সম্মানার্থে
কুরআনে পাকের আয়াত অবতীর্ণ
এক মুসলিম মায়ের দৌড়াদৌড়িকে আল্লাহ হজ-ওমরার অন্যতম রোকন বানালেন
কাফেররা বলে কোন দল মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ
আল্লাহ তাঁর রসূলদেরকে সর্বপ্রথম মুসলমান হওয়ার আদেশ দিয়েছেন
আত্মসম্মানের হেফাজত করা, নিজেকে লাঞ্ছিত না করা
ফেরেশতাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন
প্রিয় মুসলিমগণ! দোয়েল পাখি বাংলাদেশের জাতীয় পাখি। দুই টাকার নোটে তার ছবি। সে কি জানে-বুঝে যে, বাংলাদেশে তার জাতীয় মর্যাদা ? ঠিক তেমনি আজ অধিকাংশ মুসলিম জানে না, বুঝে না মহান আল্লাহর নিকট তার কী পরিমাণ সম্মান-মর্যাদা ও দাম।
এ ঈমানের কি মূল্য এবং মুসলমান অবস্থায় দুনিয়া ত্যাগ করা যে, কত জরুরী তা বুঝে আসবে কাফেরদের পরকালে, তারা কামনা করবে যদি পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারতাম, তাহলে মুসলমান হতাম এবং তা বুঝেছিল ফেরাউনের জাদুকররা। পবিত্র কুরআনের ভাষায়-
(১)فَلَوْ
أَنَّ لَنَا كَرَّةً
فَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
অর্থ : হায়! যদি একবার আমরা পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ পেতাম, তাহলে আমরা মুমিনের অন্তর্ভুক্ত হতাম।[1]
(২)وَمَا تَنْقِمُ
مِنَّا إِلَّا أَنْ آمَنَّا
بِآيَاتِ رَبِّنَا لَمَّا جَاءَتْنَا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ অর্থ : তুমি
তো আমাদেরকে শাস্তিদান করছো
এই জন্যে যে, আমরা আমাদের
প্রতিপালকের নিদর্শনে বিশ্বাস করেছি; যখন আমাদের
কাছে এসেছে। হে আমাদের
প্রতিপালক! আমাদেরকে
ধৈর্য দান কর এবং আমাদের
মৃত্যু দান কর মুসলমান
অবস্থায়।[2]
আল্লাহ তাআলার নির্দেশে
মুসা (আ.)
লাঠি নিক্ষেপ করলে, তখন এ বিশাল
অজগর হয়ে জাদুকরদের সাপরূপী
রশি ও লাঠিগুলো গিলে
ফেলল। জাদুকররা বুঝতে
পারলো যে, এ আসমানি ব্যবস্থা ছাড়া
আর কিছুই হতে পারে
না এবং একখনও জাদুর
কারসাজি হতে পারে না। তখনই তারা সন্ত্রস্তভাবে সেজদায়
পড়ে গেল এবং বলল, “আমরা
সৃষ্টিকুলের প্রতিপালকের ওপর ঈমান
আনলাম যিনি মুসা ও হারুনের প্রতিপালক।”
ফেরাউন
তখন তাদেরকে হাত-পা বিপরীত
কর্তন ও শূলেবিদ্ধ করার
হুমকি-ধমকি দিলে, জাদুকররা আল্লাহ
দরবারে দোআ করেন- হে আমাদের
পালনকর্তা! এই সংকটে তুমি আমাদেরকে
ধৈর্য দাও যেন তোমার
দীনের ওপর স্থির ও সুদৃঢ়
থাকতে পারি এবং তোমার
নবি মুসা (আ.)-এর অনুসারী
হিসেবে মৃত্যুদান কর।
অতঃপর তারা ফেরা্উনকে বলল, قَالُوا لَنْ نُؤْثِرَكَ
عَلَى مَا جَاءَنَا
مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالَّذِي فَطَرَنَا فَاقْضِ مَا أَنْتَ
قَاضٍ إِنَّمَا تَقْضِي هَذِهِ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا . إِنَّا آمَنَّا بِرَبِّنَا لِيَغْفِرَ لَنَا خَطَايَانَا
وَمَا أَكْرَهْتَنَا عَلَيْهِ مِنَ السِّحْرِ
وَاللَّهُ خَيْرٌ وَأَبْقَى . إِنَّهُ مَنْ يَأْتِ
رَبَّهُ مُجْرِمًا فَإِنَّ لَهُ جَهَنَّمَ
لَا يَمُوتُ فِيهَا وَلَا يَحْيَى وَمَنْ
يَأْتِهِ مُؤْمِنًا قَدْ عَمِلَ
الصَّالِحَاتِ
فَأُولَئِكَ
لَهُمُ الدَّرَجَاتُ الْعُلَى অর্থ : অত্রতব তুমি যা করতে চাও কর; তুমি তো কেবল এই পার্থিব জীবনের ওপর কর্তৃত্ব করতে পার। আমরা আমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছি যাতে তিনি ক্ষমা করেন আমাদের স্বেচ্ছাকৃত অপরাধ ও তুমি আমাদেরকে যে জাদু করতে বাধ্য করেছো সেই অপরাধ। আর আল্লাহ সর্বোত্তম ও স্থায়ী। যে তার পালনকর্তার নিকট অপরাধী হয়ে উপস্থিত হবে তার জন্য তো আছে জাহান্নাম, সেখানে সে মরবেও না, বাঁচবেও না। আর যারা তাঁর নিকট উপস্থিত হবে, মুমিন অবস্থায় সৎকাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে সর্বোচ্চ মর্যাদা।[3]
হজরত ইবনে আব্বাস, উবায়েদ ইবনে উমায়ের, কাতাদা ও ইবনে জুরাইজ (রহ.) বলেন, তারা পূর্বাহ্নে জাদুকর ছিল ও অপরাহ্নে শহিদ হল।[4]
(৩) وَلَوْ تَرَى إِذِ
الظَّالِمُونَ
مَوْقُوفُونَ
عِنْدَ رَبِّهِمْ يَرْجِعُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ
الْقَوْلَ يَقُولُ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لَوْلَا أَنْتُمْ لَكُنَّا مُؤْمِنِينَ অর্থ : হায়! যদি আপনি দেখতেন পাপিষ্ঠদেরকে যখন তাদের প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে;
তখন পরস্পর বাদ-প্রতিবাদ করতে থাকবে। যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তারা অহংকারীদেরকে বলবে, তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই মুমিন হতাম।[5]
দুনিয়াতে যারা দুর্বল এবং ছোট বলে
পরিগণিত ছিল, তাদেরকে বড়দের কথা মেনে চলতে হতো, তারা তাদের মাতব্বর এবং সমাজপতিদেরকে লক্ষ্য করে বলবে, শুধু তোমাদের জন্যেই আজ আমাদের এ দুর্দশা, তোমাদের
কারণেই আমাদের এই বিপদ, দুনিয়ার জীবনে আমরা তোমাদের কথা মেনে
ছিলাম, তাই আজ তাঁর প্রতি ঈমান এনে তথা মুমিন হয়ে জীবনকে ধন্য
করতাম।[6]
স্বয়ং ফেরাউনও ঈমান এনেছিল : যে ফেরাউন জাদুকরদের ঈমান আনার দরুন তাদের হত্যা করেছিল সেই
ফেরাউনই সলিল সমাধির সময় সত্য বুঝতে পেরে ঈমান এনেছিল; যদিও ঐ সময় তার তওবা ও ঈমান গৃহীত হয়নি। কুরআন পাকে ইরশাদ হচ্ছে- وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْيًا وَعَدْوًا حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ آمَنْتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ
إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو
إِسْرَائِيلَ
وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ
অর্থ : আমি বনি ইসরাঈলকে সাগর
পার করে দিলাম এবং ফেরাউন ও তার সৈন্য বাহিনী বিদ্বেষ পরবশ হয়ে ও ন্যায়ের সীমালংঘন
করে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল। পরিশেষে যখন সে নিমজ্জমান হল তখন সে বলল, আমি বিশ্বাস করলাম
বনি ইসরাঈল যাঁর প্রতি বিশ্বাস করে, তিনি ব্যতিত অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং আমি মুসলমানদের
অন্তর্ভুক্ত।[7]
মুমিন-এর পরিচয় : মুমিন-এর শাব্দিক অর্থ:বিশ্বাসী। কিন্তু শব্দটি মূলত (اِيْمَانٌ) ঈমান আরবি শব্দ থেকে এসেছে। পরিভাষায় যিনি ঈমানের বিষয়াদিকে বিশ্বাস করে, তাকে মুমিন
বলা হয়। সুতরাং ঈমানের পরিচয়ও জানা দরকার।
টিকা: নারী মুমিনকে(বিশ্বাসীকে) মুমিনা বলে। তবে পবিত্র কুরআনে অধিকাংশ জায়গায় মুমিন বলে সকল নারী-পুরুষকে সম্বোধন(উদ্দেশ্য) করেছেন।
ঈমানের আভিধানিক অর্থ : اِيْمَانٌ (ঈমান)শব্দটি
اِفْعَالٌ এর ওজনে(নিরাপত্তা) থেকে উৎপত্তি, যা خَوْفٌ বা ভীতির বিপরীত। ভীতি দূরীভূত
হওয়া ও নিশ্চিন্ততার নাম হল اَمْنٌ বা নিরাপত্তা। কুরআনুল কারিমে রয়েছে-
وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ
مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا অর্থাৎ আল্লাহ
তাআলা অবশ্যই ভয়-ভীতির পরে তাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করবেন।[8]
এ থেকে জানা গেল যে, اَمْنٌ শব্দটি خَوْفٌ এর বিপরীত। خَوْفٌ বা ভয়-ভীতি মুক্ত ও নিশ্চিন্ত হওয়াকে اَمْنٌ বলে। হাদিসের বাণী- قَالَ
النَّبِي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم َ الْمُؤمن من أَمنه النَّاس عَلَى
أنفسهم وَأَمْوَالهمْ
অর্থাৎ সেই ব্যক্তিই প্রকৃত মুমিন, যার দ্বারা মানুষের জান ও
মাল নিরাপদ থাকে।[9]
ঈমানের শরয়ি অর্থ : শরিয়তের পরিভাষায়
প্রত্যেক বিশ্বাসকেই ঈমান বলা হয় না। যেমন-আসমান আমাদের ওপরে আর জমিন আমাদের নিচে,
সূর্য পূর্ব
দিকে উদিত হয়। এ বিশ্বাসকে ঈমান বলা হবে না। বরং শরিয়তের দৃষ্টিতে ঐ সকল বিষয়কে পূর্ণ বিশ্বাস
করা এবং দৃঢ়ভাবে নিঃসংকোচে মেনে নেওয়াকে ঈমান বলা হয়, যা রসূল (ﷺ) আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ে এসেছে। সূত্র : উমদাতুল কারি, ১ম খণ্ড;১০২পৃষ্ঠা আল্লামা জাফর আহমদ ওসমানি (রহ.) বলেন, যেসব বিষয় রসূল (ﷺ) কর্তৃক নিশ্চিতরূপে আনীত বলে জানা যায়, তার বিস্তারিত বিষয়কে বিস্তারিতভাবে আর সংক্ষিপ্ত বিষয়কে সংক্ষিপ্তভাবে বিশ্বাস
করাকে ঈমান বলা হয়।[10]
মুসলিম-এর পরিচয় : মুসলিম শব্দটি আরবি, শাব্দিক অর্থ আত্মসমর্পনকারী,
আনুগত্যকারী। শব্দটি (ইসলাম) থেকে এসেছে। পরিভাষায় বলা হয়, যিনি ইসলামের হুকুম-আহকম মেনে চলে, তাকে মুসলিম বলে। এখন আমরা
ইসলাম সম্পর্কে জানবো ইনশাল্লাহ।
ইসলাম-এর আভিধানিক অর্থ : اِسْلَامٌ (ইসলাম) শব্দটি বাবে اِفْعَالٌ ওজনে মাসদার। سِلْمٌ থেকে উৎপত্তি, অর্থ হল-আত্মসমর্পন করা, অবনত হওয়া, সপে দেওয়া, বশ্যতা স্বীকার করা ইত্যাদি।
ইসলামের শরয়ি অর্থ: ইসলাম হল, সেই সকল বিষয়কে মেনে নেওয়া যা আমাদের পর্যন্ত তাওয়াতুর বা অকাট্যভাবে পৌঁছেছে।[11]
কাশফুল বারি শরহু সহিহিল বুখারি, ২য় খণ্ড; ৩৭পৃষ্ঠা
ঈমান ও ইসলাম মাঝে সম্পর্ক : এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মত পার্থক্য রয়েছে যে, ঈমান এবং ইসলাম এ দুটি বিষয় কি এক না, এ দুয়ের মধ্যে
কোন পার্থক্য রয়েছে?
প্রথম মত : বিজ্ঞজনের মতে উভয়ের
মাঝে পার্থক্য বিদ্যামান। যেমন, আল্লাহ তাআলার বাণী-
قَالَتِ الْأَعْرَابُ آمَنَّا قُلْ لَمْ
تُؤْمِنُوا
وَلَكِنْ قُولُوا أَسْلَمْنَا অর্থাৎ মরুবাসী
বলে, আমরা ঈমান এনেছি। বলুন, তোমরা ঈমান আনয়ন করনি;
বরং বল, আমরা বশ্যতাস্বীকার করেছি।[12]
দ্বিতীয় মত : কতিপয় মুহাদ্দিস,
দার্শনিক ও মুতাজিলাদের অধিকাংশের মতে ঈমান ও ইসলাম সমান ও সমার্থবোধক। অর্থাৎ প্রত্যেক মুমিনই মুসলিম এবং প্রত্যেক মুসলিমই
মুমিন। তাদের প্রমাণ হচ্ছে-
فَأَخْرَجْنَا مَنْ كَانَ
فِيهَا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ (35) فَمَا وَجَدْنَا فِيهَا غَيْرَ
بَيْتٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ অর্থ: সেখানে যারা ঈমানদার ছিল, আমি তাদেরকে উদ্ধার করলাম এবং সেখানে একটি ঘর ব্যতিত কোন মুসলমান আমি পাইনি।[13]
তৃতীয় মত : ঈমান দ্বারা যদি পূর্ণ ঈমান আর ইসলাম দ্বারা
পূর্ণ ইসলাম উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়, তাহলে উভয়ের মাঝে সমতার সম্পর্ক হবে, যা তিন ইমাম,মুহাদ্দিস ও স্বয়ং ইমাম বুখারি (রহ.)-এর মতাদর্শ। তাঁদের প্রমাণ فَأَخْرَجْنَا
مَنْ كَانَ فِيهَا
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فَمَا وَجَدْنَا
فِيهَا غَيْرَ بَيْتٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ সর্বসম্মতভাবে উক্ত বস্তিতে মুসলমানদের বাড়ি ছিল কেবলমাত্র একটি। অর্থাৎ হজরত লুত আলাইহিস সালামের বাড়ি বা পরিবার। আর তাঁদেরকেই মুমিন বলা হয়েছে এবং মুসলিমও বলা
হয়েছে।
চতুর্থ মত : যদি ঈমান দ্বারা শুধু অন্তরের বশ্যতা বা বিশ্বাস
আর ইসলাম দ্বারা অনির্দিষ্টভাবে বশ্যতা-আনুগত্য উদ্দেশ্য নেওয়া
হয়, তাহলে উভয়ের মাঝে عُمُوْمٌ خُصُوْصٌ مُطْلَقٌ (অবাধ সাধারণত্ব ও বিশেষত্বে)-এর সম্পর্ক হবে। এ অবস্থায়
ইসলাম হবে ব্যাপকার্থক আর ঈমান হবে বিশিষ্টার্থক। আর যদি ঈমান দ্বারা শুধু অন্তরের বিশ্বাস আর ইসলাম দ্বারা বাহ্যিক
আনুগত্য উদ্দেশ্য হয়, তাহলে উভয়ের
মাঝে বা বৈপরিত্যের সম্পর্ক
হবে।
পঞ্চম মত : আল্লামা আইনি
(রহ.) বলেন, আমার নিকট এটা অগ্রগণ্য যে, উভয়ের মাঝে عموم خصوص مِنْ وَجهٍ এর সম্পর্ক। যেমন, কতিপয় লোক মুমিন বটে কিন্তু মুসলমান হবে না। অর্থাৎ অন্তরে বিশ্বাস করেছে ঠিকই কিন্তু প্রকাশ
করার সময় পওয়ার পূর্বেই মারা গিয়েছে। তাহলে এ ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার
নিকট মুমিন কিন্তু মুসলমান নয়। উদাহরণ-পাহাড়ের ওপর একাকী বসবাসকারী ব্যক্তি।
অপর
ব্যক্তি মুখে স্বীকার করে, কিন্তু তার অন্তরে এর প্রতি বিশ্বাস
নেই, তাহলে এমন ব্যক্তি মুসলমান কিন্তু মুমিন নয়; বরং মুনাফিক। আর এক ব্যক্তি এমন রয়েছে, যে মুমিন ও মুসলিমও (অন্তরে বিশ্বাস রেখে কম-বেশি আমলও করেছে)।[14]
চূড়ান্ত মত : হাফেজ ইবনে রজব হাম্বলি
(রহ.) ঈমান ও ইসলামের শরয়ি ব্যবহার সম্পর্কে একটি
কথা বর্ণনা করেছেন যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার যোগ্য। তাহলো اَلْاِسْلَامُ وَ الْاِيْمَانُ كَاِسْمِ الْفَقِيْرِ وَ الْمِسْكِيْنِ اِذَا اِجْتِمَعًا تَفَرّقًا وَ اِذَا تفرُّقا اِجْتِمَعًا অর্থাৎ ইসলাম ও ঈমান ফকির ও মিসকিনের ন্যায় দুটি বিশেষ্য। একত্রে আসলে পৃথক অর্থ দিবে। আর পৃথকভাবে আসলে একই অর্থ দিবে। সারকথা উভয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। আভিধানিক দিক থেকে এবং শরিয়তের দিক থেকেও।[15]
ইজ্জত শুধুই আল্লাহ,
তাঁর রসূল ও মুমিনদের
يَقُولُونَ لَئِنْ رَجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ অর্থ: তারা বলে, আমরা মদিনায় ফিরে গেলে সেখানকার সবল(মুনাফেকদের) দল দুর্বল(মুসলমান) দলকে অবশ্যই সেই শহর থেকে বের করে দেবে। কিন্তু যাবতীয় শক্তি সম্মান তো আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর অনুসারী মুমিনদের জন্যেই; কিন্তু মুনাফেক দল একথাটা জানেই না।[16]
মুনাফেকরা জানে না কে শক্তি-প্রতিপত্তি আর মর্যাদার অধিকারী। স্মরণ রাখবে, মৌল আর সত্তাগত মর্যাদা তো আল্লাহর জন্য। অতঃপর তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কারণে স্তরে স্তরে রসূলের এবং ঈমানদারদের মর্যাদা। এখানে আল্লাহ তাআলার সাথে রসূলে কারিম ও মুমিনদের উল্লেখ করে বুঝানো হয়েছে যে, উজ্জতের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি যাকে ইচ্ছা আংশিক মর্যাদা দান করেন। রসূলুল্লাহ (ﷺ) ও মুমিনগণ
যেহেতু আল্লাহ তাআলার একান্ত অনুগত, পছন্দীয় ও প্রিয়পাত্র,
তাই তিনি তাঁদেরকে মর্যাদা দান
করেন। পক্ষান্তরে কাফের মুশরেকের ভাগ্যে সত্যিকার কোনো ইজ্জত নেই। আল্লাহর ইজ্জত ও মর্যাদা হলো আল্লাহর দীনের শত্রুদেকে পরাজিত করা। আর রসূলের ইজ্জত হলো অন্যান্য ধর্মের ওপর তাঁর দীনকে বিজয়ী করা। আর মুমিনের ইজ্জত হলো শত্রুদের ওপর তাঁদেরকে আল্লাহ কর্তৃক সাহায্য-সহযোগিতা দান করা।[17]
মুনাফেক সর্দারের ঈমানদার ছেলের দৃষ্টিতে নবি-সাহাবিরা সম্মানিত : বনি মুসতালিকের
যুদ্ধ শেষ। নবিজির
নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী মদিনায়
ফিরছে। পথের মধ্যে
আনসার-মুহাজিরের মধ্যে কোনো বিষয়ে
দ্বন্দ্ব-শোরগোল সৃষ্টির সুবাদে মুনাফেক
সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই
বললেন-
এবার মদিনায় পৌঁছে, সম্মানি লোকেরা (মদিনাবাসী)নীচু
সম্প্রদায়ের (মক্কাবাসী) লোকদের মদিনা
থেকে বের করে দেব। তখন তার পুত্র (আব্দুল্লাহ রা.)যিনি
তখন মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন, তখনই
তরবারি হাতে নিয়ে পিতার
সম্মুখে গিয়ে বললেন, আল্লাহ
শপথ যতক্ষণ তুমি স্বীকার
করবে না যে, তুমিই লাঞ্ছিত
আর সম্মানি রসূল-সাহাবারা-সে পর্যন্ত
তোমার রক্ষা নেই। অবশেষে
তিনি আপন পিতাকে একথা
স্বীকার করিয়ে ছাড়লেন।[18]
মুসলমান হত্যার বদনামের ভয়ে মুনাফেককে
ছাড় : সুফইয়ান ইবনে উয়াইনাহ্ (রহ.) থেকে বর্ণিত। আমর (রহ.) জাবির (রা.)-কে বলতে শুনেছেন,
আমরা এক যুদ্ধে নবি
(ﷺ)এর সাথে ছিলাম।
তখন একজন মুহাজির একজন আনসারের পশ্চাতাঘাত করেছিল। সে সময় আনসারি চীৎকার করে বলল,
হে আনসার! আর
মুহাজির ব্যক্তি ডাক দিল, হে মুহাজিরগণ! তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
কী ব্যাপার! জাহিলি
যুগের মতো হাঁক-ডাক করছ কেন? তারা বলল, হে আল্লাহর রসূল (ﷺ)! একজন মুহাজির একজন আনসারির
পশ্চাতে আঘাত করেছে। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
তোমরা এ ধরণের হাক-ডাক
ছেড়ে দাও। কেননা এতো নিন্দনীয় কাজ। এরপর ঘটনাটি ‘আব্দুল্লাহ ইবনে ওবাই শুনে বলল,
তারা কি এরূপ
কাণ্ড ঘটিয়েছে? আল্লাহর কসম! আমরা মদিনায় ফিরে গেলে সেখানকার শক্তিশালীরা
অবশ্যই দুর্বলকে বহিষ্কৃত করে দিবে। ওমর (রা.) বললেন,
হে আল্লাহর রসূল
(ﷺ) আমাকে অনুমতি
দিন, আমি
এ মুনাফেকের মস্তক উড়িয়ে দিই। তখন তিনি বললেন,
একে ছেড়ে দাও,
যাতে লোকেরা
বলতে না পারে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর সাহাবাদের
হত্যা করেন।[19]
নোট : বুখারির বর্ণনায় কিছুটা পার্থক্য আছে।
মুমিন আর কাফের কি
সমান?
আগুন-পানি, ভাল-মন্দ, বাসি-টাটকা যেমন সমান নয়, ঠিক তেমনি
মুমিন-কাফের সমান নয়। যেমন কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে: (১)وَمَا
يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ وَلَا
الظُّلُمَاتُ
وَلَا النُّورُ
وَلَا
الظِّلُّ وَلَا الْحَرُورُ وَمَا
يَسْتَوِي الْأَحْيَاءُ وَلَا الْأَمْوَاتُ
إِنَّ اللَّهَ يُسْمِعُ مَنْ يَشَاءُ
وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَنْ فِي
الْقُبُورِ অর্থ: সমান নহে অন্ধ ও চক্ষুষ্মান, অন্ধকার ও আলো, ছায়া ও তপ্তরোদ, সমান নহে জীবিত ও মৃত। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শ্রবণ করান, আপনি কবরে শায়িতদেরকে শুনাতে সক্ষম নন।[20]
এখানে আল্লাহ তাআলা মুমিন ও কাফেরের পার্থক্য সুস্পষ্টরূপে বুঝাবার জন্য পরস্পর
বিপরীত অবস্থার কয়েকটি উদাহরণ পেশ করেছেন। যেমন অন্ধ-চক্ষুষ্মান, অন্ধকার-আলো, ছায়া-রোদ এবং জীবিত-মৃত কখনও সমান হতে পারে না। ঠিক তেমনি মুমিনরা হল জীবিত ও কাফেররা হল মৃত। মৃত ব্যক্তিরা কবরস্থ পর যেমন তার কোনো কল্যাণ করার সুযোগ থাকে না, তেমনি কাফেররাও কবরস্থ মৃতের মত কোনো কল্যাণ গ্রহণ করতে পারে না। যেমন তিনি অন্যত্র বলেন, مَثَلُ
الْفَرِيقَيْنِ
كَالْأَعْمَى
وَالْأَصَمِّ
وَالْبَصِيرِ
وَالسَّمِيعِ
هَلْ يَسْتَوِيَانِ مَثَلًا অর্থ: দুই
দলের উদাহরণ দেখ; একদল অন্ধ ও বধির,
অপর দলটি চক্ষুষ্মান ও শ্রবণশক্তি সম্পন্ন। দল দুইটি কি সমান? সূরা হুদ-২৪[21]
(২) أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا
فَأَحْيَيْنَاهُ
وَجَعَلْنَا
لَهُ نُورًا يَمْشِي بِهِ فِي
النَّاسِ كَمَنْ مَثَلُهُ فِي الظُّلُمَاتِ
لَيْسَ بِخَارِجٍ مِنْهَا كَذَلِكَ زُيِّنَ لِلْكَافِرِينَ مَا كَانُوا
يَعْمَلُونَ অর্থ: আর যে ব্যক্তি মৃত ছিল
অতঃপর আমি তাকে জীবিত করেছি এবং তাকে এমন আলো দিয়েছি, যা নিয়ে সে মানুষের মধ্যে চলাফেরা করে। সে কি ঐ ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে, যে অন্ধকারে রয়েছে-সেখান থেকে বের হতে পারছে
না? এমনিভাবে কাফেরদের দৃষ্টিতে তাদের কাজকর্মকে সুশোভিত করে
দেওয়া হয়েছে।[22]
এই আয়াতে আল্লাহ পাক সেই সব মুমিনদের জন্য উদাহরণ বর্ণনা করেছেন, যাঁরা মৃত ছিল। অর্থাৎ পথভ্রষ্টতা
ও গোমরাহির মধ্যে নিপতিত হয়ে ধ্বংস হচ্ছিল। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাকে ঈমানের জ্যোতি
দান করে অন্ধকার হতে উদ্ধার করত নতুন জীবনে উপনীত করলেন। কেউ কেউ বলেন, এর দ্বারা দুই দুইজন লোকের কথা বুঝিয়েছেন, একজন হলেন
হজরত ওমর (রা.), অপরজন হলেন-আম্মার ইবনে ইয়াসার (রা.)। পক্ষান্তরে যারা পথভ্রষ্টতার অন্ধকারের নিমজ্জিত রয়েছেন; কোনো কালেই সেই অন্ধকার ভেদ করে আলোর মুখ দেখার নহে, তারা দুইজন অভিশপ্ত আবু জাহেল ও আমর ইবনে হিশাম। এক্ষেত্রে সঠিক ও বিশুদ্ধ অভিমত হল এই যে, আয়াতটি সাধারণ। প্রত্যেক মুমিন ও কাফিরের বেলায়ই এই আয়াত প্রযোজ্য হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বিশেষ কোনো লোকের কথা বুঝানোর জন্য এ আয়াত অবতীর্ণ
করেন নাই।[23]
ঈমান আলো এবং কুফর অন্ধকার : ঈমানকে আলো এবং কুফরকে অন্ধকার
বলা হয়েছে। চিন্তা
করলে বোঝা যায়, এ দৃষ্টান্তটি মোটেই কাল্পনিক নয়-বাস্তব সত্যেরই বর্ণনা। আলো ও অন্ধকারের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে চিন্তা করলে দৃষ্টান্তের স্বরূপ ফুটে
উঠবে। আলোর উদ্দেশ্য
হচ্ছে নিকট ও দূরের বস্তুসমূহ দেখা, যার ফলে ক্ষতিকর
বস্তুসমূহ বেঁচে থাকা এবং উপকারী বস্তুসমূহকে অবলম্বন করার সুযোগ পাওয়া যায়।
এখন ঈমানকে দেখুন! সেটি একটি নুর, যার আলো সমগ্র আকাশ, ভূপৃষ্ঠ এবং এগুলোর বাইরের সব বস্তুতে প্রতিফলিত। একমাত্র এ আলোই গোট বিশ্বের পরিণাম এবং সবকিছুর বিশুদ্ধ ফলাফল
দেখাতে পারে। যার কাছে
এ নুর থাকে, সে নিজেও সব ক্ষতিকর বস্তু থেকে বাঁচতে
পারে এবং অপরকেও বাঁচাতে পারে। পক্ষান্তরে যার কাছে এ আলো নেই, সে নিজে অন্ধকার
নিমজ্জিত্ সামগ্রিক বিশ্ব এবং গোটা জীবনের দিক দিয়ে কোনো বস্তু উপকারী এবং কোনো বস্তু অপকারী,
সে তা বাছাই করতে পারে না। শুধু হাতের কাছে বস্তুসমূহকে অনুমান করে কিছু চিনতে পারে। ইহকালীন জীবনই হচ্ছে হাতের কাছের
পরিবেশ। কাফের
ব্যক্তি পার্থিব ও ক্ষণস্থায়ী এ জীবন এবং এর লাভ-লোকসান চিনে নেয়। কিন্তু পরবর্তী চিরস্থায়ী এ জীবনের কোনো খবরই সে রাখে না। এ জীবনের লাভ-লোকসানের কোনো অনুভূতিও তার নেই? কুরআনে পাক এ
বিষয়টি বোঝানোর জন্যেই বলেছে, يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِنَ الْحَيَاةِ
الدُّنْيَا
وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ
هُمْ غَافِلُونَ অর্থাৎ
তারা বাহ্যিক পার্থিব জীবন এবং এর লাভ-লোকসান যৎসামান্য
বোঝে, কিন্তু পরকাল সম্পর্কে এরা একবারেই গাফেল-অজ্ঞ-মূর্খ।[24]
ঈমানের আলোর উপকার অন্যেরাও পায় : এ আয়াতে وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا
يَمْشِي بِهِ فِي
النَّاسِ বলে এ কথাও ব্যক্ত করা হয়েছে যে,
ঈমানের আলো শুধু মসজিদ, খানকা, নির্জন প্রকোষ্ঠ কিংবা হুজরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে
এ নুর প্রাপ্ত হয়, সে একে নিয়ে জনসমাবেশে
চলাফেরা করে এবং সর্বত্র এর দ্বারা নিজেও উপকৃত হয় এবং অপরকেও উপকার পৌঁছায়। আলো কোনো অন্ধকারের কাছে
পরাভূত হয় না। একটি মিটিমিটি প্রদীপ ও অন্ধকারে নতিস্বীকার
করে না, তবে প্রদীপের আলো দূর পর্যন্ত
পৌঁছে না। কিরণ প্রখর
হলে দূর পর্যন্ত পৌঁছে এবং নিস্তেজ হলে অল্প স্থান আলোকিত করে। কিন্তু সর্বাবস্থায়ই সে অন্ধকার ভেদ করে। অন্ধকার তাকে ভেদ করতে পারে না। অন্ধকার যে আলোকে ভেদ করে, সে আলোই নয়। এমনিভাবে
যে ঈমান কুফররের কাছে পরাভূত হয়ে যায়, তা ঈমানই নয়। ঈমানের নুর
মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে, সর্বাবস্থায়
ও সর্বযুগে সাথে থাকে।
এমনিভাবে এ দৃষ্টান্তে আরও একটি ইঙ্গিত রয়েছে যে, আলোর
উপকারিতা প্রত্যেক মানুষ ও জীব-জন্তু ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় সর্বাবস্থায় কিছু না কিছু ভোগ করে। এমনিভাবে মুমিনের ঈমান দ্বারা অন্যরাও কিছু না কিছু উপকার লাভ
করে, সে অনুভব করুক বা না করুক।[25]
(৩) أَفَمَنْ كَانَ مُؤْمِنًا
كَمَنْ كَانَ فَاسِقًا
لَا يَسْتَوُونَ অর্থ: ঈমানদার ব্যক্তি কি অবাধ্যের অনুরূপ? তারা সমান নয়।[26]
যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলী
প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং তাঁর রসূলের অনুসরণ করে চলেছে,তাঁরা ঐ সকল লোকের সমান হতে পারে না যারা স্বীকার করে নাই এবং রসূলগণকে অস্বীকার
করে। যেমন অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে: أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءً مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ’ যারা পাপাচারে লিপ্ত রয়েছে তারা কি এই ধারণা পোষণ করে যে, আমি তাদেরকে ঐ সকল লোকের সমান করব, যারা
ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করে ? তাদর জীবন ও মৃত্যু সমান। তারা যা ফয়সালা করছে তা মন্দ, ভাল নয়।[27]
(৪)أَمْ نَجْعَلُ
الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَالْمُفْسِدِينَ فِي الْأَرْضِ
أَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِينَ كَالْفُجَّارِ অর্থ: আমি কি বিশ্বাসী ও সৎকর্মীদেরকে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী
কাফেরদের সমতুল্য করে দেব? না খোদাভীরুদেরকে
পাপাচারীদের সমান গণ্য করব।[28]
অত্র আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,আমি এরূপ করতে পারতে পারি না। তারা সমান হতে পারে না। তাঁর সুবিচার
ও প্রজ্ঞা দ্বারা মুমিন ও কাফেরগণকে সমান গণ্য করতে পারে না।[29]
(৫)وَمَا يَسْتَوِي
الْأَعْمَى
وَالْبَصِيرُ
وَالَّذِينَ
آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَلَا الْمُسِيءُ
قَلِيلًا مَا تَتَذَكَّرُونَ
অর্থ: সমান নহে অন্ধ ও চক্ষুষ্মান এবং যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম
করে এবং যারা দুষ্কৃতিপরায়ণ। তোমরা অল্পই
উপদেশ গ্রহণ করে থাক।[30]
অর্থাৎ যারা চক্ষুষ্মান দূর দৃষ্টিসম্পন্ন আর যারা অন্ধ দৃষ্টিহীন তারা কখনো
সমান নহে। বরং এদের
মধ্যে রয়েছে অসমান্য ব্যবধান। অনুরূপ ব্যবধান
রয়েছে নেককর্মশীল মুমিন ও পাপিষ্ঠ কাফেরের মধ্যে।[31]
স্বাধীন কাফের-মুশরেক হতে মুমিন গোলাম-দাস উত্তম
এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-وَلَا
تَنْكِحُوا
الْمُشْرِكَاتِ
حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَةٍ
وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنْكِحُوا
الْمُشْرِكِينَ
حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكٍ
وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ أُولَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ
وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ
وَالْمَغْفِرَةِ
بِإِذْنِهِ
وَيُبَيِّنُ
آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ অর্থ: আর তোমরা মুশরেক নারীদেরকে বিয়ে করোনা, যতক্ষণ না তারা ঈমান গ্রহণ করে। অবশ্য মুসলমান ক্রীতদাসী মুশরেক নারী অপেক্ষা উত্তম, যদিও তাদেরকে তোমাদের কাছে ভাল লাগে। এবং তোমরা(নারীরা) কোনো মুশরেকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ো
না, যে পর্য্ন্ত সে ঈমান না আনে। একজন মুসলমান
ক্রীতদাসও একজন মুশরেকের তুলনায় অনেক ভাল, যদিও তোমরা তাদের দেখে মোহিত হও।[32]
এ আয়াতে অমুসলিমদের বিবাহ
করা হারাম ঘোষণা হয়েছে।(বিস্তারিত দেখুন-তাফসিরে মাআরেফুল কুরআন-১১৯পৃষ্ঠা)পাশাপাশি এ কথাও সুস্পষ্ট প্রামাণিত হয়েছে
যে, একজন কাফের-মুশরেকের চেহারা-অবয়ব, ধন-সম্পদ, বংশ যতই উন্নত হোক না কেন? অপরপক্ষে একজন মুমিন-মুসলমান যতই নিঃস্ব-অসহায়-নিগ্র
এমনকি ক্রীতদাস হোক তবুও সে উত্তম-শ্রেষ্ঠ-উৎকৃষ্ঠ, সম্মানিত মহান আল্লাহর নিকট, যদিও বাহ্যিক দিক থেকে তাদেরকে (অমুসলিমকে)ভাল-উত্তম মনে হয়।
মুসলমান গোলামকে আজাদ করার ফজিলত : عن أبي هريرة رضي الله تعالى عنه قال : قال رسول الله ( صلى الله
عليه وسلم ) مَنْ أَعْتَقَ رَقَبَةً مسلمة (مُؤْمِنَةً) أَعْتَقَ اللَّهُ بِكُلِّ
عُضْوٍ مِنْهُ عُضْوًا مِنْهُ مِنَ النَّارِ حَتَّى يُعْتِقَ فَرْجَهُ بِفَرْجِهِ অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,যে ব্যক্তি নিজের মুসলমান গোলামকে আজাদ করে
দিবে, আল্লাহ সেই গোলামের প্রতিটি অঙ্গের পরিবর্তে তার
মনিবের অঙ্গসমূহকে দোজখের অগ্নি থেকে মুক্ত করে দিবেন। এমনকি গোলামের লজ্জা
স্থানের পরিবর্তে তার মালিকের লজ্জা স্থানকেও।[33] এ হাদিস থেকে মুমিনের মর্যাদা প্রমাণিত হয়।
একজন মুমিন বেঁচে থাকতে কিয়ামত হবে না
এই পৃথিবীতে একজন ব্যক্তি যিনি আল্লাহ তাআলার নাম নেন (অর্থাৎ একজন মুমিন) জীবিত থাকতে কিয়ামত কায়েম
হবে না। কিয়ামত সংগঠিত হওয়ার প্রক্কালে মৃদু বাতাসে সকল মুমিন-মুসলিম মৃত্যু বরণ করবে। নিকৃষ্ট লোকদের উপর কিয়ামত হবে। যেমন হাদিস
শরিফে এসেছে-
عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: “ لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى لَا يُقَالَ فِي الْأَرْضِ: اللَّهُ اللَّهُ .
অর্থ: হজরত আনাস রা.হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন- পৃথিবীতে যতদিন “আল্লাহ আল্লাহ” বলা হবে ততদিন কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হবে না।[34] অন্য বর্ণনায় রয়েছে- আল্লাহ আল্লাহ বলার মত একটি মানুষ বাকি থাকতে কিয়ামত হবে না।[35]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “ إِنَّ اللهَ يَبْعَثُ رِيحًا مِنَ الْيَمَنِ أَلْيَنَ مِنَ الْحَرِيرِ، فَلَا تَدَعُ أَحَدًا فِي قَلْبِهِ - قَالَ أَبُو عَلْقَمَةَ مِثْقَالُ حَبَّةٍ، وَقَالَ عَبْدُ الْعَزِيزِ: مِثْقَالُ ذَرَّةٍ - مِنْ إِيمَانٍ إِلَّا قَبَضَتْهُ “
অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা রা.হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: আল্লাহ
তাআলা ইয়ামানের দিক থেকে
রেশমের চেয়ে অধিক নরম একটি
বাতাস প্রেরণ করবেন। সে দিন যার অন্তরে
সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান
থাকবে সেও এ বাতাসে
মৃত্যু বরণ করবে।[36]
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تَقُومُ السَّاعَةُ إِلَّا عَلَى شِرَارِ النَّاسِ»
অর্থ : হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.হতে বর্ণিত। নবি (ﷺ) বলেন- নিকৃষ্ট মানুষের উপর কিয়ামত সংঘটিত হবে।[37]
উপরোক্ত হাদিসসমূহ দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, একজন
মুমিন যার অন্তরে জাররা পরিমাণ ঈমান বাকি থাকা অবস্থায় আল্লাহ তাআলা পৃথিবী ধ্বংস করবেন
না, তাহলে মহান রবের নিকট একজন মুমিনের মূল্য কত তা সহজে অনুমেয়।
মুমিন আল্লাহ তাআলার নিকট কাবা ও ফেরেশতার
চেয়েও সম্মানিত
মুমিন শুধু মুমিনের কাছেই
সম্মানিত নয়, বরং আল্লাহ তাআলার নিকট সম্মানিত। যেমন শরিফে এসেছে- اِنَّ الْمُؤْمِنَ أَكْرَمَ عَلَى الله عَزَّ وَ جَلَّ অর্থ: নিশ্চয়ই মুমিন আল্লাহ আজ্জা-জাল্লা শানহুর নিকট সম্মানিত।[38]
নোট : হাদিসটির সনদ হাসান (উত্তম সনদ)।
ونظر ابن
عمر يوما إلى
البيت فقال : ما أعظمك
و أعظم حرمتك
وللمؤمن أعظم عند الله حرمة منك অর্থ : হজরত নাফে (রহ.)বলেন, একদিন হজরত ইবনে ওমর
(রা.) বাইতুল্লাহ বা কাবার দিকে তাকিয়ে
বললেন, তুমি কতই না ব্যাপক ও বিরাট! তুমি
কতই না সম্মানিত, কিন্তু তোমার চেয়েও মুমিনের সম্মান ও মর্যাদা
আল্লাহর নিকটে অনেক বেশি।[39]
নোট : ইমাম তিরমিজি (রহ.)বলেন, হাদিস হাসান গরিব।
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : لَيْسَ شَيْءٌ أَكْرَمَ عَلَى اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ
অর্থ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমের (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তাআলার নিকট মুমিনের চেয়ে কোনো জিনিস
বেশি সম্মানিত নয় ।[40]
নোট : হাদিসটির সনদ দুর্বল।
মুমিন ফেরেশতার চেয়েও সম্মানিত : যেমন হাদিস শরিফে
এসেছে-
(১ )
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ
صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمُؤْمِنُ أَكْرَمُ عَلَى اللَّهِ مِنْ
بَعْضِ مَلَائِكَتِهِ» . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ অর্থ: আবু হুরাইরা (রা.)
থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ)ইরশাদ করেন- মুমিন ব্যক্তি মহান আল্লাহর নিকট কোনো কোনো ফেরেশতার চেয়েও অধিক সম্মানী।[41]
নোট : হাদিসটি ইমাম ইবনে মাজাহ এককভাবে বর্ণনা করেছেন। তবে অন্যান্য দলিল দ্বারা শক্তিশালী হয়।
(২) اَلْمُؤْمِنُ أَكْرَم على الله
مِنَ الْمَلَائِكَةِ الْمُقَرّبِيْنَ অর্থ: মুমিন আল্লাহ তাআলার নিকট নৈকট্যশীল ফেরেশতা চেয়েও সম্মানিত।[42]
মুমিন ও ফেরেশতাদের মাঝে মার্যাদার ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশ্বাস
হল : যেমন মুহিউস সুন্নাহ (রহ.) বলেন, অর্থাৎ সাধারণ মুমিন সাধারণ ফেরেশতা থেকে শ্রেষ্ঠ
এবং বিশেষ মুমিন (নবি-রসূলগণ) বিশেষ ফেরেশতা হতে শ্রেষ্ঠ।
একজন মুসলমানের জন্য জিহাদের বায়আত গ্রহণ
হিজরি ৬ষ্ঠ সনের জিলকদ মাসে নবি
(ﷺ) একদিন স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে মদিনা থেকে মক্কায় চলে গেলেন এবং সেখানে
ওমরা পালন করলেন। নবির স্বপ্ন নিছক একটি
স্বপ্ন নয়, বরং সেটিও এক ধরণের ওহি। সুতরাং এরপর তিনি চৌদ্দশ সাহাবিসহ ওমরা পালন করার জন্য
মক্কা রওনা হলেন। কিন্তু জেদ্দা থেকে মক্কাগামী পথের পাশে হুদাইবিয়া নামক স্থানে
মক্কার মুশরেকদের দ্বারা তিনি বাধাপ্রাপ্ত হন। ফলে, মক্কায়
পৌছে ওমরা পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। পথিমধ্যে হুদাইবা নামক স্থানে উনি
তীব্র বাধার সম্মুখীন হন। এই স্থানের সানিয়াতু মিরার নামক স্থানে তাঁর উটনী বসে
যায়। অপরদিকে কুরাইশদের পক্ষ থেকে সামরিক অভিযানের হুমকি আসতে থাকে। শেষ পর্যন্ত
কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহায়ল ইবনে আমরকে দূত হিসেবে পাঠান হয়।
এই মহান বায়আতের প্রেক্ষাপট : মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে ইয়াসার (রহ.) স্বীয় সিরাত গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন: অতঃপর রসূলুল্লাহ
(ﷺ) হজরত ওমর (রা.)-কে ডেকে পাঠালেন যে, তিনি যেন মক্কায় গিয়ে কুরাইশ
নেতৃবর্গকে বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) যুদ্ধের উদ্দেশ্য আসেননি, বরং শুধু বায়তুল্লাহ শরিফের ওমরা করার করার উদ্দেশ্যে
এসেছেন। কিন্তু হজরত ওমর (রা.) রসূলুল্লাহ
(ﷺ)-এর প্রস্তাবের
পরিপ্রেক্ষিতে বললেন: ‘হে
আল্লাহর রসূল! আমার ধারণামতে এ কাজের জন্যে হজরত ওসমান
ইবনে আফফান (রা.-কে পাঠানো উচিত।
মক্কায় আমার বংশের এখন কেউ নেই।------------। তারা(কুরাইশরা) আমাকে পেলে
তো জীবিত অবস্থায় ছেড়ে দিবে না।’ রসূলুল্লাহ (ﷺ) হজরত ওমর (রা.)-এর মতকে যুক্তিযুক্ত মনে করলেন এবং হজরত ওসমান (রা.)কে আবু সুফিয়ান (রা.)
এবং অন্যান্য কুরাইশ নেতৃবর্গের নিকট পাঠিয়ে দিলেন।-----তিনি কুরাইশদের বড় বড় নেতাদের নিকট গেলেন এবং তাদের কাছে রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পয়গাম পৌঁছিয়ে দিলেন। তারা তাঁকে বললো, ‘আপনি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে চাইলে করে নিন।’ তিনি উত্তরে বললেন,“রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পূর্বে
আমি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবো এটা অসম্ভব।” তখন তারা হজরত ওসমান (রা.)-কে আটক করে দিল। ওদিকে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে এ খবর ছড়িয়ে
পড়লো যে, হজরত ওসমান (রা.)-কে শহিদ (হত্যা)করে দেওয়া
হয়েছে। এই বর্বরতার পূর্ণ খবর শুনে মুসলমানগণ এবং স্বয়ং রসূলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত মর্মাহত ও বিচলিত হয়ে পড়লেন। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, “এখন তো আমরা কোনো মীমাংসা ছাড়া এখান হতে সরছি না (অর্থাৎ
ওসমান হত্যার প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত)। সুতরাং তিনি সাহাবিদেরকে (রা.) ডাক
দিলেন এবং একটি গাছের নীচে তাঁদের নিকট হতে বায়আত গ্রহণ করলেন, তাঁরা কখনো কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করবেন না। এটাই বায়আতে রিদওয়ান নামে প্রসিদ্ধ। ইমাম বায়হাকি (রহ.) বর্ণনা করেছেন যে,
বায়আত গ্রহণের সময় রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,“হে আল্লাহ! ওসমান (রা.) আপনার রসূলের কাজে গিয়েছেন। অতঃপর তিনি নিজের
একটি হাতকে অপর হাতের ওপর রেখে হজরত ওসমান (রা.)-এর পক্ষ হতে বায়আত গ্রহণ করেন।” পরে জানা যায় যে, ওসমান রা.-এর
শাহাদতের খবরটি মিথ্যা।[43]
প্রিয় বন্ধুগণ! উল্লেখিত ঘটনা দ্বারা এই কথাই প্রমাণিত হয় যে, একজন
মুসলমানের মূল্য –সম্মান কী পরিমাণ যার কারণে চৌদ্দশ লোক
মৃত্যুর বায়আত গ্রহণ করেন। আর মহান রব্বুল আলামিন এ বায়আতের প্রতি খুশি প্রকাশ করে আয়াত নাজিল করেন যাকে বায়আতে রিদওয়ান
বা আল্লাহর সন্তুষ্টির বায়আত নামে ভূষিত করেন এবং মহাপুরস্কারে ঘোষণা করেন। শুধু
এতটুকু বলেই ক্ষান্ত হন নাই, যাঁরা রসূলের হাতে হাত দিয়ে বায়আত
গ্রহণ করেছেন তাঁদের হাতের ওপর মহান আল্লাহর হাত ছিল। যদিও আল্লাহর হাতের স্বরূপ
কারো জানা নেই এবং জানার চেষ্টা করাও দুরস্ত নয়।[44]
তথাপি মহান রবের হাতের কথা
উল্লেখ করে এই বায়আত তথা একজন মুসলমান ওসমান (রা.) এর হত্যার প্রতিশোধের শপথ মহাসম্মান-মর্যাদায়
প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
হজরত ওমর (রা.)-এর নিকট একজন মুমিন-মুসলমানের
মর্যাদা
২৩ হিজরিতে হজরত ওমর (রা.) যখন হজ আদায় করলেন ও আবতাহ নামক স্থানে অবতরণ করেন, তখন
তিনি মহান আল্লাহর দরবারে দোআ করেন ও ফরিয়াদ করে বলেন যে, তাঁর
বয়স বেশি হয়ে গিয়েছে। তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। প্রজাদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। তাই কর্তব্যে অবহেলার ভয় করছেন। তিনি মহান আল্লাহর কাছে দরখান্ত করেন যেন তাঁর কাছে তাঁকে নিয়ে নেন। আর নবি (ﷺ)–এর শহরে শাহাদত প্রদানে তিনি যেন তাকে ধন্য করেন। তিনি দোআর মধ্যে বলতেন,“হে আল্লাহ! আমি তোমার পথে শাহাদত কামনা করি
এবং তোমার রসূলের শহরে মৃত্যুবরণ করতে চাই।” আল্লাহ তাআলা তাঁর এ দোআ কবুল করেন এবং মদিনা মুনাওয়ারাতে শাহাদতের
মাধ্যমে তাঁর দুটি আবেদনই একত্রে সংযোজিত হয়। এরুপ সৌভাগ্য একটা বিরল বস্তু। আল্লাহ তাআলা যা চান তা অতিশয় সূক্ষ্মভাবে সম্পন্ন করে দেন।
রোম নিবাসী অগ্নিপূজক বংশোদ্ভূত আবু লুলু ফিরোজ নামক গোলামকে হজরত ওমর (রা.)বলেন, “আমি জানতে পেরেছি তুমি নাকি এমন চাকা তৈরি করতে পার যা বায়ু দ্বারা চলে”। আবু লুলু বলেন,“আল্লাহর শপথ! আমি তোমার জন্যে এমন এক চাকা তৈরি করব যা নিয়ে লোকজন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে আলোচনা মুখর থাকবে”। তখন সময় ছিল মঙ্গলবার বিকাল বেলা। ঘাতক দুইদিকে ধারাল খঞ্জর দ্বারা ওমর (রা.)-কে ফজরের নামাজের ইমামতি চলাকালে আঘাত করে। দিনটি ছিল বুধবার। বছরের জিলহজ মাসের বাকি ছিল মাত্র চারদিন। তাঁকে সে তিনটি/ছয়টি আঘাত করেছিল। তন্মধ্যে একটি ছিল নাভীর নিচে। তিনি দণ্ডয়মান অবস্থা থেকে ঢলে পড়েন। হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ইমামতির জন্যে তাঁর স্থলে দাঁড়ালেন। কাফেরটি তার খঞ্জরসহ প্রত্যাবর্তন করল ও যাকে সামনে পেল তাকেই আঘাত করল। এভাবে সে ১৩ জনকে আঘাত করল। তন্মধো ৬ জন মারা গেল। পরে আটকে পড়লে সে আত্মহত্যা করে। হজরত ওমর (রা.)-কে তাঁর বাড়িতে নেওয়া হয়। তার জখমি থেকে রক্ত ঝরছিল। একবার তিনি চেতনা পান আবার অচেতন হয়ে যান।
উপস্থিত লোকেরা তাঁকে সালাতের কথা স্মরণ করিয়েছেন, তখন তিনি চেতনা ফিরে পান এবং বলেন, হ্যাঁ, যে এ সালাতকে ছেড়ে দেবে তার ইসলামে কোনো অংশ নেই। তারপর সময়ের মধ্যে তিনি সালাত আদায় করেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, কে তাকে আঘাত করেছে। উপস্থিত জনতা বললেন, সে ছিল আবু লুলু, মুগিরা ইবনে শুবাহ(রা.)-এর গোলাম। একথা শুনে তিনি বললেন, “আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা যিনি আমার মৃত্যু এমন লোকের মাধ্যমে করাননি যে ঈমানের দাবি করে অথচ আল্লাহর দরবারে একটি সিজদাও করে না (অর্থাৎ সে ইসলামের অনুসারী নয়)”। জখমি হবার তিনদিন পরে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন এবং রবিবার দিন ২৪ হিজরির মুহররমের ১লা তারিখ রসূলুল্লাহ
(ﷺ) –এর হুজরায় হজরত আবু বকর (রা.)-এর পাশ্বে হজরত আয়েশা(রা.)-এর অনুমতিক্রমে তাঁকে দাফন করা হয়। আর ঐদিন আমিরুল মুমিনিন হজরত ওসমান ইবনে আফ্ফান(রা.)-এর খেলাফত আরম্ভ হয়।[45]
প্রিয় পাঠকবৃন্দ! দেখলেন তো হজরত ওমর (রা.) একজন মুসলমানের আঘাত দ্বারা মুত্যু হয়নি দেখে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করেছেন। এতে প্রমাণিত হয় একজন মুমিন-মুসলমানের মর্যাদা কত?
যে কাফের ব্যক্তি কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলল, তাকে
হত্যা করা হারাম
قَالَ سَمِعْتُ أُسَامَةَ بْنَ زَيْدٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا يَقُوْلُ
بَعَثَنَا رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِلَى الْحُرَقَةِ فَصَبَّحْنَا الْقَوْمَ فَهَزَمْنَاهُمْ وَلَحِقْتُ أَنَا وَرَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ رَجُلًا مِنْهُمْ فَلَمَّا غَشِيْنَاهُ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ فَكَفَّ الْأَنْصَارِيُّ فَطَعَنْتُهُ بِرُمْحِيْ حَتَّى قَتَلْتُهُ فَلَمَّا قَدِمْنَا بَلَغَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا أُسَامَةُ أَقَتَلْتَهُ بَعْدَ مَا قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ قُلْتُ كَانَ مُتَعَوِّذًا فَمَا زَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى تَمَنَّيْتُ أَنِّيْ لَمْ أَكُنْ أَسْلَمْتُ قَبْلَ ذَلِكَ الْيَوْمِ. وفي روايةٍ: فَقالَ رسولُ اللَّه ﷺ: أَقَالَ: لا إِلهَ إِلَّا اللَّهُ وَقَتَلْتَهُ؟! قلتُ: يَا رسولَ اللَّهِ! إِنَّمَا قَالَهَا خَوْفًا مِنَ السِّلاحِ،
قَالَ: أَفَلا شَقَقْتَ عَنْ قَلْبِهِ حَتَّى
تَعْلَمَ أَقَالَهَا أَمْ لا؟! فَمَا زَالَ
يُكَرِّرُهَا حَتَّى تَمَنَّيْتُ أَنِّي أَسْلَمْتُ يَومَئذٍ. فَكيْفَ تَصْنَعُ بلا إِله إِلَّا اللَّهُ إِذا جاءَت يوْمَ القيامَةِ؟ وفي روايةٍ: قَال:
يَا رسولَ اللَّه! اسْتَغْفِرْ لِي، قَالَ: وكَيف تَصْنَعُ بِلا إِله إِلَّا اللَّهُ إِذا جاءَت يَوْمَ القِيامَةِ؟! فَجَعَلَ لا يَزيدُ عَلى أَنْ يَقُولَ: كيفَ تَصْنَعُ بِلا إِلهَ إِلَّا اللَّهُ إِذَا جاءَتْ يَوْمَ القِيامَةِ؟! رواه مسلم.
অর্থ: ওসামা ইবনে জায়েদ রা বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
(ﷺ) আমাদেরকে
হুরকা গোত্রের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। আমরা প্রত্যুষে গোত্রটির উপর আক্রমণ করি এবং
তাদেরকে পরাজিত করি। এ সময়ে আনসারদের এক ব্যক্তি ও আমি তাদের হুরকাদের
একজনের পিছু ধাওয়া করলাম। আমরা যখন তাকে ঘিরে ফেললাম তখন সে
বলে উঠল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। এ বাক্য শুনে আনসারি তার অস্ত্র সামনে নিলেন। কিন্তু আমি
তাকে আমার বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে ফেললাম। আমরা মদিনায় ফিরার পর এ সংবাদ নবি
(ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছালে তিনি বললেন, হে ওসামা! ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছ? আমি
বললাম, সে তো জান বাঁচানোর জন্য কালিমা পড়েছিল। এর পরেও তিনি
এ কথাটি ‘হে ওসামা! ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছ’ বারবার
বলতে থাকলেন। এতে আমার মন চাচ্ছিল যে, হায়, যদি সেই দিনটির পূর্বে আমি ইসলামই গ্রহণ না করতাম।[46]
অপর এক বর্ণনায় আছে, রসূলুল্লাহ
(ﷺ) বললেন,‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলেছে এবং তাকে হত্যা করেছো? আমি বললাম হে আল্লাহর রসূল! সে কেবলমাত্র অস্ত্রের ভয়ে এই (কালেমা) বলেছে। তিনি বললেন, তমি কি তার অন্তর চিরে দেখেছিল যে,সে এ (কালেমা ) অন্তর থেকে বলেছিল কি না ? অতঃপর একথা পুনঃ পুনঃ বলতে থাকলেন। এমনকি আমি আকাঙ্ক্ষা করলাম যে, যদি আমি আজ মুসলমান হতাম।
অন্য এক বর্ণনায় আছে, রসূলুল্লাহ
(ﷺ) বললেনন ,কিয়ামতের দিন যখন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আসবে, তখন তুমি কী করবে? ওসামা (রা.)বললেন, হে আল্লাহর রসূল আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন যখন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আসবে, তখন তুমি কী করবে? (তিনি বারংবার একথা বলতে থাকলেন এবং এর চেয়ে বেশি কিছু বললেন না,)কিয়ামতের দিন যখন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আসবে, তখন তুমি কী করবে?[47]
নোট : লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠকারী
ব্যক্তিকেও হত্যা করার ফলে রসূলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত ব্যথিত হন। তাই ওসামা (রা.) চরম অনুতপ্ত হয়ে এ কথা বলেছিলেন। তিনি
বুঝাতে চেয়েছেন যে,
ঐ দিনের পর ইসলাম গ্রহণ করলে এত বড় কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন
হতে হতো না আর রসূলুল্লাহ (ﷺ)ও এত কষ্ট পেতেন না।
কোনো অমুসলিম ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করার সাথে সাথেই তার জান-মাল মুসলমানের কাছে নিরাপদ
হয়ে যায়, যদিও তার পঠিত কালেমা যে উদ্দেশ্যই হোক
না কেন? এতে একজন মুমিন তথা নব্য মুসলিমের মর্যাদা-মূল্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
তাওহিদের স্বীকৃতি দিলে তার জান-মাল নিরাপদ হয়ে যায় : রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,مَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَكَفَرَ بِمَا يُعْبَدُ مَنْ
دُونِ اللهِ، حَرُمَ مَالُهُ، وَدَمُهُ، وَحِسَابُهُ عَلَى اللهِ অর্থ: যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ এর স্বীকৃতি দান করল এবং আল্লাহ
ছাড়া অন্য সব উপাস্যকে অস্বীকার করল, তার ধন- সম্পদ ও জীবন নিরাপদ
হল এবং তার কৃতকর্মের হিসাব আল্লাহর ওপর বর্তাল।[48]
যে ব্যক্তি সালাম দিবে তাকে হত্যা করা যাবে না
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيَّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَى إِلَيْكُمُ السَّلَامَ لَسْتَ مُؤْمِنًا تَبْتَغُونَ عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فَعِنْدَ اللَّهِ مَغَانِمُ كَثِيرَةٌ كَذَلِكَ كُنْتُمْ مِنْ قَبْلُ فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْكُمْ فَتَبَيَّنُوا إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
অর্থ: হে ঈমানদার ব্যক্তিরা, তোমরা যখন
আল্লাহর পথে জেহাদের উদ্দেশ্যে রাস্তায় বের হবে, তখন বিচারবুদ্ধি
ব্যবহার করবে এবং যে তোমাদেরকে সালাম করে তাকে বলো না যে, তুমি
মুসলমান নও। তোমরা পার্থিব জীবনের সম্পদ অন্বেষণ
কর, বস্তুত আল্লাহর কাছে অনেক সম্পদ রয়েছে।[49]
ইমাম
আহমদ (রহ.) হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণনা করেন: একদিন বনি সালিম গোত্রের জনৈক
ব্যক্তি স্বীয় বকরী চরাইতে একদল সাহাবির নিকট দিয়ে যাচ্ছিল। লোকটি সাহাবিদেরকে সালাম প্রদান করলে তারা পরস্পর
বলাবলি করলেন, এই লোকটি শুধু আমাদের হাত হতে জান বাঁচানোর
জন্যে আমাদেরকে সালাম প্রদান করছে। তারা তাকে হত্যা করে তার বকরীগুলো লয়ে রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হলেন। এই ঘটনা উপলক্ষে আলোচ্য আয়াত নাজিল হয়।[50]
কেবলার অনুসারীকে কাফের না বলার তাৎপর্য : এ আয়াত থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসয়ালা জানা গেল যে, যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলমানরূপে পরিচয় দেয়, কালেমা
পাঠ করে কিংবা অন্য কোনো ইসলামি বৈশিষ্ট্য
যথা নামাজ, আযান ইত্যাদিতে যোগদান
করে, তাকে মুসলমান মনে করা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। তার সাথে মুসলমানের মতই ব্যবহার
করতে হবে এবং সে আন্তরিকভাবে মুসলমান হয়েছে না কোনো স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ইসলাম
গ্রহণ করেছে, একথা প্রমাণ করার জন্যে অপেক্ষা করতে
হবে। এ কারণেই
ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) বলেন
: আমরা কেবলার অনুসারীকে কোনো পাপ কর্মের কারণে কাফের সাব্যস্ত করি
না। কোনো কোনো
হাদিসে এ জাতীয় উক্তি বর্ণিত আছে যে, যত গুনাহগার
দুষ্কর্মীই হোক, কেবলার অনুসারীকে কাফের বলা যাবে না।[51]
মুমিন যখন এই পৃথিবীতে ছিল তখন সে
সম্মানিত ছিল। তাই তার গুপ্তাঙ্গ অপরের জন্য দেখা
ও স্পর্শ করা হারাম ছিল। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে- أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ " لاَ يَنْظُرُ الرَّجُلُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ وَلاَ الْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ وَلاَ يُفْضِي الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ فِي ثَوْبٍ وَاحِدٍ وَلاَ تُفْضِي الْمَرْأَةُ إِلَى الْمَرْأَةِ فِي الثَّوْبِ الْوَاحِدِ " .অর্থ: এক পুরুষ অপর পুরুষের গুপ্তাঙ্গের দিকে এবং এক নারী অপর নারীর
গুপ্তাঙ্গের দিকে তাকাবে না। এক পুরুষ আরেক পুরুষের সাথে এবং এক নারী আরেক নারীর
সাথে বস্ত্রহীন অবস্থায় এক কাপড়ের ভিতর শয়ন করবে না।[52]
নারী-পুরুষের সতর : পুরুষের সতর হল নাভি থেকে নিয়ে হাটু পর্যন্ত। অর্থাৎ এতটুকু স্থান অন্য
ব্যক্তিদের সামনে ঢেকে রাখা ফরজ। বাকি মানুষের সামনে যাওয়ার সময় ক্ষেত্র ও সমাজ
হিসেবে যা শালীন
ও তাকওয়া প্রকাশ করে এমন পোশাক পরিধান করা উত্তম। আর
মাহরামদের সামনে মহিলাদের সতর হল : মাথা, চুল, গর্দান, কান, হাত, পা, টাখনু, চেহারা, গর্দান
সংশ্লিষ্ট সিনার ওপরের অংশ ছাড়া বাকি পূর্ণ শরীর সতর। {ফাতাওয়া
হিন্দিয়া-৫/৩২}আর মহিলাদের নামাজের সময় হাত, পা,
মুখ ছাড়া পূর্ণ শরীরই সতর।
মৃত্যুর পর
গোসলের সময় এখনও পূর্বের ন্যায় তার লজ্জাস্থান দেখা ও স্পর্শ করা অপরের জন্য হারাম
বহাল রয়েছে। তবে গুপ্তাঙ্গে পরিষ্কারের সুবিধার্থে স্পর্শ করতে হলে হাতে কাপড় বা অন্য কিছু পেঁচিয়ে নিতে হবে, যাতে সরাসরি হাত না লাগে। যেমন সুনানে আবু দাউদে এসেছে- عَنْ عَلِيٍّ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تُبْرِزْ فَخِذَكَ، وَلَا تَنْظُرْ إِلَى فَخِذِ حَيٍّ وَلَا مَيِّتٍ» অর্থ: হজরত আলি (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূল (ﷺ) বলেছেন: নিজের উরু কাউকে দেখাবে না এবং কোনো জীবিত অথবা
মৃত ব্যক্তির উরুর প্রতি দৃষ্টিপাত করোনা।[53]
ইন্তেকালের পরও পর্দার বিধান বহাল থাকে। তাই জীবদ্দশায় যাদের সাথে দেখা
সাক্ষাত নাজায়িয ছিল তারা মৃত ব্যক্তিকে দেখতে পারবে না। সুতরাং
বেগানা পুরুষের লাশ বেগানা মহিলাদের জন্য দেখা যেমন নিষেধ, তেমনিভাবে
বেগানা মহিলার লাশ বেগানা পুরুষের জন্য দেখাও নিষেধ। তবে স্বামী স্ত্রীর চেহেরা দেখতে
পারবে। স্ত্রী স্বামীর চেহেরা ও স্পর্শ করতে
পারবে, কিন্তু স্বামী স্পর্শ করতে পারবে না। [54]
ঈমান ব্যতিত যত ভাল কাজেই হোক না কেন তা কবুলযোগ্য নয়
مَا
كَانَ لِلْمُشْرِكِينَ أَنْ يَعْمُرُوا مَسَاجِدَ اللَّهِ شَاهِدِينَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ
بِالْكُفْرِ أُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ وَفِي النَّارِ هُمْ خَالِدُونَ
(17) إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ
وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُولَئِكَ
أَنْ يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ (18) أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِّ وَعِمَارَةَ
الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي
سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَوُونَ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
(19) الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ
وَأَنْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ
অর্থ: মুশরেকরা যোগ্যতা রাখে না আল্লাহর মসজিদ আবাদ করার, যখন তারা নিজেরাই নিজেদের কুফরির স্বীকৃতি দিচ্ছে। এদের আমল বরবাদ হবে এবং এরা আগুনে স্থায়ীভাবে বসবাস
করবে। নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদ আবাদ
করবে, যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি এবং কায়েম করেছে
নামাজ ও আদায় করে জাকাত; আর আল্লাহ ব্যতিত আর আর কাউকে ভয় করে
না -----। তোমরা কি হাজিদের পানি সরবরাহ ও মসজিদুল-হারাম আবাদকরণকে সেই লোকের সমান মনে কর, যে ঈমান রাখে
আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি এবং যুদ্ধ করেছে আল্লাহর রাহে, এরা
আল্লাহর দৃষ্টিতে সমান
নয়, আর আল্লাহ জালেম লোকদের হেদায়েত করেন না। যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে ও আল্লাহর রাহে যুদ্ধ করেছে তাদের মাল ও জান দিয়ে, তাদের জন্য আল্লাহর নিকট বড় মর্তবা রয়েছে। আর তারাই সফলকাম।[55]
মক্কার অনেক মুশরেক মুসলমানদের মোকাবেলায় গর্ব সহকারে বলত, মসজিদুল-হারামের আবাদ ও হাজিদের পানি সরবরাহের ব্যবস্থা
আমরাই করে থাকি। এর উপর আর
কোনো আমল শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার হতে পারে না। তাদের এই ভ্রান্ত ধারণাপনোদনে মহান আল্লাহ উপরোক্ত আয়াত নাজিল করেন।
এ আয়াতে যে সত্যটি তুলে ধরা হয় তা
হলো, শিরক মিশ্রিত আমল তা যত বড় আমলই হোক কবুলযোগ্য নয় এবং এর
কোনো মূল্যমানও নেই। যে কারণে কোনো মুশরেক মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজিদের পানি সরবরাহ দ্বারা মুসলমানদের
মোকাবেলায় ফজিলত ও মর্যাদা লাভ করতে পারবে না। অন্যদিকে ইসলাম গ্রহণের পর ঈমান ও জেহাদের মর্যাদা মসজিদুল হারামের
রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজিদের পানি সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি। তাই যে মুসলমান ঈমান ও জেহাদে অগ্রগামী, সে জেহাদে অনুপস্থিত মুসলমানের চেয়ে অধিক মর্যাদার অধিকারী।[56]
কোনো মুসলমানকে শরিয়তসম্মত কারণ ব্যতিরেকে
কষ্ট দেওয়া হারাম
إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُهِينًا. وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا
অর্থ: যারা আল্লাহ ও রসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি ইহকালে
ও পরকালে অভিসম্পত করেন এবং তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি। যারা বিনা অপরাধে মুমিন
পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে
কষ্ট দেয়, মিথ্যা অপবাদ
ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।[57]
রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে যে কোনো প্রকারের কষ্ট দেওয়া কুফরি : উল্লেখিত প্রথম আয়াতে, যে ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে যে
কোনো প্রকার কষ্ট দেয়, তাঁর সত্তা অথবা গুণাবলীতে প্রকাশ্য
কিংবা ইঙ্গিতে কোনো দোষ বের করে, সে কাফের হয়ে যায়। আলোচ্য আয়াত দৃষ্টে তার প্রতি আল্লাহ
তাআলার অভিসম্পাত ইহকালেও এবং পরকালেও।
রসূলুল্লাহ
(ﷺ)-এর কষ্টই যে আল্লাহ তাআলার কষ্ট, একথা আব্দুর রহমান
ইবনে মুগাফফাল মুজানি (রা.)-এর নিম্নোক্ত
রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত : রসূলুল্লাহ (ﷺ)বলেন, আমার সাহাবিদের
ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর পরে তাঁদেরকে সমালোচনার লক্ষ্যস্থলে পরিণত করো না। কেননা, যে ব্যক্তি তাঁদেরকে ভালবাসে,
সে আমার ভালবাসার কারণে তাঁদেরকে ভালবাসে। আর যে তাঁদের সাথে শত্রুরা রাখে, সে আমার সাথে শত্রুতা রাখার কারণে শত্রুতা রাখে। যে তাঁদেরকে কষ্ট দেয়, সে আমাকে কষ্ট দেয়। যে আমাকে কষ্ট দেয়, সে আল্লাহকে কষ্ট দেয়, যে আল্লাহকে কষ্ট দেয়। আল্লাহ সত্বরেই তাকে পাকড়াও করবেন।
এই হাদিস থেকে জানা গেল যে, রসূলুল্লাহ
(ﷺ)-এর কষ্টের কারণে আল্লাহ তাআলাকে কষ্ট দেওয়া
হয়। অনুরূপভাবে
আরও জানা গেল যে, কোনো সাহাবিকে কষ্ট দিলে অথবা তাঁর প্রতি
ধৃষ্টতা প্রদর্শন করলে রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কষ্ট হয়।(এ বিষয়ে লেখকের ‘মুসলিম জীবন সাফল্যে চল্লিশ’ হাদিসের ১২৬ পৃষ্ঠা)[58]
মুমিন নর-নারীকে কষ্ট দেওয়া হারাম : . وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ আয়াত দ্বারা কোনো মুসলমানকে শরিয়তসম্মত কারণ ব্যতিরেকে কষ্টদানের অবৈধতা প্রমাণিত হয়েছে। সাধরণ মুসলমান নারী-পুরুষকে কষ্ট দেওয়া হারাম ও মহাপাপ।[59]
পিঁয়াজ-রসুন খেয়ে মসজিদে না
যাওয়া :
جَابِرِ
بْنِ
عَبْدِ
اللهِ،
زَعَمَ
أَنَّ
النَّبِيَّ
صلى
الله
عليه
وسلم،
قَالَ:
مَنْ
أَكَلَ
ثُومًا
أَوْ
بَصَلاً
فَلْيَعْتَزِلْنَا أَوْ قَالَ فَلْيَعْتَزِلْ مَسْجِدَنَا و فى روايته مَنْ أَكَلَ الثُّومَ وَالْبَصَلَ وَالْكُرَّاثَ فَلَا يَقْرَبَنَّ مَسْجِدَنَا فَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ تَتَأَذَّى مِمَّا يَتَأَذَّى مِنْهُ بَنُو آدَمَ » . مُتَّفَق عَلَيْهِ অর্থ:
হজরত জাবের (রা.)
থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি পিঁয়াজ-রসুন
খাবে সে যেন আমাদের থেকে অথবা আমাদের মসজিদের থেকে দূরে থাকে। তাখরিজ : বুখারি-
মুসলিম-অপর বর্ণনায় এসেছে- যে ব্যক্তি পিঁয়াজ-রসুন বা গো-রসুন
খাবে সে যেন আমাদের মসজিদের নিকটে না আসে। কেননা এসব জিনিসে মানুষ কষ্ট পায়,
তাতে ফেরেশতাগণও কষ্ট পায়।[60]
এ হাদিসের দিকে লক্ষ্য বুঝে আসে মুসলিম ভাই ও
ফেরেশতাগণ কষ্ট পাবে বিধায় ইবাদত করতে মসজিদে আসতে নিষেধ করা হয়েছে, তাহলে যে কোনভাবে বা যেকোন পন্থায় মুসলমান
ভাই কষ্ট পায় এরকম কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মুসলমানকে
ইচ্ছায় অনিচ্ছায় কষ্ট না দেওয়ার তাওফিক দিন।
সকল মুসলিম যার কাছ থেকে নিরাপদ সেই প্রকৃত মুসলিম : যেমন হাদিসে এসছে- وَعَن عَبدِ اللهِ بنِ عَمرِو بنِ العَاصِ رَضِيَ الله عَنهُمَا، عَنِ النَّبيّ ﷺ، قَالَ: «المُسْلِمُ منْ سَلِمَ المُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ، وَالمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ مَا نَهَى اللهُ عَنْهُ». مُتَّفَقٌ عَلَيهِ অর্থ: হজরত
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, নবি (ﷺ)বলেছেন, প্রকৃত মুসলিম সেই, যার মুখ
ও হাত থেকে সকল মুসলিম নিরাপদ থাকে। আর প্রকৃত মুহাজির ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ যা করতে নিষেধ করেছেন, তা ত্যাগ
করে।[61]
নোট : ইমাম তিরমিজি ও নাসায়ি (রহ.) এই হাদিসে
আরো কিছুটা বৃদ্ধি করেছেন।
কামিল মুমিন ঐ ব্যক্তি
যাকে লোকেরা নিজেদের জানমালের ব্যাপারে আমানতদার
মনে করে। উল্লেখিত হাদিসে ইশারা করা হয়েছে যে, শুধু ইসলামের রুকনগুলো আদায় করে নিলে এবং কতগুলো বিশেষ বিশেষ আকিদায় বিশ্বাস
স্থাপন করলেই কোনো ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন-মুসলিম হতে পারবে না,
বরং তাকে এটাও প্রমাণ করতে হবে যে, সে আগা-গোড়া নিরাপত্তার প্রতীক। রসূলের এই বর্ণনায় এদিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, কবিতা রচনার
ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন ব্যতিত যেমন কোনো ব্যক্তি কবি নামে আখ্যায়িত হয় না, তেমনি নিরাপত্তার প্রতিচ্ছবি
হওয়া ব্যতিত কাউকেও মুসলিম-মুমিন বলা যেতে
পারে না। এখানে হাত ও জিহ্বার বিশেষত্ব শুধু
এজন্যেও যে, এগুলোই সাধারণত অত্যাচারের মাধ্যম, নচেৎ মূল উদ্দেশ্য অত্যাচার পরিহার করা, চাই তা যে কোনো
ভাবেই হোক। উভয় অঙ্গের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, হাতের অত্যাচারের সম্পর্কে উপস্থিত ব্যক্তির সাথে জড়িত আর জিহ্বার অত্যাচার
উপস্থিত ও অনুপস্থিতি উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এতে জীবিত ও মৃতের
পার্থক্য নেই।[62]
মুসলমানকে কষ্ট দেওয়া মানে মহান আল্লাহকে কষ্ট দেওয়া : মুসলমানকে
কষ্ট দেওয়া আল্লাহ তাআলাকে কষ্ট দেওয়ারই নামান্তর। যেমন পবিত্র হাদিস এসেছে-مَنْ آذَى مُسْلِمًا فَقَدْ آذَانِى، وَمَنْ آذَانِى فَقَدْ آذَى اللَّهَ عز وجل” ” অর্থ: রসূলুল্লাহ
(ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি
কোনো মুসলমানকে
কষ্ট দিল, সে যেন আমাকে
কষ্ট দিল আর যে আমাকে
কষ্ট দিল সে আল্লাহ
তাআলাকেই কষ্ট দিল। [63]
একজন মুসলমানকে উৎপীড়ন করা, কষ্ট দেওয়া শুধু একটি সৃষ্টিকে উৎপীড়ন নয়; বরং তা রসূলকে অতিক্রম করে আল্লাহ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে। প্রিয় পাঠক ! এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তাআলার কাছে একজন মুমিন-মুসলমানের কত সম্মান-মর্যাদা।[64]
মুমিনকে কষ্ট
দেওয়ার দরুন আল্লাহ তাআলার প্রতিশোধ
إِنَّ الَّذِينَ
فَتَنُوا الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ لَمْ
يَتُوبُوا فَلَهُمْ عَذَابُ جَهَنَّمَ وَلَهُمْ عَذَابُ الْحَرِيقِ অর্থ: যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদের নিপীড়ন করেছে,
অতঃপর তাওবাহ
করেনি, তাদের
জন্যে আছে জাহান্নামের শাস্তি, আর আছে দহন যন্ত্রণা।[65]
الَّذِينَ দ্বারা উদ্দেশ্য : এখানে الَّذِينَ
দ্বারা আসহাবুল উখদূদ তথা গর্তের মালিক জালিমগণ হতে পারে অথবা যারাই এ কাজ করে
তারা সবাই الَّذِينَ
এর ভিতরে শামিল, অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত যতজন এ ধরণের কাজ
করবে সবাই এ الَّذِينَ এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা
মাজলুম মুমিনের পক্ষে প্রতিশোধ নিবেন। এতে মুমিন-মুসলিমের মূল্য-মর্যাদা
প্রকাশিত হয়।[66]
দুবার আজাব দ্বারা
উদ্দেশ্য : আয়াতে কারিমায়
দুবার আজাব উল্লেখিত হয়েছে। মুমিনকে যারা
আগুনে নিক্ষেপ করেছিল,তাদেরকে
ডাবল আজাবের কথা ঘোষণা করেছেন। এ বিষয়ে মুফাসসেরে কেরামগণ বিভিন্ন ব্যাখ্যা
দিয়েছেন। তবে আল্লামা রাজি (রহ.) বলেন, عَذَابُ جَهَنَّمَ
দ্বারা পরকালের
শাস্তির প্রতি ইঙ্গিত হতে পারে। আর وَلَهُمْ
عَذَابُ الْحَرِيقِ
দ্বারা দুনিয়ার
আগুন দ্বারা পোড়ানোর দিকে ইঙ্গিত হতে পারে। কেননা কোনো কোনো রেওয়ায়েতে মুমিনদেরকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করার পর অগ্নি স্পর্শ করার পূর্বেই আল্লাহ তাআলা তাঁদের
রূহ কবজ করে নেন। এভাবে তাদেরকে দহন যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেন। ফলে তাঁদের মৃত দ্হেই কেবল অগ্নিতে দগ্ধ হয়। অতঃপর এই অগ্নি আরও বেশি প্রজ্বলিত হয়ে তার লেলিহান শিখা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে যারা মুসলমানদের অগ্নিদগ্ধ হওয়ার তামাশা দেখছিল, তারাও এই আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। কেবল বাদশাহ ‘ইউনুস যুনওয়াস’ পালিয়ে যায়। সে অগ্নি থেকে আত্মরক্ষার জন্যে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সেখানেই সলিল সমাধি হয়। নিম্নে ঘটনাটি বর্ণনা করা হলো:
আসহাবে উখদুদের
ঈমানদীপ্ত ঘটনা : আসহাবুল উখদুদ বা গর্তওয়ালাদের কাহিনী সম্পর্কে অনেক
বর্ণনা বিদ্যমান। এর মধ্যে আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বর্ণিত ঘটনাটি এখানে
তুলে ধরা হল-রসূল (ﷺ)এর আগমনের সত্তর বছর পূর্বে ইয়েমেনের নাজরানে ‘ইউসুফ
যুনওয়াস’ নামক এক
জালিম বাদশাহ ছিল। সে এতটাই জালিম ছিল যে, নিজের রাজত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সাধারণ মানুষের উপর জাদু করে তাদেরকে বশ
করে রাখত যেন কেউ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা প্রতিবাদ করতে না পারে। এর জন্য তার এক
বিখ্যাত জাদুকর ছিল যে মানুষের উপর জাদু-টুনা চালাত এবং গ্রহ
নক্ষত্র দেখে রাজাকে ভবিষ্যতের খবরাদি দিত। কিন্তু সেই জাদুকর বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিল
তাই রাজার কাছে সে আবদার করল তাকে একটা চালাক চতুর বালক দেওয়া হোক যাকে সে
মৃত্যুর পূর্বে তার সকল জ্ঞান শিখিয়ে যেতে পারে।
তখন রাজার আদেশে অনেক যাচাই বাছাই এর পর এক বালককে নির্বাচন
করা হল। তার নাম ছিল ‘আব্দুল্লাহ ইবনে তামের’। রাজা তাকে জাদুকরের কাছে বিদ্যা অর্জন করতে আদেশ দিল। তো যথারীতি সে জাদুকরের
কাছে আসা যাওয়া করতে লাগল। কিন্তু আসা যাওয়ার পথে জনৈক খৃষ্টান পাদ্রি বসবাস করত। সেই যুগে খৃষ্ট
ধর্মই ছিল সত্য ধর্ম। তো সে পাদ্রির কথা বার্তায় কিছুটা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। এর পর
আশা যাওয়ার পথে সে পাদ্রীর কাছ থেকেও জ্ঞান অর্জন করতে থাকে। কিন্তু বাড়িতে ফিরে
আসতে এবং জাদুকরের কাছে যেতে তার দেরি হয়ে যেত পাদ্রির মজলিসে বসার কারণে। তাই
উভয় পক্ষের লোকেরা যাতে সন্দেহ না করে সেমতে পাদ্রি তাকে বলে দিল যদি জাদুকর তাকে
জিজ্ঞাস করে দেরি হল কেন তবে বলবে বাড়ি থেকে দেরিতে ছেড়েছে আর যদি বাড়ির লোকেরা
শোনে দেরি হল কেন, তবে বলবে জাদুকর দেরিতে
ছেড়েছে এবং কোনো অবস্থাতেই যেন পাদ্রির কথা না বলে।
একবার আসা যাওয়ার পথে যুবকের দৃষ্টিতে এক
হিংস্র জন্তু পড়ে যে মানুষকে যাতায়াতে সমস্যার সৃষ্টি করছিল। তো সে একটি পাথর
নিয়ে মনে মনে বলল যদি পাদ্রি সত্য হয় তবে যেন জন্তুটি মারা যায় আর জাদুকর সত্য
হয় তবে যেন জন্তুটি না মরে। এর পর পাথরটি নিক্ষেপ করলে জন্তুর মৃত্যু ঘটে। এই
খবরের মাধ্যমে যুবকের ক্ষমতার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে রাজদরবারের জনৈক অন্ধ
ব্যক্তি এসে তার অন্ধত্ব মোচনের জন্য আবেদন করে। বালক বলে সকল ক্ষমতার উৎস আল্লাহ্
তাআলা তুমি সত্য ধর্ম গ্রহণ করলে আমি চেষ্টা করে দেখব। অন্ধ এই শর্ত মেনে নিলে যুবক তার জন্য দোআ করতেই সে দৃষ্টি শক্তি ফিরে পায় এবং সে সত্য
ধর্ম গ্রহণ করে।
এই সংবাদ বাদশাহর কানে যাওয়ার পর উভয়কে গ্রেফতার করা হল
অন্ধ ব্যক্তিকে ধর্ম ত্যাগ করাতে না পারায় নির্মম ভাবে হত্যা করা হল। বালককে অনেক
নির্যাতন করার পর সে পাদ্রির নাম বলে দেয়। পাদ্রিকে এনে করাত দ্বারা মাথা থেকে চিড়ে
ফেলে হত্যা করা হল। অতঃপর বালকের অতি কষ্টকর মৃত্যু আচ্ছাদনের জন্য রাজা তাকে
পাহাড়ের উপর থেকে ফেলে হত্যা করার নির্দেশ দিল কিন্তু যারা বালকের সাথে পাহাড়ে
গেল তারাই বরং ভূকম্পনের ফলে পাহাড় থেকে পড়ে মারা গেল। যুবক তখন নিরাপদে ফিরে
এল। তারপর রাজা তাকে সমুদ্রে নিয়ে নিক্ষেপ করার আদেশ দিল। কিন্তু যারা তাকে নিয়ে
গেল তারাই সমুদ্রে নিমজ্জিত হল এবং বালক নিরাপদে ফিরে এল।
রাজা কোন ভাবেই তাকে হত্যা করতে সমর্থ হল না। অবশেষে বালক
রাজাকে বলল তুমি
শুধু আমার কথা মত কাজ করলেই আমাকে মারতে পারবে। তখন রাজা বলল ঠিক আছে। বালক বলল এই
শহরের সবচেয়ে বড় মাঠে সকল মানুষকে জড়ো কর অতঃপর তাদের সম্মুখে আমার তূণীর থেকে
একটি তীর নিয়ে ‘এই যুবকের পালনকর্তার নামে’
বলে নিক্ষেপ করলেই আমি মারা যাব। সেই অনুযায়ী
কাজ করা হলে বালকটি মারা গেল। এই বিস্ময়কর ঘটনা দেখে কতিপয় কিছু দরবারি ছাড়া সবাই
বলে উঠল আমরা এই বালকের পালনকর্তার উপর ঈমান আনলাম।
কিন্তু রাজা এতে
পেরেশান হয়ে গেল এবং তার সভাসদদের পরামর্শে বিরাট বিরাট গর্ত খনন করে তাতে অগ্নি
পূর্ণ করে ঘোষণা দিল যে,
যেই এই নতুন ধর্ম ত্যাগ না করবে তাকেই অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে। কিন্তু কেউই তাতে রাজি হল না; বরং অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত
হওয়াকে বেছে নিল। কিন্তু মাত্র একজন মহিলা তার কোলের বাচ্চার কারণে অগ্নিতে ঝাঁপ
দিতে ইতস্তত বোধ করছিল। তখন আল্লাহ তাআলা বাচ্চার জবান খুলে দেন
এবং বাচ্চা বলে উঠল ‘আম্মা আপনি সত্যের উপর আছেন’
তখন মহিলা
নিশ্চিত হয়ে আগুনে ঝাঁপ দিল। তারপর সেই আগুনই ওপরে ওঠে উল্লাসকারীকে গ্রাস করে
ফেলে, যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।[67]
আসহাবে উখদূদ মুমিনকে কেন আজাব দিয়েছিলেন? এ সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে- وَمَا نَقَمُوا
مِنْهُمْ إِلَّا أَنْ يُؤْمِنُوا
بِاللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ
الَّذِي
لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ
شَيْءٍ شَهِيدٌ অর্থ: তারা তাদেরকে
শাস্তি দিয়েছিল শুধু এ কারণে যে, তারা মহাপরাক্রমশীল প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন
করেছিল, যিনি
আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্বের অধিকারী, আর সেই আল্লাহ সবকিছু দেখছেন।[68]
বক্ষ্যমাণ
আয়াতে উল্লেখ করেছেন যে, আসহাবে উখদূদ যে মুমিনদের
ওপর নির্যাতন করেছিল, মূলত তাঁদের কোনো অপরাধই ছিল না। উক্ত কাফেরদের দৃষ্টিতে সে মুমিনগণের একটি মাত্র অপরাধ ছিল –তা হলো এই যে, তারা মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর প্রতি ঈমান এনছে, যিনি আকাশমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজাধিরাজ-সার্বভৌমত্বের
একচ্ছত্র মালিক।[69]
যে মুসলমানের
ক্ষতি করবে, তার ওপর অভিশাপ
وَعَنْ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى اللَّه عليه وسلم-: “مَلْعُونٌ مَنْ ضَارَّ مُؤْمِنًا أَوْ مَكَرَ بِهِ”. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ. অর্থ: হজরত আবু বকর
(রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
(ﷺ) বলেছেন: যে ব্যক্তি কোনো
মুসলমানের ক্ষতি সাধন করবে বা তাকে ধোঁকা দেবে সে অভিশপ্ত।[70]
নোট : ইমাম তিরমিজি (রহ.) হাদিসটিকে গরিব বলেছেন।
মুসলমানদের কল্যাণকামিতার উপর
বায়আত গ্রহণ
عَنْ
جَرِيرٍ قَالَ: «بَايَعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ عَلَى إِقَامِ
الصَّلَاةِ،
وَإِيتَاءِ
الزَّكَاةِ،
وَالنُّصْحِ
لِكُلِّ مُسْلِمٍ» অর্থ: জাবের (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট বায়আত গ্রহণ করেছি সালাত কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা এবং সমস্ত মুসলিমের মঙ্গল কামনা করার ওপর।[71]
উপরোক্ত হাদিস শরিফ থেকে প্রমাণিত
হয় যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কাছে মুসলমানদের জান-মাল-ইজ্জত এত গুরুত্বপূর্ণ যে সাহাবিদের নিকট থেকে বায়আত
তথা অঙ্গীকার নিয়েছেন।
عَنْ تَمِيمٍ الدَّارِيِّ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ:” الدِّينُ النَّصِيحَةُ , فَقُلْنَا: لِمَنْ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ: لِلهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ “ অর্থ:
হজরত আবু রুকাইয়া তামিম ইবনে আওস আদ-দারি
(রা.) হতে বর্ণিত। নবি (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, দীন ইসলামের মুল কথা হচ্ছে কল্যাণকামিতা। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কার জন্য? তিনি বললেন, মহান আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রসূল, মুসলমানদের ইমাম ও সমস্ত মুসলমানদের জন্য।[72] তাখরিজ : মুসলিম-৫৫; আবু দাউদ-৪৯৪৪; দারেমি-৪১৯৭;মুসনাদে আহমদ-১৬৯৪০
আভিধানিক অর্থে ঐ সময় نّصحَ (নুসহ) বলা হয়, যখন মধুকে মোম থেকে পরিষ্কার করে নেওয়া হয়। ইমাম মাজেরি রহ. বলেন, ‘নুসহ’-এর অর্থ কোনো বস্তুর ময়লা বের করে দেওয়া। আর তা থেকেই এ অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। ‘মুহকাম’ এ আছে যে, ‘নুসহ’ ময়লার বিপরীত শব্দ। ইবনে তারিফ লিখেছেন, ঐ সময় এর অর্থ বান্দা নিজের এবং আল্লাহর মধ্যে কোনো ভেজালযুক্ত কর্মের সৃষ্টি করবে না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুষ্কর্ম হচ্ছে, আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার বলে বিশ্বাস করা। রুদ্রময় ও দয়াময় গুণাবলী পূর্ণ পবিত্রতার সাথে স্বীকার না করা এবং তাঁর বিধি-নিষেধ পালনে পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ না করা।
‘আল্লাহর কিতাবের উপকার’ এর অর্থ হচ্ছে, পূর্ণ আদবের সাথে, সম্মানের সাথে তা পাঠ করা, মনে প্রাণে তার অর্থ স্বীকার, তার জ্ঞান-ভাণ্ডানের প্রচার করা, তা অনুসরণের জন্য সারা বিশ্ববাসীকে আহবান করা এবং তার প্রতিটি বিধি-নিষেধের কাছে নতি স্বীকার করা।
‘রসূলের উপকার’ এর অর্থ হচ্ছে, তাঁর রেসালতে বিশ্বাস স্থাপন করা,তাঁর আনীত দীন অক্ষরে অক্ষরে পালন করা, প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সাহায্যে নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকা, তাঁর সাহাবিগণ ও পরিবার-পরিজনের প্রতি ভালবাসা এবং তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।
‘আয়িম্মা মুসলিমিনের উপকার’ এর অর্থ প্রত্যেক ন্যায় কাজে তাঁদের সহযোগিতা করা, তাঁদের সাথে জিহাদে শরিক হওয়া, তাদের পেছনে নামাজ আদায় করা, যেসব সদকা বায়তুর মালের প্রাপ্য তা বিশ্বস্ততার সাথে সহজ পন্থায় তাঁদের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া এবং তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করা।
‘সাধারণ মুসলমানের উপকার’-এর অর্থ হচ্ছে, তাদেরকে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণসমূহ সম্পর্কে অবহিত করা, তাদেরকে নিপীড়ন না করা, তাদের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখা এবং উপকারের বেলায় তাদেরকে নিজেদের সমতুল্য মনে করা।
কুরআনুল কারিমে ‘নুসহ’ ও পরোপকারিতাকে আম্বিয়া কিরামের (আ.) দাওয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছেঃ قَالَ يَا
قَوْمِ لَيْسَ بِي سَفَاهَةٌ
وَلَكِنِّي
رَسُولٌ مِنْ رَبِّ
الْعَالَمِينَ
أُبَلِّغُكُمْ
رِسَالَاتِ
رَبِّي وَأَنَا لَكُمْ نَاصِحٌ أَمِينٌ অর্থ: হুদ (আ.) বললেন, হে আমার সম্প্রদায় আমি তো নির্বোধ নই; আমি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের রসূল। আমি আমার প্রতিপালকের হুকুম-আহকাম তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়ে থাকি, আমি তোমাদের একজন বিশ্বস্ত হিতৈষী। সূরা আরাফ, ৬৭-৬৮ এমনিভাবে সূরা আরাফের-৬২,৭৯নং আয়াতে উল্লেখিত আছে।[73]
মুসলমানের বিষয়ে গুরুত্ব না দিলে এবং মঙ্গল কামনা না করলে তার সাথে কোনো সম্পর্ক
নেই :
وعن حُذَيْفَةَ بنِ اليَمانِ رضي الله عنه قال: قال رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم -:”مَن لا يَهْتَمُّ بآمْرِ المُسْلِمينَ؛ فليسَ مِنْهُمْ، ومَنْ لَمْ يصبِحْ ويُمسْي ناصحاً لله ولِرَسولِه ولِكِتَابِه ولإِماَمِهِ ولعَامَّةِ المُسْلِمينَ؛ فَلَيْسَ مِنْهُمْ”. অর্থ:
হজরত হুজাইফা (রা.)বর্ণনা করেন। নবি (ﷺ) ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি
মুসলমানের কোন বিষয়ের পরওয়া
করে না, মুসলমানের সাথে তার কোনো
সম্পর্ক নেই। আর যে ব্যক্তি
সকাল হতে সন্ধ্যা বা সন্ধ্যা
হতে ভোর অবধি আল্লাহ
তাআলা,তাঁর রসূল, তাঁর কিতাব
এবং মুসলমানদের কল্যাণ কামনা
থেকে অবহেলা করে বিরত
থাকে, মুসলমানদের সাথে তার কোনো
সম্বন্ধ নেই।[74]
কোনো
মুসলমান পরামর্শ চাইলে
তাকে কল্যাণকর পরামর্শ দেওয়া : قَالَ حَدَّثَنِي حَكِيمُ بْنُ أَبِي يَزِيدٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ حَدَّثَنِي أَبِي أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ دَعُوا النَّاسَ يُصِيبُ بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ فَإِذَا اسْتَنْصَحَ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ فَلْيَنْصَحْهُ অর্থ: হজরত হাকেম ইবনে ইয়াজিদ (রা.) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। রসূলুল্লাহ
(ﷺ) বলেছেন, যদি তোমাদের কোনা
ব্যক্তি কোনো মুসমলমান ভাইয়ের
নিকট উপকারের পরামর্শ চায়, তবে তার উচিত
তাকে এমন কথা বলে দেওয়া
যা তার জন্য কল্যাণকর
হয়।[75]
গোলাম
তার মালিকের জন্য
কল্যাণের দোআ করলে
লাভ কী? عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ :« إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا نَصَحَ لِسَيِّدِهِ وَأَحْسَنَ عِبَادَةَ اللَّهِ فَلَهُ أَجْرُهُ مَرَّتَيْنِ » অর্থ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ
(ﷺ) বলেন, গোলাম যখন
স্বীয় মনিবের কুশল বা কল্যাণ কামনা করে এবং খোদার ইবাদতও সঠিকভাবে করতে থাকে,
তখন সে দ্বিগুণ সওয়াব পায়।[76]
এসব হাদিসের কোনো একটি সাধারণ
মুসলমানের সঙ্গে আর কোনো কোনটি শাসকবর্গের সাথে সম্পর্কযুক্ত এগুলো সারমর্ম হচ্ছে-শাসক থেকে নিয়ে শাসিত পর্যন্ত সবাই জাতির কল্যাণ কামনায় সমান
পর্যায়ের। যদি প্রজাদের
কেহ কেহ এতে অবহেলা করে, তবে সে দোষী। আর যদি শাসক অবহেলা করেন, তবে তিনি দোষী। বড়ই পরিতাপের বিষয়, যে জাতির ধর্মে পরস্পর কল্যাণ করা এত গুরুত্বপূর্ণ। সে জাতি আজ কল্যাণ কামনা থেকে অনেক দূরে সরে
পড়েছে। আজ কাউকেও জাতির কল্যাণ কামনায় ব্যাপৃত
হতে দেখা যায় না।[77]
মুসলিম ভাইয়ের জন্য কল্যাণকামিতার
কয়েকটি দুআঃ
দেখা হলে সালাম বিনিময় করা: إِذَا لَقِيتَهُ
فَسَلِّمْ
عَلَيْهِ
অর্থ: তুমি যখন তার
সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে,তাকে সালাম দেবে।[78] ইসলাম জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। তার প্রতিটি পদ্ধতি
ও পদক্ষেপ শ্রেষ্ঠ। আপনি কেবল ওই বাক্যটির প্রতি খেয়াল করুন, যা মুসলমান পরস্পর সাক্ষাৎ হলে বিনিময় করে থাকে অর্থাৎ ‘আসসালামু আলাইকুম’। এই ছোট্র বাক্যে কী নিগূঢ় রহস্য ও মর্ম লুকিয়ে রয়েছে। দুনিয়ার প্রত্যেক
জাতি ও সোসাইটিতে এমন বাক্য প্রচলিত রয়েছে, যা পরস্পর কুশল বিনিময়েরর জন্য প্রকাশ করা হয়। যেমন, শুভ সকাল ও শুভ সন্ধ্যা। কিন্তু তার কোনো বাক্যতেই ওই রহস্য,
মর্ম ও হাকিকত নেই, যা আসসালামু আলাইকুমের মধ্যে
রয়েছে।
সালামদাতা মুসলমান প্রথমত অন্য মুসলমানের
জন্য দোআ করল-আল্লাহ তোমাকে সবরকম বিপদ-মুসিবত, রোগ-ব্যাধি, দুশ্চিন্তা-দুর্ঘটনা, ফেতনা-ফ্যাসাদ ও গোমরাহি থেকে নিরাপদ রাখুক। দুশমনের দুশমনি, হিংসুকের হিংসা থেকে হেফাজত করুক। তা ছাড়া সে
‘আসসালামু
আলাইকুম’ বলে
তাকে আশ্বস্ত করতে চায় যে, আমার অন্তরে তোমার জন্য কল্যাণকামনা
ছাড়া কিছুই নেই।[79]
আর সালামের মত মহাকল্যাণকামিতা দোআটি দিনে একবার নয়, বরং যতবার
দেখা হবে ততবার, শুধু তাই
নয় গাছের, দেওয়াল কিংবা পাথরের আড়ালে গেলে আবার দেখা হলে সালাম করবে। যেমন পবিত্র
হাদিসে এসেছে-
عن
أبي هريرة رضي اللّه عنه، عن رسول اللّه صلى اللّه عليه وسلم قال : " إِذَا
لَقِيَ أحَدُكُمْ أخاهُ فَلْيُسَلِّمْ عَلَيْهِ، فإنْ حالَتْ بَيْنَهُما شَجَرَة
أوْ جِدَارٌ أوْ حَجَرٌ ثُمَّ
لَقِيَهُ فَلْيُسَلِّمْ عَلَيْهِ " . অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেহ যখন তার ভাইয়ের সঙ্গে
দেখা করে। সে যেন তাকে সালাম করে। তারপর যদি তাদের দুজনের
মধ্যে কোনো গাছ, দেওয়াল বা পাথরের অন্তরাল সৃষ্টি হয় এবং
এরপর আবার তারা মুখোমুখি হয়। তাহলে যেন আবার তাকে সালাম করে।[80]
হাসতে দেখলে দোআ পড়া: কোনো মুসলমানকে হাসতে দেখলে এই দোআ পড়তে হয়, أَضْحَكَ اللَّهُ سِنَّكَ
অর্থ: আল্লাহ আপনাকে সর্বদা সহাস্য রাখুন।[81]
প্রিয় পাঠক! দোআটির অর্থের
দিকে খেয়াল করুন। আল্লাহ
তাআলা আপনাকে সর্বদা হাসি-খুশি-আনন্দে রাখুন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে এমন অবস্থায়
রাখুন যেন সার্বক্ষণিক আপনার মুখে হাসি লেগেই থাকে। অর্থাৎ মুখে হাসি সর্বদা তখনি থাকবে যখন সে সর্বক্ষেত্রে সুখে-আরামে থাকবে। কোনো মুসলিম ভাইয়ের জন্য এর চেয়ে আর বড় দোআ আর কি হতে পারে?
হাঁচি দিলে দোআ পড়া:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ،
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ،
قَالَ: " إِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ، فَلْيَقُلْ: الْحَمْدُ لِلَّهِ، فَإِذَا
قَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ، قَالَ لَهُ
أَخُوهُ: يَرْحَمُكَ اللَّهُ، فَإِذَا قِيلَ لَهُ
يَرْحَمُكَ
اللَّهُ: فَلْيَقُلْ: يَهْدِيكُمُ اللَّهُ وَيُصْلِحُ بَالَكُمْ " অর্থাৎ যখন তোমাদের কোনো ব্যক্তি হাঁচি দেয়, তখন
সে যেন “আলহামদুলিল্লাহ” বলে। আর শ্রোতা যেন এর জবাবে “ইয়ারহামুকাল্লাহ” বলে। আর যখন সে
বলবে, তখন হাঁচিদাতা তাকে “ইয়াহদীকুমুল্লাহ ওয়া ইউছলিহ বালাকুম”।[82]
(ক)“ইয়ারহামুকাল্লাহ” অর্থ- আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন।
(খ)“ইয়াহদীকুমুল্লাহ ওয়া ইউছলিহ বালাকুম” অর্থ- আল্লাহ আপনাকে সঠিক পথ দেখান এবং আপনার অবস্থাকে সংশোধন করে দেন।
অসুস্থ ব্যক্তির জন্য দোআ : وعن ابن عباس رضى
الله عنهما عن النبى صلى الله عليه و سلم من عاد مريضًا لم يحضُرْ أجلُه فقال عنده سبعَ مرَّاتٍ : أسألُ اللهَ
العظيمَ ربَّ العرشِ العظيمِ أن يشفيَك إلَّا عافاه اللهُ من ذلك المرضِ
অর্থ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) রসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি এমন কোনো রোগীকে দেখতে যায়, যার
মৃত্যু নিকটবর্তী নয়(অর্থাৎ মৃত্যুর আলামত প্রকাশ পায়নি, মুমূর্ষ নয়)। তারপর তার কাছে সাতবার এ দোআটি বলে, আস-আলুল্লাহাল আজিম রব্বিল আরশিল আজিম আয় আয়াশফিকা ইল্লা আফাহুল্লাহু মিন জালিকাল মারাদ।
অর্থ: আমি বিরাট আরশের প্রভু মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা
করছি। তিনি তোমাকে রোগ মুক্তি দান করুন। তবে আল্লাহ তাকে সেই রোগ থেকে মুক্তি দান করেন।[83]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، رَضِيَ الله عَنْهُمَا ، قَالَ : دَخَلَ
رَسُولُ الله صَلَّى الله عَلَيه وسَلَّم عَلَى أَعْرَابِيٍّ يَعُودُهُ وَهُوَ
مَحْمُومٌ ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ الله
صَلَّى الله عَلَيه وسَلَّم : لاَ بَأْسَ
، طَهُورٌ إِنْ شَاءَ الله অর্থ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) জনৈক গ্রাম্য
ব্যক্তিকে তার অসুস্থাবস্থায় দেখতে গিয়েছিলেন আর তিনি যখনই কোনো অসুস্থকে দেখতে
যেতেন, তখনই বলতেন- লা বাসা তহুরুন
ইনশাল্লাহ অর্থাৎ কোনো চিন্তা নেই ইনশাল্লাহ এ রোগ গুনাহ থেকে পবিত্র করবে।[84]
জানাযা নামাজের দোআ : وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ - رضى الله عنه - قَالَ: { كَانَ رَسُولُ اَللَّهِ - صلى الله عليه
وسلم -إِذَا صَلَّى عَلَى جَنَازَةٍ يَقُولُ: "اَللَّهُمَّ اغْفِرْ
لِحَيِّنَا, وَمَيِّتِنَا, وَشَاهِدِنَا, وَغَائِبِنَا, وَصَغِيرِنَا, وَكَبِيرِنَا,
وَذَكَرِنَا, وَأُنْثَانَا, اَللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ
عَلَى اَلْإِسْلَامِ, وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى اَلْإِيمَانِ, অর্থ: তিনি
একটি জানাযার নামাজ পড়লেন এবং তাতে নিম্নোক্ত দোআ করেছেন- উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মাগফির লিহায়য়িনা ওয়া মায়য়িতিনা ওয়া ছগিরিনা ওয়া কাবিরিনা।
ওয়া জাকারিনা ওয়া উনছানা। ওয়া শাহিদিনা ওয়া গয়িবিনা। আল্লাহুম্মা মান আহইয়ায়তাহু
মিন্না ফাআহয়িহি আলাল ইসলাম ওয়া মান তাওয়াফায়তাহু মিন্না ফাতাওয়াফফাহু আলাল ঈমান।
অর্থাৎ হে আল্লাহ আমাদের মধ্যে যারা
বেঁচে আছে ও মারা গেছে, যারা ছোট ও যারা বড়, যারা উপস্থিত ও অনুপস্থিত আর
যারা পুরুষ ও যারা নারী তাদের সবাইকে ক্ষমা কর। হে আল্লাহ! আমাদের
মধ্যে যারা বেঁচে আছে, তাদেরকে ইসলামের ওপর জিন্দা রাখ। আর
আমাদের মধ্যে থেকে যাদের তুমি মৃত্যু দাও, তাদেরকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দান কর।[85]
মুসলমানের রাস্তা পরিষ্কার লাভজনক ব্যবসা
عَنْ
أَبِي بَرْزَةَ الْأَسْلَمِيِّ قَالَ: قُلْتُ:
يَا رَسُولَ اللَّهِ، دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ
أَنْتَفِعُ
بِهِ، قَالَ: “اعْزِلِ
الْأَذَى عَنْ طَرِيقِ الْمُسْلِمِينَ” অর্থ: হজরত
আবু বারজা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেন, আমি আরজ করলাম হে আল্লাহর রসূল!
আমাকে এমন আমল শিখিয়ে দিন যা আমার জন্য লাভজনক হবে। রসূল (ﷺ) বললেন, মুসলমানের যাতায়াতের রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করবে।[86]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى اللَّه عليه وسلم-: “مَرَّ رَجُلٌ بِغُصْنِ شَجَرَةٍ عَلَى ظَهْرِ طَرِيقٍ، فَقَالَ: لأُنَحِّيَنَّ هَذَا عَنْ طَرِيقِ الْمُسلمين لَا يُؤْذِيهِمْ، فَأُدْخِلَ الْجنَّةَ”. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ.
অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.)থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ
(ﷺ) বলেছেন: এক ব্যক্তি পথচলা অবস্থায় সামনে দেখে একটি গাছের ডাল
পথের ওপর পড়ে আছে। সে ভাবলো, আমি মুসলিমদের চলার পথ থেকে ডালটিকে সরিয়ে দেব, যাতে তাদের কষ্ট না হয়। এতটুকু সদিচ্ছার দরুন তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো।[87]
নোট : মুসলিম এর বর্ণনার সাথে বুখারির শব্দ ভিন্নতা রয়েছে।
মুসলিম ভাইকে আনন্দদানের জন্য মুচকি হাসিও সদকা
عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ، وَأَمْرُكَ بِالمَعْرُوفِ وَنَهْيُكَ عَنِ المُنْكَرِ صَدَقَةٌ،
وقال الترمذي:
“هذا حديث
حسن غريب
অর্থ: হজরত
আবু জর (রা)
থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: আপন ভাইকে (মুসলিম ভাইকে) আনন্দদানের জন্য একটু মুচকি হাসিও সদকা,
কোনো সৎ উপদেশ দেওয়াও সদকা, মন্দ কাজ থেকে কাউকে
বাধা দেওয়াও সদকা।-------।[88]
নোট : ইমাম তিরমিজি (রহ.)হাদিসটিকে হাসান গরিব বলেছেন।
মুসলমানদের
মধ্যে বিভেদ আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না
عن أبي هريرة؛ أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: “إنَّ اللهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلاثًا، وَيَسْخَطُ لَكُمْ ثَلاثًا، يَرْضى لَكُمْ: أنْ تَعْبدُوهُ وَلا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا، وأنْ تَعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا وَلا تَفَرَّقُوا، وأنْ تُنَاصِحُوا مَنْ وَلاهُ اللهُ أمْرَكُمْ؛ وَيَسْخَطُ لَكُمْ ثَلاثًا: قيلَ وَقَالَ، وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ، وإِضَاعَةَ الْمَالِ” অর্থ:
আবু হুরাইরা (রা.) নবি (ﷺ) হতে বর্ণনা করেন। নবি (ﷺ) বলেছেন: “আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য
তিনটি কাজ পছন্দ করেছেন এবং তিনটি
জিনিস অপছন্দ করেন। ১. তোমরা একমাত্র তাঁর
উপসনা করবে, কাউকে তাঁর
সাথে অংশীদার করবে না। ২. সবাই মিলে
আল্লাহর রশিকে শক্তভাবে আঁকড়িয়ে
ধরবে এবং নিজেদের মধ্যে
বিভেদ সৃষ্টি করবে না। ৩. যে ব্যক্তি
তোমদের শাসক হবে তাকে
সহায়তা করবে। আর তিনি
তোমাদের জন্য অপছন্দ করেন
তা হল, ১.অহেতুক আলোচনা-সমালোচনায় লিপ্ত
হওয়া, ২.বেশি (অনর্থক) প্রশ্ন
করা,
৩.ধন-সম্পদ
বিনষ্ট করা।[89]
يَا
أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ
وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
অর্থ: হে
ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমনিভাবে ভয়
করকে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ
করো না। আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়
হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।[90]
মুসলমানদের শক্তির ভিত্তি : আলোচ্য ১০২
ও ১০৩ নং আয়াতের প্রথমটিতে প্রথম এবং দ্বিতীয় মূলনীতি ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রথম মূলনীতিটি তাকওয়া বা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা। অর্থাৎ তাঁর অপছন্দীয় কাজ কর্ম থেকে বেঁচে থাকা।
মুসলমানদের জাতীয় শক্তির দ্বিতীয় ভিত্তি : وَاعْتَصِمُوا
بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا আয়াতে পারস্পরিক ঐক্যের বিষয়টি
অত্যন্ত সাবলীল ও বিজ্ঞজনোচিত ভঙ্গিতে বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ, এতে সর্বপ্রথম মানুষকে পরস্পর
ঐকবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিভেদ ও বিচ্ছন্নতা সৃষ্টি করতে নিষেধ
করা হয়েছে।
এর ব্যাখ্যা এই যে, ঐক্য ও মৈত্রী যে প্রশংসনীয় ও কাম্য, তাতে জগতের জাতি,
ধর্ম ও দেশ-কাল নির্বিশেষে সব মানুষই একমত । এতে দ্বিমতের কোনই অবকাশ নেই। সম্ভবত জগতের কোথাও এমন কোনো ব্যক্তি নেই যে, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বিবাদ-বিসংবাদকে
উপকারী ও উত্তম মনে করে। সাময়িক স্বার্থের অধীনে কয়েক ব্যক্তি কোনো বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়। স্বার্থ উদ্ধার হয়ে গেলে কিংবা স্বার্থোদ্ধারে অকৃতকার্য হলে
শুধু তাদের ঐক্যই বিনষ্ট হয় না; বরং পরস্পর শত্রুতা মাথা চাড়া
দিয়ে উঠে।
এ কারণে
কুরআন পাকে শুধু মৈত্রী, একতা, শৃঙ্খলা
ও দলবদ্ধ হওয়ার উপদেশই দান করেনি; বরং তা অর্জন করা ও মজবুত করা
ও অটুট রাখার জন্যে একটি ন্যায়ানুগ মূলনীতিও নির্দেশ করেছে। বর্তমানে এ কুরআনী মূলনীতিকে পরিত্যাগ করার কারণেই
সমগ্র মুসলিম সমাজ শতধাবিভক্ত হয়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। এ বিভেদ মেটানোর অমোঘ ব্যবস্থাই وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا অর্থাৎ ‘আল্লাহর রজ্জুকে সবাই মিলে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ কর।’ আয়াতে ব্যক্ত হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর বর্ণনায় হুযুর(ﷺ)বলেন,كتاب
الله هو
حبل الله
الممدود من
السماء الى
الارض অর্থাৎ কুরআন হল আল্লাহ তাআলার রজ্জু যা আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত প্রলম্বিত।–(ইবনে কাসির)যায়েদ ইবনে আনকাম (রা.)-এর রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে- حبل الله هو القرانঅর্থাৎ
‘আল্লাহর
রজ্জু হচ্ছে কুরআন’।–(ইবনে কাসির)
আলোচ্য আয়াতে
মুসলমানদেরকে দুটি নির্দেশ দেওয়া
হয়েছে। প্রথমত আল্লাহ
তাআলার প্রেরিত জীবন-ব্যবস্থার অনুসারী
হয়ে যাও। দ্বিতীয়তঃ
একে সবাই শক্তভাবে ধারণ
কর,
যাতে মুসলিম সম্প্রদায়ের সুশৃঙ্খল
ঐক্যবন্ধন স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিষ্ঠিত
হয়ে যায়। ইসলামের
প্রাথমিক যুগে একবার তা প্রত্যক্ষ
করা গেছে। মুসলমানদের
পারস্পরিক ঐক্যের ধনাত্মক দিক ফুটিয়ে
তোলার জন্য বলা হয়েছে :
وَلَا تَفَرَّقُوا পরস্পর
বিভেদ করো না। কুরআন
পাকের বিজ্ঞজনোচিত বর্ণনাভঙ্গি এই যে, যেখানে
ধনাত্মক দিক ফুটিয়ে তোলা
হয়,
সেখানেই ঋণাত্মক দিক উল্লেখ
করে বিপরীত রাস্তায় অগ্রসর
হওয়া থেকে বারণ করা হয়।
এছাড়া কুরআনুল
কারিমে বিভিন্ন পয়গম্বরের উম্মতের
ঘটনাবলি বর্ণনা করে দেখিয়েছে
যে,
তারা কিভাবে পারস্পরিক মতবিরোধ
ও অনৈক্যের কারণে জীবনের উদ্দেশ্য
থেকে বিচ্যুত হয়ে ইহলৌকিক
ও পারলৌলিক লাঞ্ছনায় পতিত হয়েছে।[91]
মুসলমানদের ঐক্য আল্লাহর আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল : মুসলমানরা যদি শক্তিশালী
সংগঠন ও ঐক্য কামনা
করে,
তবে একমাত্র উপায় হচ্ছে
আল্লাহ তাআলার আনুগত্যকে অঙ্গের
ভূষণ করে নেয়া। এদিকে
ইশারা করার জন্যই আয়াতে
শেষাংশে বলা হয়েছে, كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তোমাদের
জন্যে সত্যাসত্য সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা
করেন-যাতে তোমরা বিশুদ্ধ পথে থাক।[92]
ইজতেহাদি (গবেষণালব্ধ মাসয়ালা) মতবিরোধে
কোনো পক্ষের নিন্দাবাদ জায়েয় নয় : তাদের মত হয়ো না, যারা প্রকৃষ্ট প্রমাণাদি
আসার পর পরস্পর মতবিরোধ করেছে। উদ্দেশ্য এই যে, ইহুদি খ্রিষ্টানদের মত হয়ো না। আয়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, বিচ্ছন্নতা ও মতবিরোধের কারণে পূর্ববর্তী জাতিসমূহ ধ্বংস হয়ে গেছে। তোমরা তাদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর এবং নিজেদের মধ্যে এ ব্যাধি
অনুপ্রবেশ করতে দিও না। জ্ঞাতব্য
যে, কুরআন ও হাদিসের বর্ণনা দুই প্রকার। ১. ছরিহ বা সুস্পষ্ট যার ব্যাখ্যার কোনো অবকাশ নেই, বিশ্বের কোনো আলেমদের দ্বিমত নেই। যেমন- তাওহিদ, রেসালাত, পরকাল,
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজানের রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি। যাকে ইসলামের মৌলিক বিষয় বলে। ২. কিনায়া বা অস্পষ্ট যার ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে। অস্পষ্ট বলতে একই বিষয়ে একাধিক বর্ণনা বা বিপরীতমুখী বর্ণনা
কিংবা এমন শব্দ যার দুটি অর্থবহন করে অথবা কোনো বিষয়ে শরিয়তের সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই
ইত্যাদি ইত্যাদি এসব ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন-সুন্নাহর সুগভীর জ্ঞান ধারণকারী ইমাম-ফুকাহা-মুজতাহিদগণ কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মাসয়ালা বাতলান
(অভিমত পেশ করেন), সমাধান পেশ করেন, শরিয়তের শাখা-প্রশাখাগত বিষয়ে। তবে তা আয়াতের উল্লেখিত নিন্দার আওতায় পড়বে না। বুখারি-মুসলিমের বর্ণনায় এ ধরণের মতবিরোধের সমর্থন এবং অনুমতি পাওয়া যায়। হাদিসটি এই ‘যদি কেই ইজতেহাদ করে এবং সঠিক নির্দেশ
প্রকাশ করে, তবে সে দ্বিগুণ সওয়াব
পাবে। আর যদি ইজতেহাদ ভুল করে তবুও একটি
সওয়াব পাবে।’
এতে বুঝা যায় যে, ইজতেহাদ সম্পর্কিত মতবিরোধ ভুল হলেও
যখন একটি সওয়াব পাওয়া যায়, তখন তা নিন্দনীয় হতে পারে না। সুতরাং সাহাবায়ে-কেরাম
ও মুজতাহিদ ইমামগণের মধ্যে যেসব ইজতেহাদি মতবিরোধ হয়েছে, সেসবগুলোই
কোনো না কোনো পর্যায়ে আলোচ্য আয়াতের সাথে সম্পর্কহীন। হজরত কাসেম ইবনে মুহাম্মাদ ও হজরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) বলেন, সাহাবায়ে-কেরামের মতবিরোধ মুসলমানদের জন্যে রহমত ও মুক্তির কারণ স্বরূপ।–(রুহুল-মা-আনি)
ইজতেহাদের নীতিমালা যথাযথভাবে পালন করার পরও যদি ইজতেহাদি মতবিরোধ দেখা দেয়, তবে তা আলোচ্য وَلَا
تَفَرَّقُوا আয়াতের পরিপন্থি ও নিন্দনীয়
নয়। কিন্তু আজকাল মুসলমানদের মধ্যে কি
হচ্ছে? আজকাল এতদম্পর্কিত আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ককেই দীনের ভিত্তি মনে করা হচ্ছে এবং এ নিয়ে গালি-গালাজ, লড়াই-ঝগড়া, এমনকি মারামারি পর্যন্ত সংঘটিত হচ্ছে, আমিন জোরে না আস্তে,
হাত বুকে না নাভির নিচে ইত্যাদি কারণে মসজিদ আলাদা হচ্ছে, মাযহাব অনুসারীকে কাফের-মুশরেক ফতোওয়া দিচ্ছে। এ সমস্ত আচরণ অবশ্যই আলোচ্য আয়াতের সুস্পষ্ট বিরোধী, নিন্দনীয় এবং সাহাবায়ে-কেরাম ও তাবেয়িগণের
রীতির পরিপন্থি। পূর্ববর্তী
মনীষীগণের মধ্যে ইজতেহাদি মতবিরোধ নিয়ে বিপক্ষ দলের সাথে এরূপ ব্যবহারের কথা কখনও শোনা
যায়নি।[93]
ইজতেহাদি মত-পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পরস্পর সম্পর্ক ও আচরণ
কেমন হবে? এই পৃথিবীতে অসংখ্য
মানুষের চেহেরা আল্লাহ তাআলা কারও সাথে কারও ১০০% মিল রাখেননি,
এটা তাঁর অপার সৃষ্টি কৌশল-কুদরত। সুতরাং বাহ্যিক যেহেতু মিল নাই, অভ্যন্তরীণ(মনের) মিল
না থাকাই স্বাভাবিক। তাইতো মানুষের
রুচি-বুঝ-মেধা
ভিন্ন। আমরা যদি লক্ষ্য করি দেখবো প্রতিটি
যুগেই দীনদার-মুত্তাকি-আহলে এলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে(এই মতভেদ শাখাগত বিষয়;
মৌলিকবিশেষে মতভেদ চলে না)। হযরতে সাহাবায়ে-কেরামের মধ্যে মতভেদ
হয়েছে, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধও সংঘাটত হয়েছে। তারপরও পরম্পর ধারণা-আচরণ-ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রেখেছিল। যেমন একটি ঘটনা দ্বারা বিষয়টি পরিস্কার হবে :
আমিই হবো প্রথম সৈনিক : রোমানরা
যখন দেখল হজরত আলি ও হজরত মুআবিয়া (রা.)-এর মধ্যে দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ হচ্ছে। তখন রোমানরা হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-কে নিজেদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করল। তাঁর বরাবর পত্র লিখল যে, ‘আমরা শুনেছি, আপনি সত্যের ওপর আছেন। তা সত্ত্বেও আলি (রা.) আপনাক অস্থির করে তুলছে। আলির বিরুদ্ধে মোকাবেলায় আমরা আপনাকে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত আছি। সংবাদ পাওয়া মাত্রই আমাদের সৈন্যদল আপনাকে সাহায্য করার জন্য ছুটে যাবে’।
রণাঙ্গনে সবকিছু বৈধ। শত্রু-মিত্র সবার থেকে সাহায্য নেওয়া যায়। কিন্তু জীবন উৎসর্গ হোক সাহাবাদের ইখলাস ও লিল্লাহিয়াতের ওপর! চূড়ান্ত রাগ-গোসসা ও যুদ্ধাবস্থায়ও সীমালঙ্ঘন করতেন না।
হযরতে মুআবিয়া (রা.) রোম সম্রাটের চিঠির জবাবে লিখেছেন, ‘হে রোমের কুকুর, আমাদের মতভিন্নতা দেখে বিভ্রান্ত হবে না। যদি তোমরা মুসলমানদের দিকে হাত প্রসারিত করতে চেষ্টা করো, তা হলে তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য হজরত আলি (রা.)-এর সৈন্যদলে প্রথম যে সৈনিকটি প্রস্তুত থাকবে, সে হবে মুআবিয়া’।[94]
মুসলিম ভাইয়ের তাই পছন্দ করা, যা
নিজের জন্য পছন্দীয় ঈমানের অংশ
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ مَرْفُوْعًا لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيْهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ. وَفِي البُخَارِيِّ (13) وَمُسْلِمِ (45) অর্থ: খাদেমুর রসূল
হজরত আনাস (রা.) রসূল(ﷺ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, তোমাদের কেউ পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার মুসলিম ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তা নিজের জন্য পছন্দ করে।[95]
যদিও কথাটি বলতে বড় সংক্ষিপ্ত মনে হয় কিন্তু এর ওপর আমল করা
ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষণ মানুষের ঈমানের পরিপূর্ণতা
লাভ না করে। এ গুণটি মানবিয়
কৃত্বিতের একটি উন্নততর পর্যায় । এ গুণ অর্জনের
জন্য সর্বপ্রকার সাধনা ও প্রচেষ্টা চালাতে হয়। এটাই শরিয়তের বিধি-নিষিধের চরম লক্ষ্য। সম্ভবত সুফিগণ একেই “ফানা”–এর স্তর বলে
আখ্যায়িত করে থাকেন। আমার মতে
এ গুনটিও “ফানা” -এর প্রক্রিয়াসমূহের অন্যতম প্রক্রিয়া।[96]
সুপ্রিয় পাঠক! নিজের জন্য ভাল-পছন্দ
মনে করি মুসলিম ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করা ঈমানের পূর্বশর্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয় মুসনাদে আহমদ, সুনানে আরবাআ-একটি হাদিসে বিষয়টি জান্নাত নামে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন-ইয়াযীদ ইবনে আসাদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে। ‘তিনি বলেন, আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,তুমি কি জান্নাত লাভের ইচ্ছা কর? আমি বললাম,জি-হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ কর তাই তোমার মুসলমান ভাইয়ের জন্য পছন্দ করবে।’ এতে কি প্রমাণিত হয় না যে, মহান আল্লাহর কাছে একজন মুমিনের মর্যাদা -মূল্য কত?
নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া সাহাবিদের চরিত্র : আল্লাহ তাআলা আনসাদের প্রশংসা করে বলেন,وَالَّذِينَ
تَبَوَّءُوا
الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ
يُحِبُّونَ
مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ
فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ
وَلَوْ كَانَ بِهِمْ
خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ
نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ অর্থ: মুহাজিরদের
আগমনের পূর্বে যারা এই নগরীতে বসবাস করেছিল ও ঈমান এনেছে তারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে
এবং মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না আর তারা
তাদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও, যারা কার্পণ্য হতে নিজেদেরকে বিরত রেখেছে তারাই সফলকাম।[97]
وَلَا
يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ
حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা
মুহাজিরদেকে যে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বদান করেছেন, আনসারগণ তার
জন্য কোনো বিদ্বেষ ও হিংসা পোষণ করে না। হাসান বসরি (রহ.) বলেন, আলোচ্য আয়াতের অর্থ হল আনসারদের মনে মুহাজিরদের
প্রতি কোনো হিংসা নেই।
وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ
وَلَوْ كَانَ بِهِمْ
خَصَاصَةٌ অর্থাৎ আনসারদের আরেকটি গুণ হল যে, নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা অন্য মুসলমান ভাইকে নিজেদের উপর প্রাধান্য
দান করে এবং নিজেদের প্রয়োজন মিটাবার আগে অন্য ভাইয়ের প্রয়োজন মিটিয়ে দেয়। ছহিহ হাদিসে আছে যে, যার কাছে সামান্য সম্পদ আছে আর নিজেরও প্রয়োজন আছে, তা
সত্ত্বেও সে উহা সদকা করে দেয়, এই ব্যক্তির সদকাই আল্লাহর দরবারে
সর্বাপেক্ষা উত্তম।
দানশীলদের
সম্পর্কে অন্য আয়াতে এসেছে- وَيُطْعِمُونَ
الطَّعَامَ
عَلَى حُبِّهِ অর্থাৎ সম্পদের প্রতি ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও তারা অসহায়দেরকে
আহার দান করে।(সূরা ইনসান-০৮) আলোচ্য আয়াতে উল্লেখিত শ্রেণীর মর্যাদা এদের অপেক্ষা অনেক ঊর্ধে। কারণ, এই শ্রেণীর লোক সম্পদের প্রতি মায়া থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর পথে ব্যয় করে ঠিক কিন্তু এদের কোনো অভাব বা প্রয়োজন নেই। কিন্তু উল্লেখিত ব্যক্তিরা নিজেদের অভাব ও প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও নিজেদের প্রয়োজনে ব্যয়
না করে অন্য ভাইয়ের প্রয়োজন
পূরণের জন্য নিজেদের সম্পদ দান করেন। হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। নিজের সমুদয় সম্পদ সদকা দেওয়ার পর রাসূলুল্লাহ
(ﷺ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছে
? উত্তরে তিনি
বললেন, পরিবাবরের জন্য আল্লাহ এবং তাঁর
রসূল (ﷺ)-কে রেখে এসেছি।
ইয়ারমুক যুদ্ধের পানির ঘটনা : ইয়ারমুক যুদ্ধের ঘটনাও এখানে উল্লেখযোগ্য। পিপাসা কাতর আহত মুজাহিদরা একদিকে পানি পানি করে চিৎকার করছিলেন। অপরদিকে এহেন সংকটময় মুহূর্তেও আরেক ভাইয়ের আহাজারি
শুনে পানি নিজে পান না করে অন্য ভাইকে দিতে বলছেন। এইভাবে প্রত্যেকেই পানি নিজে পান না করে অন্য ভাইকে নিজের উপর
প্রাধান্য দিয়েছিলেন। অথচ প্রত্যেকেরই
তখন পানির তীব্র প্রয়োজন ছিল। অবশেষে একে একে প্রত্যেকেই শাহাদত বরণ করেন। কারও আর পানি পান করা হল না।
বাতি নিভিয়ে মেহমানকে খাওয়ানোর ঘটনা : ইমাম বুখারি (রহ.) আবু হুরাইরা (রা.)
হতে বর্ণনা করেন যে, আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-এর নিকট এস বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমি বড় ক্ষুধার্ত আমাকে খাবার দিন। রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রীদের কারও ঘরে কিছুই পাওয়া গেল না। অগত্যা রসূল (ﷺ) উপস্থিত লোকদেরকে বললেন, এমন কেহ আছ কি, যে এই লোকটিকে একরাতের জন্য মেহমান রাখবে? এক আনসারি দাঁড়িয়ে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি
প্রস্তুত আছি। অতঃপর আনসারি
সাহাবি মেহমানকে সংগে নিয়ে ঘরে চলে গেলেন। স্ত্রীকে বললেন, ইনি আল্লাহর রসূলের মেহমান। স্ত্রী বললেন, শিশুদের সামান্য
খাবার ব্যতিত ঘরে কোন কিছুই নেই। আনসারি বেললেন, ঠিক আছে। তুমি বাচ্চাদেরকে কোনক্রমে ফুসলিয়ে না খাওয়ায়েই ঘুম পড়িয়ে রাখ। আর আমরা মেহমানের সংগে একত্রে খেতে বসব। খাওয়া শুরু হওয়ার পর কোনো এক বাহানায় বাতিটা নিভিয়ে
দিও। তখন অন্ধকারে আর আমরা খাব না। এতে মেহমানের খাওয়া হয়ে যাবে, আমরা উপবাস করে রাত কাটিয়ে দিব। পরদিন মেহমান লোকটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হলে রাসূলুল্লাহ
(ﷺ) বললেন, অমুক স্বামী ও স্ত্রীর রাতের ঘটনায় আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হযেছেন। এ প্রসংগে আল্লাহ তাআলা وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ
وَلَوْ كَانَ بِهِمْ
خَصَاصَةٌ আয়াতটি নাজিল করেন। মুসলিম শরিফের এক বর্ণনায় এই আনসারি সাহাবির নাম আবু তালহা (রা.) উল্লেখ করা হয়েছে।[98]
মুমিন সত্তাগত পবিত্র আর মুশরিক অপবিত্র
قال أبو هريرة رضي اللَّه عنه: “لَقِيَني رسولُ اللَّه صلى اللَّه عليه وسلم وأنا جُنُبٌ، فأخذَ بيدي فمشيتُ معَهُ حتى قعدَ، فَانْسَلَلْتُ فأتيتُ الرحلَ فاغتسلتُ، ثمّ جئتُ وهو قاعدٌ فقال: أينَ كنتَ يا أبا هُريرة؟ فقلت له: لقِيتَني وأنا جُنُبٌ، فكرِهْتُ أنْ أُجالِسَكَ وأنا جُنُبٌ. فقال: سُبْحَانَ اللَّه، إِنَّ المُؤْمِنَ لا يَنْجُس” . অর্থ:
হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি
বলেন,
একদা রসূলুল্লাহ (ﷺ) (পথে) এর সাথে
আমার সাক্ষাত হলো। আমি (স্ত্রী সহবাসের কারণে) তখন অপবিত্র
ছিলাম। তিনি আমার
হাত তাঁর হাতে তুলে
নিলেন। আমি তাঁর
সাথে সাথে চলতে লাগলাম। অতঃপর তিনি যখন (মজলিসে) এসে উপবেশন
করলেন তখন আমি চুপিসারে
নিজের ঘরে ফিরে এলাম
এবং গোসল করে পুনরায়
রসূলের খেদমতে উপস্থিত হলাম। তিনি তখনও (মজলিসে) বসা ছিলেন। আমাকে (দেখে) জিজ্ঞেস করলেন, আবু হুরাইরা, কোথায়
গিয়েছিলে? আমি আসল বিষয়টি ব্যক্ত
করলাম। তিনি অবাক
হয়ে বললেন, সুবহানাল্লাহ! মুমিন কখনও
নাপাক হয় না।[99]
কুরআনুল মাজিদে মুশরিকদের
যে অপবিত্র বলা হয়েছে, তা তাদের
কুফর ও শিরকজনিত বাতেনি
অপবিত্রতার কারণে। অতত্রব
হাদিসের অর্থ হচ্ছে, মুমিন সে ধরণের
অপবিত্র নয়, বরং তার অপবিত্রতা
ক্ষণস্থায়ী। আর মুশরিকের
অপবিত্রতা মল-মূত্রের ন্যায় চিরস্থায়ী। তাই রসূল (ﷺ) মুমিনের
এই বিশেষ শানকে স্পষ্ট
করে দিলেন। কুরআনের
দৃষ্টিতে মুমিন ও মুশরিকের
মধ্যকার পার্থক্য ঠিক সেরুপ
যেরুপ পার্থক্য পবিত্র ও অপবিত্রের
মধ্যে। যতদূর সম্ভব
মুমিন অপবিত্র হয়েও মানুষের
সাথে উঠাবসার যোগ্য থাকে। পক্ষান্তরে মুশরেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়েও
এর যোগ্য থাকে না। রসূল (ﷺ) যদি শিষ্টাচারের ভিত্তিতে চুপ থাকতেন, তাহলে এ গুঢ় রহস্য নিঃসন্দেহে অপ্রকাশিত থেকে যেত।[100]
عن ابنِ عباسٍ قال: قال رسولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم -: “لا تُنَجِّسوا مَوتاكُم، فإِن المُسلِمَ لَيسَ بنَجِسٍ حَيًّا ولا مَيِّتًا”
অর্থ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ
(ﷺ) ইরশাদ করছেন,
তোমরা স্বীয় মৃত ব্যক্তিদের অপবিত্র মনে করো না। কেননা মুসলমানের শান হচ্ছে এই যে, তাকে জীবিত এবং মৃত কোনো অবস্থাতেই অপবিত্র মনে করা হয় না।[101]
ইসলামি শরিয়ত শহিদকে পবিত্রতার
দিক থেকে আরো উচ্চ মর্যাদা দান করেছে। আর শহিদের রক্তও অপবিত্র না। এজন্য তাঁকে
গোসল দেওয়া হয় না।[102]
মুমিন
সোনার
মত
খাঁটি, মৌমাছির ন্যায় পরিচ্ছন্ন :
والذى نفس
محمد
إنَّ مثلَ المؤمنِ كمثلِ القطعةِ من الذهبِ ، نفخ فيها صاحبُها فلم تتغيَّرْ ، و لم تنقصْ ، و الذي
نفسُ محمدٍ بيدِه ، إنَّ مثلَ المؤمنِ كمثلِ النحلةِ ، أكلَتْ طيِّبًا ، و وضعت
طيِّبًا ، و وقعتْ فلم تُكْسَرْ ، و لم تفسُدْ
অর্থ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি: ঐ সত্তার শপথ! যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, মুমিনের উদাহরণ হচ্ছে স্বর্ণের ঐ টুকরা, যার মালিক সেটাকে আগুন দ্বারা উত্তপ্ত করল, তবুও তার রংয়ের পরিবর্তন হল না এবং ওজনও কমল না। ঐ সত্তার শপথ! যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, মুমিনের উদাহরণ হচ্ছে, ঐ মৌমাছি, যে উন্নতমানের ফুল চুষে উন্নতমানের মধু তৈরি করল অথচ গাছের যে ডালে সে বসল, নিজের ভারে তা ভাঙ্গলোও না, নষ্টও করল না।[103]
এখানে মুমিনের কয়েকটি গুণ বর্ণনা করেছেন। প্রথমত গুণ হল, তার মধ্য থেকে ময়লা বের হয় না। যতই তাকে পরখ করা হয়; ততই সে আরও খাঁটি বলে প্রমাণিত হয়। সে ঐ নকল সোনার মত না, অগ্নি দ্বারা পোড়ালে যার রং বদলে যায় বা ওজন কমে যায়। মুমিনের দ্বিতীয় গুণ হল, সে মৌমাছির ন্যায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন খাদ্য ব্যতিত কোন সন্দেহজনক খাবার ভক্ষণ করে না। তৃতীয় গুণ হল যে, সে মৌমাছির ন্যায় যেখানে বসে (সেখানে) কারও ক্ষতি করে না।[104]
দুর্বল মুমিনদের ফজিলত-মর্যাদা
দুর্বল-অসহায়-নিঃস্ব মুমিন-মুসলমানদের মর্তবা-ফজিলত বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর পবিত্র জবানে বলে গিয়েছেন। فَعَنْ مُصْعَبِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: رَأَى سَعْدٌ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ لَهُ فَضْلاً عَلَى مَنْ دُونَهُ. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هَلْ تُنْصَرُونَ وَتُرْزَقُونَ إِلا بِضُعَفَائِكُمْ» رواه البخاري، وفي
رَوَايةُ «إِنَّمَا يَنْصُرُ اللَّهُ هَذِهِ الأُمَّةَ بِضَعِيفِهَا بِدَعْوَتِهِمْ وَصَلاتِهِمْ وَإِخْلاصِهِمْ»
অর্থ: হজরত মুসআব ইবনে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-সাদ (রা.)
দেখলেন অন্যদের ওপর তার একটা শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করলেন, তোমরা কেবল তোমাদের দুর্বলদের
ওসিলায়ই সাহায্য ও রিজক প্রাপ্ত হও।[105] অপর বর্ণনায় আছে- আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে
সাহায্য করেন তার দুর্বলদের দ্বারা, তাদের
দোআ, সালাত এবং ইখলাসের কারণে।[106]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: "السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِينِ، كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللهِ - وَأَحْسِبُهُ قَالَ - وَكَالْقَائِمِ لَا يَفْتُرُ، وَكَالصَّائِمِ لَا يُفْطِرُ"
অর্থ: হজরত
আবু হুরাইরা(রা.) রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন- বিধবা, বৃদ্ধ ও মিসকিনদের জন্য চেষ্টা-সাধনাকারী আল্লাহর পথে জিহাদকারীর সমতুল্য। রাবি বলেন, আমার ধারণা তিনি এ কথাও বলেছেন, সে অবিরাম
নামাজ আদায়কারী ও রোজাদার ব্যক্তির সমতুল্য। [107]
অসহায়-দুর্বল মুমিনদেরকে তাড়িয়ে দিতে হজরত নূহ (আ.)-এর অস্বীকৃতি : সর্বকালে শুধু পার্থিব জীবনের গোলক ধাঁধায় আবদ্ধ মানুষ বিত্তবানদেরকে সম্ভ্রান্ত ও ভদ্র এবং দীন-দরিদ্রদের সম্মানহীন ও নীচ বলে গণ্য করেছে। এ মাপকাঠির ভিত্তিতেই হজরত নুহ (আ)-এর কওম বিশ্বাস স্থাপনকারী দরিদ্রদেরকে নীচ বলে আখ্যা দিয়ে, তাঁদের সঙ্গে একত্রে বসতে নারাজ, তাই আগে তাঁদেরকে সরিয়ে দিতে বললে, হজরত নুহ অস্বীকৃতি জানান। পবিত্র কুরআনের ভাষায়-
وَيَا قَوْمِ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مَالًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ وَمَا أَنَا بِطَارِدِ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّهُمْ مُلَاقُو رَبِّهِمْ وَلَكِنِّي أَرَاكُمْ قَوْمًا تَجْهَلُونَ . وَيَا قَوْمِ مَنْ يَنْصُرُنِي مِنَ اللَّهِ إِنْ طَرَدْتُهُمْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ
অর্থ: আর হে আমার জাতি! আমি তো এজন্য তোমাদের
কাছে কোনো অর্থ চাই না; আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহর জিম্মায় রয়েছে। আমি কিন্তু ঈমানদারদের তাড়িয়ে দিতে পারি না। তারা অবশ্যই তাদের পালনকর্তার সাক্ষাত লাভ করবে। বরঞ্চ তোমাদেরই আমি অজ্ঞ সম্প্রদায় দেখছি। আর হে আমার জাতি! আমি যদি তাদের তাড়িয়ে দেই, তাহলে আমাকে আল্লাহ হতে (আজাব
হতে) রেহাই দেবে কে? তোমরা কি চিন্তা করে
দেখ না?[108]
অন্য আয়াতে এসেছে- وَمَا
أَنَا بِطَارِدِ الْمُؤْمِنِينَ অর্থ: মুমিনদেরকে
তাড়িয়ে দেওয়া আমার কাজ নহে।[109]
হজরত নুহ (আ.)-এর সম্প্রদায়ের
নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা দাবি করেছিল যে, তুমি এসব নীচ ইতর শ্রেণীর
লোকদের তোমার দরবার হতে সরিয়ে দাও, তবেই আমরা তোমার কাছে আসতে
পারি। এদের সাথে বসতে আমাদের ঘৃণা হয়। তখন হজরত নুহ (আ.)
জবাবে বলেন, তোমাদের দৃষ্টি দ্বারা দরিদ্র ঈমানদারগণকে
যেরূপ লাঞ্ছিত-ক্ষদ্রাদপি ক্ষুদ্র দেখছ, আমি কিন্তু তোমাদের মত একথা বলতে পারি না যে, আল্লাহ
তাদের কোন কল্যাণ ও কামিয়াবি দান করবেন না । কারণ, প্রকৃত কল্যাণ ও কামিয়াবি ধন-সম্পদ এবং ক্ষমতার জোরে হাসিল করা যায় না। বরং মানুষের অন্তরের অবস্থা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে তা দান করা
হয়। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই সম্যক অবহিত
আছেন যে, কল্যাণ ও কামিয়াবি হাসিল করার জন্য কার অন্তর
যোগ্য আর কার অন্তর অযোগ্য। অতত্রব, তিনিই তার ফয়সালা করবেন।
পরিশেষে
হজরত নুহ (আ.)বলেন, তোমাদের মত আমিও যদি দরিদ্র ঈমানদারগণকে লাঞ্ছিত-অবাঞ্ছিত
মনে করি এবং আমার সাহচর্য হতে তাড়িয়ে দেই, তাহলে আমিও জালেমরূপে
পরিগণিত হবো। তাদেরকে তাড়িয়ে
দিলে পরে আল্লাহর শাস্তি হতে আমাকে কে রক্ষা করবে?
প্রিয়
পাঠক! আল্লাহর নবি মুমিনদেরকে লাঞ্ছিত-নিচু
মনে করা এবং তাদের দূরে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার আজাবের ভয় করছেন। এতে কি প্রতিয়মান হয় না যে, একজন মুমিনের ইজ্জত-সম্মান মহান আল্লাহর নিকট কত?[110]
দুর্বল মুমিনদেরকে তাড়িয়ে না দিতে রসূলুল্লাহ (ﷺ)–কে নির্দেশ : মহান আল্লাহ বলেন, وَلَا تَطْرُدِ
الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ مَا عَلَيْكَ
مِنْ حِسَابِهِمْ مِنْ شَيْءٍ
وَمَا مِنْ حِسَابِكَ
عَلَيْهِمْ
مِنْ شَيْءٍ فَتَطْرُدَهُمْ فَتَكُونَ مِنَ الظَّالِمِينَ
(52) অর্থ: আর তুমি তাদেরকে বিতাড়িত কর না যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের
প্রতিপালকের ইবাদত করে তাঁর সন্তুষ্টির এরাদায়। তাদের হিসেবের কিছুই তোমার দায়িত্ব নয় এবং তোমার হিসেবের কিছুই
তাদের দায়িত্ব নয়, যে তাদেরকে বিতাড়িত করবে। তাহলে তুমি বে-ইনসাফকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।[111]
আয়াতের শানে নুজুল হলো : হজরত ইবনে
মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত- কতিপয় নেতৃস্থানীয় কুরাইশি কাফের রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে আসল । তারা বলল, হে মুহাম্মাদ!
আপনার সম্প্রদায়ের এসব লোকদেরকে নিয়ে (অসহায়-গরিব সাহাবায়ে কেরাম) আপনি তুষ্ট, এদের অনুগামী হতে হবে আমাদেরকে, এদেরই ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ
করেছেন? (এদের সাথে একত্রে উপবেশন করলে আমাদের সম্মানহানি হয়।) অতত্রব এদেরকে আপনার মজলিস থেকে বের করে দিন, তাহলে হয়তবা আমরা আপনার অনুসরণ করব।
তাদের প্রস্তাব শুনে হজরত ওমর
(রা.) মত প্রকাশ করে বললেন, এতে অসুবিধা কী ? আপনি কিছুদিন তাই করে দেখুন। এরা তো অকপট বন্ধুবর্গই। কুরাইশ সর্দাদের আগমনের সময় এরা না হয় সরেই যাবে। এ প্রসঙ্গে আয়াতটি নাজেল হয়। এতে উল্লেখিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে কঠোর ভাষায় নিষেধ করা হয়েছে। আয়াত অবতরণের পর হজরত ওমর রা.-কে ‘আমার মত ভ্রান্ত ছিল’-এই বলে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়।
যে দরিদ্রদের সম্পর্কে আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে, তারা
ছিলেন, হজরত বেলাল হাবশি (রা.),
শুহায়েব রুমি (রা.), আম্মার (রা.),সালেম,
ছবিহ (রা.), মেকদাহ (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.),
মসউদ ইবনুল কারি (রা.), যুশ-শিমালাইন (রা.) প্রমুখ সাহাবায়ে
কেরাম। তাঁদের সম্মান ও ভদ্রতার সনদ আল্লাহর
তরফ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে।[112]
অসহায়-দুর্বল মুমিন কসম করলে আল্লাহ তাআলা তা পূর্ণ করে দেন : উপরোক্ত আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, কারও ছিন্নবস্ত্র কিংবা বাহ্যিক দূরাবস্থা দেখে তাকে নিকষ্ট ও
হীন মনে করার অধিকার কারও নেই। প্রায়ই এ ধরণের পোশাকে এমন লোকও থাকেন, যারা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত সম্মানিত ও প্রিয়। যেমন পবিত্র হাদিসে এসেছে-
عن حارِثَةَ بنِ وَهْبٍ الخُزاعيُّ قال: قال رسولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم ألا أخْبرُكُمْ بِأهْلِ الجَنَّةِ؟ كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَعِّفٍ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لأَبَرَّهُ، أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ؟ كُلُّ عُتُلٍّ جَوَّاظٍ مُسْتَكْبِرٍ”. অর্থ: হজরত হারিসা
ইবনে ওহাব (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ)ইরশাদ করছেন, আমি কি তোমাদেরকে বলব না বেহেশতি লোক কে? সে হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে নিজের ও অন্যদের দৃষ্টিতে দুর্বল ও অসহায়। যদি সে কোনো ব্যাপারে আল্লাহর নামে শপথ করে, তবে আল্লাহ তার শপথ অবশ্যই পূর্ণ করে দেন। শোন, আমি কি তোমাদেরকে
বলব না দোজখি কারা? তারা হচ্ছে ওসব লোক যারা দুষ্ট, মূর্খ ও অহংকারী।[113]
দুর্বল মুমিনদেরকে দয়াময়ের পক্ষ থেকে সালাম : পবিত্র কুরআনের ভাষায়- وَإِذَا جَاءَكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِنَا فَقُلْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ অর্থ: আর যারা আমার আয়াতসমূহের
প্রতি ঈমান রাখে,তারা যখন আপনার নিকট আসে, তখন বলে দিও, তোমাদের ওপর সালাম।[114]
“তোমাদের ওপর সালাম” কথাটি ত্রিবিধ অর্থে হতে পারে। যথা-(এক ) আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এতে করে কুরাইশ নেতৃবৃন্দ যেসব দরিদ্র মুসলমানকে মজলিস থেকে
হটিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল, তাদের মনে প্রফুল্লতা আসবে এবং
তাদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সম্মান প্রদর্শন হবে। (দুই) এ সালাম হবে রসূলুল্লাহ
(ﷺ)-এর পক্ষ থেকে। সালামের সুন্নাত তরিকানুযায়ী আগমনকারী মুসলমানই মজলিসে উপস্থিত
নবি (ﷺ) -কে সালাম করবে,কিন্তু তাদের সম্মানার্থে রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে অগ্রে
সালাম দিতে বলা হয়েছে। (তিন) এখানে ‘সালাম’ অর্থ শান্তি ও নিরাপত্তা। এত তাঁদের ভুল-ত্রুটি ও সর্ব প্রকার বিপদাপদ থেকে নিরাপদ থাকার
সুসংবাদ শুনিয়ে দিতে বলা হয়েছে।[115]
গরিব মুমিন পাঁচশত (৫০০)বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে عَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ
عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ وَسَلَّمَ: «يَدْخُلُ فُقَرَاءُ المُسْلِمِينَ
الجَنَّةَ قَبْلَ أَغْنِيَائِهِمْ بِنِصْفِ يَوْمٍ وَهُوَ خَمْسُمِائَةِ عَامٍ». অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা(রা.)থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, গরিব লোক ধনী লোকের চেয়ে পাঁচশত (৫০০) পূর্বে বেহেশতে প্রবেশ করবে।[116]
মুমিন বান্দার আলোচনা আসমানে
স্বয়ং আল্লাহ তাআলা
আমাদের কোন ভাল বিষয় যদি দুনিয়ার রাজা-বাদশাহর দরবারে আলোচনা হয়, তখন আমাদের খুশি লাগে;
আমরা গর্ববোধ করি। কোথায় দুনিয়ার রাজা-বাদশাহ আর কোথায় রাজাধিরাজ মহান রব্বুল আলামিন। তিনি যদি কোন বান্দার আলোচনা করেন, তাহলে সেটা কত সম্মান-গৌরবের বিষয়। যেমন পবিত্র হাদিসে এসেছে- عَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ،
عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ قَالَ: " قَالَ اللَّهُ
عَزَّ وَجَلَّ: عَبْدِي عِنْدَ ظَنِّهِ بِي، وَأَنَا
مَعَهُ إِذَا دَعَانِي،
وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِهِ،
ذَكَرْتُهُ
فِي نَفْسِي، وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي مَلَإٍ،
ذَكَرْتُهُ
فِي مَلَإٍ خَيْرٍ مِنْهُمْ وَأَطْيَبَ، وَإِنْ تَقَرَّبَ مِنِّي شِبْرًا، تَقَرَّبْتُ مِنْهُ ذِرَاعًا، وَإِنْ تَقَرَّبَ ذِرَاعًا، تَقَرَّبْتُ بَاعًا، وَإِنْ أَتَانِي يَمْشِي، أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً " (حم) 10224 অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে
বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ(ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, আমার বান্দা আমার ব্যাপারে যেরূপ ধারণা পোষণ করে, আমি
তার নিকট তেমনি। যখন সে আমাকে
স্মরণ করে, তখন আমি তার সাথেই থাকি। যদি সে আমাকে মনে মনে স্মরণ করে, তবে আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। যদি সে আমাকে কোন জামাআতে স্মরণ করে, আমিও তাকে তার চেয়ে উত্তম জামাআতে (ফেরেশতাদের মধ্যে)
স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে
এক বিঘত এগিয়ে আসে, তবে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। সে যদি আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়; আমি তার দিকে দুহাত এগিয়ে যাই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।[117]
একটি ঘটনা : এক বুযুর্গ
বললেন, আল্লাহর কসম আল্লাহ তাআলা আমাকে এই মুহূর্তে আসমানে স্মরণ করছেন। তিনি খুব দৃঢ়তার সাথে কথাটা বললেন। লোকজন জিজ্ঞেস করলেন,আপনার এ কথার সত্যতার দলিল-প্রমাণ কি? তখন ঐ বুযুর্গ বললেন, তোমরা কি কুরআন পাকের এ আয়াত পড়নি?
(আল্লাহ পাক বলেন,) فَاذْكُرُونِي
أَذْكُرْكُمْ অর্থ: সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের করবো।[118]
বান্দাকে ভালবাসার কথা আসমানে প্রচার
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: " إِذَا
أَحَبَّ
اللَّهُ
عَبْدًا
نَادَى
جِبْرِيلَ:
إِنَّ
اللَّهَ
يُحِبُّ
فُلاَنًا
فَأَحِبَّهُ، فَيُحِبُّهُ
جِبْرِيلُ،
فَيُنَادِي
جِبْرِيلُ
فِي
أَهْلِ
السَّمَاءِ:
إِنَّ
اللَّهَ
يُحِبُّ
فُلاَنًا
فَأَحِبُّوهُ، فَيُحِبُّهُ
أَهْلُ
السَّمَاءِ،
ثُمَّ
يُوضَعُ
لَهُ
القَبُولُ
فِي
أَهْلِ
الأَرْضِ"
, (خ)
6040
অর্থ: হজরত আবু
হুরাইরা (রা.)বলেন,
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন- যখন আল্লাহ তাআলা
কোনো বান্দাকে ভালবাসেন, তখন তিনি জিবরিল(আ.)-কে ডেকে বলেন,আল্লাহ তাআলা
অমুক বান্দাকে ভালবাসেন, তুমিও তাকে ভালবাস। তখন জিবরিল (আ.) তাকে ভালবাসে এবং তিনি আসমানবাসীদেরকে ডেকে বলেন,আল্লাহ তাআলা অমুককে ভালবাসেন, অত্রতব তোমরাও
তাকে ভালবাসবে। তখন আসমানবাসীরাও
তাকে ভালবাসে। তারপর আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে দুনিয়াবাসীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা সৃষ্টি
করা হয়।[119]
জিকিরের মজলিস নিয়ে আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাদের সামনে গর্ববোধ
وَإِنَّ
رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم خَرَجَ عَلَى حَلْقَةٍ مِنْ أَصْحَابِهِ
فَقَالَ " مَا أَجْلَسَكُمْ " . قَالُوا جَلَسْنَا نَذْكُرُ
اللَّهَ وَنَحْمَدُهُ عَلَى مَا هَدَانَا لِلإِسْلاَمِ وَمَنَّ بِهِ عَلَيْنَا .
قَالَ " آللَّهِ مَا أَجْلَسَكُمْ إِلاَّ ذَاكَ " . قَالُوا
وَاللَّهِ مَا أَجْلَسَنَا إِلاَّ ذَاكَ . قَالَ " أَمَا إِنِّي لَمْ
أَسْتَحْلِفْكُمْ تُهْمَةً لَكُمْ وَلَكِنَّهُ أَتَانِي جِبْرِيلُ فَأَخْبَرَنِي
أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يُبَاهِي بِكُمُ الْمَلاَئِكَةَ " অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন। রসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর সাহাবিগণের
নিকট হাজির হয়ে প্রশ্ন করলেন, তোমরা কেন
বসে আছো ? তারা উত্তর
দিল, আমরা বসে আল্লাহর জিকির করছি,
তাঁর প্রশংসা করছি এজন্য যে, তিনি আমাদের ইসলামের
পথ দেখিয়েছেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন আল্লাহর কসম! এছাড়া আর কোন উদ্দেশ্যে তোমরা এখানে বসোনি ? তারা বলল, আল্লাহর শপথ! এছাড়া আর কোন উদ্দেশ্যে আমরা এখানে বসিনি। তিনি বললেন, আমি কোন দোষারোপের
কারণে তোমাদেরকে কসম দেয়নি ? বরং হজরত জিবরিল আলাইহিস সালাম
আমার নিকট এসে জানালেন যে, আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাগণের কাছ তোমাদের
জন্য গর্ব করছেন।[120]
মুমিন জীবিত থাকার কারণে রিজিক-বৃষ্টি, সাহায্য-হেফাজত
হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা একজন বুযুর্গ ও নেককার মুসলমানের বদৌলতে তাঁর সন্তান,
তাঁর সন্তানের সন্তান, পাড়া-প্রতিবেশি ও তাঁর সমাজকে ততক্ষণ পর্যন্ত আপন হেফাজতে রাখেন যতক্ষণ পর্যন্ত
সে উক্ত এলাকায় বেঁচে থাকে।
নোট : হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, হাদিসটি
দুর্বল।
হজরত ছাওব্ন (রা.) এক হাদিস বলেন,
সব সময় তোমাদের মধ্যে এমন সাতজন ব্যক্তি থাকবেন, যার কারণে তোমাদেরকে কেয়ামত পর্যন্ত সাহায্য করা হবে, বৃষ্টি হবে এবং আহার করাবেন।
হজরত ওবাদা ইবনে সামেত (রা.) বলেন,
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন- আমার উম্মতের মধ্যে
ত্রিশজন আবদাল থাকবেন, তাদের কারণে তোমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ
করা হবে এবং তোমাদেরকে আহার্য দান করা হবে। কাতাদা (রহ.) বলেন, আমার মনে হয়, হাসান বসরিও
তাদের একজন।[121]
আল্লাহ ওয়ালাদের উপস্থিতি আজাব নাজিলের প্রতিবন্ধক
: আল্লাহ তাআলা বলেন,قَالَ فَمَا
خَطْبُكُمْ
أَيُّهَا الْمُرْسَلُونَ অর্থ: হজরত ইব্রাহিম (আ.)বললেনঃ
হে ফেরেশতাগণ! তোমরা কাদের ব্যাপারে কি উদ্দেশ্য এসেছো ?
জবাবে ফেরেশতাগণ বললেন, قَالُوا
إِنَّا أُرْسِلْنَا إِلَى قَوْمٍ
مُجْرِمِينَ لِنُرْسِلَ
عَلَيْهِمْ
حِجَارَةً مِنْ طِينٍ
مُسَوَّمَةً
عِنْدَ رَبِّكَ لِلْمُسْرِفِينَ অর্থাৎ
আমরা একটি অপরাধী সম্প্রদায় তথা লুত সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। অর্থাৎ আমাদেরকে লুত সম্প্রদায়ের উপর মাটির এমন শক্ত পাথর
নিক্ষেপ করার জন্য পাঠানো হয়েছে, আল্লাহর নির্দেশে যার প্রতিটির
গায়ে অপরাধীদের নাম লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।[122]
উল্লেখ্য যে, প্রত্যেক অপরাধীর
জন্য এক একটি পাথর চিহ্নিত করে রাখা হয়েছিল।
এ প্রসংগে আল্লাহ তাআলা সূরা আনকাবুতে বলেছেন,
وَلَمَّا جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَى قَالُوا إِنَّا مُهْلِكُو أَهْلِ هَذِهِ الْقَرْيَةِ إِنَّ أَهْلَهَا
كَانُوا ظَالِمِينَ
قَالَ
إِنَّ فِيهَا لُوطًا قَالُوا نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَنْ فِيهَا لَنُنَجِّيَنَّهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ অর্থ: যখন আমার
প্রেরিত ফেরেশতাগণ সুসংবাদসহ ইব্রাহিমের
নিকট আসল, তারা বলল, আমরা
এই জনপদবাসীদেরকে ধ্বংস
করব। ইব্রাহিম বলল, এই জনপদে
তো লুত রয়েছে। তারা
বলল,
সেথায় কারা আছে, তা আমরা
ভাল জানি। আমরা
তো লুতকে ও তাঁর
পরিবারবর্গকে রক্ষা করবো।[123] সূরা
আর এই জায়গায় বলেছেন,فَأَخْرَجْنَا مَنْ كَانَ
فِيهَا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
অর্থাৎ সেখানে যেসব মুমিন ছিল আমি তাদেরকে উদ্ধার করেছিলাম।[124]
হজরত লুত (আ.) তাঁর কওমের
চরম অবাধ্যতার পরে তিনি
যখন আল্লাহর দরবারে তাঁর
সাহায্য প্রার্থনা করলেন, তখন আল্লাহ
তাআলা তাঁর সাহায্যার্থে ফেরেশতা
প্রেরণ করলেন। কিন্তু
তাঁরা প্রথম হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর নিকট
এসে তাঁর স্ত্রী সারাহ
–এর গর্ভে
এক সুসন্তান ভূমিষ্ঠ হবার
সুসংবাদ দান করেন। সূরা হুদ ও হিজরে
এর বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ
করা হয়েছে। সন্তানের
সুসংবাদ দান করার পর তাঁকে
ইহাও জানালেন যে, তাঁরা হজরত
লুত (আ.)-এর কওমকে
ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে প্রেরিত
হয়েছেন। তা শ্রবণ করে তিনি
তাঁদেরকে আরও কিছু অবকাশ
দান করার জন্য বললেন, তথায়
তো লুত রয়েছে। কিন্তু
হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর কথা শ্রবণ
করে তারা বলল : তথায় কারা
রয়েছে তা আমরা খুব ভাল করেই
জানি, আমরা তাঁকে ও তাঁর
বিশেষ বিশেষ লোকজনকে বাঁচিয়ে
নিব।[125]
উপরোক্ত
আয়াতে কারিমা ও ঘটনা
থেকে বুঝা যায় যে, কোনো
জনপদে আল্লাহওয়ালাদের অবস্থান
সেখানে আজাব আসার পক্ষে
অন্তরায় হতে পারে, তাঁদের অনুপস্থিতিতে
সেখানে আজাব আসার পথ উন্মুক্ত
হয়। যেমন হজরত
লুত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের
বেলায় হয়েছে।[126] .
বৃদ্ধ মুসলমানের সম্মান-মর্যাদা
সাদা চুল ওয়ালা প্রবীণদের সম্মান : মানুষ স্বভাবতই বৃদ্ধ হওয়াকে
পছন্দ করে না। বুড়া হওয়ার একটি সাধারণত আলামত হলো
চুল পাঁকা বা সাদা হওয়া। কিন্তু দয়াময়
আল্লাহর নিকট মুমিনের এই চুলে শুভ্রতারও মূল্য আছে, নিম্নে হাদিসটি উল্লেখ করছি: عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، قَالَ: “نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ نَتْفِ الشَّيْبِ”، وَقَالَ: “هُوَ نُورُ الْمُؤْمِنِ”، وَقَالَ: “مَا شَابَ رَجُلٌ فِي الْإِسْلَامِ شَيْبَةً، إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ بِهَا دَرَجَةً، وَمُحِيَتْ عَنْهُ بِهَا سَيِّئَةٌ، وَكُتِبَتْ لَهُ بِهَا حَسَنَةٌ” - وفي رَوَايةُ مَنْ شَابَ شَيْبَةً فِي الْإِسْلاَمِ كَانَتْ لَهُ نُوْرًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ অর্থ: হজরত আমর
ইবনে
শুআয়েব তিনি তাঁর ------বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,“রসূলুল্লাহ (ﷺ) সাদা চুল উঠাতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন,
এটা মুমিনের নুর। তিনি আরো বলেন, ইসলামে যদি কেউ সাদা চুল বিশিষ্ট হয়
আল্লাহ তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন,
একটি পাপ মোচন
করে দেন এবং একটি পুণ্য লিখে দেন”।[127] অপর
বর্ণনায় - ‘যে মুসলিম সাদা চুল বিশিষ্ট হবে,
ক্বিয়ামতের দিন
এটা তার জন্য জ্যোতি বা আলো হবে’।[128]
যুবক বৃদ্ধকে
সম্মান করলে সেও সম্মান পাবে :
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “مَا أَكْرَمَ شَابٌّ شَيْخًا لِسِنِّهِ إِلَّا قَيَّضَ اللَّهُ لَهُ مَنْ يُكْرِمُهُ عِنْدَ سِنِّهِ”: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ অর্থ: হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করছেন : যদি কোনো যুবক কোনো বৃদ্ধকে তার বার্ধক্যের কারণে সম্মান প্রদশন করে,
তবে আল্লাহ তার বৃদ্ধাবস্থায় এমন লোক নির্দিষ্ট করে দিবেন। যে তাকে সম্মান করবে। [129] নোট : ইমাম তিরমিজি (রহ.)বলেন, হাদিসটি গরিব।
কিছু ভাল-নেক কাজের বিনিময় আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে দেন
আবার কিছু আখেরাতে দিবেন। যুবক কর্তৃক
প্রবীণকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন এমন একটি আমল যার পুরস্কার মহান আল্লাহ দুনিয়াতে দিবেন। এ হাদিসে উক্ত যুবকের হায়াত বৃদ্ধিরও রহস্যের প্রতিও ইশারা করে।
ইমামতিতে
অগ্রাধিকার :
عن أبي
مسعودٍ البدريِّ قالَ: قالَ
النبيُّ صلى الله
عليه وسلم:
قَالَ لَنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَؤُمُّ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللهِ وَأَقْدَمُهُمْ قِرَاءَةً فَإِنْ كَانَتْ قِرَاءَتُهُمْ سَوَاءً فَلْيَؤُمَّهُمْ أَقْدَمُهُمْ هِجْرَةً فَإِنْ كَانُوْا فِي الْهِجْرَةِ سَوَاءً فَلْيَؤُمَّهُمْ أَكْبَرُهُمْ سِنًّا অর্থ: আবু মাসউদ বদরি (.রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে বললেন, “আল্লাহর কিতাব কুরআন মাজিদের জ্ঞান যার সবচেয়ে বেশি এবং যে কুরআন তিলাওয়াতও সুন্দরভাবে করতে পারে,
সেই সালাতের জামাআতে ইমামতি করবে। সুন্দর কিরাতের
ব্যাপারে সবাই যদি সমান হয়, তাহলে তাদের মধ্যে যে হিজরতে
অগ্রগামী সে ইমামতি করবে। হিজরতের ব্যাপারেও সবাই যদি সমান হয় তাহলে তাদের মধ্যে
যে বয়সে প্রবীণ সেই ইমামতি করবে”।[130]
রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকটবর্তী হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার :
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : لِيَلِنِيمِنْكُمْ ، أُولُو الْأَحْلَامِ وَالنُّهَى ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثَلَاثًا ، وَإِيَّاكُمْ وَهَيْشَاتِ الْأَسْوَاقِঅর্থ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
তোমাদের মধ্যে যারা বুদ্ধিমান ও বয়স্ক তারা যেন আমার কাছে প্রথম কাতরে থাকে। অতঃপর যারা বয়স ও বুদ্ধিতে তাদের কাছাকাছি তারা দাঁড়াবে। তিনি তিনবার বললেন। তোমরা সবাই মসজিদকে বাজারে পরিণত করা হতে দূরে থাক। বাজারের ন্যায় মসজিদ শোরগোল করো না।[131]
বসার ক্ষেত্রে
অগ্রাধিকার :
عُبيد اللَّه بن عمر بن موسى يقول:كُنْتُ عِنْدَ سُلَيْمَانَ بْنِ عَلِيٍّ، فَدَخَلَ شَيْخٌ مِنْ قُرَيْشٍ، فَقَالَ سُلَيْمَانُ : انْظُرَ الشَّيْخَ، فَأَقْعِدْهُ مَقْعَدًا صَالِحًا অর্থ: ওবায়দুল্লাহ
বিন ওমর বলেন, ‘আমি সুলাইমান বিন আলির নিকট ছিলাম। এ সময় কুরাইশ গোত্রের জনৈক
প্রবীণ ব্যক্তি প্রবেশ করল। সুলাইমান বললেন, এই প্রবীণ ব্যক্তির দিকে লক্ষ্য কর,
তাকে উপযুক্ত
আসনে বসাও’।[132]
নোট : হাদিসটির
সনদ হাসান গয়রিহি
কথা বলার
ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার : আব্দুর রহমান ইবনে সাহল (রা.) এবং মাসউদের দুই পুত্র মুহাইয়য়াসা ও হুয়াইয়াসা রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এলেন, আব্দুর রহমান (রা.) কথা বলতে উদ্যত হলেন,
তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, বড়কে কথা বলতে দাও,
বড়কে কথা বলতে দাও। তিনি ছিলেন দলের ভেতর বয়ঃকণিষ্ঠ। তাই তিনি চুপ করলেন। অতঃপর তাঁরা দুজন কথা বলবেন।[133]
নোট : হাদিসটির পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা উল্লেখ
না করে অংশ বিশেষ করা হয়েছে।
বৃদ্ধ মুসলমান, কুরআনের হাফেজ ও ন্যায়বান বাদশাহকে সম্মান মানে আল্লাহকে সম্মান
করা :
|
عَنْ أَبِي مُوسَى
الأَشْعَرِيِّ،
قَالَ
قَالَ
رَسُولُ
اللَّهِ
صلى
الله
عليه
وسلم
“
إِنَّ
مِنْ
إِجْلاَلِ
اللَّهِ
إِكْرَامَ
ذِي
الشَّيْبَةِ
الْمُسْلِمِ
وَحَامِلِ
الْقُرْآنِ
غَيْرِ
الْغَالِي
فِيهِ
وَالْجَافِي
عَنْهُ
وَإِكْرَامَ
ذِي
السُّلْطَانِ
الْمُقْسِطِ
”
. |
অর্থ: হজরত আবু মুসা
আশআরি (রা.) থেকে
বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ
করেছেন: কোনো বৃদ্ধ
মুসলমানকে সম্মান করা এবং এমন ‘হাফেজে কুরআন’ কে সম্মান করা,
যে কুরআনে হ্রাস বৃদ্ধি করে না-মূলত আল্লাহকেই
সম্মান করার শামিল। ঠিক তেমনি
অবস্থা ন্যায় বিচারক বাদশাহকে সম্মান করাও।[134]
ঐ হাফেজ যিনি কুরআন শরিফের বেলায় এবং ঐ বাদশাহ যিনি ন্যায় ও ইনসাফের ক্ষেত্রে
সোজা পন্থা অবলম্বন করে। তিনি আল্লাহর সিফাতে কালামের এবং সিফাতে আদল (ন্যায়)-এর বিশেষ নিদর্শন হয়ে থাকে। ঠিক তেমনি ঐ মুসলমান যিনি আল্লাহর আনুগত্যে বৃদ্ধ হয়েছেন তিনিও
আল্লাহর রহমত নাজিল হওয়ার বিশেষ ক্ষেত্র। তাই ঐ তিন ব্যক্তির প্রতি সম্মান মূলত আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শামিল। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যে, বান্দা সরাসরি আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শনে স্বভাবত দ্বিধাবোধ করে না,
শয়তানেরও আল্লাহকে সিজদা
করতে কোন আপত্তি ছিল না। তবে বান্দা স্বজাতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনে দ্বিধাবোধ করে। তাই হাদিসের এই বাচন ভঙ্গীমায় মানুষকে স্বজাতির প্রতি
সম্মান প্রদর্শনে উৎসাহিত করা হয়েছে যে, এই সম্মান প্রদর্শনকেই
আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে মানুষ তথা মুসলমানের মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।[135]
যে বড়দের সম্মান প্রদর্শন করে না সে উম্মত নয় : وَعَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضي الله عنه قَالَ: “ جَاءَ شَيْخٌ يُرِيدُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَأَبْطَأَ الْقَوْمُ عَنْهُ أَنْ يُوَسِّعُوا لَهُ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: “ لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا، وَيُوَقِّرْ كَبِيرَنَ “ وفي رواية : لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا , وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا , وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا حَقَّهُ “ অর্থ: হজরত
আনাস (রা.)
থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি ছোটদের স্নেহ করে না, বড়দের শ্রদ্ধা করে না, সে আমাদের সমাজের
লোক নয়। অন্য বর্ণনায়, সে ব্যক্তি আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়, যে
ব্যক্তি আমাদের বড়দের সম্মান দেয় না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং
আলেমদের অধিকার চেনে না।[136]
মুমিনের উপাধিতে অন্যকিছুকে ডাকা নিষেধ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، عَنِ النَّبيّ ﷺ، قَالَ: لا تَقُولُو الْكَرْمُ إِنَّمَا الْكَرْمُ قَلْبُ الْمُؤْمِنِ
অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে
বর্ণিত। নবি (ﷺ) ইরশাদ করেছেন: আঙ্গুরকে ‘কারাম’ বলো না। কেননা ‘কারাম’ হচ্ছে মুমিনের অন্তরের নাম।(আঙ্গুর কেমন করে ‘কারাম’ হবে এমতাবস্থায় যে, তা থেকে মদ তৈরি হয় যা হচ্ছে সর্বপ্রকার অশ্লীলতার উৎস)।[137]
নোট : হাদিসটি একাধিক বর্ণনা রয়েছে, তবে শব্দের মধ্যে কমবেশি-ভিন্নতা আছে।
‘নেহায়া’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে,‘যেহেতু আঙ্গুর দ্বারা মদ তৈরি করা হয় এবং আরবদের রুচি অনুসারে মদ দানশীলতার ভাব অন্তরে ফুটিয়ে তুলে তাই তারা আঙ্গুরকে ‘কারাম’ নাম দিয়েছিল। কিন্তু রসূল (ﷺ) তাদের এই ভ্রান্ত ধারণার অপনোদন করতে গিয়ে বললেন: এ সুন্দর ও অর্থপূর্ণ নামের একমাত্র অধিকারী হতে পারে মুমিনেরই অন্তর।’ এতে মুমিন-মুসলিমের মর্যাদা
প্রকাশিত হয় না কি?
আল্লাহর ওলির (কামেল মোমিন) সাথে যে শত্রুতা করে তার বিরুব্ধে যুদ্ধের ঘোষণা
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ -: “إِنَّ الله عَزَّ وَجَلَّ يَقُولُ: مَنْ عَادَى لِي وَلِيًا فَقَدْ آذَنتُهُ بِالْحَرْبِ، وَمَا تَقَربَ إِليَ عَبْدِي بِشَيْءِ أَحَبَّ إِليَّ مِمَّا افْتَرَضْتُهُ عَلَيْهِ، وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يتقربُ إِلي بِالنَّوافِلِ حَتَّى أَحْبَبْتُهُ، فَكُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يُبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، وَلِئَنْ سَألَنِي لأعْطِيَنهُ وَلَئِنْ اسْتَعَاذَ بِي لأُعِيذَنَّهُ، وَمَا تَرَدَدْتُ عَنْ شَيْءِ أَنَا فَاعِلُهُ تَرَدُّدِي عَنْ نَفْسِ الْمُؤمِنِ يَكرَهُ الْمَوْتَ وَأَنا أَكْرَهُ مُسَاءَتَه”.
অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে
বর্ণিত। রসূলুল্লাহ
(ﷺ) ইরশাদ
করেছেন: আল্লাহ আজ্জা ও জাল্লা বলেন- যে ব্যক্তি আমার ওলির সাথে শত্রুতা করে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করছি। আমার বান্দার প্রতি যা ফরজ করেছি তা দ্বারাই আমার অধিক নৈকট্য
লাভ করে। আমার বান্দা নফল কাজের মাধ্যমেও আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে। অবশেষে আমি
তাকে ভালবেসে ফেলি। যখন আমি তাকে ভালবাসি, তখন আমি তাঁর কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তাঁর চোখ
হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, তাঁর হাত হয়ে যাই যা দ্বারা সে ধরে
এবং তাঁর পা হয়ে যায় যা দিয়ে সে চলাফেরা করে। সে আমার কাছে কিছু চাইলে, আমি তাকে তা দেই। সে যদি আমার
কাছে আশ্রয় চায়, তাহলে আমি তাকে আশ্রয়
দেই। আমি যা করার ইচ্ছা করি, সে ব্যাপরে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগি না
কেবল মুমিনের আত্মার ব্যাপার ছাড়া। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে, আর আমি তাঁর
মন্দকে অপছন্দ করি।[138]
আলোচ্য হাদিসে মুমিনের তিনটি মর্যাদা ফুটে ওঠে। প্রথমত : ‘যে ব্যক্তি আমার ওলির সাথে শত্রুতা করে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করছি।’ এ সম্পর্কে- প্রখ্যাত আলেমে দীন, বরিশাল দারুল আবরার মডেল কামিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল, আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন ওস্তাদ মুফতি মুহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম (রহ.) বলেন, সমগ্র কুরআন ও হাদিসে মাত্র দুটি জায়গায় আল্লাহ তাআলা সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা করেছেন- ১.সুদের বিরুদ্ধে যেমন আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন- فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ অর্থ:
‘অতঃপর
যদি তোমরা সুদ পরিত্যাগ
না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর
রসূলের সাথে যুদ্ধ করতে
প্রস্তুত হয়ে যাও। কিন্তু
যদি তোমরা তওবা কর,তবে তোমরা
নিজের মূলধন পেয়ে যাবে। তোমরা কারও প্রতি জুলুম
করো না এবং কেউ তোমাদের
প্রতি জুলুম করবে না।[139]
২.‘আল্লাহর ওলি তথা কামেল মুমিনের সাথে যে শত্রুতা করে তার বিরুব্ধে যুদ্ধের ঘোষণা।’ প্রিয় বন্ধুগণ! এতে খুব সহজেই অনুমেয় হয় যে,
একজন কামেল মুমিনের মূল্য-মর্যাদা আল্লাহর নিকট কী পরিমাণ যার কারণে যুদ্ধের ঘোষণা
করেছেন।
দ্বিতীয়ত : ‘তখন আমি তাঁর কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে,তাঁর চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে------।’ মুহাদ্দেসে কেরামগণ এর
বিভিন্ন ব্যাখ্যা লিখেছেন, এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো,
মহান আল্লাহ বান্দার কান-চোখ, হাত-পা হওয়ার কথা বলে মুমিন বান্দার সম্মান মর্যাদা বহু উচ্চাঙ্গে সমাসীন করলেন।
তৃতীয়ত : ‘আমি যা করার ইচ্ছা করি, সে ব্যাপরে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগি না কেবল মুমিনের
আত্মার ব্যাপার ছাড়া। সে মৃত্যুকে
অপছন্দ করে আর আমি তাঁর মন্দকে অপছন্দ করি।’ এখানে অল্লাহ তাআলা মুমিনের অপছন্দকে মূল্যায়ন করেছেন। কারণ পৃথিবীর থাকার জায়গা নয়, সকল প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ
করতেই হবে। এটা প্রভুর
অনিবার্য সিদ্ধান্ত। তাঁর কাজের
জন্য, তিনি কারও কাছে কৈফিয়ত দিতে হয়
না। তারপরও তিনি যে মুমিনের জান কবজের
সময় দ্বিধাবোধের কথা বলেছেন, তা শুধু তাঁর
অসীম দয়া-স্নেহ-করুণা ও আপন বান্দার সম্মানের
কারণে।
আল্লাহর ওলিদের তথা প্রিয় বান্দাদের সঙ্গে বেআদবি বা কষ্ট দিলে কী পরিণাম
হয় তার দুটি ঘটনা নিচে উল্লেখ করছি:
(১) হজরত সাদ (রা.)এর নামে মিথ্যাপবাদের ফলাফল :
عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ : شَكَا أَهْلُ الْكُوفَةِ سَعْدًا إِلَى عُمَرَ فَعَزَلَهُ ، وَاسْتَعْمَلَ عَلَيْهِمْ عَمَّارًا فَلَمْ يَدَعْ مَسْجِدًا إِلاَّ سَأَلَ عَنْهُ وَيُثْنُونَ مَعْرُوفًا حَتَّى دَخَلَ مَسْجِدًا لِبَنِى عَبْسٍ ، فَقَامَ رَجُلٌ مِنْهُمْ يُقَالُ لَهُ أُسَامَةُ بْنُ قَتَادَةَ يُكْنَى أَبَا سَعْدَةَ قَالَ : أَمَّا إِذْ نَشَدْتَنَا ، فَإِنَّ سَعْدًا كَانَ لاَ يَسِيرُ بِالسَّرِيَّةِ ، وَلاَ يَقْسِمُ بِالسَّوِيَّةِ ، وَلاَ يَعْدِلُ فِى الْقَضِيَّةِ. قَالَ سَعْدٌ : أَمَا وَاللَّهِ لأَدْعُوَنَّ اللَّهَ بِثَلاَثٍ : اللَّهُمَّ إِنْ كَانَ عَبْدُكَ هَذَا كَاذِبًا ، قَامَ رِيَاءً وَسُمْعَةً ، فَأَطِلْ عُمْرَهُ وَأَطِلْ فَقْرَهُ وَعَرِّضْهُ بِالْفِتَنِ. وَكَانَ بَعْدُ إِذْ يُسْأَلُ يَقُولُ : شَيْخٌ كَبِيرٌ مَفْتُونٌ أَصَابَتْنِى دَعْوَةُ سَعْدٍ. قَالَ عَبْدُ الْمَلِكِ : فَأَنَا رَأَيْتُهُ بَعْدُ قَدْ سَقَطَ حَاجِبَاهُ عَلَى عَيْنَيْهِ مِنَ الْكِبَرِ ، وَإِنَّهُ لَيَتَعَرَّضُ لِلْجَوَارِى فِى الطُّرُقِ يَغْمِزُهُنَّ. رَوَاهُ الْبُخَارِىُّ অর্থ: হজরত জাবের ইবনে
সামুরা (রা.)
থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
কুফাবাসীরা হজরত সাদ (রা.)-এর বিরুদ্ধে ওমর (রা.)-এর
অভিযোগ করল-(ওমর রা. তদন্ত করার জন্য
প্রতিনিধি প্রেরণ করলেন)-------- সব মসজিদের লোকেরাই তাঁর (সাদ রা.-এর) প্রশংসা করল।
অবশেষে তারা বনি আবসের মসজিদে এলেন। সেখানে মসজিদে লোকদের মধ্যে একজন লোক দাঁড়ালো,
তার নাম ওসামা ইবনে কাতাদা এবং তার ডাকনাম ছিল আবু সাদ। সে বলল,
যখন আমাদের জিজ্ঞেস করা হয়েছে। তখন আমি বলে দিচ্ছি, সাদ কখনও কোনো সেনাদলের সঙ্গে যান না এবং গনিমতের মালও সমভাবে বণ্টন করেন
না। আর রাষ্ট্রীয় ব্যাপারেও ন্যায় বিচার করেন না। সাদ (রা.)
বলেন, আল্লাহর কসম! আমিও
তিনটি বদ দোআ দিবো। এ সময় সাদ(রা.) আবেগ
প্রবণ হয়ে পড়লেন এবং বললেন, হে আল্লাহ! যদি তোমার ঐ বান্দা মিথ্যুক হয়ে থাকে এবং লোক দেখাবার ও খ্যাতি লাভ করার
জন্য দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে তার আয়ু দীর্ঘ করে দাও, তার দারিদ্র্য ও অনাহারকে দীর্ঘ করে দাও এবং তাকে ফেতনার মধ্যে নিক্ষেপ
কর। কাজেই এ বদ দোআর যখন সেই ব্যক্তিকে
জিজ্ঞেস করা হতো, সে বলতো বুড়ো, থুরথুরে
বুড়ো, ফেতনার মধ্যে ডুবে গেছে। আমার ওপর সাদের বদ দোআ
লেগেছে। বর্ণনাকারী জাবের (রা.) বলেন,
আমি তাকে দেখেছি। বুড়ো হবার কারণে তার চোখের পাতা চোখের ওপর পড়েছিল।
এবং সে পথে খাঁটে যুবতি, মেয়েদের টানাটানি করত ও তাদেরকে জ্বালাতন করে ফেরত।[140]
নোট : হাদিসটির
অংশ বিশেষ উল্লেখ করা হয়েছে।
(২) সাঈদ
ইবনে জায়েদ (রা.)-এর বদ দোআর পরিণাম :
وعن عروة بن الزبير : أنَّ سعيد بن زيد بن عمرو بن نُفَيلٍ - رضي الله عنه - خَاصَمَتْهُ أَرْوَى بِنْتُ أوْسٍ إِلَى مَرْوَانَ بْنِ الحَكَمِ ، وادَّعَتْ أنَّهُ أخَذَ شَيْئاً مِنْ أرْضِهَا ، فَقَالَ سعيدٌ : أنا كُنْتُ آخُذُ شَيئاً مِنْ أرْضِهَا بَعْدَ الَّذِي سَمِعْتُ مِنْ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - ؟! قَالَ : مَاذَا سَمِعْتَ مِنْ رَسُولِ الله - صلى الله عليه وسلم - ؟ قَالَ : سَمِعْتُ رسولَ الله - صلى الله عليه وسلم - يقول : « مَنْ أخَذَ شِبْراً مِنَ الأرْضِ ظُلْماً ، طُوِّقَهُ إِلَى سَبْعِ أرْضِينَ » فَقَالَ لَهُ مَرْوَانُ : لا أسْألُكَ بَيِّنَةً بَعْدَ هَذَا ، فَقَالَ سعيد : اللَّهُمَّ إنْ كَانَتْ كاذِبَةً ، فَأعْمِ بَصَرَها ، وَاقْتُلْهَا في أرْضِها ، قَالَ : فَما ماتَتْ حَتَّى ذَهَبَ بَصَرُهَا ، وَبَيْنَما هِيَ تَمْشِي في أرْضِهَا إذ وَقَعَتْ في حُفْرَةٍ فَماتَتْ . متفق عَلَيْهِ .
وفي روايةٍ لِمُسْلِمٍ عن محمد بن زيد بن عبد الله بن عُمَرَ بِمَعْنَاهُ ، وأنه رآها عَمْيَاءَ تَلْتَمِسُ الجُدُرَ تقولُ : أصابَتْنِي دَعْوَةُ سَعيدٍ ، وأنَّها مَرَّتْ عَلَى بِئرٍ في الدَّارِ الَّتي خَاصَمَتْهُ فِيهَا ، فَوَقَعَتْ فِيهَا ، فَكَانتْ قَبْرَها .
অর্থ:
উরওয়া ইবনে
জুবায়ের (রা.)
বর্ণনা করেন। সাঈদ ইবনে জায়েদ (রা.)-এর সঙ্গে আরওয়া বিনতে আওসের বিবাদ বাঁধে একটি জমি নিয়ে। মারওয়ান জিজ্ঞেস
করলেন, আপনি রসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে কী শুনেছেন। সাঈদ (রা.) বললেন, আমি
রসূলুল্লাহ (ﷺ)
হতে শুনেছি-যে
ব্যক্তি কারও থেকে জুলুম করে এক বিঘত জমিও নিবে, কেয়ামতের দিন
তার গলায় সাত স্তবক জমিন বেড়ী পরিয়ে দেওয়া হবে। মারওয়ান বললেন, ব্যাস, এরপর আমি আপনার
কাছে থেকে আর দলিল প্রমাণ চই না। সাঈদ (রা.)
বললেন, হে আল্লাহ! যদি এ
মহিলা মিথ্যাবাদী হয়, তাহলে তার চোখ অন্ধ করে দাও এবং তার জমিতেই
মৃত্যু দাও। বর্ণনাকারী বলেন, এ মহিলা মরেনি যতদিন না সে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর
একদিন সে অন্ধ অবস্থায় তার জমির ওপর দিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় একটি গর্তের মধ্যে পড়ে যায় এবং তাতেই
তার মৃত্যু ঘটে।[141]
আল্লাহর নিকট রোজাদের মুখের গন্ধের মূল্য
عَنِ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: " وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ الْمِسْكِ " অর্থ: হজরত
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ
করেছেন: “ঐ সত্তার কসম! যার হাতে মুহাম্মাদের
প্রাণ, রোজাদের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের সুগন্ধি অপেক্ষা
অধিক প্রিয়।[142]
মুমিন
তার রবের আদেশে ও তাঁর খুশির জন্য রোজা রাখে। দিনভর উপোস থাকার ফলে তার মুখের গন্ধের সৃষ্টি হয়(মুখ পরিষ্কার না করার দরুন যে দুর্গন্ধ হয়, সেটা উদ্দেশ্য
নয়)। আর এই গন্ধ মহান আল্লাহর নিকট মেশকের
ঘ্রাণের চেয়েও শ্রেয়। রোজাদার মুমিনের
মুখের গন্ধই যদি এত প্রিয় হয়, তাহলে খোদ রোজাদার মুমিন আল্লাহর
নিকট কত প্রিয়-মাহবুব ?
মুমিনদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ, সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও সহযোগিতা
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব : মদিনায় হিজরতের পর রসূল (ﷺ)
আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে সুসম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। মদিনায় রসূল (ﷺ)
আনাস ইবনে মালেকের গৃহে আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব কায়েম করেন। নব্বই জন
সাহাবি তার ঘরে একত্রিত হয়; অর্ধেক আনসার আর বাকি অর্ধেক মুহাজির। তাদের সম্পর্ক বদরের
যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এতই নিবিড় ছিল, একজন মারা গেল তার সম্পত্তিতে অপরজন অংশ পেত।
অথচ তার সাথে রক্তের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তারপর যখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাজিল
করেন, তখন উত্তরাধিকার শুধু মাত্র রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
﴿وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ
مِنۢ بَعۡدُ وَهَاجَرُواْ
وَجَٰهَدُواْ مَعَكُمۡ فَأُوْلَٰٓئِكَ مِنكُمۡۚ
وَأُوْلُواْ ٱلۡأَرۡحَامِ بَعۡضُهُمۡ
أَوۡلَىٰ بِبَعۡض فِي
كِتَٰبِ ٱللَّهِۚ إِنَّ
ٱللَّهَ بِكُلِّ شَيۡءٍ
عَلِيمُۢ ﴾ [الأنفال:75 ]
অর্থ, আর যারা পরে ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং তোমাদের সাথে জিহাদ করেছে,
তারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত,
আর আত্মীয়-স্বজনরা একে অপরের
তুলনায় অগ্রগণ্য, আল্লাহর কিতাবে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ে মহাজ্ঞানী।[143]
রসূল (ﷺ) তাদের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন,
তা শুধু কাগজের লেখা বা মুখের কথা
ছিল না। বরং তাদের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছিল তা ছিল তাদের অন্তরের গাথা
একটি চিরন্তন বন্ধন, তা ছিল তাদের জান মালের সাথে একাকার ও অভিন্ন। তাদের কথা ও
কাজে ছিল একটি চিরন্তন ও স্থায়ী সম্পর্কের বহি:প্রকাশ। বিপদে আপদে তারা ছিলেন একে
অপরের হিতাকাংক্ষি ও সহযোগী। বুখারিতে এ বিষয়ে একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা
হয়-
«
حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمُ بْنُ سَعْدٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ لَمَّا قَدِمُوا الْمَدِينَةَ آخَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ وَسَعْدِ بْنِ الرَّبِيعِ قَالَ لِعَبْدِ الرَّحْمَنِ إِنِّي أَكْثَرُ الْأَنْصَارِ مَالًا فَأَقْسِمُ مَالِي نِصْفَيْنِ وَلِي امْرَأَتَانِ فَانْظُرْ أَعْجَبَهُمَا إِلَيْكَ فَسَمِّهَا لِي أُطَلِّقْهَا فَإِذَا انْقَضَتْ عِدَّتُهَا فَتَزَوَّجْهَا قَالَ بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ وَمَالِكَ أَيْنَ سُوقُكُمْ فَدَلُّوهُ عَلَى سُوقِ بَنِي قَيْنُقَاعَ فَمَا انْقَلَبَ إِلَّا وَمَعَهُ فَضْلٌ مِنْ أَقِطٍ وَسَمْنٍ ثُمَّ تَابَعَ الْغُدُوَّ ثُمَّ جَاءَ يَوْمًا وَبِهِ أَثَرُ صُفْرَةٍ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَهْيَمْ قَالَ تَزَوَّجْتُ قَالَ كَمْ سُقْتَ إِلَيْهَا قَالَ نَوَاةً مِنْ ذَهَبٍ أَوْ وَزْنَ نَوَاةٍ مِنْ ذَهَبٍ شَكَّ إِبْرَاهِيمُ
অর্থ, আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ও সাদ ইবনে রবি (রা.)
উভয়ের মাঝে রসূল (ﷺ) সুসম্পর্ক কায়েম ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন। তখন সাদ (রা.) তার
সাথীকে বলল, আনসারিরা জানে আমি সম্পদের দিক দিয়ে তাদের চেয়ে অধিক
সম্পদের অধিকারি। সুতরাং, তুমি আমার যাবতীয় সম্পদকে তোমার মধ্যে ও আমার মধ্যে দুই ভাগ
করে নাও; অর্ধেক তোমার আর বাকি অর্ধেক আমার। আর আমার দুটি স্ত্রী আছে তাদের মধ্যে তোমার
নিকট যাকে পছন্দ হয়, তার নাম নিয়ে বল, আমি তাকে তালাক দিয়ে দিব তারপর যখন তার ইদ্দত
শেষ হয়ে যাবে, তখন তুমি তাকে বিবাহ করবে। এ সব কথা শোনে আব্দুর রহমান তার
সাথীকে বলল, আল্লাহ তা‘আলা তোমার পরিবার ও জান- মালের মধ্যে বরকত দান করুন।
তোমাদের বাজার কোথায়? তারা বনি কায়নুকা নামক বাজারের সন্ধান দিলে,
সেখান থেকে সে সামান্য পণীর ও ঘি
নিয়ে ফিরে আসে। তারপর তারা দুপুরের খাওয়া খায়। এরপর সে একদিন রসূল (ﷺ) এর নিকট আসে তার দেহে লাল রং এর
আলামত পরিলক্ষিত দেখে রসূল (ﷺ) তাকে বলল, তোমার কী অবস্থা? উত্তরে সে বলল, আমি একজন আনসারি নারীকে বিবাহ করেছি। তখন রসূল
তাকে বলল, এ বিষয়ে তুমি কী খরচ করেছ? সে বলল, একটি খেজুরের আটি পরিমাণ স্বর্ণ। তারপর রসূল (ﷺ) তাকে বললেন,
তুমি ওলিমা খাওয়াও! যদি না পার
তাহলে কমপক্ষে একটি ছাগল হলেও খাওয়াও।[144]
পারস্পরিক
সহমর্মিতা,
সহানুভূতি : এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ
أَوْلِيَاء بَعْضٍ يَأْمُرُونَ
بِالْمَعْرُوفِ
وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ অর্থ: আর মুমিন পুরুষরা ও মুমিনা নারীরা হচ্ছে পরস্পর একে অন্যের
বন্ধু, তারা সৎ বিষয়ে শিক্ষা দেয় এবং অসৎ বিষয়
হতে নিষেধ করে।[145]
এর পূর্বের আয়াতে মুনাফেকের বদাভ্যাসের বর্ণনা দেওয়ার পর আল্লাহ
তাআলা এখানে মুমিনের উত্তম স্বভাবের বর্ণনা দিয়েছেন। মুমিনরা পরস্পর
একে অপরের সাহায্য থাকে এবং একে অন্যের বাহু স্বরূপ। যেমন হাদিস শরিফে এসছে-
عَنْ أَبِي مُوسَى، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا
(১) অর্থ: আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত।
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন: একজন মুমিন
ব্যক্তি অপর মুমিনের জন্য একটি অট্টালিকা সদৃশ, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে। তিনি এ কথা বলে তাঁর এক
হাতের অঙ্গুলিগুলোকে অন্য হাতের অঙ্গুলিগুলোর মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেখিয়ে দেন।[146]
عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ترى المؤمنين في تراحُمهم وتوادّهم وتعاطُفهم كمَثَل الجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى .
(২) অর্থ: হজরত নুমান ইবনে বশির (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন: তোমরা মুমিনদেরকে এমনভাবে পরস্পর দয়াশীল, বন্ধু, একে অপরের দুঃখে সহানুভূতিশীল দেখতে
পাবে যেমন একটি দেহের কোনো অঙ্গ রোগাক্রান্ত হলে সারটি দেহ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে
এবং জাগ্রত থাকার জন্য তৈরি হয়ে যায়।[147]
উপরোক্ত আয়াত
ও হাদিসদ্বয়ের সারমর্ম হচ্ছে, সারা বিশ্বের সকল মুসলমান একটি
দেহের মত, দেহের একটি অঙ্গ আঘাতপ্রাপ্ত হলে সর্বশরীরে তা অনুভুত
হয়, ঠিকতেমনি পৃথিবীর একজন মুসলমান দুঃখিত-ব্যথিত হলে বাকি সকল মুসলমান তা অনুভব করবে, মুসলমানের
কষ্টকে নিজের কষ্টের ন্যায় অনুভব করা, এটাই ঈমানের দাবি। এর ব্যত্যয় হলে বুঝতে হবে ঈমানের ঘাটতি রয়েছে। আর এই কথাটিই
জাগ্রত কবি মুহিব খান (রহ.) কত সুন্দর বলেছেন তার ছন্দে-
বন্ধু তোমার পা কেটে গেলে, ব্যাথা হয় কেন বুকে ?
বন্ধু তোমার হাত ভেঙ্গে গেলে, জল আসে কেন চোখে ?
বন্ধু তোমার ভাই মরে গেলে, তুমি কাঁদো কোন দুখে ?
বন্ধু তোমার ঘর পুড়ে গেলে,ভেঙ্গে পড়ো কোন শোকে ?
বলবে আমায় পাগল তুমি বুঝ না সহজ কথা ?
যে কোন অঙ্গে আঘাত পেলে যে,সারা দেহ করে ব্যাথা,
শিরায় শিরায় রক্ত ধারায় মিশে যায় যন্ত্রণা।
প্রকৃতির এই শাশ্বত বিধান তুমি কেন বুঝলে না
?
ওগো বন্ধু আমার তাহলে আসল কথাটা এবার শোনো!
সারা দুনিয়ার মুসলমানের ভেদাভেদ নেই কোনো,
উত্তর হতে দক্ষিণ মেরু সকলি মুসলমান,
সাদা-কালো আর ধনী-গরিব সবাই, এক দেহ এক প্রাণ।
তবে দুনিয়ার বুকে ভেসে যায় কত মুসলমানের খুন,
তবুও তোমার রক্তে এখনো জ্বলে না কেন আগুন ?
বন্ধু জ্বলে না কেন আগুন ?!!
মুসলমানের
মাঝে মীমাংসার নিমিত্তে মিথ্যা বলা শুধু জায়েজ নয়; বরং কাম্য
أُمَّ كُلْثُومٍ بِنْتَ عُقْبَةَ، أَخْبَرَتْهُ: أَنَّهَا سَمِعَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَيْسَ الكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ، فَيَنْمِي خَيْرًا، أَوْ يَقُولُ خَيْرًا زادمسلم قَالَ ابْنُ شِهَابٍ: وَلَمْ أَسْمَعْ يُرَخَّصُ فِي شَيْءٍ مِمَّا يَقُولُ النَّاسُ كَذِبٌ إِلَّا فِي ثَلَاثٍ: الْحَرْبُ، وَالْإِصْلَاحُ بَيْنَ النَّاسِ، وَحَدِيثُ الرَّجُلِ امْرَأَتَهُ وَحَدِيثُ الْمَرْأَةِ زَوْجَهَا. » অর্থ: উম্মে কুলসুম(রা.) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ
(ﷺ)ইরশাদ করেছেন: সে মিথ্যাবাদী নয়, যে মীমাংসার প্রত্যাশায় কোনো ভাল কথা মুখ দিয়ে বলে দেয় এবং কোনো
ব্যক্তিকে অপর ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোনো ভাল কথা পৌঁছিয়ে দেয়।[148]
নোট : (মুসলিম শরিফের বর্ণনায় শব্দ বেশি আছে। ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, তিনটি স্থান ছাড়া আর কোনো বিষয়ে রসূলুল্লাহ (ﷺ)মিথ্যা বলার অনুমতি দিয়েছেন বলে
আমি শুনিনি। যুদ্ধ কৌশলের ক্ষেত্রে, মানুষের মধ্যে আপোষ-মীমাংশা করার জন্য, সহধর্মিণীর সাথে স্বামীর কথা ও স্বামীর সাথে সহধর্মিণীর কথা বলার ক্ষেত্রে। )
মিথ্যা এমন এক জিনিস যা সবার কাছেই ঘৃণিত কোনো ধর্মে গ্রহণীয় নয়। তবে ইসলামে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ফায়দার জন্য কয়েক জায়গায় তা অনুমতি রয়েছে।
পরস্পর ঝগড়ার কুফল : وَأَطِيعُوا
اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ
وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- তোমরা ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর,পরস্পরে ঝগড়া-বিবাদ করো না, তা করলে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে, তোমাদের শক্তি-ক্ষমতা বিলুপ্ত হবে।[149]
এ আয়াতের বাস্তবচিত্র আজকে লক্ষ্য করছি; মুসলমানদের পারস্পারিক দ্বন্দ্ব-কলহের কারণে তাঁরা নির্যাতিত-নিষ্পেষিত, দিনদিন তাঁদের
রাজ্য হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে হাদিস শরিফে এসেছে-(১) হজরত উবাদা ইবনে সামেত (রা.) বলেন,
একবার নবি কারিম (ﷺ) আমাদের শবে কদরের নির্দিষ্ট তারিখ
জানানোর জন্য বের হলেন। তখন দুজন মুসলমানের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছিল। হুজুর (ﷺ) বলেন, আমি তোমাদের শবে কদরের নির্দিষ্ট তারিখ জানানোর উদ্দেশ্যে
বের হয়েছিলাম। কিন্তু ওমুক দুই লোকের মাঝে ঝগড়া হচ্ছিল। তাই তা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।
হয়তো তা উঠিয়ে নেওয়ার মধ্যেও কোনো কল্যাণ রয়েছে। অতএব,
তোমরা নবম,
সপ্তম ও পঞ্চম রাত্রিগুলোতে
তা তালাশ কর।[150]
(২)
আবুদ দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: আমি কি তোমাদেরকে নামাজ,
রোজা ও সদকার
চেয়ে উত্তম কাজ প্রসঙ্গে অবহিত করবো না? সাহাবিগণ বলেন,
হ্যাঁ। তিনি
বললেন: পরস্পর সুসম্পর্ক স্থাপন। কারণ, পরস্পর সুসম্পর্ক নষ্ট হওয়ার অর্থ হলো দীন
বিনাশ হওয়া।[151]
নবি (ﷺ) হতে আরো বর্ণিত আছে,
তিনি বলেন, এটা মুণ্ডন করে দেয়। আমি বলছি না
যে, তা মাথা মুড়িয়ে দেয়,
বরং তা দীনকে মুণ্ডন করে দেয় (বিনাশ করে)।[152]
(৩)আবু হুরাইরা (রা.)থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন- যে ব্যক্তি কোনো নারীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে অথবা
কোনো গোলামকে তার মনিবের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে সে আমার উম্মত নয়।[153] মুসলমানদের
মধ্যে ঝগড়া আল্লাহ তাআলার নিকট এতই
নিন্দিত যে, রসূলুল্লাহ (ﷺ) কে শবে কদর ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাইতো মিথ্যার মত হারাম-ঘৃণিত কাজকে পরস্পরকে আপোষ-ভালবাসা পয়দা, মুসলিম ভ্রাতৃত্ব বন্ধন অটুট রাখার কারণে মিথ্যা বলা জায়েজ করা হয়েছে।
মুসলমানকে ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য
মিথ্যা বলা ওয়াজিব : মুসলমানকে ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য মিথ্যা বলা ওয়াজিব। যেমন-কোনো এক মুসলমান কোনো অত্যাচারীর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য কোথাও লুকিয়ে রয়েছে। তখন ঐ ব্যক্তিকে অত্যাচারীর কবল থেকে বাঁচাবার জন্যে মিথ্যা বলে দেওয়া ওয়াজিব। আর তা তখন তাওয়ারিয়ার দ্বারা যখন কাজ চলে না, নতুবা তাওয়ারিয়াই বাঞ্ছনীয়।[154] .(এছাড়াও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ফায়দার জন্য কয়েক জায়গায় তা অনুমতি রয়েছে। বিস্তারিত দেখুন-মুখতালাফুল হাদিস-৪৩পৃ.)
عَنْ سُوَيْد
بْنِ حَنْظَلَةَ قَالَ : خَرَجْنَا نُرِيدُ رَسُولَ اللهِ ? وَمَعَنَا وَائِلُ ابْنُ حُجْرٌ
، فَأَخَذَهُ عَدُوٌّ لَهُ فَتَحَرَّجَ الْقَوْمُ أَنْ يَحْلِفُوا ، وَحَلَفْتُ
أَنَّهُ أَخِي فَخُلِّيَ
عَنْهُ ، فَأَتَيْنَا
إلَى رَسُولِ اللهِ ? فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لَهُ ،
فَقَالَ : « أَنْتَ كُنْتَ أَبَرَّهُمْ وَأَصْدَقَهُمْ صَدَقْتَ ، الْمُسْلِمُ
أَخُو الْمُسْلِمِ » . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَابْنُ مَاجَةْ অর্থ: হজরত সুওয়াইদ
ইবনে হানজালা (রা.)বর্ণনা করেন যে, আমরা রসূলুল্লাহ (ﷺ) সমীপে হাজির হওয়ার মানসে যাত্রা করলাম। আমাদের সঙ্গে ওয়াইল ইবনে হুজুরও ছিলেন। (পথে) তাঁর দুশমন তাকে ধরে ফেলল, অন্য সাথীরা শপথ করতে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হলেন; কিন্তু আমি শপথ করে বললাম যে, তিনি আমার ভাই। সে তৎক্ষাণাৎ আমার খাতিরে তাঁকে ছেড়ে দিল।আমরা যখন রসূলের খেদমতে উপস্থিত হলাম, তখন আমি আরজ করলাম যে, তারা তো শপথ করাকে পাপ বলে ধরে নিয়েছে; কিন্তু আমি শপথ করেই ফেলেছি যে, সে আমার ভাই। রসূল(ﷺ) বললেন, তুমি তো সত্যই বলেছ। একজন মুসলমান
অপর মুসলমানের ভাই।[155]
একবার হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর মুখ দিয়েও বিবি সারা সম্পর্কে (নিশ্চয়ই সে আমার বোন) এর সত্য বের হয়ে পড়েছিল। তাও
ছিল এক জালেম বাদশাহ থেকে নিজেদের ইজ্জত-সম্মান হেফাজত করার
মানসে।
এবার বিচার করে দেখুন, উপরোক্ত ঘটনায় যদি ইসলামি ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে ঐ শপথকারী এগিয়ে না আসতো, তবে কি অন্যায়ভাবে একজন সাহাবির মূল্যবান প্রাণহানি হতো না?[156]
এতে প্রতিয়মান হয় যে, ইসলামে একজন মুসলমানের জান-মালের দাম কত? ইসলামে পারিবারিক-সামাজিক জীবনের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই যে ব্যক্তি ইসলামের সমষ্টিগত ঐক্যে ফাটল-বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী সে মুসলমান বলে গণ্য হবার যোগ্য নয়।
মুসলমানের হকসমূহ
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اُنْصُرْ أَخَاك ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا , قُلْت يَا رَسُولَ اللهِ، أَنْصُرُهُ مَظْلُومًا، فَكَيْفَ أَنْصُرُهُ ظَالِمًا؟ , قَالَ: تَمْنَعُهُ مِنْ الظُّلْمِ، فَذَلِكَ نَصْرُك إيَّاهُ.
অর্থ: আনাস (রা.)বর্ণনা করেন। রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেন, তোমাদের মুসলমান ভাইকে সর্বাবস্থায় সাহায্য কর চাই সে অত্যাচারী হোক কিংবা অত্যাচারিত। জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসূল! অত্যাচারিত অবস্থায় তো সাহায্য করতে পারি কিন্তু অত্যাচারী অবস্থায় কেমন করে তাকে সাহায্য করবো? তিনি বললেন,তুমি তাকে অত্যাচার করা থেকে বিরত রাখ। কেননা অত্যাচারীকে অত্যাচার করা থেকে নিবৃত্ত রাখার অর্থই হচ্ছে তাকে সাহায্য করা।[157]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ -:
حَقُّ
الْمُسْلِمِ
عَلَى
الْمُسْلِمِ
سِتٌّ
قِيلَ
مَا
هُنَّ
يَا
رَسُولَ
اللَّهِ
قَالَ
: إِذَا
لَقِيتَهُ
فَسَلِّمْ
عَلَيْهِ،
وَإِذَا
دَعَاكَ
فَأَجِبْهُ،
وَإِذَا
اسْتَنْصَحَكَ
فَانْصَحْ
لَهُ،
وَإِذَا
عَطَسَ
فَحَمِدَ
اللَّهَ
فَسَمِّتْهُ،
وَإِذَا
مَرِضَ
فَعُدْهُ
وَإِذَا
مَاتَ
فَاتَّبِعْهُ অর্থ: আবু হুরাইরা
(রা.) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ)
ইরশাদ করেন- এক মুসলিমের ওপর অন্য
মুসলিমের ছয়টি হক রয়েছে। বলা হলো, সেগুলো কী হে আল্লাহর রসূল ? তিনি
বললেন :
(১) তুমি
যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তাকে সালাম
দেবে।
(২) সে
যখন তোমাকে নিমন্ত্রণ (দাওয়াত) করবে তা রক্ষা করবে।
(৩) সে
যখন তোমার মঙ্গল কামনা করবে, তুমিও তার শুভ
কামনা করবে।
(৪) যখন
সে হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলবে, তখন তুমি ইয়ারহামুকাল্লাহ বলবে।
(৫) যখন
সে অসুস্থ হবে, তুমি তাকে দেখতে যাবে।
(৬) এবং
যখন সে মারা যাবে, তখন তার জানাযায়।[158]
নোট : কোনো কোনো বর্ণনায় শব্দে র ভিন্নতা রয়েছে।
মুমিন তার ভাইয়ের
দামের ওপর দাম এবং বিবাহের প্রস্তাবের ওপর প্রস্তাব দিবে না
عن أبي هُريرة قال: نهى رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم -؛ أنْ يَبِيعَ حَاضِرٌ لبَادٍ: "ولا تَناجَشُوا، ولا يبيعُ الرَّجلُ على بيعِ أخِيه، ولا يخطُبُ على خِطْبَةِ أخِيه، ولا تسألُ المرأةُ طلاقَ أُختِها؛ لِتكْفَأَ ما فِي إنائِها" অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে
বার্ণত। তিনি বলেন,রসূলুল্লাহ (ﷺ) গ্রাম্য লোকের পণ্যদ্রব্য বেচতে শহরে লোককে নিষেধ
করেছেন। “ক্রেতাকে প্রতারিত করে মূল্য বৃদ্ধির জন্য দালালি করো না। কোন ব্যক্তি তার (মুসলিম) ভাইয়ের ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর ক্রয়-বিক্রয় করবে না। আর কোন ব্যক্তি তার ভাইয়ের বিবাহ-প্রস্তাবের ওপর নিজের
প্রস্তাব দেবে না। কোন মহিলা
তার বোনের (সতিনের) তালাক চাইবে না;
যাতে সে তার পাত্রে যা আছে তা ঢেলে ফেলে দেয়। (এবং একাই স্বামী-প্রেমের অধিকারিণী হয়)।[159]
অত্র
হাদিসে নবি (ﷺ) কারিম ব্যক্তিগত,সামাজিক ও লেনদেনের
ক্ষেত্রে আহকাম বর্ণনা করেছেন। যা মুসলিম সমাজে ঝগড়া-মারামারি,বিশৃংখলা-অশাস্তির অন্যতম কারণ। কোন ধরণের দালালি নিষিদ্ধ ? যদি কোন পণ্যদ্রব্য ক্রয়ের ইচ্ছা না থাকে; বরং প্রকৃত ক্রেতাকে ঠকানোর
উদ্দেশ্যে পণ্যের উচ্চদাম হাঁকা। এটা এক ধরণের প্রতারণা এবং মুসলমানদের মধ্যে পরস্পরে ঘৃণা ও শত্রুতার বীজ বপন করে। এ ধরণের কর্মকান্ডের ফলে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি
পায়। উক্ত হাদিস শরিফে এ ধরণের দালালি নিষেধ করা হয়েছে।
মাসয়ালা : প্রশ্ন : দালালি করে মজুরি নেয়া জায়েয কিনা?
উত্তর : দালালি করে মজুরি নেয়া জায়েয আছে। তবে শর্ত হলো, কতো টাকা মজুরি দিতে হবে তা পূর্বেই নির্দিষ্ট করে নিতে হবে।[160]
একজনের দামের ওপর দাম না করা: অর্থাৎ একজন ব্যক্তি কোন মাল ক্রয় করার জন্য বিক্রিতার সঙ্গে দরকষাকষি
করছেন। এমতাবস্থায় তাদের দামাদামি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত অথবা ক্রেতা
উক্ত পণ্য ছেড়ে না দেওয়া পর্যন্ত অপর ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় যে, সে হুট করে দাম বলবে।
একজনের বিয়ের প্রস্তাবের ওপর প্রস্তাব না দেওয়া: অর্থাৎ বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর ছেলে ও মেয়ে পক্ষ যতক্ষণ না অসম্মতি
জ্ঞাপন করে, ততক্ষণ অন্যজন প্রস্তাব দিতে পারবে না। হায় আফসোস! বিবাহের মত বৈধ কাজের ব্যাপারে
নিষেধাজ্ঞা। অবৈধ সম্পর্ক-প্রেম-পরকিয়ার ক্ষেত্রে কিভাবে জায়েয। এমন কোন দিন
নেই যে, অনৈতিক প্রেম-সম্পর্ক-পরকীয়ার জেরে খুন-খারাবি,মা মলা-মোকাদ্দামা হচ্ছে না। উদাহরণ স্বরূপ সম্প্রতি কয়েকটি
ঘটনা উল্লেখ করছি : (১)ত্রিভুজ প্রেমের জেরে বন্ধুকে খুন করেছেন তিনি : পিবিআই পিরোজপুরের পুলিশ পরিদর্শক মো.
মাহমুদুর রহমান জানান, ত্রিভুজ প্রেমের
কারণে মুঠোফোনে নাজিরপুর উপজেলার পশ্চিম চর বানিয়ারী এলাকায় ডেকে নিয়ে বাবলু
মণ্ডলকে (২১) লাঠি দিয়ে মাথায় এবং কেচি (সিজার) দিয়ে বুকে আঘাত করে হত্যা করে তার
বন্ধু গোপাল মণ্ডল (২০)। গোপাল মণ্ডল বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার চরবানিয়ারী
বাওয়ালীপাড়া গ্রামের গোলক মন্ডলের ছেলে।[161]
(২)অপমৃত্যু নয়,
প্রেমিকার কারণেই খুন হন শরিফ : রেলওয়ে
থানা পুলিশের ধারণা ছিল ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেছে শরিফুল ইসলাম শরিফের। থানায় এমন
অভিযোগে অপমৃত্যুর মামলাও হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে মামলা তদন্ত করে প্রকৃত
রহস্য বের করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দুর্ঘটনা নয় প্রেমের কারণেই
হত্যা করা হয়েছিল কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার গোলাচৌ গ্রামের সিরাজুল হকের ছেলে
শরিফুল ইসলাম শরিফকে।[162]
(৩) মধুপুরে স্ত্রীর
পরকীয়ায় স্বামী খুন : মধুপুরে
স্ত্রীর পরকীয়ার কারণে খুন হয়েছেন স্বামী আরশেদ। ঘটনাটি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার
থলবাড়ি গ্রামে।[163]
(৪) নাটোরে পরকীয়ার কারণে খুন : গত ১৫ জুন
বড়াইগ্রাম উপজেলার ইকোরি গ্রামের মৃত খয়ের উদ্দিনের ছেলে মোবারক হোসেন খুন হন।
মোবারককে হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।[164]
তালাক না চাওয়া : অর্থাৎ যদি কোন ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকে; এমতাবস্থায়
কোন স্ত্রী তার সতিনের তালাকের জন্য স্বামীকে বলবে না বা চাপ প্রয়োগ করবে না।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, সতিন তার সতিনের তালাক চাওয়া
যদি নিষেধ হয় তাহলে প্রেম-পরকিয়া মাধ্যমে তালাক দিতে বা হত্যা
করতে বলা কিভাবে জায়েজ হবে? আমাদের সমাজে এমন বহু এরকম অবৈধ সম্পর্কের
জেরে আপন স্বামীর হাতে স্ত্রী নিহত এবং আপন স্ত্রীর হাতে স্বামী নিহত হচ্ছে। আল্লাহ আমাদেরকে এসব থেকে হেফাজত করুন।
মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ না রাখা বড় আমল, জান্নাতি ব্যক্তির
আলামত
وَلَا
تَجْعَلْ فِي
قُلُوبِنَا غِلًّا
لِلَّذِينَ آمَنُوا
رَبَّنَا إِنَّكَ
رَءُوفٌ رَحِيمٌ
অর্থ : ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু,
পরম করুণাময়।[165]
মুসলিমের প্রতি এক জাররাও হিংসা-বিদ্বেষ না রাখা এবং
তাঁদের জন্য হৃদয়ে ভালোবাসা লালন করা, এক মস্তবড় আমল যা জান্নাতি ব্যক্তির আলামত।
এই অর্থেরই ইঙ্গিত বহন করে নিম্নের হাদিসটি : হজরত আনাস (রা.)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবি (ﷺ)-এর কাছে বসা ছিলাম। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনন
, “এখন তোমাদের সামনে একজন জান্নাতি
ব্যক্তি উপস্থিত হবে। তারপর আনসারিদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। তার দাড়ি থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ওজুর পানি ঝরছিল। বাম হাতে তার জুতো ধরা। পরদিন নবি (ﷺ) অনুরূপ বললেন। প্রথম বারের মতো ওই ব্যক্তিই উপস্থিত হলো। তৃতীয় দিন এলে নবি (ﷺ) একই রকম বললেন। এবারও প্রথম বারের মতো ওই ব্যক্তিই উপস্থিত হলো। নবি (ﷺ)যখন বৈঠক ত্যাগ করলেন, আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস তার পিছু নিলেন। তাকে
তিনি বললেন, আমি আমার পিতার সঙ্গে ঝগড়া করেছি। এক পর্যায়ে কসম করেছি তিনদিন আমি তার কাছে যাব না। তুমি যদি আমাকে এ সময়টুকু তোমার কাছে থাকতে দিতে? তিনি বললেন, ঠিক আছে। আনাস রা. বলেন, আবদুল্লাহ বলতেন, তিনি তার সাথে তিনটি রাত অতিবাহিত করেছেন। তাকে তিনি রাতে নামাজ পড়তে দেখেননি। তবে এতটুকু দেখেছেন যে, রাতে যখন তিনি ঘুম থেকে জাগ্রত হন, তখন তিনি পাশ ফিরে ফজরের
নামাজ শুরু হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর জিকির ও তাকবিরে লিপ্ত থাকেন।
আবদুল্লাহ বলেন, তবে আমি তাকে ভালো ছাড়া কারও মন্দ বলতে শুনিনি। অতঃপর যখন তিন রাত অতিক্রম হলো এবং আমি তার আমলকে সামান্য জ্ঞান করতে লাগলাম। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেসই করে বসলাম, হে আল্লাহর বান্দা, আমার ও আমার পিতার মাঝে কোনো রাগারাগি বা ছাড়াছাড়ির ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু আমি নবি (ﷺ)কে তোমার সম্পর্কে তিনদিন বলতে শুনেছি : “এখন তোমাদের সামনে একজন জান্নাতি লোক উপস্থিত হবে।” আর ঘটনাক্রমে
তিনবারই তুমি উপস্থিত হয়েছো। এজন্য আমি তোমার সান্নিধ্যে এসেছিলাম। তুমি কী আমল করো তা দেখতে। যাতে আমি তোমাকে অনুসরণ
করতে পারি। আমি তো তোমাকে খুব বেশি আমল করতে দেখলাম না।
তাহলে তোমার কোন আমল তোমাকে রসূলুল্লাহ বর্ণিত মর্যাদায় পৌঁছালো? ওই ব্যক্তি বলল, তুমি যা দেখলে তার বেশি কিছুই নয়। তিনি বলেন, যখন আমি ফিরে আসছিলাম, সে আমাকে ডাক দিলো। অতঃপর সে বললো, তুমি যা দেখলে তা তার চেয়ে বেশি কিছুই নয়। তবে মনে আমি কখনো কোনো মুসলমানের প্রতি হিংসা ও শত্রুতা করিনি
এবং কখনো কোন মুসলমানের অমঙ্গল কামনা করিনি। আমি তাঁর এ কথা শুনে বললামঃ হ্যাঁ,এবার আমার জানা হয়ে গেছে যে, আপনার এই আমলই আপনাকে এই মর্যাদায় পৌঁছিয়েছে। আর এটা এমনই এক আমল যে, অনেকেই এটার ক্ষমতা রাখে না।[166]
সব মুমিনকে ক্ষমা করা হয় তবে যারা
পরস্পরে বিদ্বেষ রয়েছে তারা ব্যতিত
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ تُعْرَضُ أَعْمَالُ النَّاسِ فِي كُلِّ جُمُعَةٍ مَرَّتَيْنِ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمِيسِ فَيُغْفَرُ لِكُلِّ عَبْدٍ مُؤْمِنٍ إِلاَّ عَبْدًا بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ فَيُقَالُ اتْرُكُوا - أَوِ ارْكُوا - هَذَيْنِ حَتَّى يَفِيئَا. অর্থ: আবু হুরাইরা (রা.)-এর সূত্রে রসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেন, “মানুষের
‘আমাল’ (সপ্তাহে দু’বার)
সোমবার ও বৃহস্পতিবার (আল্লাহর দরবারে) উপস্থাপন করা হয়। এরপর প্রত্যেক মুমিন
বান্দাকে ক্ষমা করা হয়। তবে সে ব্যক্তিকে নয়, যার ভাই-এর সাথে তার দুশমনি-বিদ্বেষ রয়েছে। তখন বলা হবে,
এ দু’জনকে
বর্জন করো অথবা অবকাশ দাও যতক্ষণ না তারা মীমাংসার প্রতি প্রত্যাবর্তন করে।[167]
যে মুমিনের কষ্ট
দূর করবে, আল্লাহ তার কষ্টসমূহ দূর করবেন
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا، نَفَّسَ اللهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ، يَسَّرَ اللهُ عَلَيْهِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا، سَتَرَهُ اللهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، وَاللهُ فِي عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ، وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ “.
অর্থ: আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দেবে আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ
গোপন রাখবেন। আর আল্লাহ তাআলা বান্দার সাহায্য করেন
যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্য করে। যে ব্যক্তি এমন পথে চলে-যাতে সে দীনি জ্ঞান অর্জন করে, তার জন্য
আল্লাহ জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।[168]
নোট : হাদিসটি বর্ণনার মধ্যে কম-বেশি রয়েছে।
যে মুসলমানের
দোষ খুঁজবে আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করবেন
عَنْ أَبِي بَرْزَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يَدْخُلِ الْإِيمَانُ قَلْبَهُ، لَا تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ، وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ، فَإِنَّهُ مَنْ تَتَّبَعَ عَوْرَاتِ الْمُسْلِمِينَ تَتَّبَعَ اللَّهُ عَوْرَتُهُ حَتَّى يَفْضَحَهُ فِي بَيْتِهِ» অর্থ:
হজরত আবু বারযা আসলামি রা. বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন: হে ঐ সকল লোক যারা শুধু মুখে ঈমান এনেছে অথচ তাদের
হৃদয়ে ঈমান প্রবেশ করেনি,
তোমরা মুসলমানের গিবত করো না এবং তাদের দোষ খোঁজায় লিপ্ত
হয়ো না। কেননা যে তাদের দোষ খোঁজায় লিপ্ত হয়, আল্লাহও তার পেছনে দোষ খোঁজেন। আর আল্লাহ যার দোষ খোঁজেন তাকে তার বাড়িতেই লাঞ্ছিত করে
ছাড়েন।[169]
মানুষ
যাবতীয় দুর্বলতার সমষ্টি। এমন কে আছে
যার কার্যকলাপ গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হলে তা থেকে কোন না কোন দোষ বের হবে না (তবে সমস্ত নবি আ .নিষ্পাপ, সকল
সাহাবি সত্যের মাপকাঠি এবং বিশিষ্ট বান্দদেরকে গুনাহ থেকে হেফাজত করেন)? তাই শরিয়ত এই দোষ অন্বেষণের অভ্যাসকে ঘৃণ্য স্বভাব বলে মন্তব্য করেছে। অতত্রব, কোন ব্যক্তি থেকে
কোন দোষ হয়ে থাকলে তা ক্ষমা করে দেওয়াই উচিত। কিন্তু যদি কোন বদ স্বভাবী এ জাতীয় বেহায়াপনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তবে তার দোষ ঢাকা সুন্নত নয়। বরং তার দোষ দেখেও না দেখার ভান করা পাপ। এ ব্যাপারটি রাষ্ট্রীয় আদালতে সোপর্দ করা উচিত। যাতে তার উপযুক্ত শাস্তি বিধান করা যায়। হাদিসের শব্দ এদিকেই ইঙ্গিত করছে যে, কোন ব্যক্তিকে অপমানিত করার জন্য তার দোষ-ত্রুটির পিছনে
পড়া অত্যন্ত নিন্দনীয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, لَا تَجَسَّسُواْ ‘তোমরা
গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না’। সূরা
হুজুরাত-১২ –এর অংশ বিশেষ। আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, যে দোষ তোমার সামনে আছে, তা ধর, কিন্তু কোন মুসলমানের
যে দোষ প্রকাশ্য নয়, তা সন্ধান করা জায়েয নয়। তবে যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে পাপ করে তার ব্যাপার
আলাদা। এ জাতীয় পাপী কখনও ক্ষমার যোগ্য নয়।[170]
মাসয়ালা : বয়ানুল কুরআনে আছে, গোপনে অথবা নিদ্রার ভান করে কারও কথাবার্তা শোনাও নিষিদ্ধ এর অন্তর্ভুক্ত। তবে যদি ক্ষতির আশংকা থাকে কিংবা নিজের অথবা অন্য মুসলমানের
হেফাজতের
উদ্দেশ্য থাকে, তবে ক্ষতিকারীর গোপন ষড়যন্ত্র
ও দুরভি-সন্ধি অনুসন্ধান জায়েয।[171]
মুসলমানের জান-মাল-ইজ্জত সম্মানিত এবং তা নষ্ট করা হারাম
فَإِنْ
تَابُوا وَأَقَامُوا
الصَّلَاةَ
وَآتَوُا الزَّكَاةَ
فَإِخْوَانُكُمْ
فِي الدِّينِ
وَنُفَصِّلُ
الْآيَاتِ لِقَوْمٍ
يَعْلَمُونَ
অর্থ : তবে তারা যদি তওবা করে, নামাজ কায়েম করে ও জাকাত আদায় করে, তবে তারা তোমাদের দীনি ভাই। আর আমি জ্ঞানী লোকদের জন্য বিধানাবলি বিস্তারিত বর্ণনা করে থাকি।[172]
এখানে
বলা হয় যে, কাফেররা যত শত্রুতা
করুক,যত নিপীড়ন চালাক, যখন সে মুসলমান
হয়,
তখন আল্লাহ তাআলা যেমন
তাদের কৃত অপরাধগুলো ক্ষমা
করেন, তেমনি সকল তিক্ততা ভুলে
তাদের ভ্রাতৃবন্ধনে আবদ্ধ
করা এবং ভ্রাতৃত্বের সকল দাবি
পূরণ করা মুসলমানের কর্তব্য।
হজরত
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, এ আয়াতে
কেবলানুসারী মুসলমানের রক্ত হারাম করে দিয়েছে। অর্থাৎ
যারা নিয়মিত নামাজ ও জাকাত
আদায় করে এবং ইসলামের
বরখেলাফ কথা বা কর্মের
প্রমাণ পাওয়া যায় না। সর্বক্ষেত্রে তারা তারা মুসলমানরূপে
গণ্য; তাদের অন্তরে সঠিক ঈমান
বা মুনাফেকি যাই থাক না কেন।[173]
عَنْ اَبِيْ بَكْرَةَ (رض) اَنَّ النَّبِيَ(صلعم) قَالَ فِيْ خُطْبَةِ يَوْمِ النَّحْرِبِمِنَى وَقَالَ اِنَّ دِمَائَكَمْ وَاَمْوَالَكُمْ حَرَامٌ عَلَيْكُمْ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِيْ شَهْرِكُمْ هَذَا فِيْ بَلَدِكُمْ هَذَا-
অর্থ: হজরত আবু বাকরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত । রসূলুল্লাহ
(ﷺ) বিদায় হজের ভাষণে মিনা প্রান্তরে বলেছেন: নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত ও তোমাদের
সম্পদ পরষ্পরের নিকট ঠিক তেমনি সম্মানিত, যেমন
সম্মানিত তোমাদের এই দিন (আরাফাতের দিন), তোমাদের এই মাস (জিলহজ) তোমাদের
এই শহর (মক্কা (।[174]
নোট : এই হাদিসটি উল্লেখিত
নাম্বারসমূহের অংশ বিশেষ।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه - قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - لَا تَحَاسَدُوا وَلَا تَنَاجَشُوا وَلَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَدَابَرُوا وَلَا يَبِعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعِ بَعْضٍ وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ التَّقْوَى هَهُنَا وَيُشِيرُ إِلَى صَدْرِهِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنْ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ.
অর্থ: আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
(ﷺ)ইরশাদ করেছেন: তোমরা পরস্পরে হিংসা পোষণ
করবে না, পরস্পর ধোঁকাবাজী করো না, পরস্পর বিদ্বেষ পোষন করো না একে অপরের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে
পিছনে শক্রতা করো না এবং একের বেচাকেনার উপর অন্যের বেচা-কেনার চেষ্টা করবে না। তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাক। এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই । সে তার উপর জুলুম করবে না, তাকে
অপদস্হ করবে না এবং হেয় করবে না । তাকওয়া এখানে, এ কথা বলে রসূলুল্লাহ (ﷺ) তিনবার তাঁর বুকের প্রতি ইশারা
করলেন। একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য
এটাই যথেষ্ট যে, সে তার ভাইকে হেয় করে। কোন
মুসলমানের উপর প্রত্যেক মুসলমানের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরু হারাম।[175]
নোট : ইবনে মাজাহ-এর বর্ণনায় শব্দ কম
আছে।
এ
কথাটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে মনে রাখতে হবে যে,আল্লাহর দৃষ্টিতে
মুসলমানের হক শুধু তাঁর প্রাণ নয়; বরং তাঁর ইজ্জত-সম্মান,
ধন-সম্পদ সব কিছুই। যে ব্যক্তি মুসলমানের বিরুদ্ধে এক ধাপ অগ্রসর হয়
সে সাধারণ দোষী নয়; বরং সে শরিয়তের মূলনীতির বিরুদ্ধাচারণকারী এমনকি তিরমিজি ও নাসায়ি-এর এক হাদিস আছে,আল্লাহ তাআলার কাছে একজন মুসলমানের প্রাণ
এতো মূল্যবান যে,তার মুকাবিলায় সারা দুনিয়াই তুচ্ছ। যে জাতির মধ্যে একে অপরকে সম্মান করার অভ্যাস থাকে না তারা অন্যদের চোখে কখনও সম্মানিত হতে পারে
না। এ জন্য ইসলাম এ শিক্ষাই দেয় যে, তোমরা এক অপরকে ইজ্জত করবে। এতে তোমরা স্বয়ং দুনিয়ার দৃষ্টিতে সম্মানের পাত্রে পরিণত হবে। বৈরাগ্যের যুগ শেষ হয়ে গেছে। এটা দীনে মুহাম্মাদির যুগ। এখন তোমাদের মধ্যে
বিচার ও শাসন পরিচালনার এবং ইজ্জতের স্পৃহা সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন
নিজে সম্মানের পাত্র হও এবং দুনিয়ার লোকজনকে সম্মানের জীবন যাপন করার দাওয়াত দাও যাতে
দুনিয়া সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় এবং আল্লাহর ইজ্জতের দ্বারা সারা জাহান ধন্য হয়ে
যায়।[176]
মিথ্যা কসম করে মুসলমানের হক
আত্মসাৎ করলে, জান্নাত হারাম :
عن أبي
أمامة أَنَّ رَسُولَ
اللهِ - صلى الله
عليه وسلم - قَالَ مَنِ
اقْتَطَعَ حَقَّ مُسْلِمٍ
بِيَمِينِهِ
حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَأَوْجَبَ لَهُ النَّارَ
قَالُوا وَإِنْ كَانَ شَيْئًا
يَسِيرًا قَالَ وَإِنْ
كَانَ قَضِيبًا مِنْ أَرَاكٍ
ـ يَقُولُهَا ثَلاَثًا
হজরত আবু উমামা ইয়াস ইবনে সালাবা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কসম করে কোন মুসলমানের
হক আত্মসাৎ করল, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জাহান্নাম
অবশ্যম্ভাবী করে দেন এবং বেহেশত হারাম করে দেন। এক ব্যক্তি তাঁকে বলল, রসূলুল্লাহ! সেটা যদি সাধারণ জিনিস হয় ? তিনি জবাবে বললেন, সেটা পিলু গাছের ছোট শাখা হলেও।[177]
মুসলমানদের জান-মালের ক্ষতির আশঙ্কায় যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়নি
هُمُ الَّذِينَ
كَفَرُوا وَصَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ
الْحَرَامِ
وَالْهَدْيَ
مَعْكُوفًا
أَنْ يَبْلُغَ مَحِلَّهُ وَلَوْلَا رِجَالٌ مُؤْمِنُونَ وَنِسَاءٌ مُؤْمِنَاتٌ لَمْ تَعْلَمُوهُمْ
أَنْ تَطَئُوهُمْ فَتُصِيبَكُمْ مِنْهُمْ مَعَرَّةٌ بِغَيْرِ عِلْمٍ لِيُدْخِلَ اللَّهُ فِي رَحْمَتِهِ
مَنْ يَشَاءُ لَوْ تَزَيَّلُوا
لَعَذَّبْنَا
الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا অর্থ: আর তারাই তো কুফরি করেছে এবং তোমাদেরকে বাধা দিয়েছে মসজিদে হারাম থেকে এবং
অবস্থানরত কুরবানির পশুকে তার জবাই-এর স্থানে পৌঁছতে। বস্তুত তোমাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হত যদি মুমিন পুরুষগণ
এবং মুমিন নারীগণ না থাকত যাদের ব্যাপারে তোমরা জান না অর্থাৎ তাদের নিহত হওয়ার(ভয়) না থাকত। অতঃপর তাদের কারণে অজান্তেই তোমাদেরও কষ্ট অনুভব হত। কিন্তু তোমাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়নি। যাতে তিনি যাকে ইচ্ছা আপন অনুগ্রহের মধ্যে দাখিল করতে পারেন। যদি তারা সরে যেত তবে তাদের মধ্যে যারা কাফের তাদেরকে অবশ্যই
আমি কঠোর যন্ত্রণাময় শাস্তি দিতাম।[178]
হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে উভয়কে উভয়ের হত্যা থেকে আল্লাহ তাআলা বিরত রেখেছেন
বিশেষ কারণ হলো : মক্কায় বহুসংখ্যক মুসলমান নর-নারী অবস্থান করছিল,
যারা গোপনে ইসলাম গ্রহণের ফলে তাদের পরিচয় মুসলমানদের জানা ছিল না। কাজেই যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলে মুসলমানদের হাতে তাদেরও নিহত
হওয়ার হওয়ার আশঙ্কা ছিল। মুসলমানগণ
যদি কাফেরদের থেকে আলাদা এবং পৃথক হত, তবে অবশ্যই যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হত। এ আয়াতে কারিমা থেকে মুসলমানদের জান-মালের হেফাজতের গুরুত্ব প্রমাণিত হয়। যার ফলে তিনি যুদ্ধের-ই অনুমতি দেননি।[179]
কাবার চেয়েও মুসলমানের
জান-মাল ও ইজ্জত সম্মানিত
عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ، قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى
الله عليه وسلم ـ يَطُوفُ بِالْكَعْبَةِ وَيَقُولُ " مَا أَطْيَبَكِ
وَأَطْيَبَ رِيحَكِ مَا أَعْظَمَكِ وَأَعْظَمَ حُرْمَتَكِ وَالَّذِي نَفْسُ
مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَحُرْمَةُ الْمُؤْمِنِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللَّهِ حُرْمَةً مِنْكِ
مَالِهِ وَدَمِهِ وَأَنْ نَظُنَّ بِهِ إِلاَّ خَيْرًا " অর্থ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কাবা ঘর তাওয়াফ করতে দেখলাম এবং তিনি বলেছিলেন: কত উত্তম তুমি হে কাবা! আকর্ষণীয় তোমার খোশবু, কত উচ্চ মর্যাদা তোমার (হে কাবা)! কত মহান সম্মান তোমার। সেই সত্তার
শপথ! যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ!
আল্লাহর নিকট মুমিন ব্যক্তির জান-মাল ও ইজ্জতের
মর্যাদা তোমার চেয়ে অনেক বেশি। আমরা মুমিন ব্যক্তি সম্পর্কে সুধারণা-ই পোষণ করি।[180]
নোট: হাদিসটি ইমাম ইবনে মাজাহ এককভাবে বর্ণনা করেছেন।
মুসনাদে আব্দুর রাজ্জাক-৯১৮৬, হাসান সনদে অনুরূপ হাদিস বর্ণনা করেছেন। হাদিসটি এই-
باب المؤمن أعظم حرمة
من البيت 9186 - أخبرنا عبد الرزاق
عن ابن جريج
قال : أخبرني عبد الله
ابن عثمان أن
سعيد بن ميناء
أخبره : إني لاطوف
بالبيت مع عبد
الله بن عمرو
بعد حريق البيت ، إذ قال :قال
أي سعيد أعظمتم
ما صنع البيت
؟ قال : قلت : وما أعظم
منه ؟ قال
دم المسلم يسفك بغير
حقه
:
ওসমান রা.এর নিকট মুসলমানের রক্তের দাম
৩৫ হিজরি
জিলকদ মাসের শেষের দিক থেকে
১৮ই জিলহজ পর্যন্ত অবরোধ
অব্যাহত ছিল। সেদিন
ছিল জুমআর দিন। এদিনের
একদিন পূর্বে ওসমান রা. গৃহে
উপস্থিত মুহাজির আনসারের উদ্দেশ্যে
বলেন, আর তাদের সংখ্যা ছিল প্রায়
সাতশ(৭০০)
জন। তাঁদের মধ্যে
ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর,আব্দুল্লাহ
ইবনে জুবাইর,হাসান,হুসাইন, মারওয়ান এবং আবু হুরাইরা
রা.। তাঁর
মুক্ত করা অনেক দাসও
উপস্থিত ছিল। তিনি
এদেরকে ছেড়ে দিলে (বাধা না দিলে)তারাই
সন্ত্রাসীদের দমন করতো। বরং তিনি
বলেছিলেন,‘যার ওপর আমার
অধিকার আছে, আমি কসম দিয়ে
বলছি সে যেন হাত গুটিয়ে
নিজ গৃহে ফিরে যায়। এ সময় বড় বড় সাহাবি এবং তাঁদের সন্তানদের
একটা বিরাট দল তাঁর নিকট ছিল। তিনি তাঁর ভৃত্যদেরকে বললেন- যে তরবারি কোষবদ্ধ রাখবে, সে মুক্ত। ফলে ভেতর
থেকে লড়াইয়ে ভাটা পড়ে গেল। কিন্তু বাইরে থেকে উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি হয়ে
উঠে তীব্রতর।
মিসরিয় সন্ত্রাসীরা যখন আমিরুল মুমিনিনের বাসভবন অবরোধ করেন। তখন ওসমান রা. লোকজনের নিকট
পরামর্শ চাইলে আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. বলেন: আমিরুল মুমিনিন!
আমি আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি তিনটি বিষয়ের মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণ করার
জন্য:
১.আপনি ওমরার ইহরাম বাঁধবেন, ফলে তাদের জন্য
আমাদের রক্ত হারাম হয়ে যাবে।
২. অথবা আমরা সঙ্গী হয়ে সিরিয়ায় মুআবিয়ার নিকট গমন করবো অথবা
৩. আমরা বের হয়ে অস্ত্র দ্বারা যুদ্ধ করবো যতক্ষণ না আল্লাহ তাদের
আর আমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেন; কারণ আমরা আছি সত্যের ওপর,
আর তারা রয়েছে মিথ্যা তথা বাতিলের ওপর।
তখন
ওসমান রা.বলেন, “আপনি যে ইহরাম বাঁধার কথা বলেছেন, যার ফলে আমাদের রক্ত হারাম হয়ে যাবে,(তার জবাব এই যে,)তারা তো আমাদেরকে এখন ইহরাম অবস্থায় এবং ইহরামের পরে (সর্বাবস্থায়)গোমরাহ মনে করে। আর সিরিয়ায় গমন করা, ভীত হয়ে আমি তাদের মধ্যে থেকে বের হয়ে যাবো-এত আমি লজ্জাবোধ
করি; আর সিরিয়াবাসী আমাকে দেখবে আর দুশমনরা শুনবে: কাফের দুশমনরাও একথা শুনবে। আর যুদ্ধ –আমি তো কামনা করি এমন অবস্থায় আল্লাহর
সঙ্গে মিলিত হতে, যাতে আমার কারণে এক ফোঁটা রক্তও প্রবাহিত না
হয়”।
আবু
জাফর দারি আইউব সাখতিয়ানি সূত্রে নাফি–এর বরাতে ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণনা করেন, ওসমান
(রা.)ভোরে লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেনঃ নবি করিম (ﷺ)-কে আমি স্বপ্নে দেখেছি। তিনি বলেছেন,‘ওসমান আমাদের সঙ্গে ইফতার করবে’। সকাল থেকে তিনি রোজা রাখেন এবং রোজাদার
অবস্থায় সেদিনই তিনি শহিদ হন।[181]
ইমাম হাসান(রা.) মুসলমানদের
মাঝে রক্তপাত বন্ধ করার নিমিত্তে নিজ ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন
৪০ হিজরি সনের ১৭ই রমজান জুমাআবার
হজরত আলি (রা.)-কে আঘাত করা হয়। তবে তাঁর ওফাত দিবস সম্পর্কে কেউ বলেছেন, ওই দিনই আবার কেউ বলেছেন, ১৯শে রমজান রবিবারে তাঁর
ওফাত হয়েছে। হজরত ইমাম হাসান (রা.)তাঁর জানাযার ইমামতি করেন। হজরত আলি
(রা.)এর দাফন-কাফন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি সমাপ্ত করার পর সর্বপ্রথম কায়স ইবনে সাদ ইবনে
উবাদা (রা.)হজরত হাসান (রা.)-এর সম্মুখে এলেন এবং বললেন, আপনার হাত প্রসারিত করুন। আল্লাহর কিতাব ও রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ বাস্তবায়নের মর্মে আমি আপনার হাতে বায়আত করব। হজরত হাসান(রা.) কিছুই বললেন না। তারপর কায়স ইবনে সাদ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর হাতে বায়আত হন।
এরপর অন্যান্য লোকজন (ইরাকিরা)তাঁ র হাতে বায়আত হন। হজরত আলি (রা.) যখন ইন্তেকাল করেন তখন সিরিয়ার অধিবাসীগণ হজরত মুআবিয়া (রা.)-কে আমিরুল মুমিনিন ঘোষণা করে এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। খলিফা ইমাম হাসান(রা.) তাঁর সত্ত্বেও সমর্থকদের চাপে ইরাকিদের নিয়ে মুআবিয়ার (রা.)বিরুদ্ধে যুদ্ধে বের হন। মুআবিয়া(রা.) ও সিরিয়দেরকে নিয়ে ইরাকিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বের হন। উভয় পক্ষ যখন মুখোমুখি, যুদ্ধ তখন অত্যাসন্ন,তখন কতক লোক উভয় দলের মধ্যে সমঝোতা ও আপোষ-মীমাংসার আপ্রাণ চেষ্টা চালান এবং শেষ পর্যন্ত হজরত হাসান (রা.) খলিফার পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং মুআবিয়া (রা.)-এর প্রতি ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এই ঘটনা ঘটে ৪১ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে। এই কারণে এই বছরকে ঐকমত্যের বছর বলা হয়।
হজরত মুআবিয়া (রা.)-এর সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করার পর হজরত হাসান
(রা.) যখন কুফায় ফিরে এলেন, তখন আমির সাঈদ ইবনে নাতল নামে আমাদের এক লোক তাঁকে সম্বোধন করে বলল,
السلام عليك يا مذل المؤمنين ‘হে মুমিনদেরকে লাঞ্ছিতকারী! আপনাকে সালাম।’ হজরত হাসান(রা.) বললেন,
‘হে আবু আমির! এমন কথা বলো
না। আমি মুমিনদেরকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত
করিনি বরং রাজত্বের লোভে মুমিনদেরকে হত্যা করাকে ঘৃণা করেছি।’
উক্ত ঘটনায়
তিনি ছিলেন পুন্যবান, সত্যানুসারী এবং প্রশংসিত
এ কাজের জন্য তিনি মানসিকভাবে
সামান্যও দুঃখিত কিংবা মর্মাহত
হননি। বরং তাতে
তিনি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ও আনন্দিত। তাঁর পরিবাবের সমর্থকদের
মধ্যে বহু লোক তাঁর
সমালোনা করেছে বটে। দীর্ঘ
সময় পর এ যুগেও
অনেক লোক ওই সমালোচনার
পথে চলেছে। বস্তুত
এই ঘটনার সত্য বিষয়
এই যে, ইমাম হাসান (রা.) রসূলে কারিম (ﷺ)-এর
হাদিসের অনুসরণ করেছেন এবং উম্মতের রক্তপাত বন্ধ করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। হজরত হাসান (রা.)-এর এই আপোষ-রফাকে বহু আগেই করেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রশংসা করে গিয়েছেন। যেমন
হাদিস শরিফে এসেছে-
عَنْ أَبِي بَكْرَةَ
رَضِيَ اللَّهُ
عَنْهُ، أَخْرَجَ
النَّبِيُّ صَلَّى
اللهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ ذَاتَ
يَوْمٍ الحَسَنَ،
فَصَعِدَ بِهِ
عَلَى المِنْبَرِ،
فَقَالَ: «ابْنِي
هَذَا سَيِّدٌ،
وَلَعَلَّ اللَّهَ
أَنْ يُصْلِحَ
بِهِ بَيْنَ
فِئَتَيْنِ مِنَ
المُسْلِمِينَ»
অর্থ: হজরত আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,একদিন নবি কারিম (ﷺ)
হাসান (রা.)
কে নিয়ে বেরিয়ে এলেন
এবং তাঁকে সহ মিম্বারে
আরোহণ করলেন। অতঃপর
বললেন, আমার এ ছেলেটি সরদার। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে
বিবাদমান দুদল মুসলমানের মাঝে
সমঝোতা-মীমাংসা করিয়ে দিবেন।[182]
হজরত হাসান
বসরি (রহ.)বলেন,‘আল্লাহর কসম! হজরত হাসান (রা.)খেলাফতের দায়িত্ব
গ্রহণের পর শিঙ্গা লাগানোর শিঙ্গা পরিমাণ রক্তপাতও ঘটেনি।’
এভাবে হজরত হাসান (রা.) ধ্বংসশীল
এই দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করেছেন এবং এই উম্মতের রক্তপাত বন্ধের পথ অবলম্বন করেছেন। তিনি খেলাফতের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন এবং রাজত্ব সোপর্দ করেছেন মুআবিয়া (রা.)-এর হাতে। ফলে সকলে এক শাসকের পেছনে ঐক্যবদ্ধ
হয়েছে।[183]
عن سعيد بن زيد ، أن النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم قال إِنَّ
مِنْ أَرْبَى الرِّبَا، الِاسْتِطَالَةَ فِي عِرْضِ الْمُسْلِمِ بِغَيْرِ حَقّ.وقال الحاكم : صحيح على شرط الشيخين، অর্থ: হজরত সাঈদ
ইবনে জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত। নবি (ﷺ) ইরশাদ করেছেন: (এক জাতীয় সুদ তো তোমরা জানই কিন্তু) সবচেয়ে নিকৃষ্ট সুদ
হচ্ছে মুসলমানের ইজ্জত বিনষ্ট করার লক্ষ্যে অন্যায় বাক্য ব্যয় করা (মুসলমানকে বে-ইজ্জত ও অপদস্থ করা)।[184]
নোট : মুসনাদে আহমদের বর্ণনায়
শব্দ বেশি এবং হাকেমের শব্দের ভিন্নতা রয়েছে।
মুসলমানের ইজ্জত সম্মান রক্ষার প্রতি সকলকে উৎসাহিত করা হয়েছে, অপরদিকে মুসলমানের ইজ্জতহানিকে সুদের সাথে তুলনা করে সুদের হারাম হওয়াকে পূর্ণভাবে
বুঝিয়ে দেওয়াও হয়েছে। সুদ দীন ইসলামে
এমন ঘৃণ্য বস্তু যে, যখন কোন কাজ থেকে
কোন মুসলমানকে বিরত রাখার ইচ্ছা করা হয় , তখন সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে সুদকে
পেশ করা যেতে পারে।
পাপ থেকে তওবার পর
কোন মুসলিমকে লজ্জা না দেওয়া
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- وَلَا تَلۡمِزُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَلَا تَنَابَزُواْ بِٱلۡأَلۡقَٰبِۖ بِئۡسَ ٱلِٱسۡمُ ٱلۡفُسُوقُ بَعۡدَ ٱلۡإِيمَٰنِۚ অর্থ: আর তোমরা একে অপরের নিন্দা করো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো
না। ঈমানের পর মন্দ নাম কতনা নিকৃষ্ট! আর যারা তাওবা করে না, তারাই তো
জালেম।[185]
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, وَلَا تَنَابَزُواْ بِٱلۡأَلۡقَٰبِۖ এর অর্থ হচ্ছে
কেউ কোন গুনাহ অথবা মন্দকাজ করে তওবা করার পরও তাকে সেই মন্দকাজের নামে ডাকা। উদাহরণত : চোর-ডাকাত, ব্যভিচারী অথবা শরাবি বলে সম্বোধন করা। যে ব্যক্তি চুরি, জিনা, শরাব (মদ) ইত্যাদি থেকে তওবা করে নেয়, তাকে অতীত কুকর্ম দ্বারা
লজ্জা দেওয়া ও হেয় করা হারাম।[186]
যেমন হাদিস শরিফে এসেছে-
عَنْ
مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ مَنْ عَيَّرَ أَخَاهُ بِذَنْبٍ لَمْ يَمُتْ حَتَّى يَعْمَلَهُ ” . يعنى مِنْ ذَنْبٍ قَدْ تَابَ مِنْهُ . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
অর্থ: হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ)বলেছেন: কোন ব্যক্তি তার কোন ভাইকে কোন
গুনাহের জন্য লজ্জা দিলে সে উক্ত গুনাহে না জড়িয়ে পড়া পর্যন্ত মারা যাবে না। (বর্ণনাকারী এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে
বলেন, এখানে ঐ কাজের জন্য লজ্জা দেওয়া উদ্দেশ্য, যা সে ভুলক্রমে করে ফেলেছিল এবং পরে তওবাও করেছিল। তওবার পর তাকে লজ্জা দেওয়া
ইসলামি ভ্রাতৃত্বের পরিপন্থি।[187]
নোট
: ইমাম তিরমিজি (রহ.)বলেন হাদিসটি গরিব।
কোন সুশ্রী ব্যক্তির চেহেরায় যদি কালি/ময়লা লাগে সাবান
দিয়ে তা ধুয়ে ফেললে তাকে কি এখন কালির জন্য ভর্ৎসনা করা যাবে? ঠিকতেমনি পাপ হয়ে যাওয়ার পর যদি কোন ব্যক্তি তওবা নামক রুহানি সাবান দ্বারা যদি ধুয়ে-মুছে পরিস্কার হয় তাকে কি এখন পূর্বের পাপের কারণে তিরস্কার করা ঠিক হবে? আল্লাহ যাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন,তা কে লাজ-শরম দেওয়া অধিকার কার আছে? বরং অনাধিকার চর্চা এবং নিজের কু-চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। কুরআনুল কারিমের
শিক্ষা কত চমৎকার। قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ অর্থাৎ আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে
ক্ষমা করুন। তিনি সব মেহেরবানদের চাইতে অধিক মেহেরবান।[188]
হযরতে ইউসুফ (আ .)-এর ভাইদের পূর্বের
সব ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেলে, লজ্জা পাবার উপক্রম হলে তিনি সাথে
সাথেই বললেন-তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। এতটুকু বলে
ক্ষ্রান্ত হননি তাদের
প্রশান্তির জন্য তাদের পক্ষে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।
মাসয়ালা
:
কোন কোন লোকের এমন নাম খ্যাত হয়ে যায়, যা আসলে মন্দ, কিন্তু
এই নাম ব্যতিত কেউ তাকে চেনে না। এমতাবস্থায় সংশিষ্ট ব্যক্তিকে হেয় লাঞ্ছিত করার
ইচ্ছা না থাকলে তাকে এই নামে ডাকা জায়েয।
এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত। বিস্তারিত দেখুন, তাফসিরে আআরেফুল কুরআন-১২৮২ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন
খান (রহ.)
ভাল নামে ডাকা সুন্নত : রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, মুমিনের হক অপর মুমিনের উপর এই যে, তাকে অধিক পছন্দীয়
নাম ও পদবী সহকারে ডাকবে। এ কারণেই আরবে ডাকনামের প্রচলন ছিল। রসূলুল্লাহ
(ﷺ)ও তা পছন্দ করেছিলেন। তিনি বিশেষ বিশেষ
সাহাবিকে কিছু পদবী দিয়েছিলেন-হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে আতিক, হজরত ওমর (রা)-কে ফারুক, হজরত হামজা
(রা.)-কে আসাদুল্লাহ এবং খালেদ ইবনে ওলিদ
(রা.)-কে সাইফুল্লাহ পদবী দান করেছিলেন।[189]
যে মুসলমানের ইজ্জতের উপর আঘাত প্রতিরোধ করবে,আল্লাহ তাকে
জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ رَدَّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ يَرُدَّ عَنْهُ نَارَ جَهَنَّمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» (حم) رواه الترمذي “ مَنْ رَدَّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ رَدَّ اللَّهُ عَنْ وَجْهِهِ النَّارَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ” و فى روايةه ثم تلا
وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ
الْمُؤْمِنِينَ
অর্থ: আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত। নবি (ﷺ) বলেছেন : যে লোক তার মুসলিম ভাইয়ের মান-সম্মানের উপর আঘাত
প্রতিরোধ করে, আল্লাহ্ তাআলার হক হলো তাকে কিয়ামত দিবসে জাহান্নামের আগুন প্রতিরোধ করবেন। অন্য বর্ণনায় আছে-অতঃপর তিনি তেলাওয়াত করলেন- وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ
الْمُؤْمِنِينَ অর্থাৎ মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।( সূরা রুম-৪৭)। [190]
নোট : তিরমিজির বর্ণনায় শব্দের ভিন্নতা রয়েছে। মুসনাদে
আহমদ -২৭৬০৯ নং হাদিসে এসেছে গিবত থেকে রক্ষা করা।
উল্লেখিত হাদিসসমূহ থেকে প্রয়িতমান হয় যে, মুসলমানের
পরস্পর গুরুত্বপূর্ণ হক হচ্ছে, সামনে-পিছনে, উপস্থিত-অনুপস্থিতে সর্বদা তার মান-সম্মানের হেফাজতের
প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখা। ইসলামের এ মহান
শিক্ষা মুসলমান যে থেকে ভুলতে শুরু করেছে সেদিন থেকেই তাদের অবস্থা অধঃপতনের দিকেই
নিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সুমহান
শিক্ষায় পুনরুজ্জীবিত করুন। আমিন!!
কোন মুসলিমের বিপদে আনন্দ প্রকাশ নিষিদ্ধ
عَنْ مَكْحُولٍ، عَنْ وَاثِلَةَ بْنِ الأَسْقَعِ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ لاَ تُظْهِرِ الشَّمَاتَةَ لأَخِيكَ فَيَرْحَمُهُ اللَّهُ وَيَبْتَلِيكَ ” . قَالَ هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ অর্থ:
ওয়াসিলা ইবনুল
আসকা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: তোমার
কোন ভাইয়ের বিপদে তুমি আনন্দ প্রকাশ করো না। অন্যথায় আল্লাহ্ তাআলা তাকে দয়া
করবেন এবং তোমাকে সেই বিপদে নিক্ষিপ্ত করবেন।[191]
নোট
: ইমাম তিরমিজি (রহ.) বলেন, হাদিসটি হাসান গরিব।
যে মুসলিম
ভাইয়ের শুশ্রূষা নিয়োজিত সে জান্নাতের ফল আহরণে রত
عَنْ ثَوْبَانَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ إِنَّ الْمُسْلِمَ إِذَا عَادَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ لَمْ يَزَلْ فِي خُرْفَةِ الْجَنَّةِ حَتَّى يَرْجِعَ ” অর্থ: সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত। নবি (ﷺ) বলেছেন: “যখন কোন মুসলিম তার মুসলিম ভাইয়ের রোগ সেবায় নিয়োজিত হয় তখন
সে প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত জান্নাতের ফল-ফলাদি আহরণে রত থাকে।[192]
মুসলমানের জন্য ব্যয়
করার ফজিলত
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: "أَيُّمَا مُسْلِمٍ كَسَا مُسْلِمًا ثَوْبًا عَلَى عُرْيٍ، كَسَاهُ اللَّهُ مِنْ خُضْرِ الْجَنَّةِ، وَأَيُّمَا مُسْلِمٍ أَطْعَمَ مُسْلِمًا عَلَى جُوعٍ، أَطْعَمَهُ اللَّهُ مِنْ ثِمَارِ الْجَنَّةِ، وَأَيُّمَا مُسْلِمٍ سَقَى مُسْلِمًا عَلَى ظَمَإٍ، سَقَاهُ اللَّهُ مِنَ الرَّحِيقِ الْمَخْتُومِ"
অর্থ: হজরত
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত। নবি করিম (ﷺ) বলেছেন,
কোন মুসলিম তার কোন বিবস্ত্র
মুসলিম ভাইকে কাপড় পরিধান
করালে আল্লাহ তাআলা তাকে
জান্নাতে সবুজ পোশাক পরিধান
করাবেন। কোন মুসলিম
তার ক্ষুধার্ত মুসলিম ভাইকে
খাবার খাওয়ালে, আল্লাহ তাআলা
তাকেও জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। কোন মুসলিম তার কোন তৃষ্ণার্ত
ভাইকে পানি পান করালে
আল্লাহ তাআলা তাকেও মোহরাঙ্কিত
জান্নাতি সুধা পান করাবেন।[193]
নোট : হাসানটি হাসান; তবে কেউ আবার
জয়িফ বা দুর্বল বলেছেন।
দুনিয়াতে যে মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে আল্লাহ আখেরাতে তার দোষ
রাখবে
عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ سَالِمٍ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لاَ يَظْلِمُهُ وَلاَ يُسْلِمُهُ مَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللَّهُ فِي حَاجَتِهِ وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَرَّجَ اللَّهُ عَنْهُ بِهَا كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ” অর্থ: সালিম-এর পিতা থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেন: এক
মুসলিম আরেক মুসলিমের ভাই। সে তার প্রতি অত্যাচার করে না এবং তাকে দুশমনের হাতে
সোপর্দও করে না। যে ব্যক্তি তার ভাই-এর অভাব-অনটন পূরণ করবে আল্লাহ তার অভাব-অনটন
দূরীভূত করবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের বিপদ দূর করবে,
আল্লাহ তাআলা
তার প্রতিদানে কিয়ামাত দিবসে তাকে বিপদ থেকে পরিত্রাণ দিবেন। আর যে ব্যক্তি
মুসলিমের দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামাত দিবসে তার
দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবেন।[194]
وَلاَ يُسْلِمُهُ (তাকে সপর্দ করবে
না) অর্থাৎ তিনি তাকে হতাশ করেন না
এবং ক্ষতি করে এমন ক্ষতিগ্রস্থদের সাথে ছেড়ে দেন না যা ক্ষতিগ্রস্থ করেন বরং তাকে সাহায্য করে এবং প্রতিরোধ করে।[195]
সকোন মুসলিমের প্রতি
অস্ত্র দিয়ে ইঙ্গিত করা নিষিদ্ধ
عَنِ ابْنِ سِيرِينَ، سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ، يَقُولُ قَالَ أَبُو الْقَاسِمِ صلى الله عليه وسلم “ مَنْ أَشَارَ إِلَى أَخِيهِ بِحَدِيدَةٍ فَإِنَّ الْمَلاَئِكَةَ تَلْعَنُهُ حَتَّى وَإِنْ كَانَ أَخَاهُ لأَبِيهِ وَأُمِّهِ ” وفي رَوَايةُ “مَنْ حَمَلَ عَلَيْنا السِّلاحَ فَلَيسَ مِنّا،و زاد مسلم وَمَنْ غَشَّنا فَلَيْس مِنّا” وفي رَوَايةُ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ مَنْ مَرَّ فِي شَىْءٍ مِنْ مَسَاجِدِنَا أَوْ أَسْوَاقِنَا بِنَبْلٍ، فَلْيَأْخُذْ عَلَى نِصَالِهَا، لاَ يَعْقِرْ بِكَفِّهِ مُسْلِمًا ”.
অর্থ: ইবনে সিরিন (রহঃ)
থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবু হুরায়রা্ (রা.) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আবুল কাসিম (ﷺ) বলেছেন : যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রতি
(লৌহ নির্মিত) মরণাস্ত্র দ্বারা ইঙ্গিত করে সে তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত ফেরেশ্তাগণ
তাকে অভিসম্পাত করতে থাকে যদিও সে তার আপন ভাই হয়। [196] অপর বর্ণনায়- যে ব্যক্তি মুসলমানের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে সে আমার উম্মত নয়। যে ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা দেবে সেও আমার উম্মত নয়।[197] অপর বর্ণনায়-যখন কোন লোক মসজিদ অথবা বাজারসমূহ হতে কোন জিনিস নিয়ে যায়
এবং তার সঙ্গে যদি তীর থাক,তবে সে যেন তার অগ্রভাগ সাবধানে রাখে অথবা
হাতের মুঠোর মধ্যে রাখে। এর ফলে কোন মুসলমানের আঘাত লাগার আশংকা থাকবে না।[198]
উপরোক্ত হাদিসসমূহ থেকে এ কথা প্রমাণ হয় যে, একজন মুসলমানের জান-মাল এত মূল্যবান-সম্মানিত যে, বিশ্ব মানবতার মহান শিক্ষক হজরত
মুহাম্মাদ (ﷺ) তীরের অগ্রভাগ
দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে আগেই থেকে সর্তক করেছে। মুসলিম ভাইয়ের প্রতি
অস্ত্রধারণ কিংবা উচিয়ে ভয় দেখানোই যদি নিষেধ-মন্দ হয়। তাহলে বাস্তবায়ন কত ভয়ানক? ইমাম আহমদ(রহ.)
বলেন,আব্দুর রাজ্জাক (রহ.)
---হজরত আবু হুরাইরা(রা.) হতে বর্ণিত তিনি তোমাদের মধ্যে হতে কেহ যেন তার কোন ভাইয়ের প্রতি অস্ত্র দ্বারা
ইশারা না করে। কারণ সে এ
জানে না সম্ভবত শয়তান তার হাত হতে তা কেড়ে
নিবে এবং তাকে আঘাত করে বনে এবং দোজখের গর্তে পতিত হবে।[199]
উপরোক্ত হাদিসগুলোতে যেসব স্থানে فَلَيْس مِنّا (আমার উম্মত নয়)
শব্দটি ব্যবহৃত
হয়েছে আলেমগণ এর বিভিন্ন অর্থ লিখেছেন। এখানে ইমাম তাহাবি
(রহ.)এর ব্যাখ্যাটি সবচেয়ে উত্তম মনে হয়। তিনি
বলেন, এই
শব্দ কুরআনে কারিমের দুজায়গায় ব্যবহৃত হয়েছেঃ (১) যে এই ঝরণার পানি পান করেছে সে আমার নয়
আর যে এর আস্বাদ গ্রহণ করেনি সে নিশ্চয় আমার।[200]
(২) যে আমার অনুসরণ করেছে সে আমার। আর যে
নাফরমানি করেছে (তার বেলায়) আপনি নিশ্চয়ই অত্যন্ত মার্জনাকারী এবং মেহেরবান।[201]
এই
আয়াত দুটি দ্বারা একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, যে ব্যক্তি নবির
হুকুম এবং তাঁর শরিয়তের অনুসারী হয়ে থাকে এবং তাঁর জামাআতের একজন বলে গণ্য হয়। আর
যে তাঁর অনুসারী হয় না তাকে তাঁর দলের বা জামাআতের লোক মনে করা হয় না। অতত্রব কোন
কোন কার্যকলাপ চাই তা শুধু ইবাদত সংক্রান্ত
অথবা স্বভাব এবং আচার-ব্যবহার সংক্রান্ত দুপ্রকার হয়ে থাকে।
হয় তো এসব কার্যকলাপ এমন যে তা মূলতই
খারাপ, যেমন গোড়ালীর নিচে কাপড় পরা বা রেশমি কাপড় পরা অথবা এমন কোন প্রতিক্রিয়া যদ্বারা বাতিল
মাবুদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। এ জাতীয় কার্যকলাপ তো মূলতই নিষিদ্ধ;
পরন্তু কাফেরদের অনুসরণও নিষিদ্ধ। আর যদি কার্যকলাপ এমন ধরণের হয়
যেগুলো মূলত দূষণীয় নয়; কিন্তু যদি তা কোন জাতির প্রতীক হয়ে
যায় অর্থাৎ কোন জাতির সাথে এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যায় যে, অবলম্বনকারীকে
বাহ্যত ঐ জাতিরই একজন বলে মনে হয় তবে তার অনুকরণও নিষিদ্ধ। আর যদি এসব কাজ বৈধ হয় এবং তা কারও প্রতীক না হয় আর তার কোন
বদল/বিকল্প আমাদের ধর্মে
বিদ্যমান থাকে তবুও এটাকে পরিহার করা উত্তম। এটাই হচ্ছে ইসলামি আত্মসম্মানবোধের
চাহিদা। যেমন, রসূল (ﷺ) কোন এক
ব্যক্তির হাতে পার্শিদের তরিকার বানানো ধনুক দেখতে পেলেন। বললেন, তোমার হাতে এটা কী নিয়েছ ? এ ধরণের আরবি ধনুক রাখ যেমন আমার হাতে রয়েছে যদ্বারা আল্লাহ তাআলা তোমাদের
বিজয় দান করেছেন। আর যদি তা এমন হয় যে,
আমাদের ধর্মে এর কোন বদল নেই, যেমন আধুনিক
আসবাবপত্র-যন্ত্রপাতি, তবে তা ব্যবহারে
কোন ক্ষতি নেই। তবে এ শর্তে যে, তাতে বিজাতীয় অনুকরণের নিয়ত
থাকবে না। যদি এগুলো ব্যবহারে কাফেরদের অনুকরণের
নিয়ত থাকে, তবে তাও নিষিদ্ধ। যদি ইসলামি শরিয়তের
সাথে এর এমনভাবে কোন সম্পর্ক থাকে যে, এর সাথে বিচ্ছিন্ন
হওয়াকে যেন ইসলামি জীবন থেকে বিছিন্ন মনে করা হয়, তবে এসব
ক্ষেত্রে ঐ হাদিস প্রয়োগ করে থাকে। যদি এ বিচ্ছিন্নতা আরও ব্যাপক হয়ে যায় ,তবে তা কুফরের সীমায়ও পৌঁছতে পারে। আর এ অর্থেই হজরত নুহ (আ.)-এর ছেলে সম্পর্কে ইরশাদ হয়ঃ قَالَ يَا نُوحُ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ
‘সে তোমার পরিবাবের লোক নয়’।[202]
সুতরাং ব্যাখ্যার ব্যাপারে
অত্যন্ত সর্তক থাকতে হবে। কেননা এটা শুধু
কোন অনিয়মানুবর্তিতা বলে ক্ষান্ত হয় না; বরং কোন কোন ক্ষেত্রে আরও মারাত্মক পাপের রূপ ধারণ করতে পারে।[203]
عَنْ أَبِي أَيُّوبَ الأَنْصَارِيِّ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ لاَ يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلاَثِ لَيَالٍ، يَلْتَقِيَانِ فَيُعْرِضُ هَذَا وَيُعْرِضُ هَذَا، وَخَيْرُهُمَا الَّذِي يَبْدَأُ بِالسَّلاَمِ
”. অর্থ: আবু আইউব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : কোন লোকের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাই-এর সাথে তিন দিনের অধিক এমনভাবে সম্পর্ক ছিন্ন
রাখবে যে, দুজনে দেখা হলেও একজন এদিকে আরেকজন ওদিকে মুখ
ঘুরিয়ে রাখবে। তাদের মধ্যে যে আগে সালাম দিবে, সেই উত্তম
লোক।[204]
মুমিন এক গর্তে দু’বার পতিত হয় না
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ “ لاَ يُلْدَغُ الْمُؤْمِنُ مِنْ جُحْرٍ وَاحِدٍ مَرَّتَيْنِ ” অর্থ: আবু হুরাইরা (রা.) থেকে
বর্ণিত যে, নবি (ﷺ) বলেছেন : প্রকৃত মুমিন একই গর্ত থেকে
দুবার দংশিত হয় না।[205]
মহান আল্লাহ তাআলা মুমিন-মুসলমানদের যে সম্মান-ইজ্জত দান করেছেন। সেই আত্মমর্যাদা বোধ যেন কোন মুমিন নষ্ট না করে,
সেই দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এমন কাজ যা ক্ষতিকারক-অপমানজনক-গোনাহের তা ভুলে-অনিচ্ছায়
একবার হতে পারে দ্বিতীয়বার মুমিন বুঝে-জেনে করতে পারে না।
এটা মুমিন সুলভ আচরণের পরিপন্থি। (যেমন ইরশাদ হচ্ছে- আল্লাহ তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন, তোমরা যদি মুমিন হও,
তবে কখনও পুনরায় এ ধরণের আচরণের পুনরাবৃত্তি করো না। সূরা নুর-১৭ ) بالصواب الله اعلم
অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ
অর্থাৎ আর যারা কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা নিজের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপ কাজের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে-আল্লাহ ছাড়া কে পাপ মাফ করবে। অতঃপর তারা জেনে শুনে কখনও উক্ত কাজের পুনরাবৃত্তি করে না।[206]
তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে শুনে তা করতে থাকে না। অর্থাৎ পাপ হতে তওবা করে এবং পরে সে পাপের পুনরাবৃত্তি করে না। আর যতবার গুনাহ করে ততবার আল্লাহর নিকট তওবা করে থাকে। হাফেজ আবু ইয়ালা (রহ.) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেন, عن مولى لأبي بكر الصديق رضي اللّه تعالى عنه قال :
قال رسول اللّه صلى اللّه عليه وسلم : " ما أصَرَّ مَنِ اسْتَغْفَرَ وَإنْ عادَ في اليَوْمِ سَبْعِينَ مَرَّةً
অর্থ: হজরত আবু বকর (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, সে ব্যক্তি হঠকারী (গুনাহকারী) নহে, যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাকে, যদিও তার দ্বারা দিনে সত্তবার পাপকাজ সাধিত হয়।
নোট : আল্লামা ইবনে কাসির রহ.বলেন, হাদিসটির সনদ হাসান আর ইমাম তিরমিজি
রহ. বলেন, জয়িফ।[207]
মুমিনের অন্তর্দৃষ্টিকে ভয় করা, কেননা সে আল্লাহ তাআলার নুর দ্বারা
দেখে
عَنْ أَبِي
سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ
قَالَ : اتَّقُوا فِرَاسَةَ الْمُؤْمِنِ ، فَإِنَّهُ يَنْظُرُ بِنُورِ اللَّهِ ثم قرأ : {
إنَّ فِي ذَلِكَ لِآيَاتٍ لِلْمُتَوَسِّمِينَ }" رواه الترمذي
অর্থ: হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন- মুমিনের
বিচক্ষণতা ও অন্তর্দৃষ্টিকে ভয় কর। কেননা সে আল্লাহর
নুর দ্বারা দেকে। অতঃপর তিনি (এতে রয়েছে পরিচয় লাভকারীদের জন্য
বিরাট নিদর্শন। সূরা হিজর-৭৫) এ আয়াত তেলাওয়াত করে।[208]
নোট : ইমাম তিরমিজি (রহ.) বলেন, হাদিসটি
গরিব অর্থাৎ বর্ণনাকারী একজন।।
হজরত শাহ ওয়ালি উল্লাহ (রহ.) –এর বক্তব্য দ্বারা জানা যায় যে, মুমিনের বিচক্ষণতায় নবির বিবেচনা শক্তির ফয়েজ বিদ্যামান থাকে। তিনি বলেন,নবির সাথে জ্ঞানগত কোন অংশে তার
উম্মতের সাদৃশ্য থাকার অর্থ হচ্ছে, তাঁর উম্মাতের কাউকেও মুহাদ্দাস
ও মুলহামের মর্যাদা দান করা। এর দুটি পন্থা রয়েছে। দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে, সঠিক অন্তর্দৃষ্টি তাকে দান করা
এবং পবিত্র আরশ থেকে এমনভাবে সমর্থন করে যে, তাঁর ইজতেহাদসমূহ
যেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ হয়। আর এ গুণের চাহিদাগুলোর একটি হচ্ছে
কোন কোন ওহি তার স্বপক্ষে অবতীর্ণ হওয়া।[209]
শাহ সাহেবের উপরোক্ত গবেষণালব্ধ মন্তব্য
হতে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, মুমিনের অন্তর্দৃষ্টি ও বিচক্ষণতার গুরুত্ব কতটুকু এবং এটাও স্পষ্ট হয়ে
গেল যে, হজরত ওমর (রা.) স্বপক্ষে ওহি নাজিল হওয়াও মূলত রসূলেরই(ﷺ) কৃতিত্ব ছিল। যদি রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিবেচনা
শক্তি এত উঁচু না হত, তাহলে তাঁর সাথী-সঙ্গীদের
মাঝে এমন উন্নতমানের
বিচক্ষণতাও পরিদৃষ্ট হত না।
হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, المُؤْمِنُ هَيِّنٌ لَيِّنٌ حَتَّى تَخَالَهُ مِنَ اللِّينِ أَحْمَقَ মুমিন ব্যক্তি
স্বভাবতই নম্র হয়ে থাকে; কিন্তু তার নম্রতার দরুন তাকে তোমরা আহমক মনে করে থাক।[210]
কোন
কোন নেক বখত মুমিনকে তার সরলতার ও অনাড়ম্বরতার কারণে আহমক মনে করা নিরেট আহমকি ছাড়া
কিছু নয়। মূলত সবচেয়ে বুদ্ধিমান ঐ ব্যক্তি যে দুনিয়ার মূল্যহীন সম্পদকে
আখেরাতের অফুরন্ত সম্পদের মোকাবেলায় বিসর্জন দিয়ে থাকে। দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ এবং আখেরাতের প্রতি অনীহা,
এটাই সাধারণ
মানুষের চিন্তাধারা হয়ে থাকে। এটাকে কোন মতেই বিবেকের মানদণ্ড সাব্যস্ত করা চলে না। তবে যারা ঐ ভাষা চিন্তাধারা থেকে বের হয় তার চাইতে আরও উন্নতমানের
চিন্তাধারা সৃষ্টি করেছেন, তাদের অনুভূতিকেই বুদ্ধি-বিবেচনার মানদণ্ড মনে করে নিজেদেরকে বুদ্ধিমান এবং মুসলমানদেরকে বোকা আখ্যা
দিয়েছিল। পবিত্র কুরআনের ভাষায়- “আর যখন তাদের বলা হয় যে, অন্যারা যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও
সেভাবে ঈমান আন। তখন তারা
বলে,আমরাও কি তদ্রুপ ঈমান আনব, যেরূপ আন্যান্য
আহমকরা এনেছে। শুনে রেখ, তারাই প্রকৃত আহমক কিন্তু তারা তা জানে না। (সূরা বাকারা-১৩)[211]
ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করার শাস্তি
وَمَنْ
يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا
عَظِيمًا
অর্থ: কেহ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি
জাহান্নাম; সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং আল্লাহ তার
প্রতি রুষ্ট থাকবেন, তাকে লানত করবেন এবং তার জন্যে মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।[212]
আলোচ্য
আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলতেছেন, একজন মুমিনের স্বেচ্ছায় তার
ভ্রাতা অপর মুমিনকে হত্যা করার কোন অধিকার নেই। বুখারি ও মুসলিম শরিফে হজরত ইবনে
মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত রয়েছে যে,
মানবতার নবি (ﷺ) বলেছেন: কিয়ামতের দিন খুনের বিচার
সর্বপ্রথম হবে। ইমাম আবু দাউদ (রহ.)
হজরত ওবাদা ইবনে সামেত (রা.) হতে বর্ণনা করেছেন যে, মুমিন ব্যক্তি খুনের অপরাধে
অপরাধী না হওয়া পর্যন্ত নেককাজে দ্রুত সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকে। যখনই সে অন্যায়
খুনের অপরাধ সংঘটন করে, তখনই তার গতি রুদ্ধ হয়ে পড়ে।
আরেক হাদিসে মহানবি (ﷺ) বলেছেন: একজন মুসলিমের হত্যা অপেক্ষা
পৃথিবী ধ্বংস যাওয়া আল্লাহর নিকট অধিকতর সহনীয়।
অপর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে : আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সকল অধিবাসী মিলে হয়ে যদি
একজন মুসলিমকে হত্যা করে, তথাপি আল্লাহ তাদের সকলকে নিম্নমুখী
করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) তাঁর
সহমতাবলম্বীদের মতে ইচ্ছাকৃতভাবে মুমিনকে হত্যাকারী ব্যক্তির তওবা কবুল হবে না
বিধায় তাকে দোজখে যেতেই হবে। পক্ষান্তরে
পূর্বসূরী ও উত্তরসূরী অধিকাংশ ফকিহ-মুফাসসিরে অভিমত
এই যে,এইরূপ পাপী
ব্যক্তি তওবা না করলে অথবা তার নেক আমলে না পোষালে এবং আল্লাহ তাকে তার প্রাপ্য
শাস্তি দিতে চাইলে তাকে দোজখে যেতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, উপরোক্ত
পাপী ব্যক্তি কতদিন ধরে দোজখের আজাব ভোগ করবে? উত্তর এই যে,
অনন্তকাল ধরে নহে; বরং বহুকাল ধরে দোজখের আজাব
ওশাস্তি ভোগ করবে। এই বহুকালের অন্ত রয়েছে এবং একদিন এর সমাপ্তি ঘটবে। আলোচ্য
আয়াতে যে শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, ইহার অর্থ এখানে অনন্তকাল
ধরে অবস্থানকারী হবে না; বরং এখানে অর্থ হবে ‘বহুকাল ধরে অবস্থানকারী’ । সনদের প্রতিটি স্তরে
বিপুল সংখ্যক রাবি রয়েছে বিধায় অনিবার্যরুপে বিশ্বাস্য একটি মুতাওয়াতার হাদিস
হচ্ছে যে, যার হৃদয়ে সামান্যতম ঈমান
রয়েছে, সে একদিন না একদিন দোজখ হতে বের হয়ে আসবে (এই বিষয়ে অত্র কিতাব ৮৮ পৃষ্ঠায় আলোচনা
আাছে)
আর যদি মুমিনের হত্যাকারীর তওবাও আল্লাহর নিকট কবুল হবে। সে অনুতপ্ত,ভীত ও সংযত হয়ে নেক আমল করলে আল্লাহ
তাআলা তার বদ আমলসমূহ মার্জনা করে দিয়ে তাকে নেকি প্রদান করবেন। আর নিহত ব্যক্তির হক? হত্যাকারী তাকে যে অত্যাচার করেছে
এবং যন্ত্রণা দিয়েছে,আল্লাহ তাআলা এর পরিবর্তে তাকে ক্ষতিপূরণমূলক
নিআমত দান করে হত্যাকারীর পক্ষ হতে তাকে দিয়ে তা মাফ করিয়ে লইবেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন: وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ
مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا
يَقْتُلُونَ
النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا (68) يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا (69) إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ
وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا অর্থ: আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন কোন মাবুদ
ডাকে না,-----------। তবে যারা তওবা করে এবং নেক আমল করে আল্লাহ তাআলা তাদের গুনাহ মার্জনা করে তদস্থলে
নেক আমল স্থাপন করবেন। আর আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, কৃপাপরায়ণ।[213]
এ আয়াত
রহিত হবার মত নহে। আয়াতে অন্যায়ভাবে
হত্যাকারী ব্যক্তির তওবা কবুল করার কথা বর্ণিত হয়েছে। অন্য আয়াতে বলা হয়েছেঃ
قُلْ يَا
عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ
لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ
اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ
يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ
الرَّحِيمُ অর্থ: বলো, ওহে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর অত্যাচার করেছো,
তোমরা আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হইও না। আল্লাহ নিশ্চয় সর্বপ্রকার গুনাহ ক্ষমা করেন। নিঃসন্দেহে তিনি ক্ষমাশীল, কৃপাময়।’ সূরা যুমার-৫৩[214]
মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসিকি এবং তাঁকে হত্যা
করা কুফুরি : এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে এসেছে- عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم” سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ ”. تَابَعَهُ غُنْدَرٌ عَنْ شُعْبَةَ. অর্থ: আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেছেন যে, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: মুসলিমকে গালি দেওয়া
ফাসিকি এবং তাকে হত্যা করা কুফুরি।[215]
নোট : শুবাহ (রহঃ) সূত্রে
গুনদারও এ রকম বর্ণনা করেছেন।
‘ফিসক’ শব্দের
অর্থ হচ্ছে অবাধ্যতা। বাংলাতে ‘ফাসেক’
শব্দের অর্থ করা হয় পাপিষ্ঠ। যে ব্যক্তি ইসলাম বিশ্বাস ও
স্বীকার করে অথচ ইসলামের আদেশ-নিষেধ লঙ্ঘন করে বা তা মেনে চলে না, তাকে
ফাসেক বলে । ‘কুফর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে অস্বীকার করা, অবিশ্বাস করা অথবা গোপন করা। বাংলাতে ‘কাফের’ শব্দের অর্থ করা হয়
অবিশ্বাসী। উক্ত হাদিসে মুসলমানকে গালি দেওয়াকে পাপের সাথে এবং হত্যা করাকে কুফরির
মত জঘণ্য কাজের সাথে তুলনা করা হয়েছে। মুসলমানকে কাফের-মুনাফেক ইত্যাদি বলে ডাকা নিষেধ : কোন মুসলমানকে শরিয়তের সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণ ব্যতিত ফাসেক-কাফের-মুনাফেক
ইত্যাদি অপবাদ বা ডাকা যাবে না। সে যদি তা না হয়, তাহলে নিজের উপরই তা বর্তাবে। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا قَالَ الرَّجُلُ لِأَخِيهِ يَا كَافِرُ، فَقَدْ بَاءَ بِهِ أَحَدُهُمَا» আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: যখন কেউ
তার মুসলিম ভাইকে ‘হে কাফের’ বলে ডাকে, তখন তা
তাদের দুজনের কোন একজনের উপর বর্তায়।[216]
অন্য বর্ণনায় আছে-অপরজন
যদি তা না হয়, তবে সে অপবাদ তার নিজের উপরই আপতিত হবে।
মুসলিম জনগণের সাথে খেয়ানতকারীর জন্য জান্নাত হারাম
عَنِ
الحَسَنِ، قَالَ: أَتَيْنَا
مَعْقِلَ بْنَ يَسَارٍ
نَعُودُهُ،
فَدَخَلَ عَلَيْنَا عُبَيْدُ اللَّهِ، فَقَالَ لَهُ مَعْقِلٌ:
أُحَدِّثُكَ
حَدِيثًا سَمِعْتُهُ مِنْ رَسُولِ
اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ،
فَقَالَ: «مَا مِنْ
وَالٍ يَلِي رَعِيَّةً مِنَ المُسْلِمِينَ، فَيَمُوتُ وَهُوَ غَاشٌّ لَهُمْ، إِلَّا حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الجَنَّةَ»
অর্থ: হজরত হাসান বসরি (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা মাকিল ইবনে ইয়াসারের কাছে তার সেবা-শুশ্রূষার জন্য আসলাম। এ সময়
উবাইদুল্লাহ প্রবেশ করল। তখন মাকিল (রা.) বললেন, আমি
তোমাকে এমন একটি হাদিস বর্ণনা করে শোনাবো যা আমি রসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে শুনেছি। তিনি বলেন, কোন দায়িত্বশীল
ব্যক্তি মুসলিম জনসাধারণের দায়িত্ব লাভ করল আর তার মুত্যু হল এই হালতে যে, সে ছিল খেয়ানতকারী , আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম
করে দেবেন।[217]
মুমিনের স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ رُؤْيَا الْمُؤْمِنِ جُزْءٌ مِنْ سِتَّةٍ وَأَرْبَعِينَ جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّةِ অর্থ: আবু হুরাইরা (রা.)
থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: মুমিনের স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।[218]
নোট : মুত্তাকি মুমিনদের অনেক
স্বপ্ন সত্য হলেও তার উপর ভিত্তি করে কোন শরয়ি বিধান পরিবর্তন, সংযোজন
বা বিয়োজন বৈধ নয়।[219]
উপরোক্ত
হাদিস শরিফে মুমিনের ভাল স্বপ্ন নবুওয়াতের মত মহান গুরু দায়িত্ব ও সম্মানিত জিনিসের
অংশ বিশেষ গণ্য-তুলনা করে, মুমিনকে সেই
সম্মান-মর্যাদায় ভূষিত করলেন।
মুমিনের জন্য নিষ্পাপ ফেরেশতারা ক্ষমা প্রার্থনা-দুআ করে
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ رَبَّنَا.
অর্থ: যারা আরশকে ধারণ করে এবং যারা এর
চারপাশে রয়েছে, তারা তাদের রবের প্রশংসাসহ তাসবিহ পাঠ
করে এবং তাঁর প্রতি ঈমান রাখে। আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা চেয়ে বলে যে, হে আমাদের রব, আপনি রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সব কিছুকে
পরিব্যপ্ত করে রয়েছেন। অতএব যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অনুসরণ করে আপনি তাদেরকে
ক্ষমা করে দিন। আর জাহান্নামের আজাব থেকে আপনি তাদেরকে রক্ষা করুন’। আপনি তাদেরকে আর তাদের পিতৃপুরুষ,
স্বামী-স্ত্রী ও
সন্তানাদির মধ্যে যারা সৎকাজ করেছে তাদেরকেও চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করান যার
ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন; আপনি মহা
পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান। আর আপনি তাদেরকে রক্ষা করেন সকল প্রকার মন্দ
থেকে। সেদিন আপনি যাকে সমস্ত অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন,
তার প্রতি তো
দয়াই করলেন। এটাই হলো চুড়ান্ত সাফল্য।[220]
নোট : আরশ বহনকারী ফেরেশতা বর্তমানে চারজন এবং কেয়ামতের দিন
আট জন হয়ে যাবে।[221]
আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেন,تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْ فَوْقِهِنَّ وَالْمَلَائِكَةُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِمَنْ فِي الْأَرْضِ أَلَا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
অর্থ: আকাশ উপর থেকে ফেটে পড়ার উপক্রম হয় আর তখন ফেরেশতাগণ তাদের পালনকর্তার প্রশংসাসহ
পবিত্রতা বর্ণনা করে এবং পৃথিবীবাসীদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। শুনে রাখ, আল্লাহই ক্ষমাশীল,পরম করুনাময়।[222]
যেসব আমলকারীর জন্য ফেরেশতারা দোআ করে : আমাদের প্রিয় নবি (ﷺ) এমন কিছু আমল শিখিছেন যা করলে মুমিনগণ নিষ্পাপ ফেরেশতার দোআর অন্তর্ভুক্ত
হয়ে যায়। নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো :
১.
রোগী পরিদর্শনকারী : عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ نَافِعٍ، عَنْ عَلِيٍّ، قَالَ: “مَا مِنْ رَجُلٍ يَعُودُ مَرِيضًا مُمْسِيًا، إِلَّا خَرَجَ مَعَهُ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكٍ يَسْتَغْفِرُونَ لَهُ حَتَّى يُصْبِحَ، وَكَانَ لَهُ خَرِيفٌ فِي الْجَنَّةِ، وَمَنْ أَتَاهُ مُصْبِحًا، خَرَجَ مَعَهُ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكٍ يَسْتَغْفِرُونَ لَهُ حَتَّى يُمْسِيَ، وَكَانَ لَهُ خَرِيفٌ فِي الْجَنَّةِ”، অর্থ: আলি
(রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, যে মুসলিম তার অসুস্থ কোন মুসলিম ভাইকে দেখতে যায়,
আল্লাহ তাআলা
তার জন্য সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রেরণ করেন, দিনের যে সময় দেখতে যাবে সে সময় থেকে
দিনের শেষ পর্যন্ত (ফেরেশতাগণ) তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে এবং রাতের যে
সময় দেখতে যায়, সে সময় থেকে রাতের শেষ পর্যন্ত (ফেরেশতাগণ) তার জন্য ক্ষমা
প্রার্থনা করতে থাকে।[223]
২.ওজু অবস্থায় ঘুমানো ব্যক্তি : روى الإمام ابن حبان وغيره مرفوعًا: «مَنْ باتَ طَاهِرًا باتَ في شِعَارِهِ مَلَكٌ، لا يَسْتَيْقِظُ إلَّا قال المَلَكُ: اللهمَّ اغفرْ لِعَبْدِكَ فلانًا، فإنَّهُ باتَ طَاهِرًا» صحيح ابن حبان؛ برقم: [1051]، صحيح الترغيب؛ برقم:597 فتح
الباري (11/ 109) অর্থ: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)
থেকে বর্ণিত যে, রসূল(ﷺ) বলেছেন: যে ব্যক্তি পবিত্র অবস্থায় (ওজু অবস্থায়) ঘুমায় তার সাথে
একজন ফেরেশতা নিয়োজিত থাকে। অতঃপর সে ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার সাথেই আল্লাহ তাআলার
সমীপে ফেরেশতাটি প্রার্থনায় বলে থাকে, হে আল্লাহ! তোমার অমুক বান্দাকে ক্ষমা করে দাও, কেননা সে পবিত্রাবস্থায় ঘুমিয়েছিল।[224]
৩. সালাতের জন্য মসজিদে অপেক্ষারত
ব্যক্তি : أَبُو هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “ الْمَلَائِكَةُ تُصَلِّي عَلَى أَحَدِكُمْ مَا دَامَ فِي مُصَلَّاهُ الَّذِي صَلَّى فِيهِ تَقُولُ: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ مَا لَمْ يُحْدِثْ “ كَمَا فِي البُخَارِيِّ ، وَمُسْلِمٍ অর্থ: আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:, “তোমাদের মাঝে কোন ব্যক্তি যখন ওজু অবস্থায় সালাতের অপেক্ষায়
বসে থাকে সে যেন সালাতেই রত। তার জন্য ফেরেশতারা দোআ করতে থাকে, হে আল্লাহ! তুমি
তাকে ক্ষমা করো, হে আল্লাহ! তুমি তার প্রতি
দয়া করো।[225]
৪. প্রথম কাতারে সালাত আদায়কারী : عَنْ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ - صلى الله عليه وسلم -: إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى الصَّفِّ الْأَوَّلِ , أَوْ الصُّفُوفِ الْأُوَلِ. وفي رواية
الصُّفُوفِ الْمُتَقَدِّمَةِ অর্থ: হজরত বারা ইবনে আজেব (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : প্রথম কাতারের নামাজিদেরকে নিশ্চয়ই আল্লাহ তালা ক্ষমা করেন ও ফেরেশতারা তাদের
জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।[226]
নোট : কোন কোন বর্ণনায় কাতারে ডান
পাশের কথা আছে।
৫. রসূল(ﷺ)-এর প্রতি দরুদ
পাঠকার : عن عبد الله بن عمرو بن العاص قوله: “من صلى على النبي ـ صلى الله عليه وسلم ـ واحدة صلى الله عليه وملائكته سبعين مرة” رواه أحمد بإسناد حسن অর্থ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে
আস (রা.) থেকে বর্ণিত। যে ব্যক্তি নবি (ﷺ) এর ওপর দরুদ পাঠ করবে আল্লাহ তাআলা তার ওপর
সত্তর বার দয়া করেন ও তার ফেরেশতারা তার জন্য সত্তরবার ক্ষমা প্রার্থনা করবে। [227]
নোট : ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)
সনদটি হাসান।
৬. দানশীল ব্যক্তি : أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: مَا مِنْ يَوْمٍ يُصْبِحُ الْعِبَاد فِيهِ إِلاَّ مَلَكَانَ يَنْزِلاَنِ، فَيَقُولُ أَحَدُهُمَا: اللهُمَّ أَعْطِ مُنْفِقًا خَلَفًا؛ وَيَقُولُ الآخَرُ: اللهُمَّ أعْطِ مُمْسِكًا تَلَفًا
অর্থ: আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাঁদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! দাতাকে তার দানের উত্তম প্রতিদান দিন আর অপরজন
বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস করে দিন।[228]
৭. সিয়ামের
নিয়তে সাহরি খাওয়া : عن ابن عمر قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم:”إن اللهَ وملائكتَه يُصَلُّون على المُتَسَحِّرين অর্থ: হজরত
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সাহরি ভক্ষণকারীদের প্রতি দয়া করেন
এবং ফেরেশতাগণ তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন।[229]
নোট : মুমিনের
জন্য (তালেবে এলেমের জন্য )
ফেরেশতা,গর্তের পিপিলিকা ও সমদ্রের মাছ কর্তৃক
দোআ এ কিতাবে ১১৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।
সুহৃদয়
পাঠকবৃন্দ! উপরোক্ত
আয়াতে কারিমা ও হাদিসে নববি দ্বারা মুমিন বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর অপার দয়া-করুণার পাশাপাশি একথাও প্রমাণিত হয় যে, সাধারণ
ফেরেশতা ও আরশ বহনকারী বিশিষ্ট ফেরেশতা,
সেই ফেরেশতাদের সম্পর্কে ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, তাঁরা হলেন উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ও সম্মানিত
ফেরেশতামণ্ডলী।[230]
ফেরেশতাদের দ্বারা মুসলমানদের জন্য কল্যাণ-ক্ষমার দোআ, তাঁদের নুরের পাখা ডানা বিছিয়ে দেওয়া
মুমিনদের সম্মান-মর্যাদা ।
ঈমান ও তওবা আল্লাহর আজাবকে হঠিয়ে দেয়
আল্লাহ তাআলা বলেন,فَلَوْلَا كَانَتْ قَرْيَةٌ آمَنَتْ فَنَفَعَهَا إِيمَانُهَا إِلَّا قَوْمَ يُونُسَ لَمَّا آمَنُوا كَشَفْنَا عَنْهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَتَّعْنَاهُمْ إِلَى حِينٍ অর্থ: তবে ইউনুসের সম্প্রদায় ব্যতিত কোন জনপদবাসী কেন এমন হল না যারা ঈমান আনত
এবং তাদের ঈমান তাদের উপকারে আসত । তারা যখন বিশ্বাস করল, তখন আমি তাদেরকে পার্থিব জীবনে অপমানজনক শাস্তি
হতে মুক্ত করলাম এবং কিছু কালের জন্য জীবনোপভোগ করতে দিলাম।[231]
তাফসিরকারগণ
এই ব্যাপারে বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন যে হজরত ইউনুস (আ.)এর কওমকে কি কেবল পার্থিব শাস্তি হতে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল; না পরকালে শাস্তি হতেও তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল? কেহ কেহ বলেন, কেবল পার্থিব শাস্তি হতে মুক্তি দেওয়া
হয়েছিল যেমন আয়াতে কারিমা দ্বারা ইহাই বুঝা যায়। আর কেহ কেহ বলেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ
করেছেন: আমি তাকে (ইউনুস আ.কে) এক লক্ষ; বরং ততধিক লোকের নিকট
প্রেরণ করেছিলাম, অতঃপর তারা ঈমান আনার ফলে আমি তাদেরকে একটি
নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সাচ্ছন্দের জীবন দান করলাম।[232]
এই আয়াত
দ্বারা বুঝা যায় যে তারা ঈমান এনছিল। তাদের উপর ঈমান শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে, আর ঈমান পরকালের আজাব
হতে মুক্তি দান করার জন্য যথেষ্ট এবং ইহাই প্রকাশ।
হজরত
কাতাদাহ (রহ.) এই আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ
করেছেন যে, আল্লাহর পক্ষ হতে আজাব আসার পর কোন কওম ঈমান আনলে
ই্হা তাদের জন্য উপকারী হয় না এবং তারা আজাব হতে মুক্তিও পায় না। কিন্তু হজরত ইউনুস(আ.) তার জাতিকে ছেড়ে চলে গেলে তখন তারা বুঝল যে এখন আর
আজাব হতে মুক্তি পাওয়া যাবে না, তখন তাদের অন্তরে তওবার অনুভূতি
সৃষ্টি হল। তারা চটের পোশাক পরিধান করে নিজের
অবস্থার পরিবর্তন ঘটাল এবং তাদের জীব-জন্তু ও তাদের সন্তানদেরকে
পৃথক পৃথক করে মাঠে জমা করল এবং চল্লিশ রাত পর্যন্ত আল্লাহর দরবারে কাকুতি-মিনতি করে কান্নাকাটি করতে লাগল। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের অবস্থা দেখে বুঝলেন যে, তারা সত্য সত্যই তওবা করেছে এবং বিগত জীবনের কর্মকাণ্ডের প্রতি তাদের অনুশোচনা
এসেছে। তখন তিনি আজাব সরিয়ে দিলেন।[233]
একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর : প্রশ্ন।। আল্লাহ তাআলার বিধান হলো কোন ব্যক্তি বা জাতির উপর আজাব কিংবা মৃত্যুতে
পতিত হলে তাদের ঈমান ও তওবা গ্রহণ করেন না, যা আয়াত দ্বারা
প্রমাণিত। অথচ ইউনুস (আ.)-এর জাতির ব্যাপারটি বিপরীত মনে হয়।
উত্তর।। স্বয়ং কুরআনের আয়াতে বর্ণনা ধারার প্রতি লক্ষ্য করুন, আয়াতে বলা হয়েছে, এর পরিষ্কার মর্ম এই যে,পৃথিবীর সাধারণ জনপদের অধিবাসীদের সম্পর্কে আফসোস প্রকাশ হিসেবে বলা হয়েছে
যে, তারা কেনই বা এমন হল না যে, এমন
সময়ে ঈমান নিয়ে আসত যে সময় পর্যন্ত ঈমান
আনলে তা লাভজনক হতো। অর্থাৎ, আজাব কিংবা মৃত্যুতে পতিত হওয়ার আগে আগে যদি ঈমান নিয়ে আসত, তবে তাদের ঈমান কবুল হয়ে যেত। কিন্তু ইউনুস (আ.)-এর সম্প্রদায় তা থেকে স্বতন্ত্র। কারণ তারা আজাবের লক্ষণাদি দেখে আজাবে পতিত হওয়ার পূর্বেই
যখন ঈমান নিয়ে আসে,তখন তাদের ঈমান ও তওবা কবুল হয়ে যায়।
আয়াতের এই প্রকৃষ্ট মর্ম প্রতীয়মান
করে যে, এখানে কোন ঐশীরীতি লংঘন করা হয়নি; বরং একান্তভাবে আল্লাহ তাআলার নিয়মানুযায়ী
তাদের ঈমান ও তওবা কবুল করে নেয়া হয়েছে।
অধিকাংশ তাফসিরকার যেমন- বাহরে-মুহিত, কুরতুবি, যমখশরি,মাজহারি, রুহুল-মাআনি
প্রমুখ এ আয়াতের এ মর্মই লিখেছেন যাতে প্রতীয়মান হয় যে, হজরত
ইউনুস(আ.)-এর সম্প্রদায়ের তওবা কবুল
হওয়ার বিষয়টি সাধারণ খোদায়ি রীতির আওতায়ই হয়েছে।[234]
মুমিন যত বড়ই পাপ করুক না কেন ? কাফের হয় না
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ অর্থ: মুমিনের দুই দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে। অতঃপর তাদের একদল অপর দলকে আক্রমণ করলে তোমরা আক্রমণকারী দলের
বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর
নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি তারা
ফিরে আসে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফয়সালা করবে এবং সুবিচার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন।[235]
পরস্পর দ্বন্দ্বরত দুই দলের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। বলা বাহুল্য যে, দ্বন্দ্ব সংঘাত লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ঈমানদার আখ্যা দিয়েছেন। তাই এ আয়াতের ওপর ভিত্তি করে আলহে সুন্নাত ওয়াল জামাআত মত পেশ
করেছেন যে, যত বড় পাপই করুক, তাতে
মুমিন বে-ঈমান হয়ে যায় না। পক্ষান্তরে খারিজি ও মুতাজিলাদের একাংশের মতে কবিরা গুনাহ করলে ঈমান
থাকে না।
হজরত আবু বকর(রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবি কারিম (ﷺ) হাসান-কে নিয়ে বের হলেন এবং তাঁকেসহ মিম্বারে আরোহণ করলেন। অত্ঃপর বললেন, আমার এ ছেলেটি সরদার। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে
বিবাদমান দুদল মুসলমানের মাঝে সমঝোতা –মীমাংসা করিয়ে
দিবেন।[236]
এ হাদিসেও প্রিয় নবি (ﷺ) বিবাদমান দুদলকে মুসলমানরূপে আখ্যা দিয়েছেন। পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার পরও মুমিন নামটি মুছে যায়নি; বরং তারা সাংবিধানিক অর্থে মুমিন ছিলেন। যদি তারা কাফের হয়ে যেত কক্ষনোও তাদের মুমিন নামে ডাকা হত না। আর তাদের মাঝে সংশোধনের হুকুম করা হত না। অন্য এক হাদিসে আরও স্পষ্টভাবে এসেছে- আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তিনটি বিষয় ঈমানের
বুনিয়াদের অন্তর্ভুক্ত। (১)
যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কালেমা পড়বে, তার প্রতি
আক্রমণ করা হতে বিরত থাকবে; কোন গুনাহর দরুন তাকে কাফের মনে করবে
না এবং কোন আমলের দরুন তাকে ইসলাম হতে খারিজ করে দিবে না। (২) জিহাদ- যেদিন হতে
আল্লাহ আমাকে জিহাদের হুকুম দিয়েছেন সেদিন হতে এই উম্মতের শেষ যামানার লোকেরা দাজালের
সাথে জিহাদ করতে থাকবে, কোন অত্যাচারী শাসকের অত্যাচার বা কোন
সুবিচারকের সুবিচার জিহাদকে বাতিল করতে পারবে না এবং (৩)
তাকদীরে বিশ্বাস করা।[237]
সুতরাং প্রমাণিত হল মুমিন যত বড়ই গুনাহ করুক না কে? সে কাফের হয় না।(তবে গুনাহ ঈমানকে
দুর্বল করে এবং কিছু কিছু গুনাহ কুফরির দিকে ধাবিত করে। প্রত্যেক মুসলিমকে এ বিষয়ে আরও সতর্কতাবলম্বন করা
উচিত)
সাত আসমান-জমিন থেকেও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ওজন বেশি
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)
বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন : হজরত নুহ আলাইহিস সালাম মৃত্যুর
পূর্বে তাঁর পুত্রকে ওসিয়ত
করেন তা তোমাদেরকে বলছি। তিনি বলেছিলেন,
لَمَّا
حَضَرَتْهُ الْوَفَاةُ قَالَ لِابْنِهِ:إِنِّي قَاصٌّ عَلَيْكَ
الْوَصِيَّةَ: آمُرُكَ بِاثْنَيْنِ، وَأَنْهَاكَ عَنِ اثْنَيْنِ. آمُرُكَ بِلَا
إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَإِنَّ السَّمَاوَاتَ السَّبْعَ وَالْأَرَضِينَ السَّبْعَ
لَوْ (وُضِعَتْ فِي كِفَّةٍ وَوُضِعَتْ لَا
إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ فِي كِفَّةٍ، رَجَحَتْ بِهِنَّ لَا إِلَهَ إَلَّا اللَّهُ،
وَلَو أَنَّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعَ وَالْأَرَضِينَ السَّبْعَ) كُنَّ
حَلْقَةً مُبْهَمَةً قَصَمَتْهُنَّ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَسُبْحَانَ اللَّهِ
وَبِحَمْدِهِ، فَإِنَّهَا صَلَاةُ كُلِّ شَيْءٍ وَبِهَا يُرْزَقُ الْخَلْقُ،
وَأَنْهَاكَ عَنِ الشِّرْكِ وَالْكِبْرِ ".
অর্থ:
আমি তোমাকে দুটি কাজের নির্দেশ দিচ্ছি এবং দুটি কাজ থেকে নিষেধ করছি। আমি তোমাকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ –এর আদেশ প্রদান
করছি। কারণ সাত আসমান ও জমিন যদি এক পাল্লায়
রাখা হয় এবং ‘লা ইলাহা
ইল্লাল্লাহ’ অন্য পাল্লায় রাখা হয়, তাহলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ভারী হবে---। এবং আমি তোমাকে সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি –এর নির্দেশ দিচ্ছি (অর্থাৎ, এ দুটি জিকির বেশি বেশি আদায় করকরতে নির্দেশ
প্রদান করছি) এ জিকির সকল সৃষ্টির দোআ, সালাত ও তাসবিহ এবং এর ওসিলাতেই সকল সৃষ্টি রিজিক প্রাপ্ত হয়। আর তোমাকে শিরক ও অহংকার থেকে নিষেধ করছি।[238]
পাপের সত্তরটি ফাইলের চেয়েও লা ইলাহা
ইল্লাল্লাহর ওজন বেশি : : سمعت عبد الله بن عمرو بن العاص رضي الله عنهما يقول: قال رسول الله صلى الله عليه وسلمإنَّ اللهَ سيُخلِّصُ رجلًا مِن أمَّتي
على
رؤوسِ الخلائقِ يومَ القيامةِ فينشُرُ عليه تسعةً وتسعينَ سِجِلًّا كلُّ سِجلٍّ مدُّ البصرِ ثمَّ يقولُ له
أتُنكِرُ
شيئًا مِن هذا ؟ أظلَمك كتَبتي
الحافظون ؟ فيقولُ: لا يا ربِّ فيقولُ: أفلك عذرٌ أو حسنةٌ ؟ فيُبهَتُ الرَّجل
ويقولُ: لا يا ربِّ فيقولُ: بلى إنَّ لك عندنا حسنةً وإنَّه لا ظُلمَ عليك اليومَ
فيُخرِجُ له بطاقةً فيها: أشهَدُ أنْ لا إلهَ إلَّا اللهُ وأنَّ محمَّدًا عبدُه
ورسولُه فيقولُ: احضُرْ وزنَك فيقولُ: يا ربِّ ما هذه البطاقةُ مع هذه
السِّجلَّاتِ ؟ فيقولُ: إنَّك لا تُظلَمُ قال: فتوضَعُ السِّجلَّاتُ في كِفَّةٍ
والبطاقةُ في كِفَّةٍ فطاشت السِّجلَّاتُ وثقُلتِ البطاقةُ يُقالُ: فلا يثقُلُ
اسمَ اللهِ شيءٌ
অর্থ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি : আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনে আমার উম্মতের একজনকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে উপস্থিত করবেন। তিনি তার সামনে নিরানব্বইটি (৯৯) আমলনামার ফাইল খুলে ধরবেন। প্রতিটি ফাইল দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। তারপর তিনি প্রশ্ন করবেন, তুমি কি এগুলো হতে কোন একটি (গুনাহ) অস্বীকার করতে পার? আমার লেখক ফিরিশতা কি তোমার ওপর জুলুম করেছ? সে বলবে, না, হে আমার প্রভু! তিনি আবার প্রশ্ন করনে। তোমার অভিযোগ আছে কি? সে বলবে, না, হে আমার প্রতিপালক! তিনি বলবেন, আমার নিকট তোমার একটি সওয়াব আছে। আজ তোমার ওপর এতটুকু জুলুমও করা হবে না। তখন ছোট একটি কাগজের টুকরা বের করা হবে। তাতে লিখা থাকবে-‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রসূলুহু’। তিনি তাকে বলবেন, দাড়িপাল্লার সামনে যাও। সে বলবে, হে প্রভু! এতগুলো খাতার বিপরীতে এ সামান্য কাগজটুকুর কী আর ওজন হবে? তিনি বলবেন, তোমার ওপর কোন জুলুম করা হবে না। রসূল (ﷺ) বলেন, তারপর ফাইলগুলো এক পাল্লা রাখা হবে এবং উক্ত টুকরাটি আরেক পাল্লায় রাখা হবে। ওজনে ফাইলগুলোর পাল্লা হালকা হবে এবং কাগজের টুকরার পাল্লা ভারী হবে। আর আল্লাহ তাআলা নামের বিপরীতে কোন কিছুই ভারী হতে পারে না।[239]
আল্লাহ তাআলার প্রিয় বাক্যের অন্যতম ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ : সামুরা ইবনে জুনদুব(রা.)বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ)বলেছেন,
عَنْ
سَمُرَةَ بْنِ جُنْدُبٍ، أنَّ النَّبِيَّ ﷺ قالَ: «”ما مِنَ الكَلامِ شَيْءٌ أحَبُّ إلى
اللَّهِ مِنَ: الحَمْدُ لِلَّهِ، وسُبْحانَ اللَّهِ، ولا إلَهَ إلّا اللَّهُ،
واللَّهُ أكْبَرُ“ . هُنَّ أرْبَعٌ، فَلا تُكْثِرْ عَلَيَّ، لا يَضُرُّكَ
بِأيِّهِنَّ بَدَأْتَ» .
অর্থ: আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় বাক্য চারটি: সুবহানাল্লাহ,আল-হামদুল্লিলাহ,লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার। তুমি ইচ্ছামত এ বাক্য চারটির যে কোনো বাক্য আগে পিছে বলতে পার(অর্থাৎ সিরিয়ালে বলা জরুরী নয়)।[240]
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল :
عن أبي ذر
قال: قلت: يا
رسول الله، أوصني.
قال: "إذا عملت
سيئة فأتبعها حسنة تمحها".
قال: قلت: يا
رسول الله، أمن
الحسنات: لا إله
إلا الله؟ قال:
"هي أفضل الحسنات" অর্থ: হজরত আবু জর গিফারি (রা.)থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে উপদেশ দিন। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, যখনই তুমি কোন বদ আমলকে (মন্দ কাজ) করে ফেললে,তখনি নেক কাজ কর; তাহলে
তা তোমার বদ আমলকে মুছে দেবে। আমি বললাম
হে আল্লাহর রসূল! ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কি নেক আমলের
অন্তর্ভুক্ত? রসূলুল্লাহ
(ﷺ) বললেন, তা হল সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল।[241]
নোট : শুয়াইব আরনাউত (রহ.) বলেন, হাদিসটির সনদ হাসান
মুমিন যে ঈমান লালন-ধারণ করে তার দাম
ঈমানদার ব্যতিত কেউ জান্নাতে
প্রবেশ করবে না : এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا অর্থ: যারা
ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম
সম্পাদন করে, তাদের অভ্যর্থনার
জন্যে আছে জান্নাতুল ফেরদাউস।[242]
হাদিসে শরিফে এসেছে- عَبْدُ
اللَّهِ بْنُ
عَبَّاسٍ، قَالَ
حَدَّثَنِي عُمَرُ
بْنُ الْخَطَّابِ،
قَالَ لَمَّا
كَانَ يَوْمُ
خَيْبَرَ أَقْبَلَ
نَفَرٌ مِنْ
صَحَابَةِ النَّبِيِّ
صلى الله
عليه وسلم
فَقَالُوا فُلاَنٌ
شَهِيدٌ فُلاَنٌ
شَهِيدٌ حَتَّى
مَرُّوا عَلَى
رَجُلٍ فَقَالُوا
فُلاَنٌ شَهِيدٌ
.
فَقَالَ رَسُولُ
اللَّهِ صلى
الله عليه
وسلم ”
كَلاَّ إِنِّي
رَأَيْتُهُ فِي
النَّارِ فِي
بُرْدَةٍ غَلَّهَا
أَوْ عَبَاءَةٍ
” . ثُمَّ
قَالَ رَسُولُ
اللَّهِ صلى
الله عليه
وسلم ”
يَا ابْنَ
الْخَطَّابِ اذْهَبْ
فَنَادِ فِي
النَّاسِ إِنَّهُ
لاَ يَدْخُلُ
الْجَنَّةَ إِلاَّ
الْمُؤْمِنُونَ ”
.
قَالَ فَخَرَجْتُ
فَنَادَيْتُ ”
أَلاَ إِنَّهُ
لاَ يَدْخُلُ
الْجَنَّةَ إِلاَّ
الْمُؤْمِنُونَ ”
. অর্থ: ফারুকে আজম হজরত ওমর (রা.) বলেন, খাছাবারে অমুক শহিদ
হয়েছেন। এভাবে কথাবার্তা চলছিল, অবশেষে এক ব্যক্তি প্রসঙ্গে
তারা বললেন যে, সেও শহিদ হয়েছে। । রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি, সে চাদর বা জোব্বার কারণে (যা সে
গনীমতের মাল থেকে আত্মসাৎ করেছিল)। তারপর রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: “হে খাত্তাবের পুত্র ! যাও লোকদের মাঝে ঘোষণা করে
দাও যে, জান্নাতে কেবলমাত্র প্রকৃত
মুমিন ব্যক্তিরাই প্রবেশ করবে। ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)বলেন, তারপর
আমি বের হলাম এবং ঘোষণা করে দিলাম,সাবধান ! শুধু প্রকৃত মুমিনরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে ।[243]
অসংখ্য আয়াতে কারিমায় ও অনেক হাদিস শরিফে শুধু ঈমানদারের জন্য জান্নাত নির্ধারিত বলে উল্লেখ আছে। সুতরাং একজন মুমিন যে ঈমান-বিশ্বাস লালন-ধারণ করে তার মূল্য কত তা সহজেই
অনুমেয়?
ঈমানদারের কোন ক্ষতির আশংকা নেই : কালামে পাকে এসেছে-فَمَنْ
يُؤْمِنْ بِرَبِّهِ
فَلَا يَخَافُ
بَخْسًا وَلَا
رَهَقًا অর্থ: যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস করে তার ক্ষতি ও কোন অন্যায়ের আশংকা
থাকবে না।[244]
হজরত ইবনে আব্বাস(রা.) ও কাতাদা
(রহ.) সহ অনেকে বলেন,--
فَلَا يَخَافُ অর্থাৎ তার নেক আমল নষ্ট হয়ে কমে যাওয়ার ভয় থাকবে না। যেমন অন্যত্র আল্লাহ বলেন, وَمَنْ يَعْمَلْ
مِنَ الصَّالِحَاتِ
وَهُوَ مُؤْمِنٌ
فَلَا يَخَافُ
ظُلْمًا وَلَا
هَضْمًا অর্থাৎ সৎকর্মপরায়ণ ঈমানদারদের জুলুম ও ক্ষতির কোন আশংকা থাকবে না।[245]
ঈমান আনার সাথে সাথেই সব গুনাহ মাফ: পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ يَنْتَهُوا
يُغْفَرْ لَهُمْ مَا قَدْ
سَلَفَ وَإِنْ يَعُودُوا فَقَدْ مَضَتْ سُنَّتُ الْأَوَّلِينَ অর্থ : হে নবি! কাফেরদেরকে বলে দিন
যে, যদি তারা বিরোধিতা হতে বিরত থাকে, তবে
অতীতে যা কিছু হয়েছে তা ক্ষমা করা হবে। আর যাদ পুনরাবৃত্তি ককতে থাকে, তবে পূর্ববর্তী কাফেরদের ক্ষেত্রে যে নিয়ম অনুসৃত হয়েছে, তাই হবে।[246]
উল্লেখিত
আয়াতে আল্লাহ পাক তাঁর নবিকে সম্বোধন করে বলেন : হে নবি!
আপনি কাফেরগণকে বলে দিন যে, তারা যদি কুফরি,
বিদ্রোহ, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি
হতে বিরত থাকে এবং ইসলামি জীবন বিধান গ্রহণ করে আনুগত্য প্রদর্শন করে আল্লাহর প্রতি
অনুরাগী হয়, আল্লাহ পাক তাদের কুফরি যুগের সমুদয় পাপ ও অপরাধ
ক্ষমা করে দিবেন।[247]
عن
أبي سعيد الخدري
أنه سمع رسولَ
الله - صلى الله
عليه وسلم - يقول: "إذا أَسلمَ العبدُ فَحَسُنَ إسلامُه، يُكَفِّرُ الله عنه
كلَّ سيِّئةٍ كانَ زَلَفَها،
وكانَ بعدَ ذلك
القِصاصُ، الحَسَنةُ بَعَشْرِ أمثالِها، إلى سَبعِمِائةِ
ضِعفٍ، والسَّيِّئةُ بمثْلِها، إلاَّ أن
يَتَجاوزَ الله عنْها". অর্থ : হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর রসূল (ﷺ)কে বলতে শুনেছেন, বান্দা যখন ইসলাম গ্রহণ করে এবং তার ইসলাম উত্তম হয়, আল্লাহ তাআলা তার পূর্বের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন।[248]
কাফেররা আফসোস করবে হায় যদি আমরা মুসলমান
হতাম, ঈমান আনতাম : দুনিয়ার কাফের-মুশরেক-নন
মুসলিমগণ আখেরাতে আফসোস করবে আর বলবে হায়! যদি আমরা ঈমান
আনয়ন করতাম তাহলে আমরাও আজ মুক্তি পেতাম। এ
সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- رُبَمَا
يَوَدُّ الَّذِينَ
كَفَرُوا لَوْ
كَانُوا مُسْلِمِينَ
অর্থ: কখনও কখনও কাফেরগণ আকাঙ্ক্ষা করবে যে তারা যদি মুসলিম
হত।[249]
অত্র আয়াতের মাধ্যমে কাফেররা যে তাদের ‘কুফর’ এর কারণে অনুতপ্ত হবে এবং পুনরায় দুনিয়ায় প্রত্যাবর্তন করে ঈমান ও সৎকাজ
করার আকাঙ্ক্ষা করবে আল্লাহ সেই সংবাদ প্রদান করেছেন। আল্লামা সুদ্দি (রহ.)
তার তাফসিরের মধ্যে মশহুর সূত্রে হজরত আব্বাস ও ইবনে মাসউদ(রা.) ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামে হতে বর্ণনা করেছেন,
কুরাইশ গোত্রীয় কাফেরগণকে যখন দোজখের সম্মুখীন করা হবে তখন তারা আকাঙ্ক্ষা
করবে হায়! যদি তারা মুসলমান হত। কেহ কেহ বলেন, সমস্ত কাফেরই তার মৃত্যুকালে মুমিন হবার আকাঙ্ক্ষা করবে।
কেহ কেহ বলেন, এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের
সংবাদ প্রদান করেছেন। যেমন- وَلَوْ
تَرَى إِذْ
وُقِفُوا عَلَى
النَّارِ فَقَالُوا
يَا لَيْتَنَا
نُرَدُّ وَلَا
نُكَذِّبَ بِآيَاتِ
رَبِّنَا وَنَكُونَ
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
অর্থ: যদি আপনি কাফেরদেরকে সেই অবস্থায় দেখতে পেতেন,যখন তাদেরকে দোজখের ওপর দণ্ডায়মান করা হবে এবং তারা বলবে হায়! যদি আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে দেওয়া হত তবে আমরা আমাদের প্রতিপালকের
আয়াতসমূহ অস্বীকার করতাম না আর খাঁটি মুমিন হয়ে যেতাম।[250]
হজরত সুফিয়ান সাওরি (রহ.) ---হজরত আব্দুল্লাহ (রা.) হতে رُبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ كَانُوا مُسْلِمِينَ –এর তাফসির প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন। এই আয়াতটি জাহান্নামিদের সম্পর্কে
অবতীর্ণ হয়েছে। তারা যখন
অন্যান্য লোককে দোজখ হতে বের হতে দেখবে তখন তারা অনুতপ্ত করে বলবে হায়! যদি
তারা মুসলমান হত। হজরত ইবনে
জারির(রহ.) বলেন, মুসান্না (রহ.) ---হজরত
ইবনে আব্বাস ও আনাস (রা.) হতে ইহার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন,
আল্লাহ তাআলা কিয়ামত দিবসে যখন মুসলমান অপারাধীদেরকেও মুশরেকদের সাথে জাহান্নামে আটক
রাখবেন, তখন মুশরেকরা তাদেরকে বলবে, তোমরা যে দুনিয়ায় আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করেছিলে
তাতো কোন উপকারে আসল না। তাদের এই উক্তিতে আল্লাহ তাআলা রাগান্বিত হবেন এবং মুসলমানদেরকে অনুগ্রহপূর্বক
দোজখ হতে বের করে দিবেন। তখন মুশরেক-কাফেররা বলবে হায়,তারাও যদি মুসলমান হত। আব্দুর রাজ্জাক (রহ.) ---মুজাহিদ হতে বলেন, দোজখিরা তাওহিদ-পন্থিদেরকে বলবে, তোমাদের ঈমানের লাভটা কি হল? তাদের এ কথার প্রেক্ষিতে
আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে বলবেন, যাদের অন্তরে ধুলিকণা পরিমাণ ঈমান
আছে,তাদেরকে দোজখ হতে বের কর। এই সময়ের প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, رُبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ كَانُوا مُسْلِمِينَ যাহহাক, কাতাদাহ,
আবুল আলিয়াহ (রহ.) ও অন্যান্য তাফসিরকারকগণ হতে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে।[251]
প্রিয় মুসলিম ভাইগণ। উপরোক্ত আয়াত ও এর তাফসির দ্বারা কি একজন মুমিনের ঈমানের মহামূল্য প্রমাণিত
হয় না?
কুফরি অবস্থায় মারা গেলে দুনিয়াজোড়া স্বর্ণও
দান করলেও মুক্তি মিলবে না : এ সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ
তাআলা বলেন, إِنَّ
الَّذِينَ كَفَرُوا
وَمَاتُوا وَهُمْ
كُفَّارٌ فَلَنْ
يُقْبَلَ مِنْ
أَحَدِهِمْ مِلْءُ
الْأَرْضِ ذَهَبًا
وَلَوِ افْتَدَى
بِهِ أُولَئِكَ
لَهُمْ عَذَابٌ
أَلِيمٌ وَمَا
لَهُمْ مِنْ
نَاصِرِينَ অর্থ: যারা কুফরি
করে এবং কাফের অবস্থায়
মারা যায়,তাদের কেহ বিনিময়
হিসেবে দুনিয়াজোড়া স্বর্ণ প্রদান
করলেও তা আদৌ কবুল
করা হবে না। তাদের
জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি
এবং তাদের কোন সহায়ক
নেই।[252]
নিশ্চিত
জেনে রাখ! যারা কাফের অবস্থায় প্রাণত্যাগ করেছে, তাদের মধ্যে কেহ যদি নিজেকে শাস্তি হতে বাঁচার জন্য পৃথিবী জোড়া স্বর্ণও বিনিময়
হিসেবে দান করে, তবে তাও কবুল করা হবে না। আব্দুল্লাহ ইবনে জাদআন (রা.) রসূলুল্লাহ
(ﷺ)-কে করলেন, যদি সে অতিথিপরায়ণ ও গোলাম আদায়কারী ব্যক্তি
হয়, তবুও কি এইগুলো তার কোন উপকার আসবে না? হুযুর (ﷺ) বললেনন -না। কেননা সে জীবনে একবারও এ কথা বলে নাই যে, হে আমার প্রভু! কিয়ামতের দিন আমার সমস্ত পাপ মোচন করে
দিন।’ অতত্রব সে যদি পৃথিবী পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর
রাস্তায় দান করে দেয়, তবু তা গ্রহণীয় হবে না। তাই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তাদের বিনিময়ও গৃহীত হবে না এবং তাদের জন্য কোন সুপারিশও কাজে আসবে না। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন,يَوْمٌ لَا
بَيْعٌ فِيهِ
وَلَا خُلَّةٌ
وَلَا شَفَاعَةٌ
সেদিন না থাকবে কোন বেচা-কেনা আর না কাজে আসবে কোন বন্ধুত্ব
ও সুপারিশ।[253]
আল্লাহ
তাআলা অন্যত্র বলেছেন, إِنَّ
الَّذِينَ كَفَرُوا
لَوْ أَنَّ
لَهُمْ مَا
فِي الْأَرْضِ
جَمِيعًا وَمِثْلَهُ
مَعَهُ لِيَفْتَدُوا
بِهِ مِنْ
عَذَابِ يَوْمِ
الْقِيَامَةِ مَا
تُقُبِّلَ مِنْهُمْ
وَلَهُمْ عَذَابٌ
أَلِيمٌ যারা কাফের,যদি তাদের কাছে পৃথিবীর সমুদয় সম্পদ এবং তৎসম আরও তদনুরূপ সম্পদ থাকে আর এগুলো
বিনিময় দিয়ে কিয়ামতের দিন শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে চায়,তবুও
তাদের কাছ থেকে তা কবুল করা হবে না। তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।[254]
যদিও
সে সমূহ বিপদ হতে রক্ষা পাবার জন্য পৃথিবী, পাহাড়-মাটি, বালু-মরুভুমি-শক্তভূমি ইত্যাদি সব কিছুর সমান ওজনের স্বর্ণও প্রদান করে, তবুও তাকে রেহাই দেওয়া হবে না।[255]
সুতরাং প্রমাণিত হলো মুমিন যে ঈমান তাঁর অন্তরে লালন করে তা কত মূল্যবান।
এক জাররা ঈমান থাকলেই মিলবে জান্নাত : عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” يَدْخُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ، وَأَهْلُ النَّارِ النَّارَ، ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ. فَيُخْرَجُونَ مِنْهَا قَدِ اسْوَدُّوا فَيُلْقَوْنَ فِي نَهَرِ الْحَيَا ـ أَوِ الْحَيَاةِ، شَكَّ مَالِكٌ ـ فَيَنْبُتُونَ كَمَا تَنْبُتُ الْحِبَّةُ فِي جَانِبِ السَّيْلِ، أَلَمْ تَرَ أَنَّهَا تَخْرُجُ صَفْرَاءَ مُلْتَوِيَةً ”. قَالَ وُهَيْبٌ حَدَّثَنَا عَمْرٌو ” الْحَيَاةِ ”. وَقَالَ ” خَرْدَلٍ مِنْ خَيْرٍ অর্থ: হজরত
আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত, নবি (ﷺ) এরশাদ করেন, যখন
জান্নাতিগণ জান্নাতে ও দোজখিগণ দোজখে চলে যাবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, যার অন্তরে
সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান রয়েছে তাকেও জাহান্নাম হতে বের লও। তাদের অবস্থা
এরূপ হবে যে, জ্বলে কালো বর্ণ হয়ে গেছে। অতঃপর তাদেরকে নহরে হায়াতে ফেলা হবে। তখন তারা এমনভাবে বের হয়ে আসবে, যেমন ঢলের(বৃষ্টির কারণে) আবর্জনাতে দানা অঙ্কুরিত হয় (গাছ জন্মায়)। তোমরা কি দেখ না যে, তা কেমন সোনালী ও
কোঁকড়ানো অবস্থায় বের হয়ে আসে। তাইব (রহঃ) বলেন, ‘আমর (রহঃ) আমাদের কাছে حيا এর স্থলে حياة
এবং خردل من
ايمان এর স্থলে خردل من
خير বর্ণনা করেছেন।[256]
عَنْ أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” يَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ شَعِيرَةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ بُرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ ذَرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ ”. قَالَ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ قَالَ أَبَانُ حَدَّثَنَا قَتَادَةُ حَدَّثَنَا أَنَسٌ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ” مِنْ إِيمَانٍ ”. مَكَانَ ” مِنْ خَيْرٍ
অর্থ: আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। নবি (ﷺ)বলেছেন: যে ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর
তার অন্তরে একটি যব পরিমাণও পূণ্য বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে
এবং যে ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর
তার অন্তরে একটি গম পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে
এবং যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর
তার অন্তরে একটি অণু পরিমাণও নেকি থাকবে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।
আবু আবদুল্লাহ বলেন, আবান (রহঃ) বর্ণনা করেছেন, আনাস (রা.)
হতে এবং তিনি রসূলুল্লাহ (ﷺ) হতে নেকি –এর স্থলে ‘ঈমান’ শব্দটি
বর্ণনা করেছেন।[257]
ইমাম গাজালি (রহ.)-এর গবেষণা: أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ (যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান রয়েছে তাকেও জাহান্নাম হতে বের লও) হাদিস থেকে রিচার্স করেছেন যে,
ঐ ব্যক্তিও মুক্তি প্রাপ্ত হবে, যে অন্তর
দিয়ে ঈমান এনেছে, কিন্তু কালেমা পড়ার সময় পায়নি এমতাবস্থায়
তার মৃত্যু হয়ে গেছে।[258]
দোজখ থেকে সদ্যমুক্তি প্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য সম্মানের ব্যবস্থা
: আমরা প্রথম হাদিসটিতে দেখলাম- “আল্লাহ তাআলা বলবেন, যার অন্তরে
সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান রয়েছে তাকেও জাহান্নাম হতে বের লও। তাদের অবস্থা
এরুপ হবে যে, জ্বালিয়ে কালো বর্ণ হয়ে গেছে। অতঃপর তাদেরকে নহরে হায়াতে ফেলা হবে। তখন তারা এমনভাবে বের হয়ে আসবে, যেমন ঢলের (বৃষ্টির কারণে) আবর্জনাতে দানা অঙ্কুরিত হয় (গাছ জন্মায়)। তোমরা কি দেখ না যে, তা কেমন সোনালী ও
কোঁকড়ানো অবস্থায় বের হয়ে আসে।”
আগুনে পোড়া কালো-কদাকার-দাগ পড়াসহ জান্নাতে প্রবেশ করলে, তার শরীরে চিহ্ন
দেখে অপরজন বলার সুযোগ আছে যে, তুমি তো জান্নাতে এসেছো বটে;
তবে জাহান্নামের সাজা ভোগ করার পর, এতে মুমিনের
সম্মানহানি হয়, লজ্জা পায়। মুমিন যেন কোন লজ্জায় পতিত হতে না হয়; সে জন্যই দয়াময় আল্লাহ নহরে হায়াতে ফেলে তাকে নতুন-আলোকিত-দীপ্তিমান-ঝলমলে
করে তারপর জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
শিরক না করলে পৃথিবীসম পাপরাশির ক্ষমার ঘোষণা : عَنْ
أَبِي ذَرٍّ،
قَالَ قَالَ
رَسُولُ اللَّهِ
ـ صلى
الله عليه
وسلم ـ
“
يَقُولُ اللَّهُ
تَبَارَكَ وَتَعَالَى
مَنْ جَاءَ
بِالْحَسَنَةِ
فَلَهُ عَشْرُ
أَمْثَالِهَا
وَأَزِيدُ وَمَنْ
جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ
فَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ
مِثْلُهَا أَوْ
أَغْفِرُ وَمَنْ
تَقَرَّبَ مِنِّي
شِبْرًا تَقَرَّبْتُ
مِنْهُ ذِرَاعًا
وَمَنْ تَقَرَّبَ
مِنِّي ذِرَاعًا
تَقَرَّبْتُ
مِنْهُ بَاعًا
وَمَنْ أَتَانِي
يَمْشِي أَتَيْتُهُ
هَرْوَلَةً
وَمَنْ لَقِيَنِي
بِقِرَابِ الأَرْضِ
خَطِيئَةً ثُمَّ
لاَ يُشْرِكُ
بِي شَيْئًا
لَقِيتُهُ بِمِثْلِهَا
مَغْفِرَةً
” . অর্থ: হজরত আবু জর(রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: আল্লাহ তাআলা বলেন, যে ব্যক্তি একটি নেকি আমল করলো, তার
জন্য রয়েছে তার দশ গুণ। আমি অবশ্য বাড়াতেও পারি। যে ব্যক্তি কোন পাপ কাজ করলো,
তার পাপের শাস্তি হবে তার সম-পরিমাণ অথবা আমি তা ক্ষমাও করতে পারি।
যে ব্যক্তি আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক
হাত অগ্রসর হই। আর যে ব্যক্তি এক হাত আমার দিকে অগ্রগামী হয়, আমি এক বাহু তার দিকে অগ্রগামী হই। যে ব্যক্তি আমার দিকে হেঁটে আসে,
আমি তার দিকে দৌড়ে যাই। কোন ব্যক্তি আমার সাথে কোন কিছু শরিক না করা
অবস্থায় পৃথিবীপূর্ণ গুনাহ নিয়ে আমার সাথে মিলিত হলেও আমি অনুরূপ পরিমাণ ক্ষমাসহ
তার সাথে মিলিত হবো।[259]
عَنْ
طَلْحَةَ، عَنْ
مُرَّةَ، عَنْ
عَبْدِ اللَّهِ،
قَالَ لَمَّا
أُسْرِيَ بِرَسُولِ
اللَّهِ صلى
الله عليه
وسلم انْتُهِيَ
بِهِ إِلَى
سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى
وَهِيَ فِي
السَّمَاءِ
السَّادِسَةِ
إِلَيْهَا يَنْتَهِي
مَا يُعْرَجُ
بِهِ مِنَ
الأَرْضِ فَيُقْبَضُ
مِنْهَا وَإِلَيْهَا
يَنْتَهِي مَا
يُهْبَطُ بِهِ
مِنْ فَوْقِهَا
فَيُقْبَضُ
مِنْهَا قَالَ
{
إِذْ يَغْشَى
السِّدْرَةَ
مَا يَغْشَى}
قَالَ فَرَاشٌ
مِنْ ذَهَبٍ
.
قَالَ فَأُعْطِيَ
رَسُولُ اللَّهِ
صلى الله
عليه وسلم
ثَلاَثًا أُعْطِيَ
الصَّلَوَاتِ
الْخَمْسَ وَأُعْطِيَ
خَوَاتِيمَ
سُورَةِ الْبَقَرَةِ
وَغُفِرَ لِمَنْ
لَمْ يُشْرِكْ
بِاللَّهِ مِنْ
أُمَّتِهِ شَيْئًا
الْمُقْحِمَاتُ
. অর্থ: আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মিরাজ রজনিতে সিদরাতুল মুনতাহা- পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হলো
। এটি ৬ষ্ঠ আসমানে অবস্হিত । জমিন
থেকে যা কিছু উত্থিত হয়, তা সে পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে এবং সেখান (রহ.) থেকে তা নিয়ে যাওয়া হয় । তদ্রূপ ঊর্ধ্বলোক
থেকে যা কিছু অবতরণ হয়, তাও এ পর্যন্ত এসে পৌঁছে এবং সেখান (রহ.) থেকে তা নেওয়া হয় । এরপর আবদুল্লাহ (রা.) তিলাওয়াত করলেনঃ { إِذْ
يَغْشَى السِّدْرَةَ
مَا يَغْشَى } যখন প্রান্তবর্তী বৃক্ষটি যদ্বারা আচ্ছাদিত হবার তদ্বারা আচ্ছাদিত হলো। (নাজম ৫৩: ১৬) এবং বলেন, এখানে যদ্দারা কথাটির অর্থ স্বর্ণের পতঙ্গ । তিনি বলেন, তারপর রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তিনটি বিষয় দান করা হলো: পাঁচ ওয়াক্ত সলাত, সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত এবং শিরক মুক্ত উম্মাতের মারাত্মক গুনাহ ক্ষমার সুসংবাদ।[260]
শিরক না করলে জান্নাতের সুসংবাদ : আল্লাহ তাআলা বলেন,وَيُنَجِّي
اللَّهُ الَّذِينَ اتَّقَوْا بِمَفَازَتِهِمْ لَا يَمَسُّهُمُ
السُّوءُ وَلَا هُمْ
يَحْزَنُونَ অর্থ: যারা শিরক থেকে থাকত, আল্লাহ তাদেরকে সাফল্যের সাথে মুক্তি দেবেন, তাদেরকে অনিষ্ট স্পর্শ করবে না এবং তারা চিন্তিতও হবে না।[261]
|
أَبَا ذَرٍّ، يُحَدِّثُ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ ” أَتَانِي جِبْرِيلُ - عَلَيْهِ السَّلاَمُ - فَبَشَّرَنِي أَنَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ” . قُلْتُ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ . قَالَ ” وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ ” |
অর্থ: আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত। নবি (ﷺ) বলেন, জিবরিল (আ.) আমার নিকট এসে সুসংবাদ দিলেন যে,
আপনার উম্মাতের
যে কেউ শিরক না করে মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি (আবু জর) বললাম,
যদিও সে
ব্যভিচার করে এবং যদিও সে চুরি করে। তিনি বললেন, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে।[262]
হজরত আবু জর যে বারবার যে
প্রশ্ন করেছিলেন যে, ব্যভিচার এবং চুরি করলেও কি মানুষ
জান্নাতে যেতে পারবে? এর কারণ সম্ভবত এই রছিল যে, চুরি ব্যভিচারকে অত্যন্ত ঘৃণ্য ও অপবিত্র গুনাহ মনে করার কারণে তিনি
আশ্চর্যবোধ করছিলেন যে, এমন গুনাহ করেও মানুষ জান্নাতে যেতে
পারবে? (সামনে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা আসছে)
যার শেষ কথা (মৃত্যুকালে) “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবেঃ عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ مَنْ كَانَ آخِرُ كَلاَمِهِ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ ” . অর্থ: মুয়াজ ইবনু জাবাল (রা.)
থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : যারা সর্বশেষ বাক্য হবে
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।[263]
নোট : ইবনে
মাজাহ ও মুসনাদে আহমদের বর্ণনায় শব্দের ভিন্নতা রয়েছে সারাংশ একই।
سعيد بن
المسيب عن أبيه قال : " لمَّا حضرت أبَا طالب الوفاةُ جاءَهُ رسُول اللهِ (
صلى الله عليه وسلم ) فوجدَ عندهُ أبَا جهْلٍ ، وعبد الله بنَ أبِي أميَّة بن
المُغِيرة - فقال : يا عم قُلْ لا إله إلاَّ اللهُ أحَاجُّ لَكَ بِها عند اللهِ
" فقال أبو جَهْلٍ وعبدُ الله بنُ أبي أميَّة : أتَرغَبُ عن ملَّةِ عَبْدِ
المُطلبِ ؟ فلمْ يزلْ رسُول الله ( صلى الله عليه وسلم ) يَعْرِضُها عليْهِ
ويُعيدُ لَهُ تِلكَ المقالةَ ، حتَّى قَالَ أبُو طالب آخِرَ ما كَلَّمَهُمْ : على
مِلَّة عبدِ المُطَّلبِ وأبَى أنْ يقُولَ لا إلهَ إلاَّ اللهُ ، فقال رسُول الله (
صلى الله عليه وسلم ) " لأسْتَغفِرَنَّ لَكَ ما لَمْ أنه عَنْكَ " فأنزل
الله هذه الآية ، وقوله : ( إِنَّكَ لاَ تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ (
অর্থ: সাঈদ ইবনে মুসাইব (রা.)
তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। যখন আবু তালেব এর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে, তখন নবি (ﷺ)তার নিকটে গেলেন। আবু জাহেলও
তার কাছে বসা ছিল। রসূলুল্লাহ
(ﷺ) আবু তালেবকে লক্ষ্য করে
বললেন, চাচাজান কালেমা পাঠ করুন, তা হলে এর অসিলায়
আমি আল্লাহর সমীপে আপনার জন্য সাক্ষ্য দিতে পারব। তখন আবু জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনে আবু
উমায়া বলে উঠল, ওহে আবু তালেব ! তুমি কি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম
হতে ফিরে যাবে ? এরা
দুজন তার সাথে কথাটি বারবার বলতে থাকল। অবশেষে
আবু তালেব তাদের সামনে শেষ কথাটি যা বলল, তা এই যে,
সে আব্দুল মুত্তালেবের ধর্মের উপর অবিচল রয়েছে। এ কথার পর নবি (ﷺ) বললেন, মাগফিরাত কামনা করতে থাকব,
যতক্ষণ না আমাকে তা থেকে
নিষেধ করা হয়। এ
প্রসংগে এ আয়াতটি নাজিল হয়, নবি ও মুমিনের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকের জন্য যদি তারা নিকটাত্মীয় হয়। যখন তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামি। (সূরা তওবা-১১৩) আরও নাজিল হয় : আপনি যাকে
ভালবাসেন, ইচ্ছা করলেই তাকে হেদায়েত করতে পারবেন না। (সূরা কসাস-৫৬)[264]
যে ব্যক্তি তাওহিদের ওপর মৃত্যবরণ করবে, সে অবশ্যই জান্নাতে যাবে-এর প্রমাণ : যেমন- হাদিস শরিফে এসছে- عَنْ عُثْمَانَ،
قَالَ قَالَ
رَسُولُ اللَّهِ
صلى الله
عليه وسلم
“
مَنْ مَاتَ
وَهُوَ يَعْلَمُ
أَنَّهُ لاَ
إِلَهَ إِلاَّ
اللَّهُ دَخَلَ
الْجَنَّةَ
”. অর্থ: আবু বকর ইবনে আবু শায়বা ও যুহায়র ইবনু হারব (রহ.) ওসমান (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি [لاَ
إِلَهَ إِلاَّ
اللَّهُ ] -লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ--এর নিশ্চিত বিশ্বাস নিয়ে ইন্তিকাল করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।[265]
مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا
رَسُولُ اللهِ، حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ النَّارَ
অর্থ: যে ব্যক্তি
খাঁটি মনে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’-এর স্বাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ পাক তার উপর জাহান্নাম হারাম করে
দেবেন।[266]
মৌলিক আপত্তি এবং এর নিরসন : উপরোক্ত
হাদিসে আমরা দেখতে পাই যে,
১। যে কেউ শিরক না করে মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যদিও সে ব্যভিচার করে
এবং যদিও সে চুরি করে।
২। যার সর্বশেষ বাক্য হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ৩। ‘যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর নিশ্চিত বিশ্বাস নিয়ে
ইন্তিকাল করবে, সে
জান্নাতে প্রবেশ করবে।
কিন্তু এর বিপরীতে অসংখ্যা আয়াতে কারিমা ও হাদিসে নবুওয়া রয়েছে। যে
ব্যক্তি এ পাপে লিপ্ত হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না,
শুধু তাই নয়, সে বেহেশতের বাতাস-ঘ্রাণও পাবে না। নিম্নে কয়েকটি
উল্লেখ করা হলো। যেমন-
১। আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী
জান্নাতে প্রবেশ করবে না। বুখারি-৫৯৮৪
২। সর্বদা মাদকদ্রব্য পানকারী জান্নাতে যাবে না। ইবনে মাজাহ-৩৩৭৬ ৩। যে দেহ
হারাম খাদ্য দ্বারা গঠিত হয়েছে, তা জান্নাতে যাবে না। বায়হাকি-৫৫২০ ৪। যার
অত্যাচার থেকে প্রতিবেশি নিরাপদ নয়, সে জান্নাতে যাবে না। মুসলিম-৬৬
৫। পিতা-মাতার অবাধ্য, দাইয়ুস(যে ব্যক্তি তার স্ত্রী-মেয়ে-বোন
প্রমুখ অধীনস্থ নারীকে বেপর্দা চলাফেরায় বাধা দেয় না), পুরুষের
বেশ ধারণকারী মহিলা। হাকেম-২২৬ ৬। চোগলখোর
জান্নাতে যাবে না। মুসলিম-১৫১ ৭। ‘দুনিয়ার উদ্দেশ্য এলমে দীন অর্জনকারী, জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। আবু দাউদ-৩১৭৯ ৮। যে নারী
তার স্বামীর কাছে অকারণে তালাক কামনা করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। তিরমিজি-১১০৮
৯। জাকাত আদায় না কারীর শাস্তি। সূরা ইমরান-১৮০; বুখারি-১৪০৩
১০। ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা। সূরা নিসা-১০
সমাধান বা সমন্বয় : যে ব্যক্তি দীনে
তাওহিদের ওপর আন্তরিক ঈমান রাখবে, সে অবশ্যই জান্নাতে যাবে। এখন সে যদি ঈমান সত্ত্বেও গুনাহ করে ফেলে থাকে,
তাহলে সে হয়তো আল্লাহর বিশেষ রহমতে অথবা কোন আল্লাহর পছন্দনীয় আমলের
বরকতে অথবা আল্লাহর অনুমদিত ব্যক্তিবর্গের সুপারিশের দ্বারা অথবা যাদের নেকি-পাপ সমান সমান হবে তারা কিছুকাল আরাফে অবস্থান করে আল্লাহর কৃপায় জান্নাতে
দাখিল হবে এবং সর্বশেষে পাপের শাস্তি ভোগ করার পর আল্লাহর দয়ায়
ক্ষমা লাভের অধিকারী হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এর স্বপক্ষে নিম্নে দলিল পেশ করছি :
v
শিরক না থাকলে সরাসরি ক্ষমা হতে পারে।
(১) আল্লাহ
তাআলা বলেন-إِنَّ
اللَّهَ لَا
يَغْفِرُ أَن
يُشْرَكَ بِهِ
وَيَغْفِرُ مَا
دُونَ ذَٰلِكَ
لِمَن يَشَاءُ
অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাঁর সাথে শিরকের অপরাধ
ক্ষমা করবেন না। আর এ ব্যতিত যাকে ইচ্ছা (তার অন্যান্য অপরাধ) ক্ষমা করে দেন।[267]
(২)إِنَّ الَّذِينَ
كَفَرُوا وَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ
اللَّهِ ثُمَّ مَاتُوا
وَهُمْ كُفَّارٌ فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ অর্থ: যারা কুফরি করে ও আল্লাহর পথ হতে মানুষকে নিবৃত্ত করে, অতঃপর
কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ
তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন
না।[268]
এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, কুফরি অবস্থায়
মৃত্যবরণ না করলে, আল্লাহ চাইলে সরাসরি ক্ষমা হতে পারে।
(৩)لَا يَمْلِكُونَ
الشَّفَاعَةَ
إِلَّا مَنِ اتَّخَذَ
عِنْدَ الرَّحْمَنِ عَهْدًا অর্থ: যে দয়াময়ের নিকট প্রতিশ্রুতি
গ্রহণ করেছে, সে ব্যতিত অন্য কারও সুপরিশ করার ক্ষমতা থাকবে
না।[269] الا
শব্দটি এখানে ইস্তিসনা মুনকাতি হিসেবে لكن এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ –এর সাক্ষ্য প্রদান করে আল্লাহর নিকট প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন,عهد এর অর্থ হল
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ –এর সাক্ষ্য প্রদান করা অন্যের পূজা অর্চনা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে কেবলমাত্র আল্লাহর
ইবাদত করা এবং আল্লাহর নিকট হতে যাবতীয় আশা আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হবার কামনা করা।[270]
v আল্লাহ তাআলার দরবারে গৃহীত আমলের বরকতে।
(৪) হাদিস শরিফে
এসেছে- وَعَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللّهِ ﷺ: غُفِرَ لِامْرَأَةٍ مُوْمِسَةٍ مَرَّتْ بِكَلْبٍ عَلى رَأْسِ رَكِيٍّ يَلْهَثُ كَادَ يَقْتُلُهُ الْعَطَشُ فَنَزَعَتْ خُفَّهَا فَأَوْثَقَتْهُ بِخِمَارِهَا فَنَزَعَتْ لَه مِنَ الْمَاءِ فَغُفِرَ لَهَا بِذلِكَ . قِيلَ: إِنَّ لَنَا فِي الْبَهَائِمِ أَجْرًا؟ قَالَ: فِىْ كُلِّ ذَاتِ كَبِدٍ رُطْبَةٍ أَجْرٌ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ অর্থাৎ একটি পতিতা মহিলাকে মাফ করে দেওয়া হলো। (কারণ)
মহিলাটি একবার একটি কুকুরের কাছ দিয়ে যাবার সময় দেখল সে পিপাসায় কাতর হয়ে একটি
কূপের পাশে দাঁড়িয়ে জিহবা বের করে হাঁপাচ্ছে। পিপাসায় সে মরার উপক্রম। মহিলাটি (এ
করুণ অবস্থা দেখে) নিজের মোজা খুলে ওড়নার সাথে বেঁধে (কূপ হতে) পানি উঠিয়ে
কুকুরটিকে পান করাল। এ কাজের জন্য তাকে মাফ করে দেওয়া হলো।[271]
(৫)عَنْ عَائِشَةَ،
أَنَّهَا قَالَتْ: جَاءَتْنِي مِسْكِينَةٌ تَحْمِلُ ابْنَتَيْنِ لَهَا، فَأَطْعَمْتُهَا ثَلَاثَ تَمَرَاتٍ، فَأَعْطَتْ كُلَّ وَاحِدَةٍ
مِنْهُمَا تَمْرَةً، وَرَفَعَتْ إِلَى فِيهَا
تَمْرَةً لِتَأْكُلَهَا، فَاسْتَطْعَمَتْهَا ابْنَتَاهَا، فَشَقَّتِ التَّمْرَةَ، الَّتِي كَانَتْ تُرِيدُ أَنْ تَأْكُلَهَا
بَيْنَهُمَا،
فَأَعْجَبَنِي
شَأْنُهَا،
فَذَكَرْتُ
الَّذِي صَنَعَتْ لِرَسُولِ اللهِ صَلَّى
اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: "إِنَّ اللهَ
قَدْ أَوْجَبَ لَهَا بِهَا
الْجَنَّةَ، أَوْ أَعْتَقَهَا بِهَا مِنَ النَّارِ" অর্থ: হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন গরিব স্ত্রীলোক তার দুটি কন্যাসহ আমার কাছে
আসল । আমি তখন তাদের তিনটি খেজুর খেতে দিলাম, সে তার মেয়ে দুটিকে একটি করে দিল এবং অবশিষ্ট একটি খেজুর নিজে খাওয়ার জন্য
তার মুখের দিকে তুলল। কিন্তু এটিও তার মেয়েরা চাইল। যে খেজুরটি সে নিজে খাওয়ার ইচ্ছা করল তাও দুভাগ করে তার মেয়ে দুটোকে দিয়ে দিল। আয়েশা (রা.) বললেন, ব্যাপরটি আমাকে অবাক করল। সে যা করল আমি তা রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললাম। তিনি বললেন, এর বিনিময় মহান আল্লাহ
তাআলা তার জন্য বেহেশত ওয়াজিব (নির্ধারণ) করে দিয়েছেন অথবা জাহান্নাম হতে মুক্তি দিয়েছেন।[272]
নোট
: বুখারির বর্ণনায় শব্দের ভিন্নতা রয়েছে।
(৬) রসূলুল্লাহ
(ﷺ) বলেছেন: اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لأَصْحَابِه অর্থাৎ- তোমরা কোরআন পাঠ কর। কেননা এ
কুরআন তার পাঠকারীর জন্য কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী হয়ে আবির্ভূত হবে।[273]
v শাফায়ত পেয়ে যাবে অর্থাৎ আল্লাহর অনুমতি প্রাপ্ত
ব্যক্তিবর্গ দ্বারা যেমন নবি-শহিদ-আলেম-হাফেজ-নেককার প্রমুখ।
(৭) مَنْ ذَا
الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ অর্থ: কে
আছে এমন যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তার অনুমতি ছাড়া।[274]
(৮) يَوْمَئِذٍ لَا تَنْفَعُ
الشَّفَاعَةُ
إِلَّا مَنْ أَذِنَ
لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا
অর্থ: দয়াময় আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথায় সন্তুষ্ট
হবেন সে ছাড়া কারও সুপারিশ সেদিন কোন উপকারে আসবে না।[275]
ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, لَا
يَمْلِكُونَ
مِنْهُ خِطَابًا
اي
لا يملكون ان يطالوه
الا فيما اذن
له কোন বিষয়ে আল্লাহর সাথে কথা বলা সম্ভব
হবে না-তবে যে বিষয়ে কথা বলার অনুমতি প্রমাণ করা হবে সে বিষয়ে বলতে সক্ষম
হবে।[276] হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) এর মতে, “সক্ষম হবে না” ঘোষণাটি মুশরিকিন এবং বিদ্রোহীদের জন্য প্রযোজ্য। রুহুল মাআনি-২০/৩০, কেহ কেহ বলেছেন যে, এই ঘোষণাটি
ফেরেশতাদের জন্য প্রযোজ্য।[277]
(৯)اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا
تَسْتَغْفِرْ
لَهُمْ إِنْ تَسْتَغْفِرْ
لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي
الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ অর্থ: (হে নবি) আপনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা তাদের
জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না কর একই কথা। আপনি সত্তরবার তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেও আল্লাহ তাদেরকে কখনও ক্ষমা করবেন
না। তা এই জন্য যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অস্বীকার করেছে। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।[278]
আলোচ্য
আয়াতে মুনাফেক-কাফেররা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অস্বীকার করার কারণে
তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা; না করা সমান। সত্তরবারও যদি ক্ষমা চায় তবুও তাদেরকে ক্ষমা হবে
না। সুতরাং মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা
করলে কবুল হওয়ার বিষয় প্রমাণিত।
(১০)
নবি (ﷺ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা বলবেন : ﺷَﻔَﻌَﺖِ
ﺍﻟْﻤَﻼَﺋِﻜَﺔُ
ﻭَﺷَﻔَﻊَ
ﺍﻟﻨَّﺒِﻴُّﻮﻥَ
ﻭَﺷَﻔَﻊَ
ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨُﻮﻥَ
ﻭَﻟَﻢْ
ﻳَﺒْﻖَ
ﺇِﻻَّ
ﺃَﺭْﺣَﻢُ
ﺍﻟﺮَّﺍﺣِﻤِﻴﻦَ
ﻓَﻴَﻘْﺒِﺾُ
ﻗَﺒْﻀَﺔً
ﻣِﻦَ
ﺍﻟﻨَّﺎﺭِ
ﻓَﻴُﺨْﺮِﺝُ
ﻣِﻨْﻬَﺎ
ﻗَﻮْﻣًﺎ
ﻟَﻢْ
ﻳَﻌْﻤَﻠُﻮﺍ
ﺧَﻴْﺮًﺍ
ﻗَﻂُّ
» “ফেরেশতাগণ শাফাআত করেছে, নবিগণ শাফাআত
করেছেন এবং মুমিনগণও শাফাআত করেছেন। এখন সবচেয়ে দয়ালু আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কারও
শাফাআত বাকি নেই। অতঃপর তিনি জাহান্নামের আগুন থেকে একমুষ্ঠি গ্রহণ করবেন। এর
মাধ্যমে তিনি জাহান্নাম থেকে এমন একদল মানুষকে বের করবেন, যারা
কখনো কোন ভাল আমলই করেনি”।[279]
(১১)عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ، فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ، وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا" অর্থাৎ: প্রত্যেক নবির
জন্য এমন একটি দোআ রয়েছে যা আল্লাহর কাছে মকবুল। আর আমি নিজ দোআটি কিয়ামতের দিন
আমার উম্মতের শাফাআতের জন্য সংরক্ষিত করে রেখেছি। আমার উম্মতের মধ্যে যে আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে ইনশাল্লাহ আমার সুপারিশ লাভ করবে।[280]
নোট :
হাদিসের শেষাংশটুকু মুসলিমের বর্ণনায়
রয়েছে।
(১২) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে
বর্ণিত, তিনি বলেন, জিজ্ঞেস করা হলো,
হে আল্লাহর রাসূল, কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ
লাভ করে সবচেয়ে বেশি ধন্য কে হবে? তিনি বললেন:
«لَقَدْ ظَنَنْتُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ، أَنْ
لَا يَسْأَلَنِي عَنْ هَذَا الْحَدِيثِ أَحَدٌ أَوَّلُ مِنْكَ لِمَا رَأَيْتُ مِنْ
حِرْصِكَ عَلَى الْحَدِيثِ، أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ،
مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ»
হে আবু হুরায়রা, আমি ধারণা করেছি, এ হাদীস সম্পর্কে তোমার চেয়ে আগে
কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করবে না। কারণ, হাদীসের ওপর আমি তোমার
আগ্রহ লক্ষ্য করেছি। কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ লাভ করে সবচেয়ে বেশি ভাগ্যবান সে
হবে, যে নিজের অন্তর অথবা মন থেকে খালিসভাবে লা-ইলাহা
ইল্লাল্লাহ বলবে।[281]
(১৩) شَفَاعَتِي لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِيঅর্থ: আমার উম্মতের কবিরা গুনাহে লিপ্তদের জন্য আমার শাফায়াত।[282]
(১৪)يَشْفَعُ الشَّهِيْدُ فِي سَبْعِيْنَ مِنْ أَهْلِ بَيْتِه অর্থ: শহিদ তার পরিবারের সত্তর জনের জন্য সুপারিশ করবে।[283]
(১৫)عَنْ أَبِي
سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ
رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ: «إِذَا خَلَصَ
الْمُؤْمِنُونَ
مِنَ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَمِنُوا، فَمَا مُجَادَلَةُ
أَحَدِكُمْ
لِصَاحِبِهِ
فِي الْحَقِّ يَكُونُ لَهُ فِي
الدُّنْيَا،
بِأَشَدَّ مُجَادَلَةً لَهُ، مِنَ
الْمُؤْمِنِينَ
لِرَبِّهِمْ
فِي إِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ أُدْخِلُوا النَّارَ» قَالَ: " يَقُولُونَ: رَبَّنَا إِخْوَانُنَا كَانُوا يُصَلُّونَ مَعَنَا،
وَيَصُومُونَ
مَعَنَا، وَيَحُجُّونَ مَعَنَا، فَأَدْخَلْتَهُمُ النَّارَ " قَالَ: فَيَقُولُ:
" اذْهَبُوا
فَأَخْرِجُوا
مَنْ عَرَفْتُمْ، অর্থ: যখন মুমিন আল্লাহর ওলিগণ দেখবে যে তারা মুক্তি পেয়ে গেলো তখন তাঁদের মুমিন
ভাইদের জন্য তাঁরা আল্লাহর কাছে আবেদন (দোআ বা কারো জন্য বলা তথা সুপারিশ) করবে :
হে আমার প্রতিপালক এরা আমাদের ভাই, যাদেরকে তুমি জাহান্নামে
নিক্ষেপ করেছ তারা আমাদের সাথে নামাজ পড়ত, আমাদের সাথে রোজা
রাখত এবং আমাদের সাথে সৎকাজ করত। তখন
আল্লাহ্ বলবেন : যাদের অন্তরে শুধুমাত্র এক দিনার ওজন পরিমাণ ঈমান পাবে তাদেরকে
জাহান্নাম থেকে বের করে নিয়ে আস। তাদের মুখমণ্ডল তথা আকৃতিকে জাহান্নামের জন্য
হারাম করে দেওয়া হয়েছে । অতঃপর তাঁরা (অলিগণ) সেখানে জাহান্নামিদের নিকট যাবেন। এসে দেখবেন কেউ কেউ পা পর্যন্ত
কেউ পায়ের গোঁড়ালি পর্যন্ত আগুনে ডুবে আছে।এর মধ্যে যাদের তারা চিনবে তাদেরকে
জাহান্নাম থেকে বের করে নিয়ে আসবেন।[284]
v আর যদি সে ক্ষমার যোগ্য না হয়, তাহলে গুনাহর শাস্তি ভোগ করার পর সে জান্নাতে যেতে পারবে।
যেমন পূর্বে হাদিসটি উল্লেখ
করা হয়েছে- হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে
বর্ণিত, নবি (ﷺ) এরশাদ করেন, যখন
জান্নাতিগণ জান্নাতে ও দোযখীগণ দোজখে চলে যাবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, যার অন্তরে
সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান রয়েছে তাকেও জাহান্নাম হতে বের করে লও(অংশ বিশেষ)।[285]
যা হোক, ইসলামের প্রতি
আন্তরিকভাবে ঈমান পোষণকারী প্রত্যেকটি মানুষ জান্নাতে অবশ্যই যাবে, যদিও জাহান্নামে
গোনাহের শাস্তি ভোগ করার পরেই যাক না কেন।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অভিমত : গুনাহের শাস্তি হওয়াই স্বাভাবিক কিন্তু আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার ওপর
নির্ভর করে। তিরি ইচ্ছা
করলে গুনাহ মাফ করতে পারেন, আবার ইচ্ছা
করলে শাস্তিও দিতে পারেন। গুনাহ মাফ
হয় তওবার মাধ্যমে অথবা প্রিয় নবি (ﷺ)-এর শাফায়াতের মাধ্যমে
কিংবা কোনো ওলি আল্লাহ তাআলার সুপারিশ ক্রমে অথবা শুধু আল্লাহ তাআলার রহমতে। যদি আল্লাহ তাআলা কোনো গুনাহগার মুমিনকে আজাব দেওয়ার ইচ্ছাও
করেন। তবে তা স্থায়ী আজাব হবে না; বরং সাময়িক হবে। কেননা আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক নেক আমলের ছওয়াব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যেমন কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ অর্থাৎ‘যে ব্যক্তি সামান্য নেক আমলও করবে
সে তার বিনিময় অবশ্যই দেখতে পাবে।’ (সূরা যিলযাল-০৭) আর ঈমান হলো সবেচেয়ে বড় নেক আমল এবং সকল নেক আমল কবুল হওয়া নির্ভর
করে ঈমানের ওপর, আল্লাহ তাআলা ওয়াদার বরখেলাফ হওয়া সম্ভব নয়। আখেরাতে ছওয়াব প্রদানের স্থানই হলো জান্নাত। অতত্রব, মুমিন মাত্রই জান্নাত যাবে। আজাব ভোগ করার পর অথবা কোনো আজাব ব্যতিতই আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাত নসিব করবেন।[286]
শুধু কি ঈমান ওপর ভরসাই যথেষ্ট, না আমল করতে হবে: একজন মুসলমানের শুধু কি ঈমান আনলেই যথেষ্ট না আরো কিছু
হুকুম-আহকাম পালন করতে হবে এ বিষয়ে
সংশয় দূর করতে স্বয়ং মুমিনের দরদি বন্ধু
রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) তা সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। নিম্নে এ সম্বন্ধে হাদিস উল্লেখ করা হলো:
عَنْ عَمْرِو بْنِ مَيْمُونٍ، عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، قَالَ كُنْتُ رِدْفَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى حِمَارٍ يُقَالُ لَهُ عُفَيْرٌ قَالَ فَقَالَ ” يَا مُعَاذُ تَدْرِي مَا حَقُّ اللَّهِ عَلَى الْعِبَادِ وَمَا حَقُّ الْعِبَادِ عَلَى اللَّهِ ” . قَالَ قُلْتُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ . قَالَ ” فَإِنَّ حَقَّ اللَّهِ عَلَى الْعِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوا اللَّهَ وَلاَ يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَحَقُّ الْعِبَادِ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ لاَ يُعَذِّبَ مَنْ لاَ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا ” . قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلاَ أُبَشِّرُ النَّاسَ قَالَ ” لاَ تُبَشِّرْهُمْ فَيَتَّكِلُوا ” . অর্থ: মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে
বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক সফরে রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর গাধা ‘উফায়র-এর পিঠে তাঁর পিছনে বসা ছিলাম। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বললেন, ‘হে মুয়াজ! তুমি কি জান,
বান্দার উপর আল্লাহর হক কী এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক কী?’ আমি
বললাম, ‘আল্লাহ তাঁর রসূলই ভালো জানেন।’ রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বললেনন , ‘বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো তারা আল্লাহর ইবাদাত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছু
শরিক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক হলো, যে তাঁর সঙ্গে শরিক করবে না, তাকে
তিনি শাস্তি দিবেন না।’ মুয়াজ
বললেন, ‘আমি আরজ করলাম,
হে আল্লাহর রসূল! আমি কি লোকদের এ সংবাদ জানিয়ে দেব না?’ তিনি
বললেন, না; লোকেদের এ সংবাদ দিও না, তাহলে তারা এর উপর ভরসা করে থাকবে।[287]
বান্দাদের
ওপর আল্লাহর এ হক ও দাবি রয়েছে যে,
তারা তাঁর এবাদত ও গোলামি করে যাবে এবং কোন বস্তুকেই তাঁর সাথে শরিক
করবে না। আর তারা যখন আল্লাহর এ হক আদায় করে নেবে, তখন
আল্লাহ তাআলাও নিজের জিম্মায় তাদের এ হক সাবস্ত্য
করে নিয়েছেন যে,তিনি তাদেরকে আজাবে ফেলবেন না। আল্লাহর এবাদত করা
এবং শিরক পরিহার করা দ্বারা উদ্দেশ্য দীনে তাওহিদ অর্থাৎ শিরক বর্জন করা, তাওহিদ ও
রেসালাতের সাক্ষ্যদান করা করা ও নামাজ-রোজা এবং আন্যান্য
হুকুম-আহকাম ইত্যাদি পালন করা। আল্লাহর পক্ষ থেকে তার নাজাত ও মুক্তির চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
যেহেতু সে সময়ে ইসলাম এবং কুফরের মধ্যে
সবচেয়ে বড় এবং স্পষ্ট পার্থক্যকারী জিনিস
তাওহিদ এবং শিরকই ছিল, এ জন্য এই হাদিসে (এবং কতিপয় অন্যান্য হাদিসেও) এই
শিরোনাম অবলম্বন করা হয়েছে। তাছাড়া এটাও বাস্তব কথা যে, আল্লাহর
এবাদত ও গোলামি করা এবং শিরক থেকে বেঁচে থাকাই ইসলামের প্রাণ এবং এর মূল ভিত্তি।[288]
ঈমান ছাড়া নবির স্ত্রী-সন্তান মুক্তি পায়নি:(১)
فَأَنْجَيْنَاهُ
وَأَهْلَهُ
إِلَّا امْرَأَتَهُ قَدَّرْنَاهَا مِنَ الْغَابِرِينَ
অর্থ: অতঃপর
আমি লূত ও তাঁর
পরিবারবর্গকে রক্ষা করলাম, তাঁর স্ত্রীকে
ব্যতিত। তার জন্যও
ধ্বংসপ্রাপ্তদের ভাগ্যই নির্ধারিত করেছিলাম।[289]
(২)ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَتَ نُوحٍ وَامْرَأَتَ
لُوطٍ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا
صَالِحَيْنِ
فَخَانَتَاهُمَا
فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللَّهِ
شَيْئًا وَقِيلَ ادْخُلَا النَّارَ مَعَ الدَّاخِلِينَ অর্থ: আল্লাহ তাআলা কাফেরদের জন্য নুহ-পত্নী ও লুত-পত্নীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। তারা ছিল আমার দুই ধর্মপরায়ণ বান্দার গৃহে। অতঃপর তারা তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। ফলে নুহ ও লুত তাদেরকে আল্লাহ তাআলার কবল থেকে
রক্ষা করতে পারল না এবং তাদেরকে বলা হল হল : জাহান্নামিদের সাথে জাহান্নামে চলে যাও।[290]
নবির স্ত্রীও ঈমান
না থাকার কারণে রক্ষা
পায়নি। অতত্রব শুধু
আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সঙ্গে
বংশীয় বা অন্য কোন কোনো
রূপ সম্পর্ক থাকলেই তা নাজাতের
জন্য যথেষ্ট হবে না, যদি নিজের
ঈমান আমল সঠিক না থাকে।[291]
(৩)وَنَادَى نُوحٌ رَبَّهُ
فَقَالَ رَبِّ إِنَّ
ابْنِي مِنْ أَهْلِي
وَإِنَّ وَعْدَكَ الْحَقُّ وَأَنْتَ أَحْكَمُ الْحَاكِمِينَ (45) قَالَ يَا
نُوحُ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ
إِنَّهُ عَمَلٌ غَيْرُ صَالِحٍ অর্থ: আর নুহ (আ.) তাঁর পালনকর্তাকে ডেকে বলবেন-হে পরওয়ারদেগার, আমার পুত্র তো আমার পরিজনের অন্তর্ভুক্ত;
আর আপনার ওয়াদাও নিঃসন্দেহে সত্য আর আপনিই সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞ ফয়সালাকারী। আল্লাহ বললেনহে নুহ! নিশ্চয় সে আপনার পরিবারভুক্ত নয়। নিশ্চয় সে দুরাচার! সুতরাং আমার কাছে
এমন দরখাস্ত করবেন না,যার খবর আপনি জানেন না। আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, আপনি অজ্ঞদের দলভুক্ত হবেন না।[292]
এ আয়াতে জানা গেল যে, নবির ঔরষজাত সন্তান হলেও ঈমান না
থাকলে প্রকৃতপক্ষে সে নবির পরিবার-পরিজনের অন্তুভুক্ত নয়।
অর্থ-সম্পদ, সন্তান-সন্তুতি এবং পারিবারিক সম্পর্ক পরকালে ঈমানের শর্তে
উপকারী হতে পারে: মানুষের অর্থ-সম্পদ
কেয়ামতের দিনেও কাজে আসতে
পারে, যদি সে মুসলমান হয়। এটা এভাবে
যে,
যে ব্যক্তি দুনিয়াতে স্বীয়
অর্থ-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয়
করেছিল কিংবা কোন সদকায়ে জারিয়া করেছিল, যদি সে ঈমানের
উপর মৃত্যুবরণ করে মুমিনদের
তালিকাভুক্ত হয়, তবে এ ব্যয়কৃত
অর্থ ও সদকায়ে জারিরার
সওয়াব হাশরের ময়দানে ও হিসেবে
দাঁড়ি পাল্লায়ও তার কাজে আসবে। পক্ষান্তরে সে যদি মুসলমান
না হয় কিংবা আল্লাহ
না করুক মৃত্যুর পূর্বে
বেঈমান হয়ে যায়, তবে দুনিয়াতে
সম্পাদিত কোন সৎকাজ তার কাজ আসবে না। সন্তান-সন্তুতির
ব্যাপারেও তাই। সংশ্লিষ্ট
ব্যক্তি মুসলমান হলে পরকালেও
সে তার সন্তান-সন্তুতির উপকারে
পেতে পারে। এটা এভাবে
যে,
তার মৃত্যুর পর তার সন্তান-সন্তুতি
তার জন্য মাগফেরাতের দোআ করবে
অথবা সওয়াব পৌঁছাবে অথবা
সে তার সন্তান-সন্তুতিকে সৎকর্মপরায়ণরূপে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। এখন তাদের সৎ কর্মের সওয়াব আপনা-আপনি সেও পেতে
থাকবে এবং আমলনামায় লিপিবদ্ধ
হতে থাকবে। অথবা
হাশরের ময়দানে সন্তান-সন্তুতি তার জন্য
সুপারিশ করবে। কোন কোন হাদিসে
সন্তান-সন্তুতির সুপারিশও কবুল হওয়ার
বিষয় প্রমাণিত আছে;বিশেষত অপ্রাপ্তবয়স্ক
সন্তানের সুপারিশ। এমনিভাবে
সন্তান-সন্তুতি যদি মুসলমান হয় এবং তাদের
সৎকর্ম পিতা-মাতার সৎকর্মের
স্তরে না পৌঁছে,তবে পরকালে
আল্লাহ তাআলা বাপ-দাদার খাতিরে
তাদেরকেও বাপ-দাদার উচ্চতম
স্তরে পৌঁছিয়ে দেবেন। কুরআনে
পাকে বিষয়টি এভাবে উল্লেখ
করা হয়েছে-
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ অর্থাৎ আমি আমার
সৎবান্দাদের সাথে তাদের সন্তান-সন্তুতিকেও
মিলিত করে দেব। (সূরা তুর-২১) ঈমানদার লোকদের সন্তান-সন্তুতি যদি ঈমানের ক্ষেত্রে মাতা-পিতার অনুগামী হয়,তাহলে সন্তানদের আমল নিম্নমানের হলেও মর্যাদার ক্ষেত্রে তাদের মাতা-পিতার সাথে মিলিত করে দিবেন, যেন সন্তানদেরকে কাছে পেয়ে মাতা-পিতার চক্ষু শীতল হয়। অসম্পূর্ণ আমলের অধিকারী সন্তানদেরকে নিখুঁত ও পূর্ণাঙ্গ আমলের অধিকারী মাতা-পিতার সমান মর্যাদা দান করা হবে। এতে মাতা-পিতার কর্মফল হতে কিছুমাত্র হ্রাস করা হবে না। এই জন্যই আল্লাহ তাআলা অতঃপর বলেছেন, “তাদের সাথে তাদের সন্তানদেরকে মিলিত করে দিব। কিন্তু তাদের কর্মফল আমি কিছুই হ্রাস করব না।”
আলোচ্য আয়াতের উল্লেখিত
প্রসিদ্ধ তাফসির থেকে জানা
গেল যে, কুরআন ও হাদিসে
যেখানেই কেয়ামতের দিন পারিবারিক
সম্পর্ক কাজে না আসার
কথা বলা হয়েছে, সেখানেই উদ্দেশ্য
এই যে, যারা মুমিন নয়, তাদের
কাজে আসবে না। এমনকি
পয়গম্বরের সন্তান-সন্তুতি ও স্ত্রীও
যদি মুমিন না হয়, তবে তাঁর
পয়গম্বরি দ্বারা কেয়ামতের দিন তাদের
কোন উপকার হবে না। কুরআন পাকের নিম্নলিখিত আয়াতসমূহের
মর্মও তাই হতে পারে। যেমন, يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ
وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ
وَصَاحِبَتِهِ
وَبَنِيهِ ---فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّورِ
فَلَا أَنْسَابَ بَيْنَهُمْ يَوْمَئِذٍ وَلَا يَتَسَاءَلُونَ অর্থাৎ যে দিন ধন-সম্পদ
ও সন্তান সন্ততি কোন উপকারে
আসবে না।[293]
v মহান আল্লাহ কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন,إِنَّ الَّذِينَ
كَفَرُوا لَنْ تُغْنِيَ
عَنْهُمْ أَمْوَالُهُمْ وَلَا أَوْلَادُهُمْ
مِنَ اللَّهِ شَيْئًا وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا
خَالِدُونَ অর্থ: যারা কুফরি করে তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি আল্লাহর নিকট কখনও কোন কাজে আসবে না। তারাই আগুনের বাসিন্দা, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।[294]
এ আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, ঈমান ওয়ালাদের মাল ও সন্তানাদি কাজে আসবে। কারণ প্রত্যেকটা জিনিসের বিপরীত জিনিস আছে। উদাহরণ স্বরূপ যদি বলা হয় ছেলেটা বেআদব, তাহলে একথা বুঝায় যে, তার মধ্যে আদব নেই। সুতরাং কাফেরদের ধন-সন্তান কাজে আসবে না, তবে মুমিনদের কাজে আসবে।
নেককার মুমিনগণকে রসূলুল্লাহ (ﷺ) বন্ধু বলে সম্বোধন
عَنْ
عَمْرِو بْنِ
الْعَاصِ، قَالَ
سَمِعْتُ رَسُولَ
اللَّهِ صلى
الله عليه
وسلم جِهَارًا
غَيْرَ سِرٍّ
يَقُولُ
“ أَلاَ
إِنَّ آلَ
أَبِي - يَعْنِي
فُلاَنًا - لَيْسُوا
لِي بِأَوْلِيَاءَ
إِنَّمَا وَلِيِّيَ
اللَّهُ وَصَالِحُ
الْمُؤْمِنِينَ
” . অর্থ: আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)কে গোপনে নয় বরং প্রকাশ্যেই বলতে
শুনেছি: সাবধান! অমুক বংশের লোকেরা আমার বন্ধু নয়। বরং আমার বন্ধু হচ্ছেন আল্লাহ ও
পুণ্যবান মুমিনগণ।[295]
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা-বিশ্বাস হলো মহান আল্লাহ পর আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ (ﷺ) মর্তবা-ইজ্জত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মত
পবিত্র সত্ত্বা নেককার মুমিনদেরকে বন্ধু বলে সম্বোধন করাটা কি মুমিনের শান-মর্যাদা বুলন্দ করে না?
বন্ধু হিসেবে শুধু মুমিনকে গ্রহণ করা উচিত :
وعنْ
أَبي سعيدٍ الخُدْرِيِّ t، عن النبيِّ ﷺ قَالَ: لا تُصَاحِبْ إِلَّا مُؤْمِنًا، وَلا يَأْكُلْ طعَامَكَ إِلَّا تَقِيٌّ رواه أَبُو داود والترمذي
بإِسْنَادٍ لا بأْسَ بِهِ.
অর্থ: হজরত আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) কে বলতে শুনেছি, মুমিন ছাড়া অন্য কারও সঙ্গী হয়ো না এবং তোমার খাবার যেন পরহেজগার ব্যক্তি ছাড়া
অন্য কেউ না খায়।[296]
মুমিন ব্যতিত অন্য কেহ আন্তরিক সঙ্গী-বন্ধু হওয়া কাম্য
নয়। আর অসংখ্য আয়াত ও হাদিসে আসহায়-মিসকিনকে খাদ্যদানে আদেশ ও উৎসাহিত করা হয়েছে।(এ সম্পর্কে
আমি “মহান আল্লাহর নিকট মানুষের মর্যাদা” কিতাবে আলোচনা করেছি) এখানে উদ্দেশ্য হল মুত্তাকি মুমিন-ই বেশি হকদার বৈকি?
মুসলমান ভাইয়ের
প্রয়োজন পূর্ণ করার বা চেষ্টা করার ফজিলত
একবার হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) মসজিদে নববিতে ইতেকাফ করছিলেন। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি মসজিদে নববিতে এসে তাকে
সালাম করে পাশে চুপচাপ বসে পড়লেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, কী
ব্যাপার তোমাকে চিন্তিত ও পেরেশান দেখা যাচ্ছে। লোকটি জবাব দিলো, হে রসূল (ﷺ)-এর চাচাতো ভাই! নিশ্চিয় আমি খুবই চিন্তিত ও
পেরেশান। কেননা,
অমুক ব্যক্তি আমার কাছে ঋণ পাবে। অতঃপর সে রওজায়ে পাকের
দিকে ইশারা করে বলেন,
এই রওজায় যিনি শুয়ে আছেন তার ইজ্জতের কসম, আমি এই
ঋণ কখনো পরিশোধ করতে সক্ষম হবো না।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) তা শুনে বলেন, তাহলে
আমি তোমার জন্য পাওনাদারের নিকট সুপারিশ করবো? লোকটি বললো আপনি যা ভালো মনে করেন
তাই করেন। এই কথা শুনে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) তখনই জুতো পরে মসজিদের বাইরে এলেন।
লোকটি বলেন, আপনি কী ইতেকাফের কথা ভুলে গেছেন? হজরত
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন,
না ভুলি নাই। তবে খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, আমি এই
কবরবাসী রসূল (ﷺ) এর কাছ
থেকে শুনেছি। এ কথা বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। সাহাবায়ে
কেরাম, রসূল (ﷺ)-কে কেমন ভালোবাসতেন তা এখান থেকে কিছুটা আন্দাজ করা যায়। তারপর তিনি বলেন,
রসূল (ﷺ) বলেছেন,
مَنْ مشى في حاجةِ أخيه؛ كان خيراً له مِنِ اعْتكافِ عَشرِ سنينَ، ومَنِ اعْتَكَف يوماً ابْتِغَاءَ وجْهِ الله؛ جعَلَ الله بينَه وبينَ النارِ ثلاثَ خنادِقَ، كلُّ خَنْدَقٍ أبعَدُ مِمّا بين الخافِقَيْنِ”. رواه الطبراني في الأوسط والبيهقي واللفظ له والحاكم مختصرا وقال صحيح الإسناد অর্থাৎ- যে
ব্যক্তি নিজের ভাইয়ের কোনো কাজ করা বা প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করবে, তা তার
জন্য দশ বছর ইতেকাফ করার চেয়ে বেশি সওয়াব লাভের কারণ হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর
সন্তুষ্টি লাভের জন্য এক দিন ইতেকাফ করে, আল্লাহ পাক তার ও জাহান্নামের
মাঝে তিন খন্দক পরিমাণ দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন। যার দূরত্ব আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের চেয়ে আরো অনেক বেশি।[297]
নোট : (১) ইমাম
হাকেম (রহ.) সনদটিকে ছহিহ বলেছেন। (২) হাদিসের শেষাংশ বায়হাকির বর্ণনা।
مَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللَّهُ فِي حَاجَتِهِ عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ سَالِمٍ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ অর্থ: যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের (মুসলমানের) প্রয়োজন পূর্ণ করবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রয়োজন পূর্ণ করবেন।[298]
প্রিয় বন্ধুগণ! প্রথমে হাদিসে জানতে পারলাম যে,
মুসলমানের উপকারের নিয়তে চেষ্টা করলে আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নাম থেকে
দূরে রাখবেন। আর যদি উপকার
করে, তাহলে কত বড় পুরস্কার পাবে। তা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন। দ্বিতীয় হাদিসে বলা হয়েছে,আপন ভাইয়ের
প্রয়োজন মিটালে আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করবেন। শুধু তাই নয় তাকে সাহায্য করবেন এবং তার প্রয়োজন মিটাতে সহজতর
করবেন। যেমন:
كَانَ اللَّهُ فِي حَاجَتِهِ (আল্লাহ তাআলা তার প্রয়োজন পূর্ণ করবেন) এ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)
বলেন- قوله:
(كان الله في حاجته)؛ أي: أعانه الله تعالى وسهَّل له قضاء حاجته؛ (فتح الباري؛ لابن
حجر العسقلاني، ج5، ص 9 অর্থাৎ ‘আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন এবং তার সব প্রয়োজন পূরণে সহজ করেন।[299]
স্বয়ং আল্লাহ জাল্লা জালালাহু যার প্রয়োজন মিটাবেন তার কি কো
অভাব-টেনশন থাকতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের বেশি বেশি মুমিন-মুসলমানের উপকার করার তাওফিক দান করুন।’ আমিন!!
মুমিনের জন্য ক্ষমা
প্রার্থনা করার লাভ
وَعَن أَبي الدَّردَاءِ أَنَّ رسُول اللَّه ﷺ كانَ يقُولُ: دَعْوةُ المرءِ المُسْلِمِ لأَخيهِ بِظَهْرِ الغَيْبِ مُسْتَجَابةٌ، عِنْد رأْسِهِ ملَكٌ مُوكَّلٌ كلَّمَا دَعَا لأَخِيهِ بخيرٍ قَال المَلَكُ المُوكَّلُ بِهِ: آمِينَ، ولَكَ بمِثْلٍ رواه مسلم. অর্থ: আবু দারদা (রা.) থেকে
বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল (ﷺ) বলেছেন : কোন মুসলিম তার
অনুপস্থিত ভাইয়ের জন্য দোআ করলে তা কবুল করা হয় এবং তার মাথার কাছে একজন ফেরেশতা
নিযুক্ত থাকে। যখনই সে ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য কল্যাণের দোআ করে তখন সে নিযুক্ত
ফেরেশতা বলে, আমিন অর্থাৎ হে আল্লাহ! কবুল
করুন এবং তোমার জন্য অনুরূপ। (তোমার
ভাইয়ের জন্য যা চাইলে আল্লাহ তোমাকেও তাই দান করুন)।[300]
ن عبادة بن الصامت رضي الله عنه قال: سمعت رسول الله
صلى الله عليه وسلم يقول: "مَن اسْتَغفَر للمُؤمنِين وللمُؤمِنات كَتَب اللهُ
لَه بكُلّ مُؤمِن ومُؤْمِنة حَسَنَة"صحيح الجامع إسناده جيد، وحسنه
অর্থ: হজরত উবাদা ইবনে সামেত (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: যে ব্যক্তি সাধারণ মুমিন নারী ও পুরুষের জন্য আল্লাহর দরবারে
মাগফেরাতের দোআ করবে তার জন্য প্রত্যেক মুমিন ও মুমিনার পক্ষ হতে একটি নেকি লেখা হবে।[301]
নোট : কতক মুহাদ্দিসীন হাদিসটিকে জয়িফ আবার কেউ জায়্যিদ-হাসান বলেছেন।
মুমিনদের জন্য দোআ করতে নবিগণকে নির্দেশ : মুমিনদের জন্য রসূল (ﷺ) কে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ। বিশিষ্ট পয়গাম্বর হজরত ইব্রাহিম আলাহিস সালামও
ক্ষমা চেয়ে দোআ করেছেন। কুরআনুল কারিমের ভাষায়-وَاسْتَغْفِرْ
لِذَنْبِكَ
وَلِلْمُؤْمِنِينَ
وَالْمُؤْمِنَاتِ
وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ অর্থ: হে নবি! ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার এবং মুমিন ও মুমিনদের
ভুল-ত্রুটির জন্য, আল্লাহ তাআলা তোমাদের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে সম্যক
অবগত।[302]
رَبَّنَا
اغْفِرْ لِي
وَلِوَالِدَيَّ
وَلِلْمُؤْمِنِينَ
يَوْمَ يَقُومُ
الْحِسَابُঅর্থ: (হজরত ইব্রাহিম (আ.) বলেন) হে আমাদের পালনকর্তা! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে ক্ষমা করুন, যেদিন হিসেব
কায়েম হবে।[303]
মানবকুলের শ্রেষ্ঠ সন্তান নবিগণ কর্তৃক
মুমিনদের জন্য দোআ করা মুমিনদের সম্মান-ইজ্জতেরই বহিঃপ্রকাশ।
মুমিন মুমিনকে উপহাস করবে না
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا يَسۡخَرۡ قَوۡمٞ مِّن قَوۡمٍ عَسَىٰٓ أَن يَكُونُواْ خَيۡرٗا مِّنۡهُمۡ وَلَا نِسَآءٞ مِّن نِّسَآءٍ عَسَىٰٓ أَن يَكُنَّ خَيۡرٗا مِّنۡهُنَّۖ . অর্থ: হে ঈমানদারগণ, কোন
সম্প্রদায় যেন অপর কোন সম্প্রদায়কে বিদ্রূপ না করে, হতে পারে
তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর কোন নারীও যেন অন্য নারীকে বিদ্রূপ না করে, হতে পারে
তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম।[304]
ইমাম
কুরতুবি (রহ.) বলেন, কোন ব্যক্তিকে হেয় ও অপমান করার জন্যে তার কোন দোষ এমনভাবে উল্লেখ করা,
যাতে শ্রোতরা হাসতে থাকে, তাকে استهزاء ও تمسخر- سخرية (উপহাস)বলা
হয়। এটা যেমন মুখে সম্পন্ন হয়, তেমনি হস্তপদ ইত্যাদি দ্বারা ব্যঙ্গ অথবা ইঙ্গিতের মাধ্যমেও সম্পন্ন হয়ে
থাকে। কারও কথা শুনে অপমানের ভঙ্গিতে বিদ্রুপ করার মাধ্যমেও হতে পারে। কেহ কেহ বলেন, শ্রোতাদের
হাসির উদ্রেক করে এমনভাবে কারও সস্পর্কে আলোচনা করাকে تمسخر ও سخرية বলা হয়। কুরআনের বর্ণনা মতে এগুলো সব হারাম।
কুরআনে
পাক এত গুরুত্ব সহকারে سخرية তথা উপহাস নিষিদ্ধ করেছে যে, এক্ষেত্রে পুরুষ
ও নারী জাতীকে পৃথকভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। কুরআনে পুরুষ পুরুষকে এবং নারী নারীকে উপহাস করাও হারাম হওয়ার কথা উল্লেখ করা
হয়েছে; অথচ কোন পুরুষ নারীকে এবং কোন নারী পুরুষকে উপহা করাও হারাম।
কিন্তু একথা উল্লেখ না করে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, নারী
ও পুরুষের মেলামেশাই শরিয়তে নিষিদ্ধ ও নিন্দনীয়। মেলামেশা না হলে উপহাসের প্রশ্নই
উঠে না।
আয়াতে
কারিমার সারমর্ম এই যে, কোন ব্যক্তির দেহ, আকার-আকৃতিতে অথবা গঠন প্রকৃতিতে কোন দোষ দৃষ্টিগোচর
হলে তা নিয়ে কারও হাসাহাসি অথবা উপহাস করা উচিত নয়। কেননা, তার
জানা নেই যে, সম্ভবত এই ব্যক্তি সততা,আন্তরিকা
ইত্যাদির কারণে আল্লাহর কাছে তার চাইতে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। এ আয়াতে পূর্ববর্তী বুযুর্গ ও মনীষীদের অন্তরে অসাধরাণ প্রভাব
বিস্তার করেছিল। আমর ইবনে শোরাহবিল (রা.) বলেন, কোন ব্যক্তিকে বকরীর স্তনে মুখ লাগিয়ে দুধ পান
করতে দেখে আমি আমার হাসির উদ্রেক হয়, তবে আমি আশংকা করতে
থাকি যে, কোথাও এরূপই না হয়ে যাই। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে
মাসউদ (রা.) বলেন, কোন কুকুরকেও উপহাস করতে আমার ভয়
লাগে, আমিও নাকি কুকুর হয়ে যাই। -কুরতুবি
মুসলিম
শরিফে হজরত আবু হুরাইরা (রা.)-এর রেওয়ায়েতক্রমে
রসূলুল্লাহ (ﷺ)
বলেন, আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের আকার-আকৃতি ও ধন-দৌলতের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তাদের অন্তর কাজকর্ম দেখেন। ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন : এই হাদিস থেকে এই বিধি ও মূলনীতি জানা যায় যে, কোন ব্যক্তির বাহ্যিক অবস্থা দেখে
তাকে নিশ্চিতরূপে ভাল অথবা মন্দ বলে দেওয়া জায়েয নয় (তবে সুধারণা করা যেতে পারে, আমার ধারণায় লোকটি ভাল)। কারণ, যে ব্যক্তির বাহ্যিক
ক্রিয়াকর্মকে আমরা খুব ভাল মনে করছি, সে আল্লাহর কাছে নিন্দনীয়
হতে পারে। কেননা আল্লাহ তার অভ্যন্তরীণ অবস্থা
ও অন্তগত গুণাগুণ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত আছেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির বাহ্যিক অবস্থা ও ক্রিয়াকর্ম মন্দ, তার অভ্যন্তরীণ অবস্থা অন্তরগত গুণাগুণ তার কুকর্মের কাফফারা হয়ে যেতে পারে। তাই যে ব্যক্তিকে মন্দ অবস্থা ও কুকর্মে লিপ্ত
দেখ, তার এই অবস্থাকে মন্দ মনে কর; কিন্তু তাকে
হেয় ও লাঞ্ছিত মনে করার অনুমতি নেই।[305]
কোন মুসলমানকে ঠাট্রা-বিদ্রুপ দ্বারা হয়রানি না
করা
عَنْ عَبْدِ
الرَّحْمَنِ
بْنِ أَبِي لَيْلَى
، قَالَ : حَدَّثَنِي نَفَرٌ مِنْ أَصْحَابِ
رَسُولِ اللهِ صَلَّى
الله عَلَيه وسَلَّم ، قَالُوا
: كُنَّا فِي سَفَرٍ
فَنَامَ صَاحِبٌ لَنَا فَأَخَذْنَا
سَهْمًا مِنْ كِنَانَتِهِ
فَلَمَّا اسْتَيْقَظَ نَظَرَ فَلَمْ يَجِدْهُ فَضَحِكْنَا ، فَقَالَ
رَسُولُ اللهِ صَلَّى
الله عَلَيه وسَلَّم : مَا شَأْنُكُمْ
؟
فَأَخْبَرْنَاهُ
، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى
الله عَلَيه وسَلَّم : لاَ يَحِلُّ
لِمُسْلِمٍ
أَنْ يُرَوِّعَ
مُسْلِمًا অর্থ: হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আবু লাইলা কয়েকজন সাহাবি থেকে বর্ণনা করেন
যে,রসূলের সাহাবিগণ একবার নবি (ﷺ)-এর সঙ্গে সফর করছিলেন (যখন এক জায়গায় কাফেলা শিবির স্থাপন করল) তখন তাঁদের এক
ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তির রশি, যা সে সাথে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিল,তা উঠিয়ে নিয়ে আসলো (ঠাট্রা স্বরূপ)। তাতে সে ভয় পেয়ে গেল। রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেন, মুসলমানের জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে কোন মুসলমানকে
(ঠাট্রা স্বরূপ) হয়রানি করবে (ভয় দেখাবে)।[306]
নোট : মুসনাদে আহমদের বর্ণনায় শব্দ বেশি রয়েছে।
অনেক
সময় ঠাট্রা-বিদ্রুপ করতে গিয়ে বড় ধরণের ঝগড়া-ফ্যাসাদ ঘটে। তাছাড়া ভয় দেখালে সে পেরেশান হয়ে যায়। তাই পূর্ব থেকেই সতর্কতা করা হয়েছে।
মুমিন মুমিনের প্রতি
কুধারণা করবে না
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱجۡتَنِبُواْ كَثِيرٗا مِّنَ ٱلظَّنِّ إِنَّ بَعۡضَ ٱلظَّنِّ إِثۡمٞۖ وَ لَا تَجَسَّسُواْ অর্থ: হে মুমিনগণ,
তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান
তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না।[307]
ٱلظَّنِّ এর অর্থ প্রবল ধারণা। এ
সম্পর্কে কুরআনে প্রথমত : বলেছে যে, অনেক ধারণা থেকে
বেঁচে থাক। এরপর কারণস্বরূপ বলা হয়েছে, কতক ধারণা পাপ। এ থেকে জানা গেল যে, প্রত্যেক ধারণাই পাপ নয়। অতত্রব, কোন্ ধারণা পাপ,
তা জেনে নেয়া ওয়াজিব হবে, যাতে তা থেকে
আত্মরক্ষা করা যায় এবং জায়েয না জানা
পর্যন্ত তার কাছেও না যায়। আলেম ও ফেকাহবিদগণ এর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। ইমাম কুরতুবি রহ.বলেন, ধারণা বলে এস্থলে অপবাদ বোঝানো
হয়েছে; অর্থাৎ কোন ব্যক্তির প্রতি শক্তিশালী প্রমাণ
ব্যতিরেকে কোন দোষ অথবা গুনাহ আরোপ করা। ইমাম আবু বকর জাসসাস (রহ.) আহকামুল করআন গ্রন্থে এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ
লিপিবদ্ধ করেছেন যে, ধারণা চার প্রকার। ১.হারাম ২.ওয়াজিব ৩. জায়েয ৪. মুস্তাহাব।
১.হারাম : হারাম
ধারণা এই যে, আল্লাহর প্রতি
কুধারণা রাখা যে, তিনি আমাকে শাস্তি দিবেন অথবা
বিপদেই রাখবেন। এটা যেন আল্লাহর মাগফেরাত
ও রহমত থেকে নৈরাশ্য। হজরত
জাবের (রা.)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (ﷺ) لَا يَمُوْتَنَّ أَحَدُكُمْ إِلَّا وَهُوَ يُحْسِنُ الظَّنَّ بِاللَّهِ عَزَّ وَجَلّ .অর্থ: তোমাদের কারও আল্লাহর প্রতি
সুধারণা পোষণ ব্যতিত মৃত্যুবরণ করা উচিত নয়। মুসলিম-২৮৭৭ অন্য এক হাদিসে আছে- أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي إِنْ ظَنَّ بِي خَيْرًا فَلَهُ অর্থাৎ আমি আমার বান্দার সাথে তেমনি ব্যবহার করি, যেমন সে আমার সম্বন্ধে ধারণা রাখে। এখন সে আমার প্রতি যা ইচ্ছা ধারণা
রাখুক। মুসলিম-৬৫৮৮ ই.ফা. এ থেকে জানা যায় যে, আল্লাহ প্রতি
সুধারণা পোষণ করা ফরজ এবং কুধারণা পোষণ হারাম। এমনিভাবে শরিয়তের সুস্পষ্ট প্রমাণ
ব্যতিত কোন মুসলমানের প্রতি কুধারণাও হারাম। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে- إِيَّاكُمْ
وَالظَّنَّ،
فَإِنَّ
الظَّنَّ
أَكْذَبُ
الْحَدِيثِ، অর্থাৎ তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে থাক। কেননা
ধারণা মিথ্যা কথার নামান্তর।[308]
২.ওয়াজিব : ওয়াজিব ধারণা বলতে, যা
আইনত : জরুরী এবং সে সম্পর্কে কুরআন-হাদিসে কোন সুস্পষ্ট
প্রমাণ নেই; সেখানে প্রবল ধারণা অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব। যেমন,
পারস্পরিক বিবাদ-বিসংবাদ ও মোকদ্দমার
ফয়সালায় নির্ভরযোগ্য সাক্ষীদের সাক্ষ্য
অনুযায়ী ফয়সালা দেওয়া। এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিরও মিথ্যা বলার সম্ভবনা
থাকে। তার সত্যবাদিতা নিছক একটা প্রবল ধারণা মাত্র। সেমতে এই ধারণা অনুযায়ী আমল
করাই ওয়াজিব। এমনিভাবে যে জায়গায় কেবলার দিক অজ্ঞাত থাকে এবং জেনে নেয়ার মত কোন
লোকও না থাকে, সেখানে নিজের প্রবল ধারণানুযায়ী আমল করা ওয়াজিব। কোন ব্যক্তির ব্যক্তির কোন বস্তুর ক্ষতিপূরণ দেওয়া ওয়াজিব হলে সেই বস্তুর
মূল্য নির্ধারণের ব্যাপারেও প্রবল ধারণানুযায়ীই আমল করা ওয়াজিব।
৩.জায়েয : জায়েয ধারণা এমন, যেমন নামাজের রাকাআত সম্পর্কে সন্দেহ হল যে, তিন
রাকাআত পড়া হয়েছে, না চার রাকাআত। এমতাবস্থায় প্রবর ধারণানুযায়ী আমল করা জায়েয। যদি সে প্রবল ধারণা বাদ দিয়ে
নিশ্চিত বিষয় অর্থাৎ তিন রাকাআত সাব্যস্ত
করে চতুর্থ রাকাআত পড়ে নেয়, তবে তাও জায়েয।
৩.মুস্তাহাব : প্রত্যেক মুসলমানের প্রতি সুধারণা পোষণ করা
মুস্তাহাব। এর জন্যে সওয়াব পাওয়া যায়।–(জাসসাস)
ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন- কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছেঃ لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ
ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ
مُبِينٌ অর্থাৎ “তোমরা যখন একথা শুনলে,তখন ঈমানদার পুরুষ-নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করনি এবং বলনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ?” সূরা নুর-১২ এতে মুমিনের প্রতি সুধারণা পোষণ করার
তাগিদ আছে। অপর পক্ষে একটি সুবিদিত বাক্য আছে
অর্থাৎ প্রত্যেকের প্রতি কুধারণা পোষণ করাই সাবধানতা। এর উদ্দেশ্য এই
যে, কুধারণার বশবর্তী হয়ে যেরূপ ব্যবহার করা হয়,
প্রত্যেকের সাথে সেইরূপ ব্যবহার করবে। অর্থাৎ আস্থা ব্যতিরেকে নিজের জিনিস কাউকে সোপর্দ করবে না। মোটকথা, কোন ব্যক্তিকে চোর
অথবা বিশ্বাসঘাতক মনে না করে নিজের ব্যাপারে সর্তক হবে।[309]
মুমিন সম্পর্কে কোন
মন্দ-খারাপ কথা শুনলে করণীয় কি ?
মুমিন নর-নারী সম্পর্কে যে কোন ধরণের অপবাদ-মন্দ কথা শুনলে আমাদের
কি করণীয় তা আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সূরা নুরের ১২ ও ১৬ নং আয়াতে শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন তিনি ইরশাদ করেন,وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ
قُلْتُمْ مَا يَكُونُ
لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ
بِهَذَا سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانٌ
عَظِيمٌ তোমরা যখন এটা শ্রবণ করলে তখন কেন বললে না যে, এ বিষয়ে বলাবলি করা আমাদের উচিত নয়। আল্লাহ পবিত্র মহান এটা তো এক গুরুতর অপরাধ (মিথ্যা রটনা)।[310]
এ ধরণের সংবাদ (জিনার অপবাদ) শুনে মুসলমানদের কি উচিত। অর্থাৎ তারা পরিষ্কার বলে দেবে যে, কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া এরূপ কথা মুখে
উচ্চারণ করাও আমাদের জন্য বৈধ নয়। এটা গুরুতর অপরাধ।
لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ
ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ
مُبِينٌ অর্থাৎ তোমরা যখন এই অপবাদের সংবাদ শুনলে, তখন মুসলমান পুরুষ ও নারী নিজেদের সম্পর্কে অর্থাৎ মুসলমান ভাই-বোনের
সম্পর্কে সুধারণা করল না কেন এবং এ কথা বলল না কেন যে, এটা প্রাকাশ্য
মিথ্যা? সূরা নুর-১২ এই আয়াতে কয়েকটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য-
১.
بِأَنْفُسِهِمْ শব্দ দ্বারা কুরআন পাক ইঙ্গিত করেছে যে, যে মুসলমান অন্য মুসলমানের দুর্নাম রটায় ও তাকে লাঞ্ছিত করে, সে প্রকৃত পক্ষে নিজেকেই লাঞ্ছিত করে। কারণ ইসলামের সম্পর্ক সবাইকে এক করে দিয়েছে। এ ধরণের সর্বক্ষেত্রে কুরআন এই ইঙ্গিত ব্যবহার করেছে। যেমন এক জায়গায় বলা হয়েছে- وَلَا تَلْمِزُوا
أَنْفُسَكُمْ অর্থাৎ তোমাদের নিজেদের প্রতি দোষারোপ করো না। উদ্দেশ্য কোনো মুসলমান পুরুষ ও নারীর প্রতি দোষারোপ করো না। অন্যত্র বলা হয়েছে- وَلَا تَقْتُلُوا
أَنْفُسَكُمْ অর্থাৎ নিজেদেরকে হত্যা করো না। এখানেও কোনো মুসলমান ভাইকে হত্যা করা বোঝানো হয়েছে। কুরআন পাকের এসব আয়াতে প্রাসঙ্গিক নির্দেশ এই যে, যে মুসলমান অন্য মুসলমানের প্রতি দোষারোপ করে কিংবা তার ক্ষতি সাধন করে, প্রকৃতপক্ষে সে নিজেকে দোষী ও ক্ষতিগ্রস্ত করে। কেননা সমগ্র জাতির অপমান ও দুর্নামই এর পরিণতি।
২.এখানে স্থানের দিকে লক্ষ্য করলে لَوْلَا
إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنّنتمَ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا
সম্বোধন পদে বলা উচিত ছিল; যেমন শুরুতে سَمِعْتُمُوهُ সম্বোধন পদে বলা হয়েছে। কিন্তু কুরআন পাক এই সংক্ষিত বাক্য ছেড়ে দিয়ে পদ্ধতি পরিবর্তন করতে সম্বোধন পদের পরিবর্তে ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ বলেছে। এতে হালকা ইঙ্গিত রয়েছে যে, যাদের দ্বারা এই কাজ সংঘটিত হয়েছে, তারা এই কাজের সীমায় মুমিন কথিত হওয়ার যোগ্য নয়। কেননা এক মুসলমান অন্য মুসলমানের প্রতি সুধারণা পোষণ করবে এটাই ছিল ঈমানের দাবি।
৩. আয়াতের শেষ বাক্য তথা هَذَا
إِفْكٌ مُبِينٌ
বাক্যে এ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, খবরটি শোনা মাত্রই মুসলমানদের ‘এটা প্রাকাশ্য মিথ্যা’ বলে দেওয়াই ছিল ঈমানের দাবি। এতে প্রমাণিত হয় যে, কোনো মুসলমান কোনো গুনাহ অথবা দোষ শরিয়তসম্মত প্রমাণ দ্বারা না জানা পর্যন্ত তার প্রতি সুধারণা রাখা এবং প্রমাণ ছাড়াই তাকে গুনাহ ও দোষে অভিযুক্ত করাকে মিথ্যা মনে করা সাক্ষাত ঈমানের পরিচয়।[311]
মুমিনদের মাঝে যারা অশ্লীলতার প্রসার
কামনা করে তাদেরকে হুশিয়ারি : যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচার-প্রসারের কামনা
করে তাদেরকে আল্লাহ দুনিয়া-আখেরাতের শাস্তির ঘোষনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন, অর্থ: যারা পছন্দ করে যে, ঈমানদারদের মধ্যে ব্যভিচার প্রসার লাভ করুক,
তাদের জন্যে ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।[312]
কোনো মুমিন সম্পর্কে খারাপ কথা শুনার পর যদি তা অন্তরে বদ্ধমূল হয় এবং মুখে
এ উচ্চারণও করে ফেলে,কিন্তু ইহার যেন অধিক প্রচার না হয় সেদিকে
তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে।[313]
মিথ্যাবাদী কে? আমরা কোনো কথা শোনামাত্রই প্রচার
করি অথচ তা মিথ্যাবাদীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
যেমন হাদিস শরিফে এসেছে-عَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ
اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ: " كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا
أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ" , (م) (المقدمة ج1ص10) অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন,
কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত
হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে কোনো কথা শোনামাত্রই বলে বেড়ায়।[314]
নোট : আবু দাউদ এর বর্ণনায় كذبا
পরিবর্তে اثما রয়েছে।
যাছাই-বাচাই ছাড়া কোন কথা বিশ্বাস করা যাবে না এবং কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে
না : যেমন মহান আল্লাহ বলেন-يَا أَيُّهَا
الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ
فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا
قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى
مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ অর্থ: মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী
ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে
তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো
সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে
নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও।[315]
এ আয়াত সম্পর্কিত বিধান ও মাসআলা : ইমাম জাসসাস (রহ.) আহকামুল
কুরআনে বলেন : এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোনো ফাসেক ও
পাপাচারীর খবর কবুল করা এবং তদনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জায়েয় নয়, যে পর্যন্ত না অন্যান্য উপায়ে তদন্ত করে তা সত্যা্তা প্রমাণিত হয়ে যায়।[316]
নোট : ফাসেক আরবি শব্দ। শাব্দিক অর্থ
হলো অবাধ্যতা,পাপিষ্ঠ ইত্যাদি। প্রকাশ্যে যে ব্যক্তি গোনাহে কবিরা করে বেড়ায় তাকে বলে
ফাসেক। আবার ব্যাপক অর্থে সব ধরণের অবাধ্যকে
ফাসেক বলা হয়, এ হিসেবে একজন কাফেরকেও
ফাসেক বলা হতে পারে, যেহেতু সেও অবাধ্য।[317]
মুসলিম ভাইয়ের দোষ দেখলে করণীয় কী
মুমিন ভাইয়ের কোনো দোষ যদি কারও নজরে আসে, তাহলে করণীয় কী এ সম্পর্কে বিশ্বনবি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যেন আমরা সুন্দরভাবে-উত্তম পন্থায় সংশোধন করে দিতে পারি। যেমন তিনি বলেন المؤمنُ
مرآةُ المؤمنِ والمؤمنُ أخو المؤمنِ يَكفُّ عنهُ ضيعتَه ويحوطُه من ورائِهِ
অর্থ:এক মুমিন অপর মুমিনের আয়না স্বরূপ এং এক মুমিন অপর মুমিনের ভাই। যা তার ভাইয়ের জন্য ক্ষতিকারক সে তা দূর করে দেয় এবং পরনিন্দা থেকে তাকে রক্ষা করে।[318]
سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ ، يَقُولُ : قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ :
" إِنَّ أَحَدَكُمْ مَرْآةُ أَخِيهِ ، فَإِذَا رَأَى بِهِ شَيْئًا فَلْيُمِطْهُ عَنْهُ "
অর্থ: তোমাদের প্রত্যেকেই স্বীয় মুসলমান ভাইয়ের জন্য আয়না স্বরূপ হওয়া উচিত। যদি সে আপন ভাইয়ের মধ্যে দোষের কিছু দেখে,তাহলে তার উচিত তা দূরীভূত করা।[319]
কোনো কোনো আলেম এ হাদিসের
বক্তব্যকে এভাবে প্রকাশ করেছেন-
صَدِيقى
مِرئَة اَمِيطٌ بها الاذَي + و غَضَبٌ
سَامٌ ان مَنَعَت حَقي
وَ اِن
ضاَقَ اَمر اَو المت ملمة + لِجاَنَت اِلَيه
دٌونَ كٌل شَقِيق
অর্থাৎ-আমার জন্য আমার বন্ধু আয়না স্বরূপ,
যাকে দেখে আমি আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করে থাকি
এবং আমার বন্ধু আমার জন্য একটি ধারালো তরবারি স্বরূপ।
যখন কোনো ব্যক্তি । আমার হক দানে অস্বীকার করে।
যদি কোনো সংকট দেখা দেয় বা বিপদ এস পড়ে,
তখন আমি আপন ভাইকে ছেড়ে তার শরণাপন্ন হই।
মোটকথা, যেভাবে আয়না মানুষের দৈহিক দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করে তাকে সংশোধন করে দেয়, ঠিক তেমনি একজন মুসলমানের উচিত অন্য মুসলমানের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করে দেওয়া।[320]
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় বুঝে আসে তাহলো, আয়না কিন্তু দোষ-ত্রুটি প্রকাশের ক্ষেত্রে কাউকে অপমান-অপদস্থ করে না,গালি দেয় না, ঝগড়া করে না, শুধু নিরবে দোষ প্রকাশ করে মাত্র। হায় আফসোস! এ হাদিসের শিক্ষা যদি আমরা বাস্তবায়ন করতাম,তাহলে সংশোধনের নামে ঝগড়া-বিশৃঙ্খলা হত না। কাউকে শাসন করার সময়ও তার সম্মান-ইজ্জতের দিকে খেয়াল রাখতে মানবতার নবি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনার চেয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ শিক্ষক এ ধরাতে কেহ আছে কি ?
শাসনের সময়ও সম্মানের প্রতি খেয়াল রাখা, যাতে লজ্জিত না হয় : عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ بُرَيْدَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ حَلَفَ بِالْأَمَانَةِ فَلَيْسَ مِنَّا، وَمَنْ عَيَّرَ مُسْلِمًا فِي خَادِمِهِ وَأَهْلِهِ فَلَيْسَ مِنَّا: অর্থ: সালমান বিন
বুরাইদাই (রা.) তার পিতা হতে তিনি
নবি (ﷺ) করিম হতে বর্ণনা করেছেন, রসূল (ﷺ) বলেছেন- যে কোনো মুসলমানকে তার চাকর-চাকরানি ও পরিবারের সামনে অপদস্থ করলো সে আমার উম্মত নয়।[321]
নোট : হাদিসটির সনদ খুঁজে পাইনি। তবে অন্য বর্ণনা দ্বারা হাদিসটির সারমর্মের প্রতি বলিষ্ঠ সমর্থন
রয়েছে।
প্রিয় মুসলিম ভাইগণ! বিশ্বমানবতার শ্রেষ্ঠ
শিক্ষক মানুষ তথা মুসলমানকে সম্মানের সর্বোচ্চ স্তর শিক্ষা দিয়েছেন। আমার জানা একটি ঘটনা বর্ণনা করছি : কোনো একটা বিষয়ে বড় ভাই ছোটকে চড় মারে, তার স্ত্রীর
সামনে। এতে ছোট ভাই অপমান সইতে না পেরে, আম গাছের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।
এ রকম হাজারো অসংখ্য ঘটনা আমাদের সমাজে
প্রতিনিয়িত ঘটছে। হায়! মুসলিম সমাজ যদি মানবতার নবি শাসনের ক্ষেত্রেও যে সম্মানের প্রতি লক্ষ্য রাখতে
বলেছেন, যেন সে লজ্জিত না হয়। তাহলে অপ্রত্যাশিত-অকাঙ্খিত ঝগড়া-মারামারি-আত্মহত্যা বহু অংশে লোপ পেত।
শাসনের সময় চেহেরায় আঘাত না করা : عَنْ
أَبِى الزِّنَادِ عَنِ الأَعْرَجِ عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِىَّ -صلى
الله عليه وسلم- قَالَ :« إِذَا ضَرَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَجْتَنِبِ الْوَجْهَ » অর্থ: আবু হুরাইরা (রা.)
থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: যখন তোমাদের মাঝে কোন ভাই তার ভাই-এর সাথে
ঝগড়া-বিবাদ করে তখন সে যেন তার মুখের উপর আঘাত করা থেকে বিরত
থাকে।[322]
মুমিন মুমিনের গিবত
করবে না
গিবত বা পরনিন্দা একটি সামাজিক ব্যাধি। ইসলামে গিবত শুধু হারাম হয়নি; বরং
নিন্দা-ভৎর্সনা করা হয়েছে। মৃত্যুর ব্যক্তির গোশতের সাথে তুলনা করা
হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন- وَلَا يَغۡتَب بَّعۡضُكُم بَعۡضًاۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمۡ أَن يَأۡكُلَ لَحۡمَ أَخِيهِ مَيۡتٗا فَكَرِهۡتُمُوهُۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ تَوَّابٞ رَّحِيمٞ .অর্থ: এবং তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের মধ্যে
কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোস্ত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক। আর
তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবা কবুলকারী, অসীম
দয়ালু।[323]
এই
আয়াতে কোনো মুসলমানের বেইজ্জতি ও অপমানকে তার গোশত খাওয়ার সমতুল্য সাব্যস্ত করেছে। অন্য আয়াতে এসেছে-وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ (প্রত্যেক পশ্চাতে ও সম্মুখে
পরনিন্দাকারীর দুর্ভোগ। সূরা
হুমাযাহ-০১) সংশিষ্ট ব্যক্তি
সামনে উপস্থিত না থাকলে তার পশ্চাতে কষ্টদায়ক কথাবার্তা বলা মৃত মানুষের গোশত ভক্ষণের সমতুল্য। কোনো মৃত মুসলমানের গোশত খাওয়া যেমন হারাম ও
চূড়ান্ত নীচতা, তেমনি গিবত করাও হারাম এবং নীচতা। কারণ, অসাক্ষাতে কাউকে মন্দ বলা
কোনো বীরত্বের কাজ নয়।
হজরত
আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণিত শবে মেরাজের
হাদিসে রসূলুল্লাহ (ﷺ)
বলেন, আমাকে নিয়ে যাওয়া হলে আমি এমন এক সম্প্রদায়ের
কাছ দিয়ে গেলাম যাদের নখ ছিল তামার। তারা তাদর মুখমণ্ডল ও দেহের মাংস আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিবরাঈল (আ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম এরা কারা ? তিনি বললেন : এরা তাদের
ভাইয়ের গিবত করত এবং তাদের ইজ্জতহানি করত।–মাজহারি বিস্তারিত দেখুন-গিবত ভয়াবহ-আল্লামা
নাখলাভি রহ.; লেখকের ‘মুসলিম জীবন সাফল্যে চল্লিশ হাদিস’ -৯৪ পৃ.
গিবতের মাধ্যমে আল্লাহর হক ও বান্দার হক উভয়ই নষ্ট হয়। তাই যার গিবত করা হয়, তার কাছ থেকে মাফ নেয়া জরুরী। কোনো কোনো আলেম বলেন : যার গিবত গিবত করা হয়, গিবতের সংবাদ তার কাছে না পৌঁছা পর্যন্ত বান্দার হক হয় না। তাই তার কাছ থেকে ক্ষমা নেয়া জরুরী
নয়।–রুহুল-মাআনি কিন্তু বয়ানুল কুরআনে একথা উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে : এমতাবস্থায় যদিও তার কাছে ক্ষমা চাওয়া জরুরী
নয়, কিন্তু যার সামনে গিবত করা হয়,তার সামনে নিজেকে মিথ্যাবাদী বলা এবং নিজ গুনাহ স্বীকার করা জরুরী। যদি সেই ব্যক্তি মারা যায়, কিংবা লাপাত্তা হয়ে যায়, তবে তার কাফফারা এই যে,
যার গিবত করা হয়েছে,তার জন্যে আল্লাহর কাছে
মাগফেরাতের দোআ করবে এবং বলবে : হে আল্লাহ আমার ও তার গুনাহ মাফ কর।[324]
মাসয়ালা, সব গিবতই কি হারাম ? কোনো কোনো রেওয়ায়েত থেকে
প্রমাণিত হয় যে, আয়াতে সব গিবতকেই হারাম করা হয়নি এবং কতক গিবতের
অনুমতি আছে। উদাহরণত-
কোনো অত্যাচারীর অত্যাচার কাহিনী এমন ব্যক্তির সামনে বর্ণনা করা, যে তার অত্যাচার দূর করতে সক্ষম। কারও সন্তান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে তার পিতা ও স্বামীর কাছে অভিযোগ
করা, কোনো ঘটনা সম্পর্কে ফতওয়া গ্রহণ
করার জন্যে ঘটনার বিবরণ দান করা, মুসলমানেরকে কোনো ব্যক্তির সাংসারিক
অথবা পারলৌকিক অনিষ্ট থেকে বাঁচানোর জন্যে তার অবস্থা বর্ণনা করা, কোনো ব্যাপারে পরামর্শ নেওয়ার জন্যে সংশিষ্ট ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা। যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে গুনাহ করে এবং নিজের পাপাচারকে নিজেই প্রকাশ
করে, তার কুকর্ম আলোচনা করাও গিবতের
মধ্যে দাখিল নয়, কিন্তু বিনা প্রয়োজনে নিজের সময় নষ্ট করার কারণে
মাকরুহ। -বয়ানুল কুরআন; রুহুল মাআনি
এসব মাসআলায় অভিন্ন বিষয় এই যে, কারও দোষ আলোচনা করার
উদ্দেশ্য তাকে হেয় করা
না হওয়া চাই; বরং প্রয়োজনবশতই আলোচনা হওয়া চাই।[325]
আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মর্যাদা
ইসলামের প্রথম মুমিন-মুসলমান হলেন, আমাদের প্রিয় নবি হজরত মুহাম্মাদ (ﷺ) । স্বয়ং নবি হলেও, তাওহিদ
ও নিজের রেসালাতের ওপর ঈমান আনা ফরজ ছিল। (যেমন- আল্লাহ তাআলা কলেন, آمَنَ
الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ
بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِঅর্থাৎ রসূল
বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং
মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহের
প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি।[326]
তাই তিনি সর্বপ্রথম মুমিন। সুতরাং তাঁর মর্তবা আলোচনাও কিতাবের শিরোনামের (নামের) অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহর নিকট রসূলে কারিমের (ﷺ) কী ইজ্জত-সম্মান তা কিঞ্চিত উল্লেখ করলাম।
রসূল (ﷺ)কে সম্মান করা আল্লাহর নির্দেশ : মহান আল্লাহ বলেন,لِتُؤْمِنُوا
بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا অর্থ: যাতে তোমরা আল্লাহ ও রসূলের প্রতি ঈমান আন, তাকে সাহায্য
কর, তাকে সম্মান কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর
তাসবিহ পাঠ কর।[327]
উক্ত আয়াতটিতে তৃতীয় সর্বনামটি খালেসভাবে আল্লাহর। তবে প্রথম দুটি সর্বনাম সম্পর্কে মতামত রয়েছে। কারও কারও মতে. প্রথম দুটি
সর্বনামও আল্লাহর। আবার কারও
কারও মতে, প্রথম দুটি সর্বনাম দ্বারা রসূল (ﷺ) কে বুঝিয়েছেন। তাহলে অর্থ হবে
তোমরা রসূলকে সাহায্য কর, তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর এবং
আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা কর।[328]
রসূলের নামকে আল্লাহ তাআলা সমুচ্চ করেছেন : পবিত্র কুরআনের বাণী: وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ
অর্থাৎ আমি তোমার খ্যাতিকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছি। সূরা নাশরাহ-০৫ হজরত মুজাহিদ(রহ.) বলেন, এই আয়াতের অর্থ হল,
আমি এমন ব্যবস্থা করে রেখেছি যে, যখনই আমার নাম
স্মরণ করা হবে, সাথে সাথে আপনার নামও স্মরণ করা হবে। ইসলামের বৈশিষ্ট্যমূলক কর্মসমূহের আল্লাহর নামের
সাথে তাঁর নাম উচ্চারণ করা হয়। সারা বিশ্বের মসজিদসমূহের মিনারে ও মিম্বারে أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلهَ إلا الله ‘আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর সাথে সাথে أشهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً رَسُولُ الله ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ’ বলা হয়ে থাকে। এছাড়া বিশ্বের
কোনো জ্ঞানী মানুষ তাঁর নাম সম্মান প্রদর্শন ব্যতিত উচ্চারণ করে না, যদিও সে অমুসলিম হয়।
হজরত
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন যে, রসূলুল্লাহ (ﷺ) একদিন আমার
নিকট আসিয়া বললেন, আপনার ও আমার প্রতিপালক বলেছেন যে, তিনি আপনার মর্যাদা কিভাবে উচ্চ করবেন ? উত্তরে আমি বললাম, আল্লাহই ভালো জানেন। অতঃপর জিবরিল (আ.)নিজেই বললেন,
যখন আল্লাহর নাম স্মরণ করা হবে,সঙ্গে আপনার নামও
স্মরণ করা হবে। রুমিয়ে জামানা,আরিফ বিল্লাহ হজরত মাওলানা আব্দুল মতিন বিন হুসাইন হাফিজাল্লাহু তাআলা এ প্রসঙ্গে বলেন, “নামাজ খোদ তাওহিদ ওয়ালা (বিশিষ্ট) ইবাদত, সেখানেও তাশাহুদের ভেতর ও দরুদ পড়ার বিধান রেখে
রসূলের নাম সমুন্নত করেছেন।”
অন্য
মুফাসসিরগণ বলেন, ইহার অর্থ হল, পূর্ব যুগের
নবিগণের মধ্যে আল্লাহ আপনার নাম আলোচনার ব্যবস্থা করে এবং সমস্ত রসূল হতে আপনার ওপর
ঈমান আনিবার ও উম্মতদেরকে আপনার ওপর ঈমান আনিবার নির্দেশ দেওয়ার অঙ্গীকার লয়ে আপনার
মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছে। অতঃপর আপনার উম্মতের মধ্যে আপনার প্রসিদ্ধ করে দিয়েছি। ফলে আপনার নাম ব্যতিত আপনার নাম স্মরণ করা হয় না।[329]
সকল নবিদের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের কারণ
: ইবনে আবু
হাতিম (রহ.) বলেন, আবু আব্দুল্লাহ
জাহরানি (রহ.) হজরত ইবনে আব্বাস
(রা.) হতে বর্ণনা বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা হজরত মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে আকাশের অধিবাসী ও আম্বিয়ায়ে কিরামের ওপর মর্যাদাশীল করেছেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, অন্যান্য অম্বিয়ায়ে
কিরামের ওপর –এর মর্যাদাশীল হবার কারণ
কী ? তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন
: অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা অন্যান্য সকল নবিকে তার স্বভাষী লোকদের নিকট প্রেরণ করেছেন,
কিন্তু মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে সমগ্র মানবজাতির নিকট প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে- وَمَا أَرْسَلْنَاكَ
إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ অর্থ: আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী
রূপে পাঠিয়েছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।[330]
আল্লাহ
তাআলা তাকে মানুষ ও জিন উভয় জাতির হেদায়তের জন্য প্রেরণ করেছেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)যা বলেছেন বুখারি ও মুসলিম এর বর্ণনা দ্বারা তা প্রমাণিত। হজরত জাবির (রা.)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন
:
"أُعطيتُ خمسًا لم يُعْطَهن أحد من قبلي: نُصرتُ بالرعب مسيرة شهر، وجُعلت لي الأرض مسجدًا وطهورًا فأيّما رجل من أمتي أدركته الصلاة فليصلِّ، وأحِلَّتْ لي الغنائم ولم تحلَّ لأحد قبلي، وأُعطيتُ الشفاعةَ، وكان النبي يُبعث إلى قومه خاصة وبُعثت إلى الناس عامة" অর্থ: আমাকে পাঁচটি এমন বস্তু দান করা
হয়েছে, যা আমার পূর্বে কোনো নবিকে দেওয়া হয় নাই। আমাকে এমন প্রভাব দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে যে, একমাস দূরত্বেও তা প্রতিফলিত হয়। ভূমিকে আমার জন্য সালাতের স্থান ও পবিত্রকারী করা হয়েছে। যে কোনো স্থানে যার সালাতের সময় হয়ে যায় সে যেন
সালাত সেখানে আদায় করে নেয়। আমার জন্য গনিমতের মাল হালাল করা হয়েছে,যা আমার পূর্বে কারও
জন্য হালাল করা হয় নাই। আমাকে সুপারিশ করার মর্যাদা দান করা হয়েছে। আমার পূর্বে কোনো নবি কেবল তার কওমের নিকট প্রেরণ
করা হয়েছে কিন্তু আমাকে সারা মানব জাতির জন্য পাঠানো হয়েছে। বুখারি-৩৩৫;মুসলিম-৫২১,আহমদ-১৪২৬৮ বুখারি শরিফে বর্ণিত
: আমাকে লাল-কালো সকলের নিকট নবি হিসেবে
প্রেরণ করা হয়েছে। মুজাহিদ (রহ.) বলেন, মানুষ ও জিন জাতির প্রতি প্রেরণ করা হয়েছে। অন্যান্য তাফসিরকারকগণ বলেন, আরব ও আজম –এর প্রতি প্রেরণ করা হয়েছে। তবে উভয় ব্যাখ্যাই বিশুদ্ধ।[331]
সালাতে দরুদ শরিফের স্থান ও তার হিকমত
: একথা সর্বজনবিদিত যে, দরুদ শরিফ সালাতের শেষ বৈঠকে তাশাহুদের পর পাঠ করা হয়। আর এটাই এর জন্য উপযুক্ত স্থান আল্লাহর বান্দাগণ রসূলুল্লাহ
(ﷺ) প্রদর্শিত শিক্ষা লাভের মাধ্যমেই ঈমান আনার সুযোগ লাভ করেছে। আল্লাহ তাআলাকে জানা এবং সালাতের তাঁর মহান দরবারে উপস্থিতি, তাসবিহ-তাহলিল পাঠ এবং মুনাজাত করার মধ্য
দিয়ে এক ধরণের মিরাজ নসিব হয় আর শেষ বৈঠকে তাশাহুদ পাঠের মাধ্যমে তা পূর্ণতা লাভ করে। কাজেই আল্লাহর গুণগান থেকে অবসর গ্রহণের পূর্বে, নিজের জন্য কিছু প্রার্থনার আগে মুসল্লি নবি (ﷺ)-এর অনুগ্রহ অনুভব করে, তাঁর প্রদর্শিত পথের স্মরণ করে তাঁর জন্য আল্লাহর মহান দরবারে দোআ করে। তিনি ও তাঁর পূতঃপবিত্র স্ত্রীগণের ও সন্তান-সন্ততির জন্য নিজের সর্বোত্তম সম্বল দরুদের মাধ্যমে দোআ করে। এর চাইতে উত্তমরূপে তাঁর অনুগ্রহ সম্রণের কোন উপযুক্ত
প্রক্রিয়া হতে পারে না। এজন্যেই রসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবা-কেরামকে দরুদ শরিফের
এহেন শব্দগুচ্ছ শিক্ষা দিয়েছেন।[332]
আল্লাহ রসূলের জীবনের কসম করেছেন
: لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ
يَعْمَهُونَ অর্থ: আপনার প্রাণের কসম,তারা আপন নেশায় প্রমত্ত ছিল। সূরা হিজর-৭২ এর মধ্যে রসূলুল্লাহ
(ﷺ)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর আয়ুর কসম রেখেছেন। ইমাম বায়হাকি দালায়েলুন্নবুওয়াত গ্রন্থে এবং আবু
নমিয় ও ইবনে মারদুবিয়াহ প্রমুখ তাফসিরবিদ হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ
তাআলা সমগ্র সৃষ্টজগতের মধ্যে কাউকে মুহাম্মাদ মুস্তফা(ﷺ) –এর চাইতে অধিক সম্মান ও মর্যাদা দান করেননি। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা
কোনো পয়গম্বর অথবা ফেরেশতার আয়ুর কসম খাননি। এবং আলোচ্য আয়াতে রসূলুল্লাহ (ﷺ) –এর আয়ুর কসম খেয়েছেন। এটা রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি চূড়ান্ত সম্মান
প্রদর্শন ছাড়া আর কিছু নয়।[333]
শুধু তাই নয় রসূল যে পবিত্র নগরীতে জন্ম গ্রহণ করেছেন সেই মক্কা নগরেরও কসম করেছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَا أُقْسِمُ بِهَذَا الْبَلَدِ ِ আমি এই নগরীর (মক্কা) শপথ করছি।[334]
আখেরাতে ‘মাকামে মাহমুদ’(প্রশংসিত স্থান) দান : এ প্রসঙ্গে
আল্লাহ তাআলা বলেন,عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا অর্থ: নিশ্চয় আপনার
পালনকর্তা আপনাকে মাকামে মাহমুদে
পৌঁছাবেন। [335]
আমি যে নির্দেশ
আপনাকে দান করেছি। তা আপনি পালন করুন, তাহলে
আপনাকে আমি সেই মাকামে
মাহমুদ ও প্রশংসিত স্থানে
দণ্ডায়মান করব যখন সমস্ত
মাখলুক আপনার ও তাদের
সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা করবে। ইবনে
জারির (রহ.)
বলেন, মাকামে মাহমুদ হল সেই স্থান
যেখানে কেয়ামত দিবসে দণ্ডায়মান
হয়ে রসূলুল্লাহ
(ﷺ) মানুষের জন্য সুপারিশ করবেন। যেন তারা কিয়ামতের ভীষণ
বিপদ হতে রক্ষা পায়। অধিকাংশ তাফসিরকারের মত ইহাই।[336].
এই মাকাম রসূলুল্লাহ (ﷺ) –এর জন্যেই বিশেষভাবে নির্দিষ্ট। অন্য কোনো পয়গম্বরের জন্যে নয়।[337]
রসূলকে কষ্ট দেওয়া হারাম : إِنَّ
الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا
وَالْآخِرَةِ
وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُهِينًا ( অর্থ: নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও রসূলকে
কষ্ট দেয়,আল্লাহ তাদের প্রতি
দুনিয়া ও আখেরাতে লানত করেন এবং তিনি তাদের
জন্য প্রস্তুত রেখেছেন লাঞ্ছনাকর শাস্তি।[338]
আল্লাহর শানে অমর্যাদাকর কথাবার্তা
বলা এবং রসূলের শানে অশোভন আচরণ ও উক্তি করাই হচ্ছে তাঁদেরকে কষ্ট দেওয়ার নামান্তার।[339]
রসূলের যুগে অন্য নবি না প্রেরণ করার
কারণ :
وَلَوْ
شِئْنَا لَبَعَثْنَا فِي كُلِّ
قَرْيَةٍ نَذِيرًا অর্থ: আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক জনপদে একজন সর্তককারী
(নবি) প্রেরণ করতে পারতাম।[340]
রসূল (ﷺ) -এর মহামর্যাদা ও সম্মানের প্রতি লক্ষ্য
করে আল্লাহ তাআলা তাঁর যুগে অন্য কোন জনপদে কোনো নবি-রসূল প্রেরণ করেননি। বরং তাঁকেই সারা বিশ্বের রসূলরূপে পাঠানো হয়েছে।[341]
শেষ বিচারের দিবসে রসূলই হবেন আদম
সন্তানের সর্দার : عَنْ أَبِي سَعِيدٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ “ أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ وَلاَ فَخْرَ وَأَنَا أَوَّلُ مَنْ تَنْشَقُّ الأَرْضُ عَنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ فَخْرَ وَأَنَا أَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ وَلاَ فَخْرَ وَلِوَاءُ الْحَمْدِ بِيَدِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ فَخْرَ ” . অর্থ: আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: কিয়ামতের দিন আমি আদম সন্তানের সরদার হব, তবে এতে গর্বের কিছু নেই(কেননা এতো মহান
আল্লাহর দান)। কিয়ামতের
দিন আমার কবরের মাটি সবার আগে বিদীর্ণ হবে। আমিই প্রথম সুপারিশকারী এবং সবার আগে আমার সুপারিশই গ্রহণ করা
হবে,তবে এতে গর্বের কিছু নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহর প্রশংসার পতাকা আমার হাতে থাকবে। এতেও গর্বের কিছু নেই।[342]
মক্কার কাফেরের দৃষ্টিতে সাহাবিদের
নিকট রসূলের মর্যাদা : فَرَجَعَ عُرْوَةُ إِلَى أَصْحَابِهِ فَقَالَ : أَيْ قَوْمِي وَاللَّهِ لَقَدْ وَفَدْتُ عَلَى الْمُلُوكِ وَوَفَدْتُ عَلَى كِسْرَى وَقَيْصَرَ وَالنَّجَاشِيَّ ، وَاللَّهِ إِنْ رَأَيْتُ مَلِكًا قَطُّ يُعَظِّمُهُ أَصْحَابُهُ مَا يُعَظِّمُ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ مُحَمَّدًا ، وَاللَّهُ إِنْ يَنْتَخِمُ نُخَامَةً إِلَّا وَقَعَتْ فِي كَفِّ رَجُلٍ مِنْهُمْ فَدَلَكَ بِهَا وَجْهَهُ وَجِلْدَهُ وَإِذَا أَمَرَهُمُ ابْتَدَرُوا أَمَرَهُ ، وَإِذَا تَوَضَّأَ كَادُوا يَقْتَتِلُونَ عَلَى وَضُوئِهِ ، وَإِذَا تَكَلَّمَ خَفَضُوا أَصْوَاتَهُمْ عِنْدَهُ ، وَمَا يُحِدُّونَ النَّظَرَ إِلَيْهِ تَعْظِيمًا لَهُ ، অর্থ: ‘অতঃপর উরওয়া ইবনে মাসউদ তার সঙ্গীদের নিকট
ফিরে গেল (অর্থাৎ হুদায়বিয়ার সন্ধির
দিনে মক্কার কাফেররা তাদের প্রতিনিধি হিসেবে উরওয়া ইবনে মাসউদকে রসূলের কাছে
পাঠিয়ে ছিল, সে রসূলের সাথে কথা বলার পর মক্কায় ফিরে যায়) এবং বলল, হে আমার কওম, আল্লাহর কসম, আমি অনেক
রাজা-বাদশাহর নিকটে প্রতিনিধিত্ব করেছি। কায়সার, কিসরা ও নাজাশি সম্রাটের নিকটে দূত হিসেবে গিয়েছি; কিন্তু আল্লাহর কসম করে বলতে পারি যে, কোনো রাজা বাদশাহকেই তার অনুসারীদের মত এত সম্মান করতে
দেখিনি, যেমন মুহাম্মাদের অনুসারীরা তাঁকে করে
থাকে। আল্লাহর
কসম, আল্লাহর রসূল (ﷺ) যদি থুথু ফেলেন, তখন তা কোনো সাহাবির হাতে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে তারা তা
তাদের গায়ে মুখে মেখে ফেলেন। তিনি কোনো আদেশ দিলে তারা তা সঙ্গে পালন করেন; তিনি ওজু করলে তাঁর ওজুর পানি নিয়ে সাহাবিগণের মধ্যে
প্রতিযোগতিা শুরু হয়; তিনি কথা বললে, সাহাবিগণ নিশ্চুপ হয়ে শুনেন। এমনকি তাঁর সম্মার্থে তারা
তাঁর চেহারার দিকেও তাকান না।[343]
নোট :
হাদিসটির অংশ বিশেষ উল্লেখ করা
হয়েছে।
নবির স্ত্রীরা উম্মতের মা,তাঁদেরকে বিবাহ করা হারাম : আল্লাহ তাআলা বলেন,وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ তাঁর পত্নীগণ তাদের মাতা। সূরা আহজাব-০৬ রসূল (ﷺ) -এর সন্মানিতা স্ত্রীগণ মুমিনদের মা অর্থাৎ নিজ জননীকে বিবাহ করা যেমন হারাম,
ঠিকতেমনি তাঁদেরকে বিবাহ করা হারাম। নিজ মায়ের
মতই তাঁদেরকে সম্মান করা,ভক্তি প্রদর্শন করা মুমিনদের
জন্য অপরিহার্য।
রসূল (ﷺ) -এর ইন্তেকালের পা তাঁর স্ত্রীগণকে যেমন অন্য কোন পুরুষের পক্ষে বিবাহ করা হারাম। তেমনি তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর অধীনে থাকা বাঁদীরাও অন্য যে কোন পুরুষের জন্য হারাম। সূত্র :আহকামুল কুরআন ;বুরহানুল কুরআন-৩/৭৫
সাধারণ উম্মতের জন্য বিধান এই যে, স্বামীর মৃত্যুর পর
ইদ্দত অতিবাহিত হলে স্ত্রী অপরকে বিবাহ করতে পারে। কিন্তু নবি
করিম(ﷺ)-এর পত্নীগণের জন্য বিশেষ বিধান
এই যে, তাঁরা রসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর ওফাতের পর কাউকে বিবাহ করতে
পারবেন না। এর কারণ এটাও হতে পারে যে,
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)
তাঁর পবিত্র রওজা শরিফে জীবিত আছেন। তাঁর ওফাত কোনো জীবিত স্বামীর
আড়াল হয়ে যাওয়ার অনুরূপ। এ কারণেই তাঁর ত্যাজ্য সম্পত্তি বণ্টন করা
হয়নি এবং এর ভিত্তিতেই তাঁর পত্নীগণের অবস্থা অপারাপর বিধবা নারীদের মতো হয়নি।
আরও একটি রহস্য এই যে,শরিয়তের নিয়মানুযায়ী জান্নাতে প্রত্যেক
নারী তার সর্বশেষ স্বামীর সাথে অবস্থান করবে। হজরত হুজাইফা(রা.) তার পত্নীকে অসিয়ত করেছিলেন,
তুমি জান্নাতে আমার স্ত্রী থাকতে চাইলে আমার পর দ্বিতীয় বিবাহ করো না। কেননা জান্নাতে সর্বশেষ স্বামীই তোমাকে পাবে।-(কুরতুবি)(অন্য বর্ণনায়
স্ত্রী যাকে ইচ্ছা গ্রহণ করতে পারবেন)
তাই আল্লাহ তাআলা নবি করিম (ﷺ) -এর পত্নীগণকে পয়গম্বরের পত্নী
হওয়ার যে গৌরব ও সম্মান দুনিয়াতে দান করেছেন,পরকালে তা অক্ষুণ্ম
রাখার জন্য তাঁদের বিবাহ অপরের সাথে হারাম করে দিয়েছেন। এছাড়া কোনো স্বামী স্বভাবগতভাবে এটা পছন্দ করে না যে, তাঁর স্ত্রীকে অপরে বিবাহ করুক। কিন্তু এই
স্বাভাবিক মনোবাসনা পূর্ণ করা সাধারণ মানুষের জন্য শরিয়তের আইনে জরুরি নয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর স্বাভাবিক বাসনার প্রতিও আল্লাহ আতালা সম্মান প্রদর্শন করেছেন। এটা তাঁর বিশেষ সম্মান।[344]
অমুসলিম মনীষীর দৃষ্টিতে মুহাম্মাদ(ﷺ) -এর সম্মান-মর্যাদা : পৃথিবীর অসংখ্য
খ্যাতনামা অমুসলিম বিজ্ঞানী-মনীষীগণ মহানবি
(ﷺ) সম্পর্কে
প্রশংসার বাণী উচ্চারণ করেছেন। তারমধ্যে
কয়েকজনের বাণী উল্লেখ করলাম:
(১) Annie Besant in ‘The Life and
Teachings of Mohammad,’ Madras, 1932. ‘যে কেউ
আরবের মহান নবির জীবন এবং চরিত্র অধ্যয়ন করেন তার হৃদয়ে মহান নবির প্রতি শ্রদ্ধার
উদ্রেক না হয়ে পারে না,------- তথাপি যখনই আমি
মুহাম্মদের জীবনি পুনরায় পাঠ করি প্রতিবারই আরবের মহান শিক্ষকের প্রতি আমার মনে
মুগ্ধতা ও শ্রদ্ধার নতুন ভাব জাগ্রত হয়।’
(২) ফরাসি
দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠতম পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদ প্রফেসর লা মার্টিন তার ‘তুরস্কের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন,
‘কার এমন
ধৃষ্টতা আছে যে, ইতিহাসের অন্য কোনো
মহামানবের সাথে হজরত মুহাম্মাদ সা. এর তুলনা করতে পারে ? প্রায়
সব বিখ্যাত মানুষ যদি কিছু অর্জন করেই থাকে তা তো জাগতিক শক্তি সামর্থ্য বৈ কিছুই
নয়, যা প্রায় ক্ষেত্রে তাদের সম্মুখেই টুকরো টুকরো হয়ে ধ্বংস
হয়ে গেছে। মানুষের বিরাটত্ব ও মহত্ত্ব পরিমাপের তাবৎ মানদণ্ড একত্র করে আমাদের
শুধু একটিমাত্র প্রশ্ন : তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর কোনো মানুষ কি আর কোথাও আছেন ?’
লা মার্টিন আরো বলেন, ‘তিনি ছিলেন বিনম্র তবু নির্ভীক, শিষ্ট তবু সাহসী। তিনি ছিলেন সবচেয়ে সম্মানিত, সবচেয়ে উন্নত, বরাবর সৎ, সর্বদাই
সত্যবাদী, শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসী এক প্রেমময় স্বামী, এক হিতৈষী পিতা, এক বাধ্য ও কৃতজ্ঞ পুত্র, বন্ধুত্বে অপরিবর্তনীয় এবং সহায়তায় ভ্রাতৃসুলভ, দয়ার্দ্র,
অতিথিপরায়ণ-------।’
(৩) বিশ্বকবি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবি (ﷺ) উপলক্ষে দেওয়া এক শুভেচ্ছা
বাণীতে বলেন, ‘যিনি
মহত্তমদের মধ্যে অন্যতম, সেই পবিত্র পয়গম্বর হজরত
মুহাম্মাদ (ﷺ) এর উদ্দেশ্যে
আমি আমার অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। মানুষের ইতিহাসে এক নতুন সম্ভাবনাময়
জীবনশক্তির সঞ্চার করেছিলেন হজরত মুহাম্মাদ (ﷺ) । তিনি
এনেছিলেন নিখাদ, শুদ্ধ ধর্মাচরণের আদর্শ।’
(৪) ইংরেজ
কবি জন কিটস বলেন, ‘পৃথিবীর
যা কিছু মঙ্গলময়, যা কিছু মহৎ ও সুন্দর সবই
নবি মুহাম্মাদ (ﷺ).। তাঁর তুলনা তিনি
নিজেই।’
বিশ্বনবিকে নিয়ে অমুসলিমের লেখা বইসমূহ :
এই পৃথিবীতে বিশ্বমানবতার কাণ্ডারি আখেরি নবি হজরত মুহাম্মাদ (ﷺ) কে নিয়ে, তাঁর সম্পর্কে বই রচিত হয়েছে, সমকক্ষ আর কেউ নেই। শুধু মুসলিম লেখকগণই নয় বহু অমুসলিম
লেখক-গবেষক, কবি-সাহিত্যিক,
রাজনৈতিক-বিজ্ঞানীগণ তাঁর সুমহান আদর্শ,
মহত্ব, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সম্মান-ইজ্জত বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। নিম্নে কয়েকটি নাম উল্লেখ করা হল :
১.দ্য হান্ড্রেড : লেখক, মাইকেল এইচ
হার্ট;১৯৭৮ সালে প্রকাশিত,১৯৯২ সালে পূণর্মূদ্রিত।
২.তোমাকে ভালবাসি
হে নবি : লেখক, গুরুদত্ত সিং, অনুবাদ মাও.আবু তাহের মিসবাহ
৩.দ্য ফাস্ট মুসলিম : দ্য স্টোরি অব মুহাম্মাদ, লেখক; দ্য লেসলি হাজলেটন; প্রকাশ ২০১৩ ৪.ইন সার্চ অব মুহাম্মাদ(মুহাম্মাদের
খোঁজে): লেখক,ক্লিন্টন বেনেট ৫.দ্য ভয়েজ অব হিউম্যান জাস্টিস : লেখক, জর্জ জর্ডেক ৬.এ প্রফেট অব আওয়ার টাইম : লেখক, কারেন আর্মস্ট্রং
৭.হজরত মুহাম্মাদ কি আলমে ইনসানিয়্যাত পর আজিম ইহসানাত (মানবতার প্রতি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর অনুগ্রহ): লেখক,
লালা রাম লাল ভর্মা
৮.ওয়াহদানিয়্যাত কা মাতওয়ালা(একত্ববাদের প্রেমিক)
: লেখক, বুদ্ধ বীর সিং ৯.আরব কা চাঁদ (আরবের চাঁদ) : লেখক,
স্বামী লক্ষ্মী প্রসাদ,প্রকাশ:১৯৩২
১০.মহাপুরুষ মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) : লেখক, বান্দাত গোপাল কৃষ্ণ
(সম্পাদক, ভারত সমাচার)
নোট : মাইকেল হার্ট-এর দ্য হান্ড্রেড(একশত মনীষীর জীবনি)গ্রন্থে ইতিহাসের সর্বাধিক প্রভাবশালী
ব্যক্তিগণের তালিকায় প্রথম ব্যক্তি হলেন, ইসলামের নবি হজরত
মুহাম্মাদ (ﷺ), এমন একটি নির্বাচন, যা
বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। হার্ট একজন খৃষ্টান হওয়া সত্ত্বেও এবং তিনি জানতেন তার স্বজাতি এটা মেনে নিতে পারবে
না, কিন্তু তিনি পরম সত্যকেই স্থান দিয়েছেন।
আম্বিয়া-কিরামের সম্মান-মর্যাদা
নবিগণ আলাহিস সালাম হলেন প্রথম কাতারের মুমিন । মহান আল্লাহর নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ মানব। তাঁদের প্রতি ঈমান আনার পর তাঁদেরকে ভালবাসা, সম্মান-ইজ্জত করাও ইসলামের নির্দেশ। তাঁরা
হচ্ছেন হেদায়তের আলোকবর্তিকা-মশাল। যে আলো দ্বারা যুগে যুগে মানুষকে তাওহিদ-আল্লাহ প্রেমের শুরা পান করিয়েছেন এবং পশুরাত্মা দূর করে মানবাত্মায়
রূপান্তারিত করেছেন।
নবি-রসূলগণের মধ্যে
কোন ভাগ নেই : সকল নবি একই কালেমার দাওয়াত
দিয়েছেন,তবে শরিয়ত কিছুটা ভিন্ন ছিল। তাই আমরা কোন নবিকে
ভাগ করি না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,(১) قُلْ آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَالنَّبِيُّونَ مِنْ رَبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ অর্থ: বলুন, আমরা
আল্লাহ ও আমাদের প্রতি যা নাজিল হয়েছে এবং ইব্রাহিম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও
তাঁর বংশধরগণের প্রতি যা নাজিল হয়েছিল এবং যা মুসা, ঈসা ও অন্যান্য নবিগণকে তাঁদের
রবের পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়েছিল তাতে ঈমান এনেছি; আমরা তাঁদের কারও মধ্যে কোন তারতম্য
করি না। আর আমরা তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণকারী (তথা মুসলিম)।[345]
(২)لَا نُفَرِّقُ
بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ
وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا অর্থ: তারা বলে,আমরা তাঁর পয়গম্বরগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি
না। তারা বলে,আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি।[346]
আমাদের
মহানবি মুহাম্মাদ (ﷺ) অন্যান্য নবিদের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত ও তাঁদের সাথে কেমন সম্পর্ক
তার উদাহরণ পেশ করেছেন। যেমন, عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ - رضي الله عنه - أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - قَالَ مَثَلِي وَمَثَلُ الْأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِي كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بُنْيَانًا فَأَحْسَنَهُ وَأَجْمَلَهُ إِلَّا مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ زَاوِيَةٍ مِنْ زَوَايَاهُ فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُونَ بِهِ وَيَعْجَبُونَ لَهُ وَيَقُولُونَ هَلَّا وُضِعَتْ هَذِهِ اللَّبِنَةُ قَالَ فَأَنَا اللَّبِنَةُ وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ. অর্থ: আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন আমার
উদাহরণ ও আমার পূর্ববর্তী নবিগণের উদাহরণ হচ্ছে- ঐ ব্যক্তির মত যিনি একটি বাড়ি
বানিয়েছেন এবং সে বাড়িটি সৌন্দর্যমণ্ডিত ও সুশোভিত করেছেন। তবে এক কর্নারের একটি
ইট ছাড়া। লোকেরা সে বাড়িটি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল, দেখে বিমোহিত হচ্ছিল এবং বলছিল, এই
জায়গাতে যদি ইটটি রাখা হত। আমি হচ্ছি সেই ইট। আমি হচ্ছি- সর্বশেষ নবি।[347]
নবিগণ মাসুম বা নিষ্পাপ : ইসলামি শরিয়তের
আলোকে عصمت বা নিষ্পাপ হওয়া নবিদের জন্য অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ, বরং عصمت এর ক্ষেত্রে নবিগণ ফেরেশতা থেকেও অধিক হকদার। যেমন নিবরায কিতাবে عصمت সম্পর্কে ইমাম মাতুরিদি রহ. বলেন, اَلْأَنْبِيَاءُ أَحَقُّ بِالْعِصْمَةِ مِنَ الْمَلئِكَةِ
অর্থাৎ নবিগণ ফিরিশতাদের তুলনায় ইসমতের অধিক হকদার।[348]
মাওলানা বদরে আলম মিরাঠি (রহ.) বলেন,নবুওয়াত
ও ইসমত একই হাকিকতের দুটি পৃথক পৃথক দিক অর্থাৎ যিনি নবি তিনি অবশ্যই মাসুম আর
যিনি মাসুম তিনি অবশ্যই নবি হবেন। সারকথা হলো, ইসমত হলো নবি-রসূলগণের অস্তিত্বের
অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুতরাং ক্ষণিকের জন্যও ইসমত নবি-রসূলগণের সত্তা হতে বিভিন্ন
হয় না। [349]
পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে অনেক আয়াতে এসেছে-যেমন (১)لَأُزَيِّنَنَّ
لَهُمْ فِي الْأَرْضِ
وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ
أَجْمَعِينَ
(39) إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ অর্থ: আমিও তাদের সবাইকে পৃথিবীতে নানা সৌন্দর্য-এ আকৃষ্ট করব এবং তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ঠ করে দেব। তবে আপনার বিশিষ্ট বান্দাদের ব্যতিত।[350]
(২)قَالَ هَذَا
صِرَاطٌ عَلَيَّ مُسْتَقِيمٌ (41) إِنَّ عِبَادِي
لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ
سُلْطَانٌ অর্থ: আল্লাহ বললেন : এটা আমার পর্যন্ত সোজা পথ। যারা আমার ব্ন্দা, তাদের উপর তোর কোন
ক্ষমতা নেই।[351]
উপরোক্ত
আয়াতসমূহ দ্বারা জানা যায়, আল্লাহ তাআলার মনোনীত বান্দাগণের উপর
শয়তানের কারসাজির প্রভাব পড়ে না। নবি-রসূলগণ আল্লাহ তাআলার বিশিষ্ট বান্দা নয় তো কারা
? হজরতে আম্বিয়া-কিরাম যে, মনোনীত এ সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ ذُرِّيَّةً بَعْضُهَا مِنْ بَعْضٍ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ অর্থ: নিঃসন্দেহে আল্লাহ আদম, নুহ ও ইব্রাহিম-এর বংশধর এবং
এমরানের খান্দানকে নির্বাচিত করেছেন। যারা পরস্পর ছিলেন ছিলেন পরস্পরের। আল্লাহ শ্রবণকারী ও মহাজ্ঞানী। সূরা আলে
ইমরান,৩৩-৩৪ সুতরাং প্রমাণিত হলো যারা শয়তানের ওসওসা
থেকে নিরাপদ তাঁরা নিষ্পাপ। নিম্নে হাদিসটি দ্বারা বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হবে আশা করিঃ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا لَقِيَكَ الشَّيْطَانُ سَالِكًا فَجًّا إِلَّا سَلَكَ فَجًّا غَيرَ فَجِّكَ» রসূলুল্লাহ
(ﷺ) বললেন: যার হাতে আমার প্রাণ
তাঁর শপথ! শয়তান যখন তোমাকে(অর্থাৎ
ওমর রা.) কোন পথে চলতে দেখে, তখন সে তোমার
পথ ছেড়ে অন্য পথ ধরে।[352]
নোট
: হাদিস অংশ বিশেষ
প্রিয়
বন্ধুগণ! রসূলের উম্মতের থেকে যদি শয়তান পলায়ন করে, তাহলে নবি-রসূলগণের ওপরে তার প্রভাব হতেই পারে না। অত্রতব, মানব জাতির শ্রেষ্ঠ
জামাত গুনাহ করতে পারে না।
(৩) হজরত ইউসুফ আ
. বলেছিলেন, কুরআনের ভাষায় : مَا كَانَ لَنَا أَنْ نُشْرِكَ بِاللَّهِ مِنْ شَيْءٍ ذَلِكَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ عَلَيْنَا وَعَلَى النَّاسِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ অর্থ: আমরা নবি সম্প্রদায়ের পক্ষে খোদার সঙ্গে শিরক করাটা অশোভনীয়। এটা আমাদের ও সমস্ত মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। কিন্তু মানুষই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।[353]
(৪)وَمَا أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَى
مَا أَنْهَاكُمْ عَنْهُ إِنْ أُرِيدُ
إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ
وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ অর্থ: আর আমি চাই না যে তোমাদেরকে
যা ছাড়াতে চাই পরে নিজেই সে কাজে লিপ্ত হব, আমি তো যথাসাধ্য শোধরাতে
চাই। আল্লাহর মদদ দ্বারা কিন্তু কাজ হয়ে
থাকে,আমি তাঁর উপরই নির্ভর করি এবং তাঁরই অভিমুখী।[354]
সাওরি রহ. বলেন , এই আয়াতের অর্থ হলো, আমি এমন নই যে আমি তোমাদেরকে একটি কাজ হতে বিরত রাখব আর আমি নিজেই গোপনে ইহাতে লিপ্ত হব। কাতাদাও (রহ.) এরূপ অর্থ করেছেন।[355]
(৫)لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ অর্থ: “ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না
আল্লাহ তাঁদেরকে যা আদেশ করেন তা এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয় তাই করে।[356]
ফেরেশতারাই
যেহেতু আল্লাহ তাআলার কোন নাফরমানি করে না আর নবি-রসূলগণ তো তাঁদের
চেয়ে অনেকে ঊর্ধ্বে। এই পবিত্র জামাত দ্বারা গুনাহ সংঘটিত হতে পারে না। অত্রতব, প্রমাণিত হলো মানবকুলের শ্রেষ্ঠ
জামাত পয়গম্বরগণ নিষ্পাপ।
(৬) قَالَ يَا قَوْمِ لَيْسَ بِي ضَلَالَةٌ وَلَكِنِّي رَسُولٌ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ অর্থ: সে বলল : হে আমার সম্প্রদায়! আমি কখনও ভ্রান্ত নই; কিন্তু আমি বিশ্বপ্রতিপালকের রসূল।[357]
ওলামায়ে
উম্মতের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত এই যে, নবিগণ ছোট-বড় যাবতীয় পাপ থেকে মুক্ত ও পবিত্র। কারণ, হযরতে আম্বিয়ায়ে-কেরামগণকে বিশ্ব মানবতার অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছিল। যদি তাঁদের দ্বারাও আল্লাহ পাকের ইচ্ছার বিরোধী
ছোট-বড় কোন পাপ কাজ সম্পন্ন হত, তবে নবিগণের বাণী
ও কার্যবলীর উপর আস্থা ও বিশ্বাস উঠে যেত। যদি নবিগণের উপর আস্থা ও বিশ্বাস
না থাকে, তবে দীন ও শরিয়তের স্থান কোথায়?
নবিগণ কর্তৃক ভুল-ত্রুটি হওয়ার
বিধান কি ? এ সম্পর্কে উম্মতের সর্বসম্মত অভিমত এই যে,
কোন ভুল বুঝাবুঝি বা অনিচ্ছাকৃত কারণে নবিদের দ্বারা এ ধরণের কাজ সংঘটিত
হয়ে থাকে। কোন নবি জেনে শুনে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে
আল্লাহ পাকের হুকুমের পরিপন্থি কোন কাজ করেননি। এ ত্রুটি ইজতেহাদ ও অনিচ্ছাকৃত এবং তা ক্ষমার যোগ্য। শরিয়তের পরিভাষায় একে পাপ বলা চলে না এবং এ ধরণের
ভ্রান্তিজনক ও অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি সেসব বিষয়ে হতেই পারে নাম, যার শিক্ষা-দীক্ষা এবং শরিয়তের প্রচারের সাথে রয়েছে,
বরং তাঁদের ব্যক্তিগত কাজ-কর্মে এ ধরণের ভুলত্রুটি
হতে পারে। কিন্তু যেহেতু আল্লাহ পাকের দরবারে
নবিগণের স্থান ও মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চে এবং যেহেতু মহান ব্যক্তিবর্গের দ্বারা ক্ষুদ্র
ত্রুটি বিচ্যুতি সংঘটিত হলেও তাকে অনেক বড় মনে করা হয় সেহেতু কুরআন হাকিমে এ ধরণের
ঘটনাবলীকে অপরাধ ও পাপ বলে অভিহিত করা হয়েছে, যদিও প্রকৃতটপক্ষে
সেগুলো আদৌ পাপ নয়।[358]
নবিদেরকে গালি বা মন্দ বলা
সম্পর্কে মুসলিম মনীষীদের অভিমত : (১) ইবনে নুজাইম আল-হানাফি (রহ.)
বলেন: কেউ কোন নবির উপর কোন দোষারোপ করলে সে কাফের হয়ে যাবে।[359]
(২) শাইখুল ইসলাম ইবনে
তাইমিয়া বলেন : নবিদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- যে ব্যক্তি কোন একজন নবিকে গালি
দিবে ইমামদের সর্বসম্মতিক্রমে তাকে মুরতাদ হিসেবে হত্যা করা হবে। যেমনিভাবে কোন নবিকে
অস্বীকার করলে ও তিনি যা নিয়ে এসেছেন সেটাকে অস্বীকার করলে যে কেউ মুরতাদ হয়ে যায়।
কারণ কারও ঈমান পরিপূর্ণ হবে না যতক্ষণ না সে আল্লাহর প্রতি, তাঁর
ফেরেশতাগণের প্রতি,
তাঁর গ্রন্থাবলীর প্রতি ও তাঁর রসূলগণের প্রতি ঈমান না আনবে।[360]
(৩) কাজি ইয়াজ (রহ.)
বলেন :
যে ব্যক্তি তাঁকে (অর্থাৎ রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে) অপমান করবে কিংবা অন্য কোন নবিকে অপমান
করবে কিংবা মর্যাদা ক্ষুণ্ন করবে কিংবা তাদেরকে কষ্ট দিবে কিংবা
কোন নবিকে হত্যা করবে কিংবা কোন নবির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে সে ব্যক্তি
সর্বসম্মতিক্রমে কাফের।[361]
হজরত সুলাইমান (আ.)-এর ইচ্ছার প্রতি সম্মান
প্রদর্শন :
حَدَّثَنَا مُحَمَّدٌ وَهُوَ ابْنُ زِيَادٍ، قَالَ: سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ، يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " إِنَّ عِفْرِيتًا مِنَ الْجِنِّ جَعَلَ يَفْتِكُ عَلَيَّ الْبَارِحَةَ، لِيَقْطَعَ عَلَيَّ الصَّلَاةَ، وَإِنَّ اللهَ أَمْكَنَنِي مِنْهُ فَذَعَتُّهُ، فَلَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ أَرْبِطَهُ إِلَى جَنْبِ سَارِيَةٍ مِنْ سَوَارِي الْمَسْجِدِ، حَتَّى تُصْبِحُوا تَنْظُرُونَ إِلَيْهِ أَجْمَعُونَ - أَوْ كُلُّكُمْ - ثُمَّ ذَكَرْتُ قَوْلَ أَخِي سُلَيْمَانَ: {رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِنْ بَعْدِي} [35]، فَرَدَّهُ اللهُ خَاسِئًا ", (م) 39 - (541)
অর্থ : হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,গত রাতে এক দুষ্ট জিন আমার সালাত নষ্ট করার জন্য
আমার উপর আক্রমন করতে শুরু করল। তবে আল্লাহ তাআলা আমাকে কাবু করার শক্তি দান করলেন। আমি তাকে গলা টিপে ধরেছিলাম। আমার ইচ্ছা হলো তাকে মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখি যাতে
সকাল বেলা তোমরা সবাই তাকে দেখতে পাও। কিন্তু তখনই আমার স্মরণ হল আমার ভাই নবি সুলাইমানের দোআর কথা। তিনি দোআ করেছিলেন : হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে এমন রাজত্ব দান করো যা আমার পরে আর কার জন্য যেন না হয়। সূরা সোয়াদ-৩৫(অর্থাৎ- জিন, বাতাস ও পশু-পাখির ওপর রাজত্ব করার ক্ষমতা। তাই আমি তাকে বেঁধে রাখা থেকে বিরত
থাকলাম।) অতঃপর আল্লাহ তাআলা জিনটিকে (আমার হাতে) লাঞ্ছিত করে তাড়িয়ে দিলেন।[362]
অপর এক হাদিস শরিফে এসেছে-আল্লাহ্র শপথ করে বলছি, আমাদের ভাই নবি সুলাইমান যদি দোআ না করে থাকতেন, তাহলে সে সকাল পর্যন্ত বাঁধা
থাকত। আর সকালবেলা মদিনাবাসীদের ছেলে সন্তানেরা তাকে নিয়ে আনন্দ করত বা মজা করে
খেলত।[363]
প্রিয়
মুসলিম ভাইগণ! উপরোক্ত হাদিস দুটি থেকে জানতে পারলাম যে,
বিশ্বনবি হজরত সুলাইমান
(আ.)-এর দুআ ও
ইচ্ছার প্রতি সম্মানের কারণে তিনি শয়তানকে বেঁধে রাখলেন না। নবি যদি নবির
ইচ্ছার সম্মান দিতে
পারে, তাহলে আমরা
কেন অপর মুসলমানের ইচ্ছা-অনুরাগের সম্মান দিতে পারব
না ?
নবিদের দেহ মাটির জন্য হারাম : মানুষ মাটির তৈরি আবার মাটিতে তার দাফন পরিশেষে আবার সেখান থেকে উত্থিত হবে। আল্লাহ তাআলা যেসব বান্দাদের ব্যাপারে ইচ্ছা করবেন, তাদের শরীর মাটিতে মিশে যাবে না ; হুবহু সংরক্ষিত থাকবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সমস্ত নবি-রসূলগণের শরীর মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন, তাদের সম্মান-মর্যাদার খাতিরে। যেমন পবিত্র হাদিস এসেছে-
عَنْ أَوسِ بنِ أَوسٍ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَومَ الجُمُعَةِ فَأَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلاةِ فِيهِ فَإِنَّ صَلاَتَكُمْ مَعْرُوضَةٌ عَلَيَّقَالَ : قَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ وَكَيفَ تُعْرَضُ صَلاَتُنَا عَلَيْكَ وَقَدْ أَرَمْتَ قَالَ : يَقُولُ بَلِيتَ قَالَإِنَّ اللهَ حَرَّمَ عَلَى الأَرْضِ أَجْسَادَ الأَنْبِيَاءِ رواه أَبُو داود بإسنادٍ صحيح অর্থ : আওস ইবনে
আওস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
(ﷺ)বলেছেন, তোমাদের দিনগুলোর
মধ্যে সর্বোত্তম দিন হচ্ছে জুমাআর দিন। সুতরাং ঐ দিন তোমরা আমার উপর অধিকমাত্রায় দরুদ
পড়। কেননা, তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়। লোকেরা বলল,
ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি তো (মারা যাওয়ার পর) পচে-গলে নিশ্চিহ্ন হয়ে
যাবেন। সে ক্ষেত্রে আমাদের দরুদ কিভাবে আপনার কাছে পেশ করা হবে ? তিনি বললেন, আল্লাহ পয়গম্বরদের দেহসমূহকে খেয়ে ফেলা মাটির উপর হারাম করে দিয়েছেন।
(বিধায় তাঁদের শরীর আবহমান কাল ধরে অক্ষত থাকবে।)[364]
ইসলামে আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের সম্মান-ইজ্জত
নবি পরিবারের সম্মান ও মহব্বত : ذَلِكَ
الَّذِي يُبَشِّرُ اللَّهُ عِبَادَهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ قُلْ لَا
أَسْأَلُكُمْ
عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى অর্থ: এরই সুসংবাদ দেন আল্লাহ তার সেসব বান্দাকে, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে। বলুন, আমি আমার দাওয়াতের জন্যে তোমাদের কাছে কেবল আত্মীয়তাজনিত সৌহার্দ্য চাই।[365]
রসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর সম্মান ও মহব্বত
সবকিছুর চাইতে বেশি হওয়া আমাদের ঈমানের অঙ্গ ও ভিত্তি। অতঃপর –এর সাথে যার যত নিকট সম্পর্ক আছে, তাঁর সম্মান ও মহব্বত এবং সে অনুপাতে জরুরী হওয়া অপরিহার্য। ঔরসজাত সন্তান সর্বাধিক নিকটবর্তী আত্মীয়। তাই তাঁদের মহব্বত নিশ্চিতরূপে ঈমানের অঙ্গ। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বিবিগণ ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামকে সম্পূর্ণভাবে ভুলে যেতে হবে,অথচ তাঁদেরও রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নৈকাট্য ও আত্মীয়তার বিভিন্নরূপ সম্পর্ক রয়েছে।
সারকথা এই যে, নবি পরিবার ও নবি বংশের মহব্বত নিয়ে কোনো সময় মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়নি। সর্বসম্মতিক্রমে তাঁদের সম্মান-মহব্বত অপরিহার্য। তবে বিরোধ সেখানে দেখা দেয়, যেখানে অন্যদের সম্মানে আঘাত হানা হয়। নতুবা রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বংশধর হিসেবে যত দূর সম্পর্কের সৈয়দই হোক না কেন, তাদের মহব্বত ও সম্মান সৌভাগ্য ও সওয়াবের কারণ। অনেকেই এ ব্যাপারে শৈথিল্যের পরিচয় দিতে শুরু করলে হজরত ইমাম শাফেয়ি (রহ.) কয়েক লাইন কবিতায় তাদের তীব্র নিন্দা করেছেন। এতে প্রকৃতপক্ষে তিনি অধিকাংশ আলেমদের মতাদর্শই তুলে ধরেছেন। তাঁর কবিতা নিম্নে উদ্ধৃত হল-
হে অশ্বারোহী! তুমি মুহাস্সাব উপত্যকার অদূরে দাম। প্রত্যুষে যখন হাজিদের স্রোত সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের ন্যায় মিনার দিকে রওয়ানা হবে, তখন সেখানকার প্রত্যেক বাসিন্দা ও পথচারীকে ডেকে তুমি ঘোষণা কর, যদি কেবল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর বংশধরের প্রতি মহব্বত রাখলেই মানুষ রাফেজি হয়ে যায়, তবে বিশ্বজগতের সমস্ত জিন ও মানব সাক্ষী থাকুক, আমিও রাফেজি।[366]
قَامَ
رَسُولُ اللهِ
صَلَّى اللهُ
عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
يَوْمًا فِينَا
خَطِيبًا، بِمَاءٍ
يُدْعَى خُمًّا
بَيْنَ مَكَّةَ
وَالْمَدِينَةِ
فَحَمِدَ اللهَ
وَأَثْنَى عَلَيْهِ،
وَوَعَظَ وَذَكَّرَ،
ثُمَّ قَالَ:
" أَمَّا
بَعْدُ، أَلَا
أَيُّهَا النَّاسُ
فَإِنَّمَا
أَنَا بَشَرٌ
يُوشِكُ أَنْ
يَأْتِيَ رَسُولُ
رَبِّي فَأُجِيبَ،
وَأَنَا تَارِكٌ
فِيكُمْ ثَقَلَيْنِ:
أَوَّلُهُمَا
كِتَابُ اللهِ
فِيهِ الْهُدَى
وَالنُّورُ
فَخُذُوا بِكِتَابِ
اللهِ، وَاسْتَمْسِكُوا
بِهِ " فَحَثَّ
عَلَى كِتَابِ
اللهِ وَرَغَّبَ
فِيهِ، ثُمَّ
قَالَ: "وَأَهْلُ
بَيْتِي أُذَكِّرُكُمُ
اللهَ فِي
أَهْلِ بَيْتِي،
أُذَكِّرُكُمُ
اللهَ فِي
أَهْلِ بَيْتِي،
أُذَكِّرُكُمُ
اللهَ فِي
أَهْلِ بَيْتِي"
فَقَالَ لَهُ
حُصَيْنٌ: وَمَنْ
أَهْلُ بَيْتِهِ؟
يَا زَيْدُ
أَلَيْسَ نِسَاؤُهُ
مِنْ أَهْلِ
بَيْتِهِ؟ قَالَ:
نِسَاؤُهُ مِنْ
أَهْلِ بَيْتِهِ،
وَلَكِنْ أَهْلُ
بَيْتِهِ مَنْ
حُرِمَ الصَّدَقَةَ
بَعْدَهُ، قَالَ:
وَمَنْ هُمْ؟
قَالَ: هُمْ
آلُ عَلِيٍّ
وَآلُ عَقِيلٍ،
وَآلُ جَعْفَرٍ،
وَآلُ عَبَّاسٍ
قَالَ: كُلُّ
هَؤُلَاءِ حُرِمَ
الصَّدَقَةَ؟
قَالَ: نَعَم.
অর্থ: একদিন রসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি খুম নামক
স্থানে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে বক্তৃতা দিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ও সানা বর্ণনা
শেষে ওয়াজ-নসিহত করলেন। অতঃপর বললেন : শোনো হে লোক সকল! আমি তো কেবল একজন মানুষ,
অতি সত্ত্বরই আল্লাহর পক্ষ
থেকে প্রেরিত দূত (মৃত্যুর ফেরেশতা) আসবেন, আর আমিও তাঁর আহ্বানে সাড়া দেবো। আমি
তোমাদের নিকট ২টি ভারি জিনিস রেখে যাচ্ছি। এর প্রথমটি হলো আল্লাহর কিতাব (কুরআন)।
এতে পথনির্দেশ এবং আলোকবর্তিকা আছে। অতএব তোমরা আল্লাহর কিতাবকে অনুসরণ করো,
একে শক্ত করে আঁকড়ে রাখো।
তারপর তিনি কুরআনের প্রতি উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিলেন। এরপর বলেন,
আর [অন্যটি হলো] আমার আহলে
বাইত [আলি, ফাতেমা,
হাসান ও হোসাইন (রা.)]। আর
আমি আমার আহলে বাইতের বিষয়ে তোমাদের আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আমার আহলে
বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি,
আমার আহলে বাইতের বিষয়ে
তোমাদের আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি …।[367]
ইমাম বুখারি (রহ.)---আবু বকর সিদ্দিক (রা.) হতে বর্ণনা করেন যে,
আবু বকর সিদ্দিক
(রা.)
বলেছেন : তোমরা
মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মত তাঁর আহলে বাইতকে সম্মান, শ্রদ্ধা ও সমীহ কর।
ছহিহ হাদিসে উল্লেখিত হয়েছে যে, আবু বকর সিদ্দিক (রা.) আলি (রা.)-কে বলেন, ‘আমি আমার আত্মীয়দের চেয়ে রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আত্মীয়দেরকে অধিক ভালবাসি।’
ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) আব্বাস(রা.)-কে বলেছেন, ‘তোমার ইসলাম গ্রহণ করা আমার নিকট আমার পিতা খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ করার চেয়েও প্রিয়। কেননা রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ করার চেয়ে তোমার ইসলাম গ্রহণ করা অধিক প্রিয় ছিল।’
অতত্রব প্রত্যেকের উচিত হজরত আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-এর মত রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আত্মীয়-স্বজনকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসা ও শ্রদ্ধা করা। যেমন তাঁরা করতেন এই জন্যই তাঁরা নবি ও রসূলগণের পরে সকল সাহাবা ও মুমিনগণের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম ও শ্রেষ্ঠ।[368]
নবি বংশ-পরিবারের বিশেষত্ব : নবি বংশ ও তাঁর পরিবার-পরিজনের জন্য জাকাত-ফেতরা-সদকার
মাল খাওয়া জায়েজ নয়। এমনকি তাঁদের
আজাদকৃত দাসের জন্যও সদকা খাওয়া জায়েজ নয়। যেমন পবিত্র হাদিসে এসেছে- قَالَ: سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: أَخَذَ الحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، تَمْرَةً مِنْ تَمْرِ الصَّدَقَةِ، فَجَعَلَهَا فِي فِيهِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كِخْ كِخْ» لِيَطْرَحَهَا، ثُمَّ قَالَ: «أَمَا شَعَرْتَ أَنَّا لاَ نَأْكُلُ الصَّدَقَةَ»
অর্থ: আবু হুরাইরা (রা.)
থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাসান ইবনে আলি
(রা.) সদকার একটি খেজুর নিয়ে মুখে দিলেন। নবি (ﷺ) তা
ফেলে দেওয়ার জন্য ওয়াক ওয়াক (বমির পূর্বের আওয়াজের মত) বললেন। অতঃপর বললেন, তুমি
কি জান না যে, আমরা সদকা ভক্ষণ করি না।[369]
সাহাবিগণও নবি-পরিবার বলতে বুঝতেন, যাদের জন্য সদকা হারাম। আর
তারা হলেন, বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিব। এর পরিবর্তে তারা গনিমতের
এক-পঞ্চমাংশ পেতেন। যেমন-আল্লাহ তাআলা বলেন, আর এ কথাও জেনে রাখ যে, কোনো বস্তু-সামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনিমত হিসেবে পাবে, তার এক পঞ্চমাংশ হল আল্লাহর জন্য, রসূলের জন্য,
তাঁর নিকটাত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং এতিম-অসহায় ও মুসাফিরের জন্য।[370]
জুবায়ের ইবনে মুতইম রা. বলেন, একবার আমি ও ওসমান
ইবনে আফফান নবিজির কাছে গিয়ে বললাম, আল্লাহর রাসুল, আপনি বনু মুত্তালিবকে দান করেছেন, আমাদের দিচ্ছেন
না। অথচ তারা ও আমরা আপনার বংশে এক স্তরের। তিনি বললেন, না,
বরং বনু মুত্তালিব ও বনু হাশিম এক।[371]
সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা কুরআন ও
হাদিস দ্বারা জানা যায় ঐতিহাসিক বর্ণনা দ্বারা নয় : হযরতে সাহাবায়ে-কেরাম সাধারণ উম্মতের ন্যায় নয়। তাঁরা রসূলুল্লাহ (ﷺ) ও উম্মতের মাঝেখানে আল্লাহর তৈরি সেতু। তাঁদের মাধ্যম ব্যতিত উম্মতের কাছে কুরআন ও রসূলুল্লাহ
(ﷺ) –এর শিক্ষা পৌঁছার কোনো পথ নেই। তাই ইসলামে তাঁদের একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাঁদের এই মর্যাদা ইতিহাস গ্রন্থের সত্য-মিথ্যা বর্ণনা দ্বারা নয়; বরং পবিত্র কুরআন-হাদিসের মাধ্যমে জানা যায়। শুধু মাগফেরাতেরই নয় رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ বলে তাঁর সন্তুষ্টিরও নিশ্চিত আশ্বাস দান করেছেন। তাই তাঁদের পারস্পরে যেসব মতবিরোধ ও বাদানুবাদের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো ভিত্তিতে তাঁদের মধ্যে কাউকে মন্দ বলা অথবা দোষারোপ করা
নিশ্চিতরূপে হারাম, রসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর উক্তি অনুযায়ী অভিশপ্ত হওয়ার কারণ এবং নিজের ঈমানকে বিপন্ন করার
শামিল।[372]
সাহাবি কাকে বলে : সাহাবি আরবি শব্দ ‘সুহবাতুন’ ধাতু হতে নির্গত যার অর্থ সাহচর্য হওয়া,
সংস্পর্শে থাকা,
সঙ্গ দেওয়া।[373]
পারিভাষিক সংজ্ঞা সম্পর্কে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) সাহাবির পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘সাহাবি সেই ব্যক্তি যিনি রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর প্রতি ঈমান সহকারে তাঁর সাক্ষাত লাভ করেছেন
এবং ইসলামের ওপর ইন্তিকাল করেছেন।[374]
পবিত্র কুরআন-হাদিস
ও পূর্ববর্তী মুসলিম মনীষীদের সাহাবিদের
ব্যাপারে শিক্ষার সারাংশ
হচ্ছে : প্রিয় রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সমস্ত সাহাবিকেই অন্তরের অন্তস্থল হতে ভালবাসা-মহব্বত,
শ্রদ্ধা-ভক্তি, সম্মান-ইজ্জত করা কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুসলমানের দায়িত্ব-কর্তব্য এবং তাঁদের সমালোচনা, শত্রুতা-বিদ্বেষ পোষণ করা ও গালি দেওয়া সবই হারাম। (বিস্তারিত দেখুন-লেখকের
‘মুসলিম জীবন সাফল্যে চল্লিশ
হাদিস’ কিতাবের
১২৬পৃ.) নিম্নে তার দলিল-প্রমাণ সংক্ষিপ্তাকারে উল্লেখ করা হলো :
কালামুল্লাহ শরীফ : হযরতে সাহাবায়ে
কেরামের শান-মর্যাদা, তাঁদের হক সম্পর্কে
বিশেরও (২০)অধিক আয়াত রয়েছে, তন্মধ্যে : وَالسَّابِقُونَ
الْأَوَّلُونَ
مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
অর্থ: আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনছারদের মাঝে পুরাতন এবং
যারা তাঁদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন
এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাঁদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কাননকুঞ্জ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রসবণসমূহ।[375]
মুহাম্মাদ ইবনে কাআব কুরবি (রা.)-কে কোনো এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেছিল
যে, রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবিগণ সম্পর্কে আপনি কী বলেন ? তিনি বলেন,
সাহাবায়ে কেরামের সবাই জান্নাতবাসী হবেন-যদি দুনিয়াতে
তাঁদের কারও দ্বারা কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েও থাকে তবুও। সে লোকটি জিজ্ঞেস করল, একথা আপনি কোত্থেকে বলছেন (এর প্রমাণ কী) ? তিনি বললেন, কুরআনুল কারিমের আয়াত পড়ে দেখ। وَالسَّابِقُونَ
الْأَوَّلُونَ এতে শর্তহীনভাবে সমস্ত
সাহাবা সম্পর্কে বলা হয়েছে رَضِيَ
اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ অবশ্য তাবেয়িনদের(অথবা সকল মুসলমান) ব্যাপারে اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ –এর শর্তারোপ করা হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, সাহাবায়ে কেরামের সবাই কোনো রকম শর্তাশর্ত ছাড়াই
আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ধন্য হবেন।[376]
সকল সাহাবির জন্যে মাগফেরাত ও রহমতের
সুসংবাদ এবং অবশিষ্ট উম্মত থেকে তাঁদের স্বাতন্ত্র্য : এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে: لَا يَسْتَوِي مِنْكُمْ مَنْ أَنْفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُولَئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِنَ الَّذِينَ أَنْفَقُوا مِنْ بَعْدُ وَقَاتَلُوا وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ অর্থ: তোমাদের মধ্যে যে মক্কা বিজয়ের
পূর্বে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে, সে সমান নয়। এরূপ লোকদের মর্যাদা বড় তাদের অপেক্ষা, যারা পরে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে। তবে আল্লাহ তাআলা উভয়কে কল্যাণের ওয়াদা দিয়েছেন। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে
সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।[377]
উল্লেখিত আয়াতে সাহাবায়ে-কেরামকের মর্যাদা পারস্পরিক
তারতম্য উল্লেখ করে শেষে
বলা হয়েছেঃ وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى অর্থাৎ পারস্পরিক তারতম্য সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা কল্যাণ অর্থাৎ
জান্নাত ও মাগফেরাতের ওয়াদা সবার জন্যেই করেছেন। তাঁদের মধ্যে এরূপ ব্যক্তি খুবই দুর্লভ,
যিনি মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর পথে কিছুই ব্যয় করেননি এবং ইসলামের
শত্রুদের মোকাবেলায় অংশ গ্রহণ করেননি (রসূলের অনুমতিক্রমে কেউ
কেউ রয়ে গিয়েছিলেন)। তাই মাগফেরাত
ও রহমতের এই কুরআনি ঘোষণা প্রত্যেক সাহাবিকে শামিল করেছে।
আল্লামা ইবনে হাজম (রহ.) বলেন,এর সাথে সূরা আম্বিয়ার
অপর একটি আয়াতকে মিলাও, যাতে বলা হয়েছে-لَا يَسْمَعُونَ
حَسِيسَهَا
وَهُمْ فِي مَا
اشْتَهَتْ أَنْفُسُهُمْ خَالِدُونَ إِنَّ الَّذِينَ
سَبَقَتْ لَهُمْ مِنَّا الْحُسْنَى أُولَئِكَ عَنْهَا مُبْعَدُونَ অর্থাৎ যাদের
জন্য আমি পূর্বেই কল্যাণ নির্ধারিত করে দিয়েছি, তারা জাহান্নাম
থেকে দূরে অবস্থান করবে। জাহান্নামের
কষ্টদায়ক আওয়াজও তাদের কানে পৌঁছবে না। সেখানে তাদের মন যা চাইবে,তারা চিরকাল তা ভোগ করবে।[378]
আলোচ্য আয়াতে وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى বলা হয়েছে এবং সূরা আম্বিয়ার এই আয়াতে যাদের জন্য কল্যাণের ওয়াদা করা হয়েছে, তাদের জাহান্নাম থেকে দূরে থাকার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এর সারমর্ম এই দাঁড়ায় যে, কুরআন পাক এই নিশ্চয়তা দেয় যে, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে
কেই যদি সারা জীবনে কোনো গুনাহ করেও ফেলেন, তবে তিনি তার ওপর
কায়েম থাকবেন না, তওবা করে নেবেন। নতুবা রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সংসর্গ, সাহায্য, ধর্মের মহান সেবামূলক কার্যক্রম এবং তাঁর অসংখ্য
পুণ্যের খাতিরে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ক্ষমা করে দেবেন। গুনাহ মাফ হয়ে পূত-পবিত্র হওয়া অথবা পার্থিব বিপদাপদ ও সর্বোচ্চ কোনো কষ্টের মাধ্যমে গুনাহের
কাফফারা না হওয়া পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু ঘটবে না।
কতক হাদিসে কোনো কোনো সাহাবির মৃত্যুর পর আজাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, এই আজাব পরকাল ও জাহান্নামের আজাব নয়; বরং বরযখ তথা কবর
জগতের আজাব। এটা অসম্ভব
নয় যে, কোনো সাহাবি কোনো গুনাহ করে ঘটনাচক্রে
তওবা ব্যতিতই মৃত্যুবরণ করলে তাকে কবর-জগতে আজাব নদ্বারা পবিত্র
করে নেওয়া হবে, যাতে পরকালের আজাব ভোগ করতে না হয়।[379]
হাদিসে নববি :
(১)عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابِي، فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ، ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ، وَلاَ نَصِيفَهُ» تَابَعَهُ جَرِيرٌ، وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ دَاوُدَ، وَأَبُو مُعَاوِيَةَ، وَمُحَاضِرٌ، عَنِ الأَعْمَشِ অর্থ: আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : তোমরা আমার সাহাবিগণকে গালমন্দ
করো না। তোমরা আমার সাহাবিগণকে গালমন্দ করবে না। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন, যদি তোমাদের মধ্যে
কেউ উহুদ পাহাড় বরাবর স্বর্ণ ব্যয় করে তাহলেও তাঁদের কারোর এক মুদ অথবা অর্ধ মুদের
সমান হবে না।[380]
নোট : বুখারির
বর্ণনায় শব্দ কিছু কম রয়েছে।
(২) عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: «آيَةُ الإِيمَانِ حُبُّ الأَنْصَارِ، وَآيَةُ النِّفَاقِ بُغْضُ الأَنْصَارِ» , অর্থ: হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। নবি (ﷺ) বলেছেন :
আনসারদের প্রতি ভালবাসা ঈমানের চিহ্ন আর
আনসারদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা মুনাফেকের চিহ্ন।[381]
(৩)أَكْرِمُوا أَصْحَابِي، فَإِنَّهُمْ خِيَارُكُمْ، অর্থ: রসূল (ﷺ)
ইরশাদ করেন, তোমরা আমার সাহাবিদেরকে সম্মান কর। কেননা তাঁরা তোমাদের মধ্যকার উত্তম
মানব।[382]
নোট : ইমাম তিরমিজি (রহ.)বলেন, হাদিসটির
সনদ হাসান গরিব।
(৪) يَقُولُ : سَمِعْتُ
رَسُولَ اللَّهِ
صَلَّى اللَّهُ
عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
يَقُولُ : لَا
تَمَسُّ النَّارُ
مُسْلِمًا رَآنِي
أَوْ رَأَى
مَنْ رَآنِ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ অর্থ: জাবের ইবনে
আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। আমি রসূলুল্লাহ (ﷺ) কে বলতে শুনেছি: জাহান্নামের
আগুন এমন মুসলিম লোককে ছুঁবে না যে আমাকে দেখেছে অথবা আমার দর্শন লাভকারীকে
দেখেছে।[383]
নোট :
ইমাম তিরমিজি (রহ.) বলেন,
হাদিসটির সনদ হাসান গরিব।
বিজ্ঞ ওলামা-কেরামের নিকট : (১) শ্রেষ্ঠতম তাবিঈ হজরত ওমর বিন আব্দুল আজিজ রহ, সাহাবা কেরামের মর্যাদা সম্বন্ধে বলেন, সাহাবা কেরামের
অনুসৃত পথ গ্রহণ করাই সকল মুসলিমের কর্তব্য।[384]
(২) ইমাম বগভি (শারহুস
সুন্নাহ) গ্রন্থে বলেন, ইমাম মালিক বলেছেন, যে রসূলুল্লাহ
(ﷺ) –এর
কোনো সাহাবিকে খারাপ জানে ও তার সম্পর্কে বিদ্বেষ লালন করে, মুসলিমদের
গনিমতে তার কোনো অংশ নেই। অতঃপর তিনি আল্লাহ তাআলার বাণী পড়ে শুনান : مَّآ أَفَآءَ ٱللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ مِنۡ أَهۡلِ ٱلۡقُرَىٰ إلى قوله تعالى: وَٱلَّذِينَ جَآءُومِنۢ بَعۡدِهِمۡ يَقُولُونَ رَبَّنَاٱغۡفِرۡلَنَاوَلِإِخۡوَٰنِنَا ٱلَّذِينَ سَبَقُونَابِٱلۡإِيمَٰنِ অর্থ:
আল্লাহ জনপদবাসীদের নিকট থেকে তার রসূলকে ফায় হিসেবে যা
দিয়েছেন ……এবং যারা তাদের পরে এসেছে, তারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান
নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা
করুন।[385]
(৩) খতিব
বাগদাদি(আল কিফায়াহ)গ্রন্থে বর্ণনা করেন,আবু জুরআ বলেছেন, যখন কোনো ব্যক্তিকে দেখ রসূলুল্লাহ
(ﷺ) -এর কোনো সাহাবিকে অসম্মান করছে,
জেনে নাও সে জিন্দিক(গোপন কাফের)। তার কারণ, রসূলুল্লাহ (ﷺ)
হক, কুরআনও হক। আর কুরআন ও
সুন্নতকে আমাদের নিকট পৌঁছিয়েছেন তার সাহাবিগণ। সে চাচ্ছে সাহাবিগণ মিথ্যা ও বাতিল
প্রমাণিত হোক, যার পশ্চাতে কিতাব ও সুন্নাহ স্বাভাবিক ভাবেই
বাতিল প্রমাণিত হবে, প্রকৃতপক্ষে তারা বাতিল ও যিন্দিক,
এ কথাই ঠিক।
কোনো সাহাবিকে ‘ফাসেক’ বলা যাবে কি ? يَا
أَيُّهَا الَّذِينَ
آمَنُوا إِنْ
جَاءَكُمْ فَاسِقٌ
بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
أَنْ تُصِيبُوا
قَوْمًا بِجَهَالَةٍ
فَتُصْبِحُوا عَلَى
مَا فَعَلْتُمْ
نَادِمِينَ অর্থ: হে মুমিনগণ! কোনো ফাসেক যদি তোমাদের কাছে
গুরুত্বপূর্ণ কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা ভালোভাবে যাচাই কর;
যাতে তোমরা না জেনে কোনো সম্প্রদায়ের বিপদ না ঘটাও,পরে তোমাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে লজ্জিত না হও।[386]
আয়াতে একজন সাহাবিকে ‘ফাসেক’ বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা হল সাহাবিগণ নিষ্পাপ নন। তদের দ্বারা কবিরা গুনাহ-ও হতে পারে যা ফিসক-এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এমন কোনো সাহাবি নেই যিনি তওবা
করে গুনাহ থেকে পবিত্র না হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সর্বাবস্থায়
সন্তুষ্টির কথা ঘোষণা করেছেন। গুনাহ ক্ষমা করা ব্যতিত আল্লাহ তাআলার
সন্তুষ্টি হয় না। তিনি তাদের ব্যাপারেই
সন্তুষ্টির ঘোষণা দেন যাদের ব্যাপারে তিনি জানেন যে, সন্তুষ্টির কারণাদির উপরই তাদের ওফাত হবে। কাজেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে কোনো সাহাবিকে গুনাহের কারণে ফাসেক বলা হলেও পরবর্তীকালে এবং সর্বদা
তাকে ফাসেক বলা এবং সমালোচনা করা জায়েয নয়।[387]
সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে সমগ্র উম্মতেরর সর্বসম্মত
বিশ্বাস : সাহাবায়ে কেরামের প্রতি সম্মান
প্রদর্শন করা, অন্তরে ভালোবাসা পোষণ করার এবং তাঁদের প্রশংসা
ও গুণকীর্তন করা ওয়াজিব। তাদের পরস্পরে যেসব মতবিরোধ ও বাদানুবাদের
ঘটনা ঘটেছে, সে সম্পর্কে নীরব থাকা এবং যে কোনো
এক পক্ষকে দোষী সাব্যস্ত না করা জরুরি। আকাঈদের সকল কিতাবে এই
সর্বসম্মত বিশ্বাসের বর্ণনা আছে।[388]
হজরত মুআবিয়া (রা.) উত্তম নাকি ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ
(রহ.) উত্তম ? হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ.)
কে এক লোক জিজ্ঞেস করলো, হজরত মুআবিয়া
(রা.) উত্তম নাকি ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ
(রহ.) উত্তম ? হজরত ওমর ইবনে
আব্দুল আজিজ (রহ.)কে দ্বিতীয় ওমর বলা হয়
এবং তাঁর শাসনকালকে খেলাফতে রাশেদার মধ্যে গণ্য করা হয়। এ প্রশ্ন শুনে তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল। তিনি বললেন, শুনো! হজরত মুআবিয়া (রা.) রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে জিহাদের যে ঘোড়ায় আরোহণ করতেন, সেই ঘোড়ার নাকের ধুলিকণা-ময়লাও ওমর ইবনে
আব্দুল আজিজের চেয়ে উত্তম।[389]
রসূল (ﷺ)-এর দৃষ্টিতে
ওমর (রা.)-এর মর্যাদা
أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ قَالَ بَيْنَا نَحْنُ عِنْدَ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِذْ قَالَ بَيْنَا أَنَا نَائِمٌ رَأَيْتُنِيْ فِي الْجَنَّةِ فَإِذَا امْرَأَةٌ تَتَوَضَّأُ إِلَى جَانِبِ قَصْرٍ فَقُلْتُ لِمَنْ هَذَا الْقَصْرُ قَالُوْا لِعُمَرَ فَذَكَرْتُ غَيْرَتَهُ فَوَلَّيْتُ مُدْبِرًا فَبَكَى عُمَرُ وَقَالَ أَعَلَيْكَ أَغَارُ يَا رَسُوْلَ اللهِ অর্থ: আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
এক সময় আমরা
আল্লাহ্র রসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর নিকটে
ছিলাম। তখন তিনি বললেন, একবার আমি ঘুমিয়েছিলাম। স্বপ্নে আমি জান্নাতে প্রবেশ করেছি। এক মহিলাকে প্রাসাদ চূড়ায় বসে ওজু করতে দেখে জিজ্ঞেস
করলাম – ‘এটা কার প্রাসাদ ?’ ফেরেশতাগণ বললেন,‘ওমর বিন খাত্তাবের।’ রসূলুল্লাহ (ﷺ ) বললেন,‘হে ওমর,আমি তোমার
মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রেখে সে প্রাসাদে প্রবেশ করিনি।’ একথা শুনে হজরত ওমর কেঁদে
ফেললেন ।[390]
রসূল (ﷺ)-এর দৃষ্টিতে
ওসমান (রা.)-এর মর্যাদা
أَنَّ عَائِشَةَ، قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مُضْطَجِعًا فِي بَيْتِي كَاشِفًا عَنْ فَخِذَيْهِ أَوْ سَاقَيْهِ فَاسْتَأْذَنَ أَبُو بَكْرٍ فَأَذِنَ لَهُ وَهُوَ عَلَى تِلْكَ الْحَالِ فَتَحَدَّثَ ثُمَّ اسْتَأْذَنَ عُمَرُ فَأَذِنَ لَهُ وَهُوَ كَذَلِكَ فَتَحَدَّثَ ثُمَّ اسْتَأْذَنَ عُثْمَانُ فَجَلَسَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَسَوَّى ثِيَابَهُ - قَالَ مُحَمَّدٌ وَلاَ أَقُولُ ذَلِكَ فِي يَوْمٍ وَاحِدٍ - فَدَخَلَ فَتَحَدَّثَ فَلَمَّا خَرَجَ قَالَتْ عَائِشَةُ دَخَلَ أَبُو بَكْرٍ فَلَمْ تَهْتَشَّ لَهُ وَلَمْ تُبَالِهِ ثُمَّ دَخَلَ عُمَرُ فَلَمْ تَهْتَشَّ لَهُ وَلَمْ تُبَالِهِ ثُمَّ دَخَلَ عُثْمَانُ فَجَلَسْتَ وَسَوَّيْتَ ثِيَابَكَ فَقَالَ " أَلاَ أَسْتَحِي مِنْ رَجُلٍ تَسْتَحِي مِنْهُ الْمَلاَئِكَةُ " . অর্থ: আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার ঘরে শুয়ে ছিলেন, তাঁর উরু কিংবা পায়ের নলা
উন্মুক্ত ছিল। আবু বকর (রা.) এসে অনুমতি চাইলে তিনি তাকে অনুমতি দিলেন এবং এ
অবস্থাতেই কথোপকথন করলেন। তারপর ওমর (রা.) অনুমতি চাইলে অনুমতি দিলেন এবং এ
অবস্থায়ই কথাবার্তা বললেন। ওসমান (রা.) অনুমতি চাইলেন। রসূলুল্লাহ
(ﷺ) উঠে বসলেন এবং তাঁর কাপড় ঠিক করলেন। বর্ণনাকারী মুহাম্মাদ বলেন, এ বিষয়টি
একই দিনে ঘটেছে বলে আমি দাবি করি না। অতঃপর ওসমান (রা.) এসে কথা বলে চলে যাওয়ার পর
আয়েশা (রা.) বললেন,
আবু বকর (রা.) আসলেন, আপনি তাকে কোন গুরুত্ব দিলেন না ও
ভ্রুক্ষেপ করলেন না,
ওমর (রা.) আসলেন আপনি তাকেও কোন গুরুত্ব দিলেন না ও
ভ্রুক্ষেপ করলেন না। ওসমান (রা.) প্রবেশ করতেই আপনি উঠে বসলেন এবং জামা ঠিক করে
নিলেন। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন :
আমি কি সে লোককে লজ্জা করবো না, ফেরেশতারা পর্যন্ত যাঁকে দেখলে লজ্জা পান।[391]
প্রিয় পাঠক! লক্ষণীয় যে, প্রাণাধিক রাসূলূল্লাহ (ﷺ) –এর ইশারায় হজরতে সাহাবায়ে-কেরাম
মুহূর্তে জান কুরবান করতে প্রস্তুত। সেই সাহাবির রুচি-মেজাজের কী
অপূর্ব মূল্যায়ন। কেননা ওসমান রা. সাহাবিদের মধ্যে অধিক
লজ্জাশীল। তাঁর উপাধি ছিলো অর্থাৎ পরিপূর্ণ লজ্জাশীল ও পূর্ণাঙ্গ ঈমানদার।
হাঁটু পর্যন্ত পুরুষের সতর। তাইতো হজরত আবু বকর ও ওমরের আগমনের
পরেও পবিত্র পা খোলা রেখেছিলেন। কিন্তু ওসমান রা.-এর আগমনে পা
ঢেকে ফেললেন, যাতে লাজুকতার কারণে সে লজ্জা না পায়।
বিশ্বমানবতার মহান শিক্ষক রাসূলূল্লাহ
(ﷺ) ছোটদের মেজাজ-স্বভাবেরও কদর-সম্মান-মূল্যায়ন
করতেন। হায়! আমরা যদি এই শিক্ষার আমল বাস্তবায়ন করতাম ? মুসলিম সমাজ আজ শত বিভক্ত
হতো না, যদিও শাখাগত মাসয়ালা-বিধানে মতবিরোধ রয়েছে।
গরিব-নিঃস্ব সাহাবিদের সঙ্গে রসূলুল্লাহ
(ﷺ)কে অবস্থান করার
নির্দেশ
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا অর্থ: আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে
আবদ্ধ রাখুন যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাঁদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি
অর্জনের উদ্দেশ্যে আহবান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য
কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে
নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির
অনুসরণ করে এবং যার কার্যকালাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার আনুগত্য করবেন না।[392]
এ আয়াতের
শানে নুজুল প্রসঙ্গে কয়েকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সবগুলোই আয়াত অবতরণের কারণ হতে পারে। আল্লামা বগভি (রহ.) বর্ণনা করেন, মক্কার সরদার ওয়াইনা ইবনে হিসান রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়। তখন তাঁর কাছে হজরত সালমান ফারেসি (রা.) উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি ছিলেন দরিদ্র সাহাবিদের
অন্যতম। তাঁর পোশাক ছিন্ন এবং আকার-আকৃতি ফকিরের মত ছিল। তাঁর মত আরও কিছুসংখ্যক (হজরত আম্মার,
বেলাল,
সুআইব,
হাব্বাব ও ইবনে
মাসউদ রা.প্রমুখ) দরিদ্র ও নিঃস্ব সাহাবি মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। ওয়াইনা বলল :
এই লোকদের কারণেই আমরা আপনার কাছে আসতে পারি না এবং আপনার কথা শুনতে পারি না। এমন
ছিন্নমূল মানুষের কাছে আমরা বসতে পারি না। আপনি হয় তাদেরকে মজলিস থেকে সরিয়ে রাখুন,
নাহয় আমাদের
জন্য আলাদা এবং তাদের জন্যে আলাদা মজলিস অনুষ্ঠান করুন।
ইবনে মরদুইয়াহ, ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়েতে বর্ণনা করেন যে, উমাইয়া ইবনে খালফ জমহি রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে পরামর্শ দেন যে, দরিদ্র, নিঃস্ব ও
ছিন্নমূল মুসলমানদেরকে আপনি নিজের কাছে রাখবেন না; বরং কুরাইশ
সরদারদেরকে সাথে রাখুন। এরা আপনার ধর্মে দীক্ষিত হয়ে গেলে ধর্মের খুব উন্নতি হবে।
এ ধরণের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আলাচ্যে আয়াত অবতীর্ণ হয়। এতে
তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। শুধু নিষেধই নয়-নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, অর্থাৎ আপনি নিজেকে তাতের সাথে বেঁধে রাখুন। এর অর্থ এরূপ নয় যে, কোনো সময় পৃথক হবেন না। বরং উদ্দেশ্য এই যে, সম্পর্ক
ও মনোযোগ তাদের প্রতি নিবদ্ধ রাখুন। কাজে-কর্মে তাদের কাছ থেকেই পরামর্শ নিন। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে,
তারা সকাল-সন্ধ্যা অর্থাৎ সর্বাবস্থায় আল্লাহর
এবাদত ও জিকির করে। তাঁদের কার্যকলাপ একান্তভাবেই আল্লাহর
সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নিবেদিত। এসব অবস্থা আল্লাহর সাহায্য ডেকে আনবে।
আল্লাহর সাহায্য তাঁদের জন্যেই আগমন করবে। ক্ষণস্থায়ী দুরাবস্থা দেখে
অস্থির হবেন না। পরিণামে সাহায্য ও বিজয় তাঁরাই লাভ করবে।
কুরাইশ সরদারদের পরামর্শ কবুল না করার কারণও
আয়াতের শেষে বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাদের মন স্মরণ থেকে গাফেল
এবং তাদের সমস্ত কার্যকলাপ তাদের খেয়াল-খুশির অনুসারী। এসব
অবস্থা মানুষকে আল্লাহর রহমত ও সাহায্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
এখানে প্রশ্ন হয় যে, তাদের জন্যে আলাদা মজলিস করার পরামর্শটি তো গ্রহণযোগ্য ছিল। এর ফলে তাদের
কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো এবং তাদের পক্ষে তা কবুল করা সহজ হত। কিন্তু এ ধরণের
মজলিস বণ্টনের মধ্যে অবাধ্য ধনীদের প্রতি বিশেষ সম্মান দেখানো হত। ফলে দরিদ্র
মুসলমানদের মন ভেঙ্গে যেত। তাই আল্লাহ তাআলা তা পছন্দ করেননি এবং এ ব্যাপারে
পার্থক্য না করাকেই দাওয়াত ও প্রচারের মূলনীতি স্থির করেন।
তাবারানি (রহ.)বলেন, ইসমাঈল ইবনে হাসান (রহ.)---আব্দুর রহমান ইবনে সাহল ইবনে হানিফ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর এই আয়াত
অবতীর্ণ হলো وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ অর্থ: “আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাঁদের পালনকর্তাকে ডাকতে থাকে।” অতঃপর তিনি সেই সকল লোকের খোঁজে বের হলেন। তিনি এমন কিছু লোক দেখতে পেলেন, যারা আল্লাহর জিকির করতেছিল, তাদের মাথার চুল
এলামেলো ছিল, তাঁদের শরীরের চামড়া শক্ত, বড় কষ্টেই তারা এক একটি কাপড় পরিহিত ছিল। রসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে
দেখতে পেয়ে তাদের নিকট বসে পড়লেন। এবং তিনি বললেন, الحمد
لله
الذي
جعل
في
أمتي
من
أمرني
أن
أصبر
نفسي
معهم”. সমস্ত প্রশংসা
সেই সত্তার জন্য
যিনি আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোক সৃষ্টি করেছেন যাদের সঙ্গে আমাকে বসার জন্য হুকুম
করেছেন।[393]
অন্ধ সাহাবির পক্ষে আল্লাহ তাআলার সুপারিশ
عَبَسَ
وَتَوَلَّى أَنْ
جَاءَهُ الْأَعْمَى
وَمَا
يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى أَوْ يَذَّكَّرُ
فَتَنْفَعَهُ
الذِّكْرَى
أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَى فَأَنْتَ
لَهُ تَصَدّى . অর্থ: তিনি ভ্রূকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন, কারণ, তাঁর কাছে এক অন্ধ আগমন করল। আপনি কি জানেন, সে হয়তো পরিশুদ্ধ
হত অথবা উপদেশ গ্রহণ করতো এবং উপদেশে তার উপকার হত। পরন্তু যে বেপরোয়া, আপনি তার চিন্তায়
মশগুল। সূরা আবাসা, ১-৬
ইবনে
জারির ও ইবনে আবু হাতিম (রহ.) আওফির সূত্রে
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণনা করেন যে,
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) উতবা
ইবনে রবিয়া, আবু জাহল, ইবনে হিশাম ও আব্বাস
ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের ঈমান ও হেদায়াতের প্রতি খুবই কৌতূহলী ও আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন। একদিন তার সাথে বসে আলাপ করছিলেন। ইত্যবসরে আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) নামক এক অন্ধ সাহাবি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আল্লাহ তাআলা আপনাকে যা শিখিয়েছেন
তা হতে আমাকে কিছু শিক্ষা দিন। রসূলুল্লাহ (ﷺ)
তার থেকে মুখ
ফিরে ভ্রূ কুঞ্চিত করে (অর্থাৎ তিনি পছন্দ করলেন না) অন্যদের সাথে কথা বলতে লাগলেন। আলাপ শেষে
ঘরে যাবার পথে আল্লাহ তাআলা عَبَسَ
وَتَوَلَّى أَنْ
جَاءَهُ الْأَعْمَى
আয়াতগুলো নাজিল করেন। এর পর রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইবনে উম্মে মাকতুমকে শ্রদ্ধা করে চলতেন এবং যত্নসহকারে
তাঁর কথা শুনতেন এবং তাঁর কোনো প্রয়োজন আছে কি না খোঁজ খবর নিতেন।
এই আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে,
দাওয়াত ও তাবলিগের ব্যাপারে ইতর-ভদ্র, দুর্বল-সবল, গরিব, দাস-মুনিব, ছোট-বড় ও নারী-পুরুষ ইত্যাদির মাঝে কোনো ভেদাভেদ নেই-বরং এ ব্যাপারে সকলকেই সমান চোখে দেখতে
হবে।
এতে সুস্পষ্টভাবে রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে,
শিক্ষা,
সংশোধন ও
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মুসলমানদেরকে পাকাপোক্ত মুসলমান করা অমুসলমানকে ইসলামের
অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রণী। এর চিন্তা অধিক করা
উচিত। অতঃপর কুরআন যে উপদেশবাণী এবং উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন,
তা বর্ণনা করা
হয়েছে।[394]
এ আয়াত নাজিল পর হওয়ার পর থেকে হজরত ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) যখনই রসূলে পাক (ﷺ)–এর দরবারে তাশরিফ আনতেন, তখনই রসূলে পাক (ﷺ) তাকে এই বলে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করতেন, مر
حبا بمن
عاتبنى فيه
ربى অর্থাৎ ঐ ব্যক্তির প্রতি “মারহাবা” যার খাতিরে আমার “রব” আমাকে তিরষ্কার করছেন।[395]
হজরত সুফইয়ান ছাওরি (রহ.) রেওয়ায়াত করেছেন যে, রসূল (ﷺ) তাকে বসার জন্য স্বীয় চাদর বিছিয়ে দিতেন এবং দুইবার রসূলে (ﷺ) পাক তাঁকে মদিনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত করেছেন।[396]
নবি (ﷺ)
কর্তৃক গৃহীত উদ্যোগের যথার্থতা : নবি কারিম (ﷺ) যে উদ্যোগ গ্রহণ
করলেন অর্থাৎ হজরত ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর প্রতি মনোযোগ না দিয়ে কাফেরদের প্রতি
মনোনিবিষ্ট থাকলেন-এর পেছনে যথার্থ কারণ রয়েছে। যেমন,
রসূল (ﷺ)
কাফেরদের সাথে
কথা-বার্তায়
নিমগ্ন ছিলেন, এমতাবস্থায় অন্যদিকে মনোনিবেশ না করাই ছিল নীতিগত বিষয়।
(বিস্তারিত দেখুন-তাফসিরে বুরহানুল কুরআন-৪/১২০)
এখন প্রশ্ন হবে যে,
হজরত ইবনে মাকতুম
(রা.)
একজন বিশিষ্ট সাহাবি
হয়েও এ মুহূর্তে কেমন করে প্রশ্ন করেছিলেন ? এর উত্তর বলা যেতে পারে,
হজরত ইবনে মাকতুম
(রা.)
একজন অন্ধ
ব্যক্তি ছিলেন। রসূল (ﷺ)-এর সামনে যারা
উপস্থিত ছিল, অন্ধ হওয়ার কারণে তিনি তাদের সম্পর্কে পুরাপুরি ধারণা নিতে
পারেননি। আওয়াজ এবং কথা-বার্তার মাধ্যেমে চূড়ান্তভাবে কোনো কিছু বুঝে ফেলা অনেক সময়
দুষ্কর হয়। তাই তিনি এরূপ প্রশ্ন করে ফেলেছিলেন।
বস্তুত এই আয়াতে আল্লাহ পাক রসূলে পাক (ﷺ)-কে সান্ত্বনা প্রদর্শনের মাধ্যমে দাওয়াত
ও তাবলিগের নিয়ম শিক্ষা দিয়েছেন। তবে উভয় আয়াতের দ্বারাই আল্লাহ পাকের নিকট হজরত
আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমের উচ্চমর্যাদা সাব্যস্ত হয়।[397]
তুমি সস্তা নও, মহান রবের নিকট তোমার অনেক দাম-ইজ্জত
عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَجُلًا مِنْ أَهْلِ الْبَادِيَةِ كَانَ اسْمُهُ زَاهِرًا، وَكَانَ يُهْدِي إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْهَدِيَّةَ مِنَ الْبَادِيَةِ، فَيُجَهِّزُهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَخْرُجَ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ زَاهِرًا بَادِيَتُنَا، وَنَحْنُ حَاضِرُوهُ». وَكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُحِبُّهُ، وَكَانَ رَجُلًا دَمِيمًا، فَأَتَاهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا وَهُوَ يَبِيعُ مَتَاعَهُ، فَاحْتَضَنَهُ مِنْ خَلْفِهِ وَلَا يُبْصِرُهُ الرَّجُلُ، فَقَالَ: أَرْسِلْنِي مَنْ هَذَا، فَالْتَفَتَ فَعَرَفَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَجَعَلَ لَا يَأْلُو مَا أَلْصَقَ ظَهْرَهُ بِصَدْرِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، حِينَ عَرَفَهُ، وَجَعَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ يَشْتَرِي الْعَبْدَ؟» فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِذًا وَاللَّهِ تَجِدُنِي كَاسِدًا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " لَكِنْ عِنْدَ اللَّهِ لَسْتَ بِكَاسِدٍ أَوْ قَالَ: «لَكِنْ عِنْدَ اللَّهِ أَنْتَ غَالٍ»
অর্থ: হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, গ্রাম্য এক ব্যক্তি ছিল, যার নাম জাহের বিন হারাম (রা.)। নবি (ﷺ)তাঁকে খুব ভালবাসতেন। তাঁর গায়ের রং ছিল কালো বর্ণের। একদিন নবি (ﷺ) তাঁর নিকটে গেলেন সে তখন তার মালামাল বিক্রির কাজে ব্যস্ত ছিল। অতঃপর তিনি তাঁর অজান্তে পিছন থেকে তাঁকে জড়িয়ে
ধরলেন। সে তখন বলতে লাগল, কে আপনি ? আমাকে ছেড়ে দিন। পিছনে দিকে ফিরে জানতে পারল যে,
তিনি রসূল (ﷺ)। নবিজিকে চেনার পর তার পিঠকে রসূলের বুকের সাথে ঘসতে কোন
প্রকার কসুর করেনি। রসূল (ﷺ)বলতে ছিলেন :
এ গোলামকে কে
ক্রয় করবে ? জাহের বলল, হে আল্লাহর রসূল ! আমাকে বিক্রি করে কেবল অচল মুদ্রাই পাবেন (অর্থাৎ সস্তা, নগণ্য
মূল্য)। এরপর তিনি বললেন, কিন্তু
তুমি আল্লাহর কাছে অচল (সস্তা) নও। অথবা তিনি বললেন, আল্লাহর নিকট তোমার উচ্চমর্যাদা রয়েছে।[398]
এ হাদিস শরিফ দ্বারা জানা গেল যে,
মুমিনের সম্মান-ইজ্জত শারীরিক রং-গঠন-অবয়ব, বাহ্যিক চাকচিক্যের উপর নয়। বরং তিনি যে ভেতরে ঈমান লালন করেন, আল্লাহ-রসূলের
আনুগত্য এবং তাঁদেরকে অগাধ ভালবাসেন এর দরুন। রসূলে কারিম (ﷺ)
বলতেন, জাহের আমার গ্রাম্য বন্ধু আর তার শহরের
বন্ধু।
আলেম-ওলামার সম্মান-মর্যাদা
কুরআনুল কারিমের
অসংখ্য আয়াতে ও হাদিস শরিফে হযরতে ওলামা-কেরামের শান-মর্তবা বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে
কিছু উল্লেখ করলাম : যেমন-আল্লাহ
তাআলা বলেন, (১)يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ অর্থ: আল্লাহ তাআলা তাদেরকে
মর্যাদায় সমুন্নত করবেন, যারা তোমাদের মধ্য হতে ঈমান আনয়ন করেছেন এবং
যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে। আর তোমরা যা কিছু কর ,আল্লাহ তদ্বিষয়ে সম্যক অবহিত।[399]
যারা এর কথা মেনে ঈমানের পরিচয় দেয়
এবং যারা মুমিনের মধ্যে জ্ঞানের অধিকারী হয়েছেন, আল্লাহ তাআলা
তাঁদের মর্যাদা সমুন্নত করেছেন।
হজরত
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)বলেন,
আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে আলেমদের প্রশংসা করেছেন। অতঃপর তিনি বলেছেন, হে লোক সকল এ আয়াতের তাৎপর্য বুঝে নাও। জ্ঞানার্জনের প্রতি তোমাদেরকে উৎসাহিত করার জন্য আল্লাহ বলেছেন, যে মুমিন আলেম সে মুমিনকে-যে মুমিন আলেম নয় তার ওপর মর্যাদা
দান করা হয়েছে।
কুরতুবি
(রহ) এ আয়াতের তাফসিরে বলেছেন, আল্লাহ তাআলা এ বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর কাছে মর্যাদার
মানদণ্ড হলো এলেম ও ঈমান, মজলিসে মধ্যে বসা নয়।-(সাফওয়া, কুরতুবি)
ইমাম
রাজি (রহ.) লিখেছেন, আলোচ্য আয়াতে আলেমদের উচ্চ মর্তবার যে ঘোষণা রয়েছে তার কারণ এই যে,
আলেমদের এলেম দ্বারা অন্যরা উপকৃত হয়। তাদের অনুসরণ করে অন্যরা নেক আমল করে। কিন্তু যে মুমিন আলেম নয়; তার দ্বারা
এমন কাজ অকল্পনীয়। (কাবির) [400]
(২)يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَشَاءُ
وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا وَمَا يَذَّكَّرُ
إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ অর্থ: তিনি যাকে ইচ্ছা হিকমত দান করেন এবং যাকে হিকমত দেওয়া হল সে
অশেষ কল্যাণ পেল। আর জ্ঞানীরা ছাড়া কেহ উপদেশ নেয় না।[401]
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে আলি ইবনে আবু তালহা (রহ.)
হিকমতের ভাবার্থে বর্ণনা করেন- কুরআনের রহিত-অরহিত,পূর্বাপর, হালাল-হারাম ও উপমা-উৎপ্রেক্ষা সংবলিত আয়াতগুলো গভীর জ্ঞান
দান। মুজাহিদ (রহ.)বলেন, যাকে হিকমত দান করা হয়, সে আল্লাহর কথার প্রকৃত
ভাবার্থ বুঝতে পারে। আবুল আলিয়া বলেন, হিকমত বলে আল্লাহকে ভয়
করাকে। কেননা হিকমতের মূলকথা হল আল্লাহকে ভয় করা। ইব্রাহিম নাখই (রহ.) বলেন : হিকমত অর্থ সুন্নাত।[402]
(৩)يَا أَيُّهَا
الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا
بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ
سَمِيعٌ عَلِيمٌ (1) يَا أَيُّهَا
الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا
أَصْوَاتَكُمْ
فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا
لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ
أَعْمَالُكُمْ
وَأَنْتُمْ
لَا تَشْعُرُونَ অর্থ: হে মুমিনগণ ! তোমরা আল্লাহ
ও তাঁর রসূলের সামনে কোনো
বিষয়ে অগ্রসর হয়ো না এবং আল্লাহকে
ভয় কর। নিশ্চয়
আল্লাহ সর্বশ্রোত্, মহাজ্ঞানী। হে মুমিনগণ! তোমরা
নবির কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের
কণ্ঠস্বরকে উচু করো না এবং তোমাদের
একজন অপরজনের সঙ্গে জোরে
কথা বলার ন্যায় তাঁর
সাথে জোরে কথা বলো না। তাহলে তোমাদের আমলসমূহ নষ্ট
হয়ে যাবে এমনাবস্থায় যে,তোমরা
টেরও পাবে না।[403]
আয়াতের দ্বারা নবি করিম
(ﷺ)-এর প্রতি
শ্রদ্ধা প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া
হয়েছে। তাঁর আগে বেড়ে
কিছু করা এবং বলার
প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তেমনিভাবে নবিগণের ওয়ারিশ হিসেবে
ওলামা-মাশায়েখের প্রতিও একই রূপ শ্রদ্ধা
প্রদর্শন করা-মুমিনের কর্তব্য। আর তেমনিভাবে নবিগণের ওয়ারিশ
হিসেবে ওলামা-মাশায়েখের মজলিসেও
তাদের আওয়াজের উপর আওয়াজ
তুলে কথা বলা বেয়াদবির
শামিল।[404]
(৪) রসূলুল্লাহ (ﷺ) আলিমের মর্যাদা
সম্পর্কে ইরশাদ করেন,
إِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ إِنَّ الأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلاَ دِرْهَمًا إِنَّمَا وَرَّثُوا الْعِلْمَ فَمَنْ أَخَذَ بِهِ أَخَذَ بِحَظٍّ وَافِرٍ অর্থ : আলিমগণ নবিদের উত্তরাধিকারী,
আর নবিগণ দিরহাম
ও দিনারের (বৈষয়িক কোনো সম্পদের) উত্তরাধিকার রেখে যাননি। তাঁরা উত্তরাধিকার
হিসেবে রেখে গেছেন ইলম। অতএব যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করেছে,
সে বিপুল অংশ
লাভ করেছে।[405]
(৫)وَإِنَّ فَضْلَ العَالِمِ عَلَى العَابِدِ كَفَضْلِ القَمَرِ لَيْلَةَ البَدْرِ عَلَى سَائِرِ الكَوَاكِبِ،.অর্থ: আবদের
ওপর আলেমের ফজিলত ঠিক তেমনি, যেমন
সমগ্র নক্ষত্রপুঞ্জের ওপর পূর্ণিমার
চাঁদের ফজিলত।[406]
(৬) অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি- দুনিয়া অভিশপ্ত এবং দুনিয়ার মধ্যে যে সব
বস্তু আছে, সেগুলো অভিশপ্ত। তবে অভিশপ্ত নয় কেবল আল্লাহর
জিকির ও তাঁর আনুগত্য এবং আলেম ও এলমে দীন অর্জনকারী।[407]
(৭) عَنْ أَبِي أُمَامَةَ البَاهِلِيِّ، قَالَ: ذُكِرَ لِرَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلاَنِ أَحَدُهُمَا عَابِدٌ وَالآخَرُ عَالِمٌ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فَضْلُ العَالِمِ عَلَى العَابِدِ كَفَضْلِي عَلَى أَدْنَاكُمْ. ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ وَمَلاَئِكَتَهُ وَأَهْلَ السَّمَوَاتِ وَالأَرَضِينَ حَتَّى النَّمْلَةَ فِي جُحْرِهَا وَحَتَّى الحُوتَ لَيُصَلُّونَ عَلَى مُعَلِّمِ النَّاسِ الخَيْرَ.অর্থ: হজরত আবু উমামা বাহেলি (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূল (ﷺ) এর সামনে দুই ব্যক্তির আলোচনা করা হল। তন্মধ্যে একজন আবেদ আরেকজন আলেম ছিল।
রসূল (ﷺ) ইরশাদ করলেন, আলেমের ফজিলত আবেদের উপর এমন যেমন আমার ফজিলত তোমাদের মধ্য
হতে একজন সাধারণ ব্যক্তির উপর। তারপর রসূল (ﷺ) ইরশাদ করলেন, যারা লোকদের ভাল কথা শিক্ষা দেয়, তাদের
উপর আল্লাহ তাআলা তাঁর ফেরেশতাগণ আসমান জমিনের সমস্ত মাখলুক, এমনকি
পিঁপড়া আপন গর্তে এবং মাছ [পানির ভিতর আপন আপন পদ্ধতিতে] রহমতের দোআ করে।[408]
নোট : তিরমিজি -২৬৮২ নং হাদিস
বর্ণনায় রয়েছে ফেরেশতারা তাঁদের পাখা বিছিয়ে দেয় তালেবে এলেমের সম্মানার্থে।
(৮)
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে
বর্ণিত।
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “فَقِيهٌ أَشَدُّ عَلَى الشَّيْطَانِ مِنْ أَلْفِ عَابِدٍ”: “هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ একজন ফকিহ (অর্থাৎ যিনি কুরআন-হাদিসের
গভীর জ্ঞান জ্ঞাত ও মর্ম উদ্ধারকারী) শয়তানের জন্য একহাজার আবিদ
(মূর্খ) অপেক্ষা বিপজ্জনক।[409]
নোট : ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে গরিব বলেছেন।
ওলামায়ে-কেরামের সমালোচনার
ব্যাপারে পূর্বসূরি মনীষীদের অভিমত : ইমাম
আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি উলামায়ে কেরামকে
অবজ্ঞা করবে তার আখিরাত ধ্বংস হবে। যে ব্যক্তি রাজা-বাদশাদের অবজ্ঞা করবে তার
দুনিয়া ধ্বংস হবে। যে ব্যক্তি নিজের ভাইকে অবজ্ঞা করবে তার মানবিকতা ধ্বংস হবে।[410]
ইমাম আহমদ ইবনে আজরায়ি (রহ.) বলেন, উলামায়ে
কেরামের কুৎসা রটনা করা,
বিশেষ করে পূর্ববর্তী ওলামায়ে কেরামের, এটা
কবিরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি ওলামায়ে কেরামের প্রতি বিদ্বেষী মনোভাব
রাখবে, এর দ্বারা তার নিজেরই ক্ষতি হবে।[411]
আল্লামা জাইনুদ্দিন ইবনে নুজাইম মিসরি (রহ.) (৯৭০ হি.) বলেন, যদি কেউ
কোনো আলেম বা ফকিহকে ব্যক্তিগত কোনো কারণ ছাড়া (আলেম হওয়ার কারণে) গালি দেয়, তাহলে সে
কাফের হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।[412]
আখেরাতে উচ্চমর্যাদা কেবল মুত্তাকিদের(কামেল মুমিনদের)জন্যে
زُيِّنَ
لِلَّذِينَ
كَفَرُوا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَيَسْخَرُونَ مِنَ الَّذِينَ
آمَنُوا وَالَّذِينَ اتَّقَوْا فَوْقَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَاللَّهُ يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ
بِغَيْرِ حِسَابٍ
অর্থ: পার্থিব জীবনের ওপর কাফেরদেরকে উন্মত্ত করে দেওয়া হয়েছে। আর তারা ঈমানদারদের প্রতি লক্ষ্য করে হাসাহাসি
করে। পক্ষান্তরে যারা পরহেজগার তারা সেই
কাফেরদের তুলনায় কেয়ামতের দিন অত্যন্ত উচ্চমর্যাদায় থাকবে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সীমাহীন রুজি দান করেন।[413]
কাফেররা দুনিয়ার ভোগ-লিপ্সার প্রতি সন্তুষ্ট রয়েছে। এমনকি এতে তারা প্রশান্তি পেয়েছে এবং সম্পদ পুঞ্জিভূত করে আল্লাহর
নির্দেশিত পথে ব্যয় করা হতে বিরত থাকছে। পক্ষন্তারে যে সকল মুমিন এই নশ্বর জগত হতে মুখ ফিরে নিয়েছে এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির
কাজে সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছে, তাদেরকে এরা
উপহাস করে থাকে। অথচ প্রকৃতপক্ষে
ভাগ্যবান সেই মুমিনরাই। কেয়ামতের
দিন মুমিনের মর্যাদা দেখে কাফেরদের চক্ষু খুলে যাবে। সেদিন নিজেদের দুর্ভাগ্য ও মুমিনদের সৌভাগ্য লক্ষ্য করে তারা
অনুধাবন করতে পারবে যে কারা উচ্চ পদস্থ এবং কারা নিম্ন প্রদস্থ।[414]
অসংখ্য নিয়ামতরাজি শুধু মুমিনের জন্য বিশেষ করে আখেরাতের নিয়ামত
قُلْ
مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ
قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ
آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ
الدُّنْيَا
خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ অর্থ : ‘হে নবি আপনি বলে দিন ! আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব শোভার বস্তু ও বিশুদ্ধ জীবিকা সৃষ্টি করেছেন তা কে নিষিদ্ধ করেছে ? বলুন, পার্থিব জীবনে বিশেষ করে কেয়ামতের দিনে এই সমস্ত তাদের জন্য যারা বিশ্বাস করে (ঈমানদারদের জন্য)। এইরুপে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করি।[415]
আয়াতটির মর্মার্থ এ রকম-হে আমার রসূল! উত্তম পোশাক-পরিচ্ছদ ও বিশুদ্ধ জীবিকাকে আল্লাহ তাআলা তো নিষিদ্ধ করেননি। তবে কোনো মানুষ তাওয়াফের সময় নগ্ন হবে ? কেনো হজের সময় পরিত্যাগ করবে গোশত ও চর্বি ? কেনো স্বেচ্ছায় সায়েবা ও অন্যান্য পশুর শ্রম কাজে লাগানোকে হারাম মনে করবে ? আলোচ্য বাক্যটির মাধ্যমে আরেকটি কথা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তাআলা নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত সকল কিছুই হালাল। হারাম কেবল সেগুলোই যেগুলোকে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।
এরপর বলা হয়েছে- বলো, পার্থিব জীবনে বিশেষ করে কেয়ামতের দিনে এ সমস্ত তাদের জন্য যারা বিশ্বাস করে। এ কথার অর্থ-দৃষ্টিনন্দন পরিচ্ছদ এবং বিশুদ্ধ ও সুস্বাদু খাদ্যবস্তু সৃষ্টি করা হয়েছে কেবল বিশ্বাসীদের জন্য, যাতে করে তারা অর্জন করতে পারে ইবাদত করার নিমিত্তে শারীরিক শক্তি এবং রক্ষা করতে পারে শালিনতা। এ সকল নেয়ামত ব্যবহার করে তারা যেন প্রকাশ করতে পারে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা। অবিশ্বাসীদের জন্য শোভন বস্তু হিসেবে এ জীবিকাসমূহকে সৃষ্টি করা হয়নি। পৃথিবীতে
কেবল এ সকল নেয়ামত উপভোগের জন্য তাদেরকে দেওয়া হয়েছে অধিকার সাময়িক অধিকার। এ সকল নেয়ামতের চিরন্তন অধিকারী নয়।[416]
দুনিয়াতে জীবনোপকরণের বাহুল্য ও স্বল্পতা আল্লাহর কাছে প্রিয়পাত্র
ও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আলামত নয়
فَأَمَّا
الْإِنْسَانُ
إِذَا مَا ابْتَلَاهُ
رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعَّمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ (15) وَأَمَّا إِذَا مَا
ابْتَلَاهُ
فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ (16) كَلَّا بَلْ لَا
تُكْرِمُونَ
الْيَتِيمَ
অর্থ: মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন,
অতঃপর সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন বলে
: আমার প্রতিপালক আমাকে সম্মান দান করেছেন। এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিজিক সংকুচিত করে দেন, তখন বলে, আমার প্রতিপালক আমাকে হেয়
করেছেন। এটা অমূলক, বরং তোমরা এতিমকে সম্মান করো না। সূরা ফজর, ১৫-১৭
فَأَمَّا
الْإِنْسَانُ আয়াতে আসলে কাফের ইনসান বুঝানো হয়েছে। কিন্তু ব্যাপক অর্থে সেসব মুসলমানও এর অন্তর্ভুক্ত যারা নিম্নরূপ ধারণায় লিপ্ত
থাকে।
আল্লাহ
তাআলা যখন কাউকে জীবনোপকরণে সমৃদ্ধি ও স্বাচ্ছন্দ্য, ধন-সম্পদ ও সুস্বাস্থ্য দান করেন, তখন শয়তান তাকে দুটি ভ্রান্ত
ধারণায় লিপ্ত করে দেয়-(এক ) সে মনে করতে
থাকে যে, এটা আমার ব্যক্তিগত প্রতিভা, গুণ-গরিমা ও কর্ম প্রচেষ্টারই অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতি, যা আমার
লাভ করাই সঙ্গত। আমি এর যোগ্য
পাত্র। (দুই) আমি আল্লাহর কাছেও
প্রিয় পাত্র। যদি প্রত্যাখ্যাত
হতাম, তবে তিনি আমাকে এসব নেয়ামত দান করতেন না। এমনিভাবে কেউ অভাব-অনটন ও দারিদ্র্যের সম্মুখীন হলে একে আল্লাহর কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার দলিল
মনে করে এবং তাঁর প্রতি এ কারণে ক্রুদ্ধ হয় যে, সে অনুগ্রহ ও সম্মানের পাত্র ছিল,
কিন্তু তাকে অহেতুক লাঞ্ছিত ও হেয় করা হয়েছে। কাফের- মুশরেকদের মধ্যে এ
ধরণের ধারণা বিদ্যমান ছিল এব্ং কুরআনে পাকে কয়েক জায়গায় তা উল্লেখও করেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, আজকাল মুসলমানও এ বিভ্রান্তিতে লিপ্ত রয়েছে। আল্লাহ তাআলা আলোচ্য আয়াতসমূহে এ ধরণের লোকদের অবস্থাই উল্লেখ
করেছেন : كَلَّا –অর্থাৎ, তোমাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ
ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন। দুনিয়াতে জীবনোপকরণের স্বাচ্ছন্দ্যে সৎ ও আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার আলামত নয়, তেমনি অভাব-অনটন ও দারিদ্র্য প্রত্যাখ্যাত ও লাঞ্ছিত
হওয়ার দলিল নয়। বরং অধিকাংশ
ক্ষেত্রে ব্যাপার সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে থাকে। খোদায়ি দাবি করা সত্ত্বেও ফেরাউনের কোনদিন মাথা ব্যথাও হয়নি, অপরপক্ষে কোনো কোনো পয়গম্বরকে শত্রুরা করাত দিয়ে চিরে দ্বিখণ্ডিত করে দিয়েছে। রসূলুল্লাহ (ﷺ)
বলেছেন, মুহাজিরগণের মধ্যে যাঁরা দরিদ্র
ও নিঃস্ব ছিল, তাঁরা ধনী মুহাজিরগণ অপেক্ষা চল্লিশ বছর আগে জান্নাতে
যাবে।-(মাজহারি) অন্য এক হাদিসে
আছে, আল্লাহ তাআলা যে বান্দাকে ভালবাসেন, তাকে দুনিয়া থেকে এমনভাবে বাঁচিয়ে রাখেন, যেমন তোমরা
রোগীকে পানি থোকে বাঁচিয়ে রাখ। -(মাজহারি)[417]
পার্থিব ধন-সম্পদ ও সম্মানকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার দলিল
মনে করা ধোঁকা : পৃথিবীর জন্মলগ্ন
থেকে পার্থিব ধন-সম্পদ ভোগ-বিলাসের নেশায়
লোকেরা সর্বদাই সত্যের বিরোধিতা এবং পয়গম্বর ও সৎলোকের সাথে শত্রুতার পথ অবলম্বন করেছে। শুধু তাই
নয়, তারা সত্যপন্থীদের মোকাবেলায় নিজেদের
অবস্থার উপর নিশ্চিত ও সন্তুষ্ট থাকার এই দলিলও উপস্থাপিত করেছে যে,আল্লাহ তাআলা যদি আমাদের কার্যকলাপ ও অভ্যাস-আচরণ পছন্দ
না করবেন, তবে আমাদেরকে পার্থিব ধন-সম্পদ,
মান-সম্মান- শাসন ক্ষমতায়
কে সমৃদ্ধ করবেন। কুরআন পাক
এর জবাব বিভিন্ন আয়াতে বিভিন্ন ভঙ্গিতে দিয়েছে। যেমন, তিনি ইরশাদ করেন,
وَقَالُوا نَحْنُ أَكْثَرُ أَمْوَالًا وَأَوْلَادًا وَمَا نَحْنُ
بِمُعَذَّبِينَ
(35) قُلْ إِنَّ رَبِّي
يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
(36) وَمَا أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ
بِالَّتِي تُقَرِّبُكُمْ عِنْدَنَا زُلْفَى إِلَّا مَنْ آمَنَ
وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَئِكَ لَهُمْ جَزَاءُ الضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوا
وَهُمْ فِي الْغُرُفَاتِ
آمِنُونَ অর্থ: তারা আরও বলেছে, আমরা ধনে-জনে সমৃদ্ধ, সুতরাং আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হব না। বলুন,আমার পালনকর্তা যাকে ইচ্ছা রিজিক বাড়িয়ে দেন এবং পরিমিত দেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা বোঝে না। তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করবে
না। আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম
করে,তারা তাদের কর্মের বহুগুণ প্রতিদান
পাবে এবং তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।[418]
জওয়াবের সারমর্ম এই যে, দুনিয়াতে ধন-সম্পদ,
মান-সম্মান ও প্রভাব- প্রতিপ্রত্তির
হ্রাস-বৃদ্ধি আল্লাহর কাছে প্রিয়-অপ্রিয়
হওয়ার দলিল নয়; বরং সৃষ্টিগত সুবিবেচনার ভিত্তিতে দুনিয়াতে আল্লাহ
তাআলা যাকে ইচ্ছা অগাধ ধন-সম্পদ দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা কম দেন। এর রহস্য তিনিই জানেন। ধন-সম্পদের প্রাচুর্য কে আল্লাহর প্রিয়
হওয়ার দলিল মনে করা মূর্খতা। আল্লাহর প্রিয়
হওয়া হওয়া একমাত্র ঈমান ও সৎকর্মের উপর নির্ভরশীল। যে ব্যক্তি এগুলো অর্জন করে না, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্য তাকে প্রিয়পাত্র
করতে পারে না।[419]
মৃত্যুলগ্নে মুমিন ব্যক্তির ইজ্জত ও সুসংবাদ
মৃত্যুকালে বেহেশতের কাফন,বেহেশতি পোশাক,বেহেশতি
খোশবু ও বিছানা :
إِنَّ
الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا
تَتَنَزَّلُ
عَلَيْهِمُ
الْمَلَائِكَةُ
أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا
وَأَبْشِرُوا
بِالْجَنَّةِ
الَّتِي
كُنْتُمْ
تُوعَدُونَ অর্থ: যারা এ কথা বলে, যে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ ! অতঃপর তার মৃত্যু পর্যন্ত
এর ওপর অটল থাকে-তাদের নিকট ফেরেশতাগণ অবতীর্ণ হয় আর তারা বলে
তোমরা ভীত-চিন্তিত হইও না। আর সেই জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর, যা তোমাদের সথে ওয়াদা করা হয়েছে।[420]
মুমিন যখন
পৃথিবীতে অবস্থান করেছিল মহান রব তার জন্যে সম্মানজনক ব্যবস্থা করেছিলেন। এখন তার বিদায় বেলাও জান্নাতি কাফন, পোশাক, খোশবু ও বিছানা ব্যবস্থাপত্র করে
রেখেছেন। যেমন হাদিস
শরিফে এসেছে-
عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ----- قَالَ إِنَّ الْعَبْدَ الْمُؤْمِنَ إِذَا كَانَ فِي انْقِطَاعٍ مِنْ الدُّنْيَا وَإِقْبَالٍ مِنْ الْآخِرَةِ نَزَلَ إِلَيْهِ مَلَائِكَةٌ مِنْ السَّمَاءِ بِيضُ الْوُجُوهِ كَأَنَّ وُجُوهَهُمْ الشَّمْسُ مَعَهُمْ كَفَنٌ مِنْ أَكْفَانِ الْجَنَّةِ وَحَنُوطٌ مِنْ حَنُوطِ الْجَنَّةِ حَتَّى يَجْلِسُوا مِنْهُ مَدَّ الْبَصَرِ ثُمَّ يَجِيءُ مَلَكُ الْمَوْتِ عَلَيْهِ السَّلَام حَتَّى يَجْلِسَ عِنْدَ رَأْسِهِ فَيَقُولُ أَيَّتُهَا النَّفْسُ الطَّيِّبَةُ اخْرُجِي إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ اللَّهِ وَرِضْوَانٍ قَالَ فَتَخْرُجُ تَسِيلُ كَمَا تَسِيلُ الْقَطْرَةُ مِنْ فِي السِّقَاءِ فَيَأْخُذُهَا فَإِذَا أَخَذَهَا لَمْ يَدَعُوهَا فِي يَدِهِ طَرْفَةَ عَيْنٍ حَتَّى يَأْخُذُوهَا فَيَجْعَلُوهَا فِي ذَلِكَ الْكَفَنِ وَفِي ذَلِكَ الْحَنُوطِ وَيَخْرُجُ مِنْهَا كَأَطْيَبِ نَفْحَة-------- --------
رواه الإمام أحمد و أبو داود وروى النسائي وابن ماجه أوله ورواه الحاكم و أبو عوانة الإسفرائيني في صحيحيهما و ابن حبان وصحَّح الحديث في صحيح الترغيب والترهيب.
অর্থ: হজরত বারা ইবনে আযেব (রা.)
বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: ঈমানওয়ালা বান্দা যখন দুনিয়া হতে শেষ
বিদায় নিয়ে আখেরাতের পথে যাত্রা আরম্ভ করে, তখন তার নিকট আসমান হতে একদল ফেরেশতা আগমন
করেন। তাদের চেহারাসমূহ এত উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময়
যে, চেহেরার ভেতর যেন দীপ্তিমান সূর্য্য ভাসছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে বেহেশত হতে আনীত কাফন ও খোশবু। তারা মুমিন ব্যক্তির সুদূর দৃষ্টিসীমা পর্য্ন্ত
বসে যায়। অতঃপর মালাকুল-মউত (মৃত্যুর ফেরেশতা) তার শিয়রে
এসে উপবেশন করে। এবং তাকে
বলে, হে নফসে মুতমাইন্নাহ, হে মাওলা পাগল রূহ
! তুমি আল্লাহর হুকুম মেনে--- জীবন কেটেছ। এখন আল্লাহর ঘোষিত ক্ষমা ও তার পরম সন্তুষ্টির
স্বাদ আস্বাদন করার জন্য বের হয়ে এসো, আল্লাহর দরবারে চল। রূহ তখন
এত সহজে বহির্গত হয় যেভাবে মশকের ভেতর হতে পানির ফোঁটা টপ করে
নির্গত হয়ে যায়।----(রূহকে)
ঐ বেহেশতি কাফন ও খোশবু দ্বারা আবৃত করে লয়। তা থেকে দুনিয়ার অতীব সুগন্ধময় মেশক অপেক্ষা তীব্র
সুগন্ধ ছড়াতে থাকে। অতঃপর তারা তাকে নিয়ে ঊর্ধ্ব জগতের
দিকে যাত্রা করে---------।[421]
নোট : হাদিসটির অংশ বিশেষ উল্লেখ করা হয়েছে।
মুমিন বান্দার জন্য আসমান-জমিনের ক্রন্দন
فَمَا بَكَتْ عَلَيْهِمُ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ وَمَا كَانُوا مُنْظَرِينَ অর্থ: আকাশ এবং পৃথিবী কেহই
তাদের জন্যে অশ্রুপাত করে নাই এবং তাদেরকে অবকাশও দেওয়া হয় নাই।[422]
তারা
এমন কোনো ভাল করে নাই যা আকাশের দ্বার অতিক্রান্ত করে ওপরে
যেতে পারে। যা বন্ধ
হবার ফলে আকাশ আক্ষেপ
করবে। তেমনি পৃথিবীতেই
এমন কোনো ভূখণ্ড নাই যেখানে
তারা আল্লাহর ইবাদত করত এবং তা এখন
হয় না বলে সেই ভূখণ্ড
আক্ষেপ করবে। সুতরাং
তাদের কুফরি, নাফরমানী ও পাপাচারের
ব্যাপারে আরও অবকাশ লাভের
তাদের কোনো অধিকার ছিল না।
হজরত আনাস
ইবনে মালেক (রা.) হতে বর্ণনা
করেন। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: প্রত্যেক বান্দার জন্য আকাশে
দুইটি দরজা রয়েছে। একটি দরজা দিয়ে তার রিজিক অবতীর্ণ হয় ও অপর দরজা দিয়ে তার
আমলনামা ওপরে ওঠে। যখন কোনো মুমিন বান্দা মারা যায় তখন দরজা দুইটি বন্ধ হয়ে
যায়। ফলে উক্ত দরজাদ্বয় তার জন্য ক্রন্দন করে। অতঃপর তিনি তেলাওয়াত করেন, فَمَا بَكَتْ عَلَيْهِمُ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ وَمَا كَانُوا مُنْظَرِينَ(আকাশ এবং পৃথিবী কেহই তাদের জন্যে অশ্রুপাত করে নাই এবং তাদেরকে অবকাশও দেওয়া হয়
নাই।)
সাঈদ ইবনে জুবাইর (রা.) বর্ণনা করেন, এক
ব্যক্তি হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর
কাছে উপস্থিত হয়ে প্রশ্ন করল, হে আবুল আব্বাস ! আপনি কি আল্লাহ পাকের فَمَا بَكَتْ عَلَيْهِمُ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ وَمَا كَانُوا مُنْظَرِينَ আয়াতটি দেখেছেন ? আকাশ
ও পৃথিবী কি কারো জন্যে কাঁদে ? তিনি বলবেন, হ্যাঁ, এমন
কোনো লোক নাই যার জন্য আকাশে দরজা রাখা হয় নাই। এক দরজা দিয়ে তার রিজিক আসে ও অন্য
দরজা দিয়ে তার আমল প্রবেশ করে। যখন কোনো মুমিন মারা যায় তখন তাকে হারিয়ে শোকে
কাঁদে। তেমনি পৃথিবীকে মুসাল্লা বানিয়ে সে সালাত আদায় করেছে ও জিকির-আজকার করেছে। তার মৃত্যুতে এ বন্ধ হওয়ায় পৃথিবী কাঁদে। পক্ষান্তরে ফেরাউন
গোষ্ঠীর না পৃথিবীতে কোনো ভাল কাজের চিহ্ন আছে, না আকাশে
তাদের কোনো ভাল পৌঁছেছে। ফলে আকাশ ও পৃথিবী তার জন্য কাঁদে নাই। সুফিয়ান ছাওরি (রহ.) ইবনে
আব্বাস হতে বর্ণনা করেন, এইরূপ বলা হত যে, পৃথিবী কোন মুমিনের জন্য চল্লিশ দিন যাবত কাঁদতে থাকে।
মুজাহিদ
(রহ.) বলেন, এমন কোনো মৃত
মুমিন নেই যার জন্য আকাশ ও পৃথিবী চল্লিশ সকাল কাঁদে না ? আমি
প্রশ্ন করলাম, পৃথিবী কি কাঁদে ? তিনি জবাব
দিলেন, তুমি কি অবাক হচ্ছো ? কেন পৃথিবী
আল্লাহর সেই বান্দার জন্য কাঁদবে না, যে লোক রুকু-সিজদা দ্বারা পৃথিবীর বুক আবাদ করল ? কেনই বা আকাশ তার
জন্য কাঁদবে না, যে লোক আল্লাহর তাকবির ও তাসবিহ দ্বারা আকাশকে
সেভাবেই গুঞ্জরিত করল, যেভাবে মধুমক্ষিকা পৃথিবীকে গুঞ্জরিত করে।[423].
মুমিনকে সাদরে গ্রহণের জন্য কবরের প্রস্তুতি
عن ابن عمر - رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم “إنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا مَاتَ تجمَّلَت الْمَقَابِرُ لِمَوْتِهِ، فَلَيْسَ مِنْها بُقْعَةٌ إِلَّا وتتمنَّى أنْ يُدْفَنَ فِيها، وَإِنَّ الْكَافِرَ إِذَا مَات أَظْلَمَتِ الْمَقَابِرُ لِمَوْتِه فلَيْسَ مِنْها بُقْعَةٌ إِلَّا وهى تَسْتَجِيرُ باللهِ أَلَّا يُدْفَن فيها”. الحكيم، وابن عساكر
অর্থ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন যে, নবি কারিম (ﷺ) বলেছেন : কোনো মুমিন
বান্দার যদি মৃত্যু হয়, তার মৃত্যু উপলক্ষে পৃথিবীর প্রতিটি ‘ভাল জায়গা’ নিজেকে
সুসজ্জিত ও সৌন্দর্য মণ্ডিত করে তোলে এবং প্রতিটি জায়গায় বাসনা করে যে, এই মুমিন বান্দাকে যেন তার বুকেই দাফন করা
হয়।[424]
ফেরেশতাদের একটি বিশেষ কাফেলার জানাযার সঙ্গে গমন
عَنِ ابْنِ مَسْعُودِ عن النبي -صلى اللَّه عليه وسلم قَال “قَال دَاودٌ -عَلَيه السلام-: إِلهى مَا جَزاءُ مَن شَيَّعَ ميتا إِلَى قَبْرِه ابْتغَاءَ مَرضاتِكَ؟ قَال: جَزَاؤُهُ أنْ تُشيِّعَه مَلائكَتِى فَتصَلَّى عَلَى رُوحِهِ في الأروَاح
অর্থ: রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : হজরত দাউদ (আ.)আল্লাহ পাকের নিকট জিজ্ঞেস করেছিলেন
যে, “হে আমার মাবুদ! যে ব্যক্তি তোমার সন্তুষ্টি লাভের
উদ্দেশ্যে কোনো মুর্দা ব্যক্তির সাথে তার কবর পর্যন্ত গমন করে, সেই ব্যক্তিকে আপনি কী পুরস্কার দান করবেন ? জবাবে
আল্লাহ পাক বললনে, তার পুরস্কার এই যে, তার মৃত্যুর পর আমার ফেরেশতারা তার জানাযার সঙ্গে সঙ্গে গমন করবে এবং তার
রূহের জন্যে নেক রূহসমূহের সমাবেশ দোআও করবে।[425]
জানাযা কবরের দিকে যাবার সময় সকল মুর্দার
সঙ্গেই একদল ফেরেশতা গমন করে। ইহাই সাধারণ নিয়ম। এই হাদিসে
ফেরেশতাদের জানাযার সঙ্গে গমনের যে কথা বলা হয়েছে তা ঐ সাধারণ সঙ্গীত্ব নহে। বরং ইহার অর্থ হচ্ছে, এই জানাযার প্রতি
‘বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান’ প্রদর্শনের
জন্য ‘বিশেষ আরেকটি কাফেলা’ তার সঙ্গে গমন করে। বিশাল দেহের
বিরাট মর্যাদাশীল নুরানি মাখলুক এই ফেরেশতাদের নিকট কারো উজ্জত ও এহতেরামের পাত্র হওয়া কোনো সাধারণ কথা নহে। দুনিয়ার বড় হতে বড় কোনো রাজা-বাদশাও এই মর্যাদা পায় না। মুর্দা যখন নিজের এই সুউচ্চ মর্যাদার খবর প্রাপ্ত হয় অথবা স্বচক্ষে তা অবলোকন করে, না জানি আখেরাতকে সে কত বেশি প্রিয় ও শ্রেষ্ঠ মনে করে!
এবং দুনিয়া তার নজরে কত-যে হীন ও তুচ্ছ হয়ে যায়। তখন তো সে ইহধাম হতে মুক্ত হয়ে পরজগতে চলে যাওয়ার জন্য কতই না
উদগ্রীব হয়ে ওঠে এবং ইহাকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে করে। وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ وَ
لِمِثْلِ هَذَا فَلْيَعْمَلِ الْعَامِلُونَ
অর্থ: বস্তুত প্রতিযোগিতাকারীদের সেই দৌলতের জন্যই প্রতিযোগিতা করা
উচিত। এবং সেই উজ্জত ও দৌলত লাভের জন্য নেক
কাজের মধ্যে নিবিষ্ট থাকা উচিত। আল্লাহ পাক
আমাদেরকে সেই তাওফিক দান করুন। সাহায্য ও
শক্তি দান করুন। সূরা মুতাফফাফিন-২৬ ও ছফফাত-৬১[426] .
মৃত্যুপ্রাপ্ত মুমিনের প্রতি কবরের
মহব্বত ও অভ্যর্থনা
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ أَنَّ رَسُولَ اللهِ - صلى الله عليه وسلم قَالَ:
فِإذَا دُفِنَ العَبْدُ المؤمِنُ، قَال لَهُ القَبْرُ: مَرْحَبَاً وأهْلَاً، أمَا إنْ كُنْتَ لمَن أحَبِّ مَنْ يَمْشِي عَلى ظَهْرِي إليَّ، فَمُذْ وُلِّيتُكَ اليومَ وصِرْتَ إليَّ، فَسَتَرى صَنِيعِي بِكَ، قَالَ: فَيتَّسِع لَهُ قَبْرُهُ مَدَّ بَصَرِهِ، وَيُفتَحُ لهُ بابٌ إِلى الجَنَّةِ. অর্থ: হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা
করেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: মুমিন বান্দাকে যখন দাফন করা হয়, তখন কবর তাকে বলে, মারহাবা! আরে,
নিজের বাড়িতেই, আপনজনের কাছেই এসেছো। যারা আমার পৃষ্ঠপরে চলাফেরা করত তাদের মধ্যে তুমি
ছিলে আমার সর্বাধিক প্রিয়জন! আজ যখন তোমাকে আমার দায়িত্বে ন্যস্ত
করা হয়েছে আর তুমি আমার কাছে এসছো, আজ তুমি স্বচক্ষে দেখবে যে,
তোমার সাথে আমি কিরূপ
উত্তম ব্যবহার অতঃপর কবর তার সুদূর দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত হয়ে যায় এবং তার কল্যাণে বেহেশতের
দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়া হয়।[427]
নোট : ইমাম তিরমিজি (রহ.) হাদিসটির সনদ গরিব বলেছেন।
জন্মলগ্ন-মৃত্যুকালে-পরকালে মুমিনকে আল্লাহ তাআলা ও ফেরেশতার সালাম
দুনিয়ার রাজা-বাদশাহ যদি কোনো ব্যক্তিকে
সালাম প্রদান করে অথবা সালাম পাঠান তাহলে সে ব্যক্তির জন্য একতবড় সৌভাগ্য-গর্বের-খুশির বিষয়। নিষ্পাপ, নুরের ফেরেশতারা ও সকল বাদশাহর বাদশা, রাজাধিরাজ, শাহান-শাহ
মালিক আল্লাহ রাব্বুলামিন মুমিন বান্দাকে তাঁর মৃত্যুর সময়, কিয়ামতের
দিন ও জান্নাতে সালাম দিবেন। যেমন কুরআনুল কারিমের বাণী-(১)
تَحِيَّتُهُمْ
يَوْمَ يَلْقَوْنَهُ سَلَامٌ وَأَعَدَّ لَهُمْ أَجْرًا كَرِيمًا অর্থ: যেদিন আল্লাহর সাথে মিলিত
হবে; সেদিন অভিবাদন হবে সালাম। তিনি তাদের জন্যে সম্মানজনক পুরষ্কার প্রস্তুত রেখেছেন।[428]
যেদিন
আল্লাহ পাকের সাথে এদের সাক্ষাত ঘটবে-তখন তাঁর পক্ষ থেকে এদেরকে
সালাম অর্থাৎ আসসালামু আলাইকুমের মাধ্যমে সম্ভাষণ জানানো হবে। ইমাম রাগেব (রহ.)
প্রমুখের মতে, আল্লাহ পাকের সঙ্গে সাক্ষাতের দিন
হলো কিয়ামতের দিন। আবার কোনো
কোনো তাফসিরকারকের মতে এ সাক্ষাতের
সময় হলো বেহেশতে প্রবেশকালে যেখানে তাদের প্রতি আল্লাহ ও ফেরেশতাকুলের পক্ষ থেকে সালাম
পৌঁছানো হবে। আবার কোনো
কোনো মুফাসসির মৃত্যু দিবসকে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের দিন বলে মন্তব্য করেছেন। সেদিন সমগ্র বিশ্বের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আল্লাহ
সমীপে উপস্থিত হওয়ার দিন। যেমন হজরত
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে
যে, মালাকুত-মউত যখন কোনো মুমিনের প্রাণ
বিয়োগ ঘটাতে আসেন, তখন তাঁর প্রতি সুসংবাদ পৌঁছানো হয় যে,
আপনার পালনকর্তা আপনার জন্য সালাম প্রেরণ করেছেন। আর সালাম শব্দ এই তিন ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই এসব উক্তির মাঝে কোনো বিরোধ ও অসামঞ্জস্য নেই। বস্তুত এ তিন অবস্থাতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম পৌঁছানো হবে।–(রুহুল-মাআনি)
(২)وَسَلَامٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ وَيَوْمَ يَمُوتُ وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيًّا অর্থ: তার প্রতি সালাম (শান্তি), যে দিন সে জন্মলাভ করে ও যেদিন তার মৃত্যু হবে
এবং যে দিন সে জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে।[429]
সুফিয়ান
ইবনে উয়ায়নাহ (রহ.) বলেন,মানুষের পক্ষে তিনটি অবস্থা সর্বাধিক বিপর্যয়পূর্ণ, জন্মের সময় যখন সে স্বীয় স্থান ত্যাগ করে
এক নতুন জগতে পদার্পন করতে নিজেকে দেখে। মৃত্যুকাল, তখন সে এমন এক সম্প্রদায়ের সম্মুখীন
হয় যাদেরকে সে কোন দিন দেখে নাই এবং কিয়ামত দিবস সে বিশাল মানব সমুদ্রে নিজেকে অসহায়বস্থায়
দেখবে। এই তিনটি বিপর্যয়পূর্ণ সময়েই হজরত
ইয়াহইয়া (আ.)-এর প্রতি নিরাপত্তা
ও শান্তি বর্ষণ করে মহান আল্লাহ তাঁকে সম্মানিত করেছেন।[430]
(৩)أُولَئِكَ يُجْزَوْنَ
الْغُرْفَةَ بِمَا
صَبَرُوا وَيُلَقَّوْنَ
فِيهَا تَحِيَّةً
وَسَلَامًا অর্থ:তাদেরকে প্রতিদান স্বরূপ দেওয়া হবে জান্নাত,যেহেতু তারা
ছিল ধৈর্যশীল,তাদেরকে সেথায় অভ্যর্থনা
করা হবে অভিনন্দন ও সালাম সহকারে।[431]
জান্নাতের
অন্যান্য নেয়ামতের সাথে তারা এই সম্মানও লাভ করবে যে, ফেরেশতাগণ
তাদেরকে মোবারকবাদ জানাবে এবং সালাম করবে। ফেরেশতাগণ প্রতি দরজা দিয়ে তাদের নিকট সালাম করতে করতে প্রবেশ
করবে।[432]
মাসআলাঃ এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, মুসলমানের পারস্পরিক অভিবাদন ও সম্ভাষণ আসসালামু আলাইকুম হওয়া উচিত;
বড়দের পক্ষ থেকে ছোটদের প্রতি হোক অথবা ছোটদের পক্ষ থেকে বড়দের প্রতি
হোক।[433]
(৪)الَّذِينَ تَتَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ طَيِّبِينَ يَقُولُونَ سَلَامٌ عَلَيْكُمُ ادْخُلُوا الْجَنَّةَ بِمَا كُنْتُمْ
تَعْمَلُونَ অর্থ: ফেরেশতা যাদের জান কবজ করেন তাদের পবিত্র
থাকা অবস্থায়। ফেরেশতারা বলে, তোমাদের প্রতি সালাম (শান্তি বর্ষিত হোক) তোমরা যা করতে, তার প্রতিদানে জান্নাতে প্রবেশ কর।[434]
মুমিন
মুত্তাকিগণের যখন মৃত্যু হবে তখন তারা শিরক ও অন্যায় অপকর্ম হতে পাক পবিত্র হবে এবং
ফেরেশতারা তাদের প্রতি সালাম করবে এবং বেহেশতের সুসংবাদ দান করবে।[435]
(৫) وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ
زُمَرًا حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا
وَفُتِحَتْ
أَبْوَابُهَا
وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فَادْخُلُوهَا خَالِدِينَ অর্থ: আর
যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করত তাদেরকে দলেদলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এমনকি যখন তারা জান্নাতের নিকটে পৌঁছবে এবং এর
দরজাসমূহ পূর্ব থেকে উন্মুক্ত থাকবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা পরমানন্দে অবস্থান কর। সুতরাং জান্নাতে প্রবেশ কর অনন্তবাসের জন্য।[436]
যেমন
আগমনের পূরর্বেই মেহমানের জন্য মেহমানখানার দরজা খোলা রাখা হয়, তেমনি জান্নাতি ব্যক্তি জান্নাতের নিকট পৌঁছেই জান্নাতের সকল দরজা খোলা পাবে। এবং ফেরেশতাগণ “আসসালামু আলাইকুম” বলে তাঁদেরকে অভ্যর্থনা জানাবেন এবং চিরস্থায়ী
জান্নাতের সুসংবাদ দিবেন।[437]
কিয়ামত দিবসে মুমিন-মুত্তাকিদের আল্লাহ তাআলা অতিথি হিসেবে সমবেত করবেন এবং ফেরেশতারা অভ্যর্থনা জানাবে
যেদিনের ভয়াবহ বিভীষিকায় সবাই সঙ্কিত-ভীত-সন্ত্রস্ত; সেদিন
করুণাময় আল্লাহ মুমিনদেকে অর্থাৎ মুত্তাকিদের মেহমানরূপে একত্রিত করবেন। এটা কি মুমিনের জন্য মহা সম্মানের
ব্যাপার নয় ? যেমন তিনি বলেন, (১) يَوْمَ
نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ
وَفْدًا অর্থ: যেদিন দয়াময়ের নিকট মুত্তাকিদের সম্মানিত মেহমানরূপে সমবেত করব।[438]
আল্লাহর
সে সকল পরহেজগার বান্দাগণ যারা দুনিয়ায় আল্লাহকে ভয় করত, তারা
রসূলগণের অনুসরণ করত, তাঁদের আনিত নির্দেশসমূহ মানিত। আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে ইরশাদ করেন যে, তিনি তাঁর এই সকল বান্দাগণকে স্বীয় মেহমান হিসেবে কিয়ামতের একত্রিত করবেন। الوفد বলা হয়, সেই সকল মেহমানকে যারা সওয়ার হয়ে
আগমন করে। কিয়ামতের দিবসে আল্লাহর ঐ সকল মেহমানগণ
নুরের সওয়ারির ওপর আরোহণ করে আল্লাহর মহাসম্মানিত শাহি অতিথি ভবনে আগমন করবেন।[439]
(২) যাদের জন্য আমার পক্ষ হতে মঙ্গল
নির্ধারিত রয়েছে। ------ ভীষণ
আতংক তাদেরকে চিন্তাযুক্ত করবে না এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে অভিনন্দন জানাবে। এটাই তোমাদের সে দিন, যে দিনের প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হতো।[440]
হাশরের ময়দানে মুমিদের চেহারা উজ্জ্বল হবে
وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُسْفِرَةٌ ضَاحِكَةٌ مُسْتَبْشِرَةٌ অর্থ: কতক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, হাসি-খুশিভরা, প্রফুল্ল।[441]
আয়াতদ্বয়ে
হাশরের ময়দানে মুমিনের মুখমণ্ডল কেমন হবে তা বলা হয়েছে। কিয়ামতের দিন তাদের মুখমণ্ডল নুরে নুরান্বিত, উজ্জ্বল ও আনন্দে উদ্ভাসিত থাকবে। সেদিন তারা ভাবনামুক্ত, চির সম্মানের অধিকারী,
চির শান্তির গৌরবে ধন্য। রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেন, হাশরের ময়দানে তাদের মুখমণ্ডল পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জ্বল হবে।
চেহেরা উজ্জ্বল করার বিশেষ আমলসমূহ : হাদিস শরিফের কিতাবসমূহ পর্যালোচনা করলে হাশরের ময়দানে বিশেষ নুর লাভের সৌভাগ্য
অর্জন করা এবং চেহেরা উজ্জ্বল হওয়ার অন্যতম আমল এবং উপাদান নিম্নরূপ:
Ø পাবন্দির সাথে পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ আদায় করা।
Ø পাবন্দির সাথে অধিক নফল ইবাদত, নামাজ আদায় করা।
Ø সঠিকভাবে ওজু করা।
Ø হজের ওয়াজিব আদায়ের জন্য মাথা মুণ্ডানো।
Ø জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে জামরাসমূহে
কঙ্কর নিক্ষেপ করা।
Ø রাতের আধারে মসজিদে গমন করা।
Ø জেহাদে আহত হওয়া।
Ø সুন্নাত
মোতাবেক দাঁড়ি, চুল পেকে সাদা হয়ে যাওয়া।
Ø বাজারে আল্লাহর জিকির প্রতিষ্ঠা করা।
Ø কোনো মুসলিমকে বিপদ থেকে উদ্ধার করা।
Ø নেক মুসলিমের অন্ধ হয়ে যাওয়া।
Ø সূরা কাহাফ, আবাসা তেলাওয়াত করা।
Ø পবিত্র
কুরআন তেলাওয়াত করা।
উপরোক্ত আমলসমূহের কয়েকটি ব্যতিত অবশিষ্ট
সমস্ত আমলে সকল নবি-রসূলগণের উম্মতই সমান। সুতরাং সুস্পষ্টভাবেই বোঝা যায় যে, অন্য সব নবি-রসূলের উম্মতের চেহেরাও নেক আমলের বদৌলতে
উজ্জ্বল এবং নুরান্বিত হবে এবং তারাও হাশরের ময়দানে হাসি-খুশিতে
ও আনন্দে উদ্ভাসিত হবে।
নুরের স্তর ও শ্রেণী বিন্যাসঃ মহান আল্লাহর দরবারে আমলের মূল্যায়ন
হল ও খুশু-খুজুর ভিত্তিতে। আর এ ক্ষেত্রে সকলের জন্য এক স্তরে উপনীত হওয়া সম্ভব হয় না। স্তরকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন,
ক. নুরের সর্বোচ্চ স্তরে আসীন হবেন নবি-রসূলগণ। তাঁদের সকলের সর্দার এবং নেতা হবেন শ্রেষ্ঠনবি
মুহাম্মাদ (ﷺ)। খ. দ্বিতীয় স্তরে অধিকারী হবেন সিদ্দিকগণ। তাঁদের সর্দার হবেন হজরত আবু আকর সিদ্দিক
(রা.)। এরপর যথাক্রমে হজরত
ওমর, ওসমান ও আলি (রা.)। গ. তৃতীয় স্তরের অধিকারী হবেন শহিদগণ। তাদের মধ্যে অনেকই শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী
হবেন। এই স্তরে হজরত হামজা (রা.) –এর স্থান হবে অতি শীর্ষ। ঘ. চতুর্থ স্তরের অধিকারী হবেন সালিহিন অর্থাৎ সাধারণ নেককারগণ। তাদের মধ্যে
বিভিন্ন স্তর এবং শ্রেণী হবে।[442]
কাফের-মুশরিক ও মুনাফেকরা কি নুর প্রাপ্ত হবে ?
কাফের-মুশরিক ও মুনাফেকরা সেদিন নুর থেকে
সম্পূর্ণভাবেই বঞ্চিত থাকবে এবং তারা কঠিন
বিপদের সম্মুখীন হবে। সেদিন তারা মুমিনের নিকট থেকে নুরের সামন্য অংশ লাভ করার
জন্য নেহায়েত কাকুতি-মিনতি এবং দীনতা-হীনতার
সাথে প্রার্থনা করে বলবে, يَوْمَ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انْظُرُونَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُورِكُمْ
قِيلَ ارْجِعُوا وَرَاءَكُمْ فَالْتَمِسُوا نُورًا فَضُرِبَ بَيْنَهُمْ بِسُورٍ لَهُ بَابٌ
بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ
وَظَاهِرُهُ
مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ
অর্থাৎ তোমরা আমাদের জন্য একটু থাম, যাতে তোমাদের নুর থেকে আমরা কিছু অংশ গ্রহণ করতে পারি। বলা
হবে, তোমরা তোমাদের পিছনের দিকে ফিরে যাও এবং নুরের সন্ধান
কর। অতঃপর উভয়ের মধ্যে প্রাচীর করে দেওয়া হবে। যে প্রাচীরের দরজা হবে মাত্র একটা।
দরজার ভিতর দিকে থাকবে রহমত এবং বর্হিভাগে থাকবে আজাব।[443]
মুমিন পাপীদের
নুর : মুমিন পাপীদের
ভাগ্যে নুর জুটবে কি না, জুটলে কিরূপ হবে ? এটা অবশ্যই একটা জটিল প্রশ্ন।
মহান আল্লাহ পাক বলেন, سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ
مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ
অর্থাৎ তাদের চেহেরায় সেজদার চিহ্ন বিদ্যামান।[444]
রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেন, পাপীদের সমস্ত দেহ জাহান্নামের অগ্নি সম্পূর্ণরূপে জ্বালিয়ে ফেলবে,
তবে সরিষার পরিমাণ ঈমান কালো বর্ণ হয়ে সংরক্ষিত থাকবে এবং সেজদার চিন্হ
হেতু সেজদার স্থানসমূহ অগ্নির প্রতি হারাম করে দেওয়া হয়েছে। মুফাসসির ইবনে হাওশাব বলেন, يعون موضع فى السجود من وجوههم كالقمر ليلة البدر অর্থাৎ তাদের চেহারায় সেজদার স্থানসমূহ পূর্ণিমার চাঁদের মত
উজ্জ্বল হবে। অতঃপর তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের
করে নহরে হায়াতে ফেলা হবে। ফলে স্রোতের ধারে যেমন ঘাসের বীজ গজায় তারাও তেমনিভাবে সতেজ হয়ে গজিয়ে উঠবে। উপরোক্ত আয়াত এবং হাদিসের দ্বারা সুস্পষ্ট হয় যে,
ক. মুমিন পাপীদের ভাগ্যেও নুর জুটবে, তবে নুরের কার্যকারিতা স্থগিত থাকবে। খ. ঈমানি শক্তি
এবং সেজদার নুর জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য সহায়ক হবে।[445]
জান্নাতে মুমিনের সুউচ্চ মর্যাদা
وَمَنْ
يَأْتِهِ مُؤْمِنًا قَدْ عَمِلَ
الصَّالِحَاتِ
فَأُولَئِكَ
لَهُمُ الدَّرَجَاتُ الْعُلَى (75) جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا
الْأَنْهَارُ
خَالِدِينَ
فِيهَا وَذَلِكَ جَزَاءُ مَنْ تَزَكَّى অর্থ: যারা তার নিকট উপস্থিত হবে মুমিন
অবস্থায় সৎকর্ম করে,তাদের জন্য আছে সমুচ্চ মর্যাদা স্থায়ী জান্নাত,
যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী
হবে এবং পুরস্কার তাদের-ই যারা পবিত্র।[446]
যে ব্যক্তি
তার প্রতিপালকের প্রতি অন্তরে ঈমান পোষণ করে সাক্ষাত করে এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে তার
ঈমানের সত্যতা প্রমাণিত করবে তাদের জন্য উচ্চতর মর্যাদা সম্পন্ন বেহেশত রয়েছে। যেখানে শান্তিপূর্ণ ঘর এবং উত্তম বাসস্থান রয়েছে।
ইমাম
আহমদ রহ.---হজরত ওবাদা ইবনে সামিত রা. হতে
বর্ণনা করেন, তিনি নবি কারিম(ﷺ) হতে বর্ণনা
করেন : বেহেশতের মধ্যে একশ স্তর রয়েছে, প্রত্যেক দুইস্তরের
মাঝে আসমান ও জমিনের মাঝের দূরত্ব বিদ্যমান, তার মধ্যে ফেরদাউস
সর্বোত্তম। এ ফেরদাউস হতে চারটি নহর প্রবাহিত
রয়েছে। তার ওপরে আরশ অবস্থিত। তোমরা যখন আল্লাহর নিকট বেহেশত প্রার্থনা করবে, তখন ফেরদাউস বেহেশতের প্রার্থনা করবে। ইমাম তিরমিজিও ইয়াজিদ ইবনে হারুন (রহ.) থেকে হাম্মাম (রহ.)
সূত্রে এ হাদিস বর্ণনা করেন।
বুখারি
ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত, বেহেশতবাসীগণ তাদের উচ্চতর মর্যাদাশীল
লোকদেরকে ঠিক তেমনি দেখতে পাবে, যেমন তোমরা আসমানে নক্ষত্রপুঞ্জকে
দেখতে পাও। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, তা তো নবিগণের বাসস্থান হবে। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তবে সেই সত্তার
কসম! যাঁর হাতে আমার জীবন, যারা আল্লাহর
প্রতি ঈমান এনেছে এবং রসূলকে মান্য করেছে তারাও সেখানে বাস করবে। সুনান গ্রন্থসমূহে বর্নিত, হজরত আবু বকর সিদ্দিক ও হজরত ওমর (রা.) তাঁদের-ই অন্তর্ভুক্ত।[447]
মুমিনকে আল্লাহ তাআলা তাঁর দোস্ত বলে ঘোষণা
মানুষ সৃষ্টিই হলো নাপাক
বস্তু থেকে। তারপর জন্মলগ্ন থেকেই সে আবার নিজের ভেতর নাপাক বহন করে আসছে
(অর্থাৎ প্রসাব-পায়খানা, রক্ত-পুঁজ ও বীর্য ইত্যাদি)। এই মাটির মানুষকে পবিত্রময় সত্ত্বা স্বীয় বন্ধুর
উপাধিতে ভূষিত করেছেন। এটা কি মুমিনের
জন্য বড় সম্মান-উজ্জত নয় ? পৃথিবীতে মানুষের
বন্ধু যেমন দুই প্রকার হয়ে থাকে। ঠিক আল্লাহ তাআলাও তাঁর বন্ধুকে দুইভাগে করেছেন। যেমন: ১.সাধারণ বন্ধু ২.বিশেষ বন্ধু।
সাধারণ বন্ধু : ঈমান আনা মাত্রই প্রত্যেক
মুমিন আল্লাহর সাধারণ বন্ধু। যেমন, তিনি বলেন, (১)
وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُؤْمِنِينَ অর্থ: আর আল্লাহ হলেন মুমিনদের বন্ধু। সূরা আলে-ইমরান-৬৮ (২)اللَّهُ
وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ
إِلَى النُّورِ
অর্থ: যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের বন্ধু
(অভিভাবক)। তাদেরকে তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে।[448]
বিশেষ বন্ধু : বিশেষ বন্ধুর ক্ষেত্রে শর্ত
দুটি (ক) ঈমান (খ) তাকওয়া। ওপরে উল্লেখ করেছি ঈমান আনার সাথে সাথেই সাধারণ বন্ধুতে পরিণত হয় তারপর যদি মুমিন
বান্দা তাকওয়ার পথে চলে (তাকওয়া বলতে ফরজ-ওয়াজিব-সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বিধানগুলো আদায় করা এবং সমস্ত গুনাহ বর্জন করা)
তখন দয়াময় আল্লাহ তাকে বিশেষ বন্ধুতে উত্তীর্ণ করেন। শর্ত দুটি সম্পর্কে এরশাদ হচ্ছে- أَلا
إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ অর্থ: জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই আর তারা চিন্তিত হবে
না। বন্ধু হলো তারা যারা ঈমান এনেছে ও তাকওয়া
অবলম্বন করেছে। ইউনুস, ৬২-৬৩ অন্য
আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, إِنَّهُمْ لَنْ يُغْنُوا
عَنْكَ مِنَ اللَّهِ
شَيْئًا وَإِنَّ الظَّالِمِينَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُتَّقِينَ অর্থ: আল্লাহর
মোকাবেলায় তারা তোমার কোন উপকার করতে পারবে না, জালেমরা একে অপরের
বন্ধু আর আল্লাহ তো মুত্তাকিদের বন্ধু।[449]
আইছারুত্তাফসির এসেছে- وَنَجَّيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ অর্থ: আর আমি তাদেরকে নাজাত দিলাম যারা ঈমান এনেছে এবং (আমাকে)
ভয় করেছে।[450]
দুনিয়া-আখেরাতে উভয় জাহানে আল্লাহর আজাব থেকে নাজাত পাওয়ার একমাত্র পথ ঈমান ও তাকওয়া অবলম্বন করা। এবং এ দুটো গুণে গুণান্বিত হলে বান্দা আল্লাহর
ওলি হিসেবে পরিগণিত হয়।[451]
ওলির আভিধানিক
অর্থ : ওলি শব্দটি
একবচন, বহুবচন
হলো আওলিয়া। শাব্দিক অর্থ-নৈকট্যশীল-নিকটবর্তী, দোস্ত-বন্ধু,
কর্তা, পৃষ্ঠপোষক ও সুহৃদ, সাহায্যকারী, রক্ষাকারী ইত্যাদি।
ওলির পারিভাষিক সংজ্ঞা : এ সম্পর্কে
মুফতি শফি (রহ.) বলেন, আল্লাহ তাআলার প্রেম ও নৈকট্যের দুটি স্তর রয়েছে। একটি সাধারণ স্তর এমন রয়েছে যে, তার আওতা থেকে পৃথিবীর কোন মানুষ, জীবজন্তু এমনকি কোন
বস্তু-সামগ্রীই বাদ পড়ে না। যদি এ নৈকট্য না থাকে, তবে সমগ্র বিশ্বের
কোন একটি বস্তুও অস্তিত্ব লাভ করতে পারত না। সমগ্র বিশ্বের অস্তিত্বের প্রকৃত উপকরণ হল সেই সংযোগ যা আল্লাহ তাআলার সাথে রয়েছে।
দ্বিতীয়
স্তর হলো আল্লাহ তাআলার বিশেষ বিশেষ বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট। সে নৈকট্যকে মুহাব্বত বা প্রেম বলা হয়। যারা নৈকট্য লাভ করতে সমর্থ হন, তাঁদেরকেই বলা হয় হয় ওলিআল্লাহ তথা আল্লাহর ওলি। যেমন-এক হাদিসে কুদসিতে
বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা
বলেন, আমার বান্দা নফল এবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমনকি আমি নিজেও তাকে ভালবাসতে আরম্ভ করি। আর যখন আমি তাকে ভালবাসি, তখন আমিই তার কান হয়ে যাই, সে যা কিছু শোনে, আমার মাধ্যমেই শোনে। আমিই তার হাত-পা, হয়ে যাই, যা কিছু সে করে আমার দ্বারাই করে।” তাখরিজ : বুখারি-৬৫০২,কিতাবুর রিফাক, বাবুল তাওয়াযু’ এর মর্ম হল এই যে, তার কোন গতি-স্থিতি ও
অন্য যে কোন কাজ আমার
ইচ্ছার বিরুদ্ধে হয় না। বস্তুত এই বিশেষ ওলিত্ব বা নৈকট্যের স্তর অগণিত ও অশেষ। এর সর্বোচ্চ স্তর হলো নবি-রসূলগণের প্রাপ্য।[452]
ওলির আলামত : হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস
(রা.) হতে বর্ণিত; আল্লাহর
ওলি সেই সমস্ত মহাপুরুষগণ যারা সদা-সর্বদা আল্লাহর যিকিরে লিপ্ত
থাকেন। এ সম্পর্কে একটি মারফু হাদিস বর্ণিত
হয়েছে। হজরত আব্বাস (রা.)বলেন, এক ব্যক্তি
জিজ্ঞেস করল ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর ওলি কারা ? তিনি বললেন আল্লাহর
ওলি তারা যাদেরকে দেখলে আল্লাহর স্মরণে আসে।[453]
আল্লাহর ওলির মর্যাদা : আবু হুরাইরা (রা.)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
(ﷺ) ইরশাদ করেছেন,“আল্লাহর
বান্দাদের মধ্য হতে কিছু এমন বান্দাও আছে যাদের প্রতি আম্বিয়া ও শহিদগণও ঈর্ষা করেন।” প্রশ্ন করা হলো, তারা কারা। আমরা যেন তাদেরকে ভালবাসতে পারি। তিনি বললেন এমন একটি সম্প্রদায় যারা ধন-সম্পদ ও বংশের
সম্পর্ক ছাড়াই কেবল আল্লাহর ওয়াস্তে পরস্পর এক অন্যকে ভালবাসে। তাদের চেহেরা উজ্জ্বল হবে এবং নুরের
মিম্বরে ওপর তারা উপবিষ্ট হবে। যখন অন্যান্য লোক ভীত সন্ত্রস্ত হবে তখন তারা সম্পূর্ণ নিরাপদে থাকবে। যখন অন্যান্য লোক চিন্তিত হবে তখন
তারা নিশ্চিত থাকবে। অতঃপর
তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন, أَلا
إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلا هُمْ يَحْزَنُونَ (জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই আর তারা চিন্তিত হবে
না। বন্ধু হলো তারা যারা ঈমান এনেছে ও
তাকওয়া অবলম্বন করেছে।)[454]
নোট : ইবনে কাসির (রহ.)
বলেন, ইমাম আবু দাউদ (রহ) ওমর (রা.)
হতে তিনি নবি (ﷺ) হতে অনুরূপ বর্ণনা করেন। এই সনদটি উত্তম।
ওলিত্বের ভিত্তি কী ? ঈমান এটা তো সবার আগে। সুতরাং যেসব অমুসলিম সাধু-দরবেশ আল্লাহর ওলি হবার দাবি করে
তা অবান্তর। তারপর হলো গুনাহ মুক্ত জীবন (যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন , إِنْ أَوْلِيَاؤُهُ إِلَّا الْمُتَّقُونَ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ অর্থ: মুত্তাকিরাই বন্ধু; কিন্তু
তাদের আধিকাংশ তা বুঝে
না। সূরা আনফাল-৩৪ এবং সুন্নাতের পদাংকানুসরণ (যেমন, কুরআনের বাণী- قُلْ إِنْ
كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ অর্থ: হে নবি আপনি বলুন! যদি তোমরা আল্লাহর ভালবাসা পেতে চাও, তবে আমার অনুসরণ
কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন
এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দিবেন।[455]
বেলায়েতের এ স্তর (ওলি)লাভের উপায় কী ? কাজি সানাউল্লাহ পানিপথি
(রহ.) তাফসিরে মাজহারিতে বলেছেন, উম্মতের লোকদের এই স্তর রসূলে কারিম (ﷺ)-এর সংসর্গের মাধ্যমে লাভ হতে পারে। রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছোহবতের ফজিলত সাহাবায়ে –কেরাম পেয়েছিলেন সরাসরি।
আর সেই কারণে তাদের বেলায়েতের দরজা
উম্মতের সমস্ত ওলি-কুতুব
অপেক্ষা বহু ঊর্ধ্বে। বেলায়েতের স্তর প্রাপ্তি তিনটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। (১) কোন ওলির সংসর্গ,(২)
তাঁর আনুগত্য ও (৩) আল্লাহর
অধিক জিকর। কিন্তু শর্ত হল এই যে, এ জিকির সুন্নত তরিকা অনুযায়ী হতে
হবে। কারণ, অধিক
জিকিরের দ্বারা যখন অন্তরের উজ্জ্বল্য বৃদ্ধি পায়, তখন সে নুর
বেলায়েতের প্রতিফলনের যোগ্য হয়ে ওঠে। হাদিস বর্ণিত হয়েছে যে, প্রতিটি বস্তুর জন্য শিরিশ বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার
পন্থা রয়েছে, অন্তরের শিরিশ হল আল্লাহর জিকির। একথাই ইবনে ওমর (রা.)-এর রেওয়ায়েতক্রমে বায়হাকিও উদ্ধৃত
করেছেন।[456]
কারামত কী ? এটা কি ওলির ইচ্ছাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন ? ‘কারামত’
শব্দটির মূল
অর্থ ‘সম্মাননা’। ইসলামি পরিভাষায় ‘কারামত’
অর্থ ‘নবি-রসূলগণ
ব্যতিত অন্যান্য নেককার মানুষের দ্বারা সংঘটিত অলৌকিক কর্ম। আহলে সুন্নাত ওয়াল
জামাতের আকিদা হচ্ছে-আওলিয়া
কেরামের কারামত সত্য। কুরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। (যেমন-পবিত্র কুরআনের বাণী-(১)
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا قَالَ يَا
مَرْيَمُ أَنَّى لَكِ هَذَا
قَالَتْ هُوَ مِنْ
عِنْدِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ
يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ
بِغَيْرِ حِسَابٍ
অর্থ: যখনই জাকারিয়া মেহরাবের মধ্যে তার
কছে আসতেন তখনই কিছু খাবার দেখতে পেতেন। জিজ্ঞেস করতেন মারইয়াম! কোথা থেকে এসব
তোমার কাছে এলো?
তিনি বলতেন, এসব আল্লাহর নিকট থেকে আসে।
আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বেহিসেব রিজিক দান করেন।[457]
হজরত মরিয়ম (আ.) নবি ছিলেন না। কিন্তু কারামত স্বরূপ আল্লাহ
তাআলা তাকে অমৌসুমি ফল দান করেছিলে
(২)قَالَ الَّذِي
عِنْدَهُ عِلْمٌ مِنَ الْكِتَابِ
أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ
أَنْ يَرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ فَلَمَّا رَآهُ مُسْتَقِرًّا
عِنْدَهُ قَالَ هَذَا
مِنْ فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ
وَمَنْ شَكَرَ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّي غَنِيٌّ كَرِيمٌ অর্থ: কিতাবের জ্ঞান যার ছিল, সে বলল, আপনার
দিকে আপনার চোখের পলক ফেলার পূর্বেই আমি তা আপনাকে এনে দেব। অতঃপর সুলাইমান (আ.) যখন
তা সামনে রক্ষিত দেখলেন,
তখন বললেন এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে
তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, না অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। যে
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে,
সে নিজের উপকারের জন্যেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং যে
অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে জানুক যে, আমার পালনকর্তা অভাবমুক্ত
কৃপাশীল।[458]
সুলাইমান (আ.) এর জমানায় মুহুর্তের মাঝে ইয়ামান
থেকে আসিফ বিন বারখিয়া নামক ব্যক্তির রানী বিলকিসের সিংহাসন নিয়ে আসাও বুজুর্গদের
কারামত সত্য হবার প্রমাণ। কারণ আসিফ বিন বারখিয়া কোন নবি ছিল না।
(৩) হজরত খুবায়েব(রা.)-এর নিকট বেমওসুমী ফল :
عَنْ أَبِى
هُرَيْرَةَ
رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ َ قَالَتِ
ابْنَةُ الْحَارِثِ : فَكَانَ خُبَيْبٌ أَسِيرًا عِنْدَنَا فَوَاللَّهِ إِنْ رَأَيْتُ
أَسِيرًا قَطُّ كَانَ
خَيْرًا مِنْ خُبَيْبٍ
وَاللَّهِ لَقَدْ رَأَيْتُهُ يَأْكُلُ قِطْفًا مِنْ عِنَبٍ
وَمَا بِمَكَّةَ يَوْمَئِذٍ مِنْ ثَمَرَةٍ
وَإِنْ هُوَ إِلاَّ
رِزْقٌ رَزَقَهُ اللَّهُ خُبَيْبًا অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন। হারেসের মেয়ে বলেন, আল্লাহ কসম! আমি খুবায়েবের চেয়ে ভাল কয়েদি আর
দেখেনি। আল্লাহর কসম! একদিন আমি তাকে দেখেছি, তিনি শিকল বাঁধা অবস্থায় আঙুরের ছড়া হাতে নিয়ে তা থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে
খাচ্ছিলেন অথচ সে সময়ে মক্কায় ফলের মওসুম ছিল না।
হারিস কন্যা বলেন, নিঃসন্দেহে তা ছিল এমন রিজক যা
আল্লাহ তাআলা খুবাইবকে দান করেছেন।[459]
নোট : হাদিসটির অংশ বিশেষ উল্লেখ করা
হয়েছে।
(৪) মৌমাছি দ্বারা হজরত আসেম (রা.)-এর লাশের হেফাজত :
عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ: وَبَعَثَ الْمُشْرِكُونَ إِلَى عَاصِمِ بْنِ ثَابِتٍ لِيُؤْتَوْا مِنْ لَحْمِهِ بِشَىْءٍ وَكَانَ قَتَلَ رَجُلاً مِنْ عُظَمَائِهِمْ فَبَعَثَ اللَّهُ مِثْلَ الظُّلَّةِ مِنَ الدَّبْرِ فَحَمَتْهُ مِنْ رُسُلِهِمْ فَلَمْ يَسْتَطِيعُوا أَنْ يَأْخُذُوا مِنْ لَحْمِهِ شَيْئًا.
অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা
করেন। হজরত আসেম ইবনে সাবিতের নিহত(শহিদ) হবার খবর পাবার পার কুরাইশদের কিছু লোক তাঁকে চিহ্নিত করার জন্য তাঁর
লাশের কিছু অংশ নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে তার কাছে লোক পাঠায়। কারণ আসেম (রা.) বদরের দিন একজন কুরাইশ নেতাকে হত্যা করেছিলেন।
কিন্তু আল্লাহ আসেমের হেফাজতের জন্য মেঘ খণ্ডের মত একদল মৌমাছি পাঠান। তারা কুরাইশদের প্রেরিত লোকদের হাত থেকে আসেমের দেহকে
সংরক্ষিত রাখে। ফলে তারা আসেম (রা.)-এর লাশ থেকে কিছু নিতে সক্ষম হয়নি।[460]
নোট : হাদিসটির অংশ বিশেষ উল্লেখ করা
হয়েছে।
তবে এটা কোন ওলি-বুযুর্গের ইচ্ছাধীন বা
নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। উদাহরণস্বরূপ হজরত ওমর (রা)-এর দুটি ঘটনা উল্লেখ করছি :
প্রথম ঘটনা : আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত
আছেوَعَنْ
ابْنِ عُمَرَ - رضي الله
عنهما - قَالَ: وَجَّهَ
عُمَرُ جَيْشًا - رضي الله
عنه - وَرَأَّسَ عَلَيْهِمْ رَجُلاً يُدْعَى: سَارِيَةَ، قَال: فَبَيْنَمَا
عُمَرُ يَخْطُبُ , جَعَل يُنَادِي:
يَا سَارِيَةُ الْجَبَل، يَا سَارِيَةُ الْجَبَل، يَا سَارِيَةُ الْجَبَل، ثُمَّ قَدِمَ
رَسُولُ الْجَيْشِ , فَسَأَلَهُ عُمَرُ، فَقَال: يَا أَمِيرَ
الْمُؤْمِنِينَ
, هُزِمْنَا،
فَبَيْنَمَا
نَحْنُ كَذَلِكَ إِذْ سَمِعْنَا
صَوْتًا يُنَادِي: يَا سَارِيَةُ
إِلَى الْجَبَل - ثَلاَثَ مَرَّاتٍ - فَأَسْنَدْنَا ظُهُورَنَا إِلَى الْجَبَل
, فَهَزَمَهُمُ
اللهُ تَعَالَى، وَكَانَتِ الْمَسَافَةُ بَيْنَ الْمَدِينَةِ حَيْثُ كَانَ يَخْطُبُ
عُمَرُ , وَبَيْنَ مَكَانِ الْجَيْشِ , مَسِيرَةَ شَهْرٍ. হজরত ওমর রা.মদিনা মনোয়ারায় খুতবা পড়ার সময় চিৎকার করে বলে উঠলেন-‘ওহে সারিয়া’ পাহাড়ের দিকে পিঠ দাও। বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হওয়ার পর উক্ত সেনাবাহিনী থেকে
বার্তা বাহক এসে জানান আমাদিগকে শত্রুরা প্রায় পরাস্ত করে ফেলেছিল। এমন সময় কোন এক
আহবানকারীর ডাক শুনতে পেলাম। উক্ত অদৃশ্য আহবানকারীর বলেছিলেন, ‘সারিয়া! পাহাড়ের শরণাপন্ন হও।’ তখন আমরা পাহাড়কে পিঠের পেছনে রেখে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। এরপর আল্লাহ আমাদের সহায় হলেন, ওদেরকে পর্যুদস্ত করে দিলেন।[461]
আল্লামা মোল্লা আলি কারি (রহঃ)
এ হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেন-
এটি হজরত ওমর (রা.)-এর কারামতের একটি, মহান রব তাঁর কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন,যুদ্ধ ক্ষেত্রেই সকলেই খুব
ভালভাবেই তাঁর আওয়াজ শুনেছেন, মুসলমানগণ যুদ্ধে বিজয় লাভ
করেছেন এবং যুদ্ধে সাহায্য প্রাপ্ত হয়েছেন হজরত ওমর (রা.)এর বরকতে।[462]
দ্বিতীয় ঘটনা : ২৭ শে জিলহজ ২৩ হিজরি মোতাবেক ফজরের সালাত আদায়ের জন্য যখন ওমর (রা) তাকবিরে তাহরিমা বলেন,
তখন তাঁরই পিছেন
চাদর গায়ে মুসল্লিরূপে দাঁড়ানো আল্লাহর শত্রু আবু লুলু লুকানো ছুরি দিয়ে তাঁকে
বারংবার আঘাত করে। তিনি অচেতন হয়ে পড়ে যান। চেতনা ফিরে পেলে তিনি জিজ্ঞেস করেন,
আমাকে কে আঘাত
করল ? তাঁকে
বলা হয়, আবু
লুলু। তিনি বলেন, আল-হামদু লিল্লাহ, আমাকে কোনো মুসলিমের হাতে শহিদ হতে হলো
না। এর কয়েকদিন পর তিনি ইন্তিকাল করেন।[463]
প্রিয় পাঠক! দেখলেন তো ? হাজার মাইল দূরে দেখতে পাচ্ছেন আবার
পিছনে সারিতে দাঁড়ানোকে দেখতে পাননি। অতত্রব,উপরোক্ত
ঘটনাদ্বয় দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, কারামত খোদার দান-সম্মান মাত্র।
ওলির লক্ষণ কি
কাশফ-কারামত
প্রকাশ করা বা হওয়া ? এ প্রসঙ্গে তাফসিরে মাজহারিতে বলা হয়েছে, সাধারণ
মানুষ যে কাশফ-কারামত
ও গায়বি বিষয় সম্পর্কে অবগত হওয়াকে ওলির লক্ষণ ধরে নিয়েছে, তা
একান্ত ভুল ও ধোঁকা। হাজার হাজার ওলিআল্লাহ এমন ছিলেন এবং রয়েছেন যাদের দ্বারা এ
ধরণের কোন বিষয় সংঘটিত হয়নি। পক্ষান্তরে
এমন লোকের দ্বারা কাশফ ও গায়বি সংবাদ কথিত হয়েছে যার ঈমান পর্যন্ত ঠিক নেই।[464]
মুমিনদের পথ অনুসরণের নির্দেশ
মহান আল্লাহ বলেন, وَاتَّبِعْ
سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ
إِلَيَّ অর্থ : যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে।[465]
এখানে سَبِيلَ অর্থ পথ, দীন, ধর্ম, বিধান। আর أَنَابَ
إِلَيَّ مَنْ (যে বিশুদ্ধচিত্তে আল্লাহ অভিমুখী হয়েছে)বলে বুঝানো হয়েছে রসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং তাঁর প্রিয়ভাজন সহচরবৃন্দকে অর্থাৎ মুমিনদের পথ ধারণ করবে। হজরত ইবনে
আব্বাস (রা.)বলেন,
এখানে যে আল্লাহ অভিমুখী হয়েছে বলে বুঝানো হয়েছে হজরত আবু বকর সিদ্দিককে। ঘটনাটি ছিল এরকম-হজরত আবু বকরের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ পেয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত হলেন, হজরত ওসমান, তালহা, যোবায়ের,
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাছ ও আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)। তাঁরা বললেন, আপনি ওই ব্যক্তির ওপর ঈমান এনছেন, যিনি নিজেকে রসূল বলে
দাবি করছেন ? আপনি কি মনে করেন তিনি সত্য রসূল ? তিনি বললেন, হাঁ, তিনি সত্য রসূল। তোমরাও তাঁর ওপর ঈমান আনো। এরপর তিনি তাঁদের সকলকে নিয়ে উপস্থিত হলেন রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মহান সান্নিধ্যে। সকলে অকুণ্ঠচিত্তে গ্রহণ করলেন ইসলাম। তাঁরাই ছিল ইসলাম গ্রহণের পুরোধা। আর তাঁরা এরকম হতে পেরেছিলেন হজরত আবু বকরের (রা.) আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে। তাঁর মতো অবদানকে লক্ষ্য করেই এখানে তাঁর দিকে ইঙ্গিত করে বলা
হয়েছে, যে বিশুদ্ধচিত্তে আমার অভিমুখী
হয়েছে।[466]
إِنَّ الَّذِينَ
آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَئِكَ هُمْ خَيْرُ
الْبَرِيَّةِঅর্থ: নিঃসন্দেহে যারা
ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে
তারাই উৎকৃষ্ট সৃষ্টি।[467]
আয়াত থেকে বোঝা
গেল,
শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার মাপকাঠি
হল ঈমান ও আমলে
সালেহ তথা নেক আমল। যারা ঈমান ও সালেহের
অধিকারী, তারাই উৎকৃষ্টতম সৃষ্টি। তারাই
শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ও মর্যাদার
অধিকারী। চাই তারা
দুনিয়াতে ধন-সম্পদ ও জাগতিক
প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী হোক বা না হোক।
ঈমান
ও আমলে সালেহ দ্বারা মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে থাকে, এমনকি
তাদের কতক ফেরেশতা থেকেও অগ্রসর হয়ে যায়। পক্ষান্তরে, যারা হক প্রত্যাখ্যানকারী,
কাফের-মুশরেক তারা চতুষ্পদ জন্তু থেকেও হীন,
নিকষ্ট। যেমন ইরশাদ হচ্ছে-إِنْ
هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ
أَضَلُّ سَبِيلًا অর্থ: তারাতো চতুষ্পদ
জন্তুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও
বিভ্রান্ত।[468]
মান-মর্যাদা একমাত্র আল্লাহ তাআলার সমীপে কামনা করা বাঞ্ছনীয়
الَّذِينَ
يَتَّخِذُونَ الْكَافِرِينَ
أَوْلِيَاءَ مِنْ
دُونِ الْمُؤْمِنِينَ
أَيَبْتَغُونَ عِنْدَهُمُ
الْعِزَّةَ فَإِنَّ
الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا
অর্থ:
যারা মুসলমানদের বর্জন করে কাফেরদেরকে
নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নেয় এবং তাদেরই
কাছে সম্মান প্রত্যাশা করে অথচ যাবতীয়
সম্মান শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য।[469]
কাফের-মুশরেকের সাথে আন্তরিক বন্ধুত্ব ও সৌহার্য স্থাপন
করাকে নিষিদ্ধ করে এ ধরণের আচরণে লিপ্ত ব্যক্তিদের প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। সাথে সাথে এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার উৎস ও মূল বর্ণনা করত
একেও অযথা অবান্তর প্রতিপন্ন করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- الْمُؤْمِنِينَ أَيَبْتَغُونَ عِنْدَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا অর্থাৎ তারা কি ওদের কাছে গিয়ে ইজ্জত-সম্মান
লাভ করতে চায় ? তবে ইজ্জত-সম্মান তো সম্পূর্ণ
আল্লাহ তাআলার এখতেয়ারাধীন।
কাফের-মুশরেকদের সাথে সৌহার্য ও বন্ধত্বের সম্পর্ক রাখা
এবং অন্তরঙ্গ মেলামেশার প্রধান কারণ এই যে, ওদের বাহ্যিক মান-সম্মান,
শক্তিসামর্থ, ধনবলে প্রভাবিত হয়ে হীনমন্যতার শিকার
হয় এবং মনে করে যে, ওদের সাহায্য সহযোগিতা আমাদের ও মান-মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ তাআলা
তাদের ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন করে বলেন যে, তারা এমন লোকদের সাহায্যে মর্যাদাবান হওয়ার আকাঙ্খা করছে, যাদের নিজেদেরই সত্যিকারে কোনো মর্যাদা নেই। অতত্রব, মান-মর্যাদা
দানকারী মালিককে অসন্তুষ্ট করে তারা শত্রদের
থেকে ইজ্জত হাসিল করার অপচেষ্টা কত বড় বোকামি!
ফারূকে আজম হজরত ওমর (রা.) বলেছেন,
“যে ব্যক্তি
বান্দাদের (মাখলুকের) সাহায্যে মর্যাদাবান হওয়ার বাসনা করে আল্লাহ তাআলা তাকে লাঞ্ছিত করেন।”
আবু বকর জাসসাস (রহ.) ‘আহকামুল কুরআনে’ লিখেছেন,
আলোচ্য আয়তের মর্ম এই যে, কাফের-মুশরেক-পাপিষ্ঠ ও পথভ্রষ্ঠদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে
মর্যাদা ও প্রতিপত্তি অর্জনের ব্যর্থ চেষ্টা করা অন্যায় ও অপরাধ।
এখানে মর্যাদার অর্থ আখেরাতের চিরস্থায়ী ইজ্জত-সম্মান
হয়, তবে তা আল্লাহ তাআলা শুধুমাত্র তাঁর রসূল (ﷺ) ও মুমিনদের জন্য সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন। কারণ আখেরাতের আরাম-আয়েশ, ইজ্জত-সম্মান কোনো কাফের বা মুশরেক কস্মিনকালেও লাভ করবে
না। আর যদি এখানে পার্থিব মান-মর্যাদা ধরা হয়, তবে মুসলমানরা যতদিন সত্যিকার মুমিন থাকবে, ততদিন সম্মান
ও প্রতিপ্রত্তি তাদেরই করায়ত্ব থাকবে। অবশ্য তাদের ঈমানের দুর্বলতা, আমলের গাফলতি
বা পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার কারণে তাদের সাময়িক ভাগ্য বিপর্যয় হলে বা ঘটনাচক্রে অসহায়
হতমান হলেও পরিশেষে তারাই আবার মর্যাদা ও বিজয়ের
গৌরব লাভ করবে দুনিয়ার ইতিহাসে এর বহু নজির রয়েছে। শেষ যুগে ঈসা (আ.) ও ইমাম মাহদির নেতৃত্বে আবার যখন সত্যিকার ইসলামের অনুসারী হবে, তখন তারাই সমগ্র দুনিয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা ও মর্যাদার অধিকারী হবে।[470]
নোট : অমুসলিমদের সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের
চারটি স্তর রয়েছে। ১.সমবেদনা, সহানুভুতি, শুভাকাঙ্খা ও উপকার জায়েয। ২. সৌজন্য ও আতিথেয়তা স্তর অর্থাৎ
বাহ্যিক সদাচার ও বন্ধুত্বপূর্ণ জায়েয। ৩. লেন-দেন
অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরী ইত্যাদি
জায়েয। ৪.আন্তরিক বন্ধুত্ব ভালবাসা। এই স্তরের সম্পর্ক একমাত্র মুসলমানের সাথেই হতে পারে, অমুসলিমদের সাথে এরূপ সম্পর্ক স্থাপন করা কিছুতেই জায়েয নয়। বিস্তারিত দেখুন[471]
মান-ইজ্জত অর্জন করার পন্থা কি: مَنْ
كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا অর্থ: কেউ সম্মান চাইলে জেনে রাখুক, সমস্ত সম্মান আল্লাহরই জন্যে।[472] অর্থাৎ যে
ব্যক্তি দুনিয়া ও আখেরাতের প্রভাব প্রতিপত্তির জন্য লালায়িত তার জন্য অপিহার্য হল আল্লাহর আনুগত্য
করা, তাহলেই তার উদ্দেশ্য সফল হবে। কারণ, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া-আখেরাতের মালিক এবং সকল সম্মান প্রতিপত্তির
তিনিই অধিকারী।
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হজরত কাতাদাহ (রহ.)বলেন, যে প্রতিপত্তি চাহে সে যেন আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে
তা হাসিল করে।[473]
মুমিন নারীদের
সম্মানার্থে কুরআনে
পাকের আয়াত অবতীর্ণ
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)আফফান (রহ.) -------উম্মুল মুমিনিন
উম্মে সালামা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি রসূলুল্লাহ (ﷺ) -কে বললাম, পবিত্র কুরআনে
পুরুষদেরকে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে নারীদেরকে তেমন উল্লেখ করা হয় নেই কেন ? হজরত উম্মে সালামা বলেন, একদিন হঠাৎ মিম্বরে ওপর রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শব্দ আমি শুনতে পেলাম। আমি তখন আমার চুল বিন্যাস করতেছিলাম; কিন্তু রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আওয়াজ শুনে আমি কোন রকম ঠিক করে আমার ঘরের আঙ্গিনায় বের হয়ে আসলাম এবং রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কথার প্রতি কর্ণপাত করে তাঁকে বলতে শুনলাম :إِنَّ الْمُسْلِمِينَ
وَالْمُسْلِمَاتِ
وَالْمُؤْمِنِينَ
وَالْمُؤْمِنَاتِ
وَالْقَانِتِينَ
وَالْقَانِتَاتِ
وَالصَّادِقِينَ
وَالصَّادِقَاتِ
وَالصَّابِرِينَ
وَالصَّابِرَاتِ
وَالْخَاشِعِينَ
وَالْخَاشِعَاتِ
وَالْمُتَصَدِّقِينَ
وَالْمُتَصَدِّقَاتِ
وَالصَّائِمِينَ
وَالصَّائِمَاتِ
وَالْحَافِظِينَ
فُرُوجَهُمْ
وَالْحَافِظَاتِ
وَالذَّاكِرِينَ
اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا অর্থ: অবশ্য আত্মসমর্পণকারী পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী,অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী,
সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী,
সওম পালনকারী পুরুষ ও সওম পালনকারী নারী, যৌন অংগ
পুরুষ নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও অধিক স্মরণকারী
নারী-তাদের জন্য আল্লাহ রেখেছেন ক্ষমা ও মহা প্রতিদান। সূরা আহজাব-৩৫ ইমাম নাসায়ি ও ইবনে জারির, ইবরে জিয়াদ হতে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।[474]
যদিও নারী-পুরুষ উভয়ই কুরআন পাকের সাধরণ নির্দেশাবলীর
আওতাধীন, কিন্তু সাধারণত সম্বোধন করা হয়েছে পুরুষদেরকে। আর নারী জাতি পরোক্ষভাবে এর অন্তর্ভুক্ত। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, নারীদের সকল বিষয়ই প্রচ্ছন্ন ও গোপনীয়। এর মধ্যেই তাদের মর্যাদা নিহিত। কুরআনুল কারিমের এই প্রকাশভঙ্গি যদিও এক বিশেষ প্রজ্ঞা, যৌক্তিকতা ও মঙ্গলের ভিত্তিতেই অনুসৃত হয়েছিল; কিন্তু এর পরিপেক্ষিতে নারীদের হীনমন্যতাবোধের উদ্রেক হওয়া একান্ত স্বাভাবিক
ছিল।
উল্লেখিত আয়াতসমূহে নারীদেরকে স্বস্তি ও সান্ত্বনা প্রদান এবং আমল গ্রহণযোগ্য
হওয়ার শর্তাবলী সংশ্লিষ্ট বিশেষ আলোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আল্লাহ পাক
সমীপে মান-মর্যাদা ও তারঁ নৈকট্য লাভের ভিত্তি হল সৎকার্যাবলী, আল্লাহর আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মাঝে
কোন ভেদাভেদ নেই।[475]
এক মুসলিম
মায়ের দৌড়াদৌড়িকে আল্লাহ হজ-ওমরার অন্যতম রোকন বানালেন
সাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে নির্ধারিত নিয়মে সাঈ করা হলো
হজ ও ওমরার রোকন। إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ فَمَنْ حَجَّ الْبَيْتَ أَوِ اعْتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَطَّوَّفَ بِهِمَا অর্থ: নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অনত্যম। সুতরাং যে কাবাগৃহে হজ এবং ওমরা সম্পন্ন করে; তার জন্য এ (পাহাড়) দুটি প্রদক্ষিণ করলে কোনো পাপ নেই।[476]
ইমাম কুরতুবি তাঁর তাফসিরে ইবনে আব্বাসের এরূপ বর্ণনা উল্লেখ করেন যে, তিনি বলেন, সাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝখানে বহু মূর্তি ছিল। শয়তানরা সেখানে চক্কর দিত। ইসলামের আবির্ভাবের পর রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এই পাহাড়দ্বয়ের মাঝে তাওয়াফের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলো। অতঃপর এই আয়াতটি নাজিল হয়।
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,«اسْعَوْا،
فَإِنَّ اللَّهَ كَتَبَ عَلَيْكُمُ السَّعْيَ» (حم) 27367 অর্থাৎ তোমরা দ্রুত চল। কারণ, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমাদের উপর সাঈর বিধান প্রবর্তন করেছেন। মুসনাদে আহমদ-২৭৩৬৭ ইমামে আজম আবু হানিফা (রহ.)মতে হজ্জে সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ করা ওয়াজিব আর ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মতে ফরজ।
ঐতিহাসিক ঘটনা : হজরত ইবনে আব্বাস রা.-এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, এর প্রকৃত ঘটনা হলো এই :
হজরত হাজেরা (আ.) তাঁর সন্তানের পানির সন্ধানে
সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝখানে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) যখন হজরত হাজেরা ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাঈল
(আ.)-কে এই স্থানে রেখে যান এবং তাদের খাদ্য ও
পানীয় দ্রব্য শেষ হয়ে যায়, তখন তাদেরকে সাহায্য করার মত কোন লোক
ছিল না। তাই যখন পানির
অভাবে শিশু ইসমাঈলের প্রাণ নাশের আশংকা দেখা দিল, তখন মা হাজেরা আল্লাহর তাআলার দরবারে আশায় প্রার্থনার
নিমিত্ত উঠে দাঁড়ালেন। অতঃপর তিনি
সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে অত্যন্ত অস্থিরতার সাথে ত্রাস্ত ও সন্ত্রস্ত পদবিক্ষেপে ছোটাছুটি
করল। অবশেষে আল্লাহ তাআলা জমজম কূপ সৃষ্টি
করে দেন। এর পানি ক্ষুধায় খাবারের কাজ দিল ও রোগে ওষধের কাজ দিল।
সন্তানের জন্য এক মুসলিম রমনীর এ রকম ছোটাছুটি আল্লাহর কাছে এত
পছন্দ হল যে, কিয়ামত পর্যন্ত হজ-ওমরা পালনকারী মুসলিম
মিল্লাতের জন্য হজরত হাজেরার এ কাজকে স্মৃতি স্মারকস্বরূপ রোকন হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। এতে হজরত হাজেরা (আ.) মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়।[477]
কাফেররা বলে
কোন দল মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ
وَإِذَا
تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ قَالَ الَّذِينَ
كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا أَيُّ الْفَرِيقَيْنِ
خَيْرٌ مَقَامًا وَأَحْسَنُ نَدِيًّا (73) وَكَمْ أَهْلَكْنَا قَبْلَهُمْ مِنْ قَرْنٍ
هُمْ أَحْسَنُ أَثَاثًا وَرِئْيًا অর্থ : তাদের নিকট আমার স্পষ্ট
আয়াত আবৃত্ত হলে কাফেররা মুমিনদেরকে বলে, দুই দলের কোন মর্যাদায়
শ্রেষ্ঠতর ও মজলিস হিসেবে কোনটি উত্তম। তাদের পূর্বে কত মানব গোষ্ঠিকে আমি বিনাশ করেছি, তাদের অপেক্ষা সম্পদ ও বাহ্য দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠতর। বলুন ! যারা বিভ্রান্তিতে আছে, দয়াময় তাদেরকে প্রচুর ঢিল দিবেন যতক্ষণ না, তারা যে বিষয়ে তাদেরকে সর্তক করা হচ্ছে তা প্রত্যক্ষ করবে এ শাস্তি হোক অথবা কিয়ামতই হোক। অতঃপর তারা জানতে পারবে কে মর্যাদায় নিকষ্ট ও দলবলে দুর্বল।[478]
আল্লাহ তাআলা কাফেরদের সম্পর্কে ইরশাদ করেন, যখন তাদের
নিকট আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, যা আল্লাহর একত্ববাদ ও কুরআনের
সত্যতা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত তখন তারা এ হতে মুখ ফিরিয়ে লয় এবং গর্বভরে তাদের বাতিল
ধর্মের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য এই কথা বলে যে, আমার বাসস্থান
ও বৈঠক ঘর অধিক উৎকৃষ্ট ও সুসজ্জিত। ধন-সম্পদ ও জনসম্পদ আমাদেরই অধিক, আমরা অধিক
ইজ্জত ও সম্মানের অধিকারী। বস্তুত আমরাই হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং আল্লাহর প্রিয়পাত্র, এই কারণেই তো তিনি আমাদেরকে ধনে-জনে সম্মানে প্রতিষ্ঠিত
করেছেন। যেমন, ইরশাদ হয়েছে- কাফেররা মুমিনদেরকে বলে, যদি ইসলাম ধর্ম উত্তম হতো; তবে তারা আমাদের পূর্বে তা গ্রহণ করতে পারত না।[479]
পরিশেষে আল্লাহ তাআলা বলেন,
তাদের এতসব অপকর্মের পরেও তাদেরকে নেয়ামতরাজি দান করে ঢেল দেওয়া হয়েছে
মাত্র, তা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। তারপর তারা প্রতিশ্রুতি শাস্তি ভোগ করবে কিংবা আকষ্মিকভাবে কিয়ামত
সংঘটিত হবে।[480]
আল্লাহ তাঁর
রসূলদেরকে সর্বপ্রথম মুসলমান হওয়ার আদেশ দিয়েছেন
প্রিয় মুসলমানগণ ! মহান আল্লাহর নিকট যাঁদের মর্যাদা সর্বাধিক, সেই মহামানবরাই সর্বপ্রথম মুসলমান হওয়ার আজ্ঞাপ্রাপ্ত হয়েছেন। যেমন পবিত্র কুরআনে এসেছে-(১) قُلْ
إِنِّي أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ
اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ
(11) وَأُمِرْتُ
لِأَنْ أَكُونَ أَوَّلَ الْمُسْلِمِينَ অর্থ: হে নবি! আপনি বলে দিন যে, আমি একনিষ্ঠভাবে
এক লা-শরিক আল্লাহর ইবাদত করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। আরও আদিষ্ট হয়েছি যেন আমি মুসলমানদের অগ্রণী হই।[481]
(২)لَا شَرِيكَ
لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ অর্থ: তাঁর কোন অংশীদার নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম মুসলমান।[482]
এ আয়াত থেকে
প্রতিয়মান যে, একজন মুমিন-মুসলমান আল্লাহ তাআলার নিকট কত দামি-মূল্যবান বৈ কি?
আত্মসম্মানের হেফাজত করা, নিজেকে লাঞ্ছিত না করা
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ
الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا অর্থ: এবং যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং অসার ক্রিয়া-কালাপের সম্মুখীন হলে স্বীয় মর্যাদার
সাথে তা পরিহার কর চলে। সূরা ফুরকান-৭২
তারা যখন অনর্থক
কার্যকলাপের মজলিস দিয়ে
অতিক্রম করে তখন ভদ্রভাবে
অতিক্রম করে। তারা
এই ধরণের মজলিসকে তো উদ্দেশ্য
করে যোগ দেয়-ইনা উপরুক্ত
যদি আকস্মিকভাবে এমন মজলিসের
নিকট দিয়ে অতিক্রম করতে
হয় তখনও তারা ইহার
প্রতি আকৃষ্ট হয় না। ইব্রাহিম ইবনে মায়সার (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) একটি খেলার নিকট দিয়ে অতিক্রম করলেন। কিন্তু তিনি তার প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে সোজা চলে গেলেন। তা জানতে পেরে বললেন, لقد اصبح ابن مسعود و امسى كريكا ইবনে মাসউদ আজ বড়ই ভদ্র প্রমাণিত হয়েছে।[483]
عَنْ حذيفة بن اليمان قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَنْبَغِي لِمُؤْمِنٍ أَنْ يُذِلَّ نَفْسَهُ؛ يَتَعَرَّضُ مِنَ البَلَاءِ لِمَا لَا يُطِيْقُ.
অর্থ: হজরত হুজাইফা (রা.)থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ)বলেছেন: মুমিনে কাম্য নয় সে নিজেকে লাঞ্ছিত করা। লোকেরা জিজ্ঞেস করেো, হে আল্লাহর রসূল ! নিজেকে লাঞ্ছিত করে কিভাবে ?
তিনি (নবিজি) বললেন, এমন বিপদাপদ কামনা করা যা সহ্য করা
সাধ্যাতীত।[484]
আল্লাহ তাআলা আপন বান্দার সাধ্যের বাহিরে হুকুম আরোপিত করেননি। যে আল্লাহ
ও তাঁর রসূল মুমিনদেরকে সমাদৃত দান করেছেন। তিনারাই আবার সে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতিকে
সংরক্ষণের তাকিদ দিয়েছেন। সুতরাং এমন
কাজ করা যাবে না যা অপমানের কারণ হয়। সরাসরি অপমানজনক
কাজ থেকে দূরে থাকা সবাই জানে, কিন্তু রসূল(ﷺ) আমাদেরকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে, অনুরূপ সম্মানজনক কাজে আত্মনিয়োগ করা যার পরিণতি শুধু অপমান-অপদস্থ তা মুমিনের শান-কাজ হতে পারে না।
অপবাদের রাস্তা থেকে বেঁচে থাকা : মুমিন শুধু পাপ কাজ থেকে থাকবে না বরং পাপের রাস্তা-জায়গা অর্থাৎ যেখানে তার উপস্থিতি অপবাদের আশঙ্কা-সংশয় এবং অপরের কুধারণা জন্ম বা সম্ভবনা থাকে; সেখান থেকেও দূরে-সর্তক থাকবে। নিম্নে একটি হাদিস শরিফ দ্বারা প্রমাণিত হয়। যেমন,
أَخْبَرَنِي عَلِيُّ بْنُ الحُسَيْنِ رضي الله عنهما أَنَّ صَفِيَّةَ -زَوْجَ النَّبِيِّ - صلى الله عليه وسلم -- أَخْبَرَتْهُ أَنَّهَا جَاءَتْ رَسُولَ اللهِ - صلى الله عليه وسلم - تَزُورُهُ فِي اعْتِكَافِهِ فِي المَسْجِدِ فِي العَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ، فَتَحَدَّثَتْ عِنْدَهُ سَاعَةً، ثُمَّ قَامَتْ تَنْقَلِبُ، فَقَامَ النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم - مَعَهَا يَقْلِبُهَا، حَتَّى إِذَا بَلَغَتْ بَابَ المَسْجِدِ عِنْدَ بَابِ أُمِّ سَلَمَةَ مَرَّ رَجُلاَنِ مِنَ الأَنْصَارِ، فَسَلَّمَا عَلَى رَسُولِ اللهِ - صلى الله عليه وسلم -، فَقَالَ لَهُمَا النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم -: "عَلَى رِسْلِكُمَا، إِنَّمَا هِيَ صَفِيَّةُ بِنْتُ حُيَيٍّ". فَقَالَا: سُبْحَانَ اللهِ يَا رَسُولَ اللهِ! وَكَبُرَ عَلَيْهِمَا. فَقَالَ النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم -: "إِنَّ الشَّيْطَانَ يَبْلُغُ مِنَ الإِنْسَانِ مَبْلَغَ الدَّمِ، وَإِنِّى خَشِيتُ أَنْ يَقْذِفَ فِي قُلُوبِكُمَا شَيْئًا". অর্থ: নবি সহধর্মিণী সাফিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত। একদিন তিনি রমজানের শেষ দশকে মসজিদে আল্লাহর রসূল (ﷺ) -এর খেদমতে উপস্থিত হন। তখন আল্লাহর রসূল (ﷺ) ইতেকাফরত ছিলেন। সাফিয়া তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ
কথাবার্তা বলেন। অতঃপর ফিরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ান। নবি (ﷺ) তাঁকে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়ালেন। যখন তিনি উম্মু সালামা(রা.)এর গৃহ সংলগ্ন মসজিদের দরজা পর্যন্ত পৌঁছলেন,
তখন দুজন আনসারি সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁরা উভয়ে আল্লাহর রসূল (ﷺ)-কে সালাম করলেন। তাঁদের দুজনকে নবি রসূল (ﷺ) বললেন : তোমরা দুজন থাম। ইনি তো (আমার স্ত্রী) সাফিয়া বিনতে হুয়ায়ি (রা.)। এতে তাঁরা দুজনে সুবহানাল্লাহ হে আল্লাহর রসূল! বলে উঠেন এবং তাঁরা বিব্রত বোধ করলেন। নবি (ﷺ) বলেন, শয়তান মানুষের রক্তের শিরায় চলাচল করে। আমি ভয় করলাম যে, সে তোমাদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করতে পারে।[485]
প্রিয়
পাঠক! নিষ্পাপ নবি যদি এত সতর্কতাবলম্বন করেছেন; তাহলে আমাদের আরও কত সজাগ হওয়া উচিত তা সহজেই অনুমেয়।
আত্মসম্মান রক্ষার্থে নবিজি (ﷺ)-এর শিখানো দোআ : وعن بريدة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يقول: اللهمَّ اجْعَلْنِي شَكُوراً واجْعَلْنِي صَبُوراً واجْعَلْني في عَيْنِي صَغِيراً وفي أعْيُنِ النّاسِ كَبِيراً অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে কৃতজ্ঞতা ও সবর করার তাওফিক দাও এবং হে আল্লাহ! আমাকে আমার দৃষ্টিতে খাটো এবং মানুষের দৃষ্টিতে সম্মানিত উন্নত করে দাও।[486]
নোট : হাদিসটির সনদ কেহ হাসান আবার কেহ জয়িফ বলেছেন।
কাফেররা মনে করবে মুসলমান মৃত্যুর ভয় করে, এ জন্য নামাজ সংক্ষেপকরণ :
عَنْ أَبِى
هُرَيْرَةَ
رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ فَلَمَّا أَجْمَعُوا عَلَى قَتْلِهِ
قَالَ لَهُمْ دَعُونِى أُصَلِّى رَكْعَتَيْنِ قَالَتْ فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ فَقَالَ : لَوْلاَ أَنْ تَحْسَبُوا
أَنَّ بِى جَزَعًا
لَزِدْتُ قَالَ فَكَانَ
خُبَيْبٌ أَوَّلَ مَنْ سَنَّ
الصَّلاَةَ
لِمَنْ قُتِلَ صَبْرًا ثُمَّ قَالَ
اللَّهُمَّ
أَحْصِهِمْ عَدَدًا
وَاقْتُلْهُمْ
بَدَدًا وَلاَ تُبْقِ
مِنْهُمْ أَحَدًا وَأَنْشَأَ يَقُولُ : فَلَسْتُ أُبَالِى حَيْثُ أُقْتَلُ مُسْلِمًا عَلَى أَىِّ
حَالٍ كَانَ فِى
اللَّهِ مَصْرَعِى وَذَلِكَ فِى جَنْبِ
الإِلَهِ وَإِنْ يَشَأْ يُبَارِكْ عَلَى أَوْصَالِ
شِلْوٍ مُمَزَّعِ
অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন। যখন কাফেররা (কুরাইশরা) তাঁকে (হজরত খুবায়েব রা.-কে)
হত্যা করার জন্য হারাম শরিফের বাহিরে হিল নামক স্থানে নিয়ে যায়,
তখন খুবায়েব (রা.) তাদেরকে
বললেন, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি দুরাকাত নামাজ পড়ব। তারা তাকে
ছেড়ে দেয় এবং তিনি দুরাকাত নামাজ পড়ে নেন।
তারপর বলেন, আল্লাহর কসম! যদি
তোমাদের একথা ধারণা করার সম্ভাবনা না থাকত যে, আমি ভয় পেয়ে
গেছি,তাহলে আমি আরও বেশি নামাজ পড়তাম। হে আল্লাহ! এদের সংখ্যা
গুণে রাখ। এদের সবাইকে একের পর এক হত্যা কর। আর একজনকেও ছেড়ে দিও না। এরপর তিনি নিম্নের কবিতাটি পড়েন-
মুসলিম হিসেবেই আমি মরতে চাচ্ছি, তখন আমার নেই কোন পরোয়া নেই।
আল্লাহর পথে কিভাবে আমার প্রাণটি যাবে।
আমার মৃত্য হচ্ছে আল্লাহর পথে।
আর কর্তিত জোড়াগুলির ওপর বরকত নাজিল করেন, যদি তিনি চান।
আর হজরত খুবায়েব (রা.) ছিলেন সর্বপ্রথম
মুসলমান যিনি আল্লাহর পথে গ্রেফতার হয়ে মৃত্যুবরণকারীদের জন্য নিহত হবার পূর্বে
নামাজ পড়ার সুন্নাত জারি করেন।[487]
নোট : হাদিসটির অংশ বিশেষ উল্লেখ করা
হয়েছে।
হায়! মুসলিম জাতি মৃত্যুর ভয় করে এমন ধারণা যেন না জন্মে, সে জন্য তিনি নামাজের মত মহতি ইবাদত সংক্ষেপ করলেন। আজ আমরা হাজারো অপকর্মে
লিপ্ত। আমাদের আমল-আখলাকের দরুন পবিত্র ধর্ম আজ কুলষিত, অপমানিত, ধৃকিত ও ঘৃণিত
হচ্ছে।
হে আমার মুসলিম
জাতি! হজরত খুবায়েব (রা.) তাঁর জীবন সায়াহ্নে এমন ছবক শিক্ষা দিলেন তা থেকে যদি আমরা শিক্ষা
অর্জন করি, তাহলে অমুসলিম জাতি ইসলামের সৌন্দর্য-মহানুভবতা দেখে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে দলে দলে আশ্রয় নিত।
হে আল্লাহ! আমাকেসহ সব মুসলমানকে সেই উন্নত-সুউচ্চ আখলাক নিজ
দয়ায় দান করুন।
ফেরেশতাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন
আমার এই কিতাবে ফেরেশতার সম্মান-মর্যাদা বর্ণনা করা প্রতিপাদ্য-উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু ফেরেশতাগণও যেহেতু আল্লাহ তাআলার সম্মানিত-অনুগত মুমিন-বান্দা। সুতরাং, তাঁরাই সম্মান-ইজ্জত পাওয়ার দাবিদার। (ফেরেশতারা আল্লাহর বান্দা ও মুমিন হওয়ার দলিল : (১) আর তারা ফেরেশতাগণকে যারা আল্লাহর বান্দা নারী সাব্যস্ত করেছে, এরা কি ফেরেশতাদের সৃষ্টি হওয়ার সময় উপস্থিত ছিল ?[488] (২) আল্লাহ তাআলা এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করেছেন যে, তিনি ব্যতিত অন্য কেউ মাবুদ হওয়ার যোগ্য নয় এবং ফেরেশতাগণ ও জ্ঞানীগণও।[489] তাই তাঁদের
আলোচনা-সংযোজন করাও সমীচীন-যুক্তিযুক্ত মনে করছি। [ফেরেশতাদের সম্পর্কে জানতে ইমাম জালালুদ্দিন সুয়িতির (রহ.)-এর বিখ্যাত কিতাব-“ফেরেশতাদের বিস্ময়কর জীবনকথা” মাকতাবুল আশরাফ লাইব্রেরি]
ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনা ফরজ : এ প্রসঙ্গে কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে : لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ
وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ
وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ অর্থ: সৎকর্ম(শুধু)এই নয়
যে, তোমরা পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে, বরং সৎকাজ হল এই যে, ঈমান আনবে
আল্লাহর উপর, কেয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের
উপর, আসমানি কিতাবের উপর এবং সকল নবিগণের উপর।[490]
ফেরেশতাদের সঙ্গে শত্রুতা কুফরি : যেমন-আল্লাহ তাআলা বলেন, مَنْ
كَانَ عَدُوًّا لِلَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَرُسُلِهِ وَجِبْرِيلَ وَمِيكَالَ
فَإِنَّ اللَّهَ عَدُوٌّ لِلْكَافِرِينَ যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা
ও রসূলগণ এবং জিবরাঈল ও মিকাঈল (আ.)-এর
শত্রু হয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ সে সব কাফেরদের শত্রু।[491]
তিন অবস্থায়
ফেরেশতাদের সঙ্গে লজ্জা করা উচিত : وى
البزّار
عن
ابن
عباس
- رضي
اللَّه
عنهما-
قال
: قال
رسول
صَلَّى
اللَّه
عليْهِ
وسَلَّم -إنّ الله يَنْهاكمْ عن التَّعَرِّي فاسْتَحْيُوا مِنْ
مَلائِكَةِ الله الذينَ لا يُفارِقُونَكمْ إلاّ عندَ ثلاثِ حالات الغائِطِ
والجَنابَةِ والغُسْلِ فإذا اغْتَسَلَ أحدُكمْ بالعَرَاءِ فلْيَسْتَتِرْ بثَوْبِهِ
أو بجَذْمَةِ حائِطٍ أو بِبَعيرِهِ ) অর্থ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)
হতে বর্ণিত, প্রিয়নবি (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, মহান আল্লাহ তোমাদেরকে কাপড় খুলতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহর ঐ সব ফেরেশতাদেরকে লজ্জা কর যারা তোমাদের সাথে থাকেন
অর্থাৎ কিরামান কাতিবিন যারা তোমাদের তিনটি প্রয়োজন ছাড়া কখনো তোমাদের থেকে পৃথক হন
না। (১) পেশাব-পায়খানা করার সময়
(২) স্ত্রী সহবাসের সময় (৩) গোসল করার সময়। (যেহেতু এ তিনটি সময় মানুষ প্রয়োজনের খাতিরে উলঙ্গ হয়ে থাকে)।[492]
নোট : হাদিসটি দুর্বল, তবে অন্যান্য দলিল দ্বারা ছহিহ প্রমাণিত হয়।
ডান দিকে থুথু নিক্ষেপ করবে
না :عَبْدُ
الرَّزَّاقِ،
عَنْ مَعْمَرٍ، عَنْ هَمَّامِ
بْنِ مُنَبِّهٍ، أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ
يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ
اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ: «إِذَا قَامَ أَحَدُكُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَلَا يَبْزُقْ أَمَامَهُ، إِنَّهُ يُنَاجِي اللَّهَ مَا دَامَ فِي مُصَلَّاهُ، وَلَا عَنْ يَمِينِهِ فَعَنْ يَمِينِهِ مَلَكٌ، وَلَكِنْ لِيَبْصُقْ عَنْ يَسَارِهِ،
أَوْ تَحْتَ رِجْلَيْهِ» অর্থ: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, প্রিয়নবি (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ নামাজে দাঁড়াবে তখন সে যেন সামনে থুথু না ফেলে;
কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত সে নামাজে থাকে ততক্ষণ মহান আল্লাহর সাথে কথা বলতে
থাকে এবং ডান দিকেও নিক্ষেপ করবে না। কেননা তার ডান দিকে ফেরেশতা রয়েছেন; বরং বাম পায়ে বা পায়ের নীচে নিক্ষেপ করবে।[493]
নোট : মুসনাদে আহমদ ও আবু দাউদের বর্ণনায়
শব্দ কম রয়েছে।
পরিশিষ্ট
পরিশেষে আমি সব মুসলিম ভাই-বোনদের দুটি বিষয় আবেদন করবো। -----
এক.সকল মান-সম্মান-উজ্জত-গুণকীর্তনের
মালিক মহান রাব্বুলালামিন। যিনি তাঁর
অপার দয়া-করুণা-অনুকম্পায় মুমিন-মুসলিমদের যে মর্যাদা-মর্তবা দান করেছেন, সেই দয়াময়ের কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়া এবং
শোকরগোজার বান্দার হওয়ার জন্যে জানে-প্রাণে চেষ্টা করা। যদি হই লাভ কী এবং না হই ক্ষতি কী ? পবিত্র কুরআনের ভাষায়-وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي
لَشَدِيدٌ অর্থ: যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন
যে, যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর (কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর), তবে তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি
অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর।[494]
দুই. মুসলিমদের আল্লাহ এক, রসূলে এক, কাবা এক। সবাই কম-বেশি আল্লাহ-রসূলে, দীন-ইসলামকে ভালবাসে, এতে কোন সন্দেহ
নেই। তবে শাখাগত মাসয়ালায় ইমাম-ফুকাহাদের মতভেদ রয়েছে। যেমন-হাত কোথায় বাঁধবো বুকে
না নাভীর নিচে, আমিন আস্তে না জোরে, নামাজের
পর দোআ করবো কি করবো না, নামোজের ফরজ-ওয়াজিব কয়টি, হজের
ফরজ-ওয়াজিব কয়টি, মিলাদ-কিয়াম ইত্যাদি(কিন্তু বাতিল ফেরকার কথা ভিন্ন)
? মতভেদের বিভিন্ন
কারণ আছে। এ বিষয়ে শায়খুল
হাদিস হজরত মাওলানা জাকারিয়া মুহাজিরে মাদানি (রহ.)-এর প্রণীত “ইমামগণের
মতভিন্নতা কী ও কেন?” দেখা যেতে পারে।
যদি আমরা হিসেব-চিন্তা-গবেষণা করি, দেখবো একজন মুমিনের সঙ্গে আমার হাজারো ও অধিকাংশ আকিদা-বিশ্বাস-আমল অভিন্ন,অল্পকিছু মাত্র মতভিন্নতা রয়েছে। সুতরাং মুষ্ঠিমেয় কয়েকটি মতভেদের কারণে মুমিন-মুসলিম আমার
শত্রু-হিংসা-বিদ্বেষের পাত্র হতে পারে না।
অতত্রব, শত মতভিন্নতা সত্ত্বেও প্রতিটি কালেমা ওয়ালা
ভাইকে মন থেকে ভালবাসবো, তাদেরকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করবো। মুসলমানদের
মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিভেদ-বিছিন্নতা পয়দা হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকবো। কাউকে অপমান-অপদস্থ করবো, কারও সামান্যতম সম্মানহানি এমন কাজ করবো
না, কারও গিবত করবো না। একে অপরকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিব, প্রতিটি মুমিন-মুসলিম উম্মাহর হিতাকাংখি
হবো। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য প্রাণ খুলে
দোআ করবো। কারও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ-অনুরাগ-এক বিন্দু বিদ্বেষ রাখবো না। পবিত্র কুরআনের ভাষায়-
وَلَا تَجْعَلْ
فِي قُلُوبِنَا
غِلًّا لِلَّذِينَ
آمَنُوا رَبَّنَا
إِنَّكَ رَءُوفٌ
رَحِيمٌ অর্থ: ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়।[495]
সর্বশেষে আল্লামা বকর বিন আব্দুল্লাহ মুজানি (রহ.)-এর সেই বিখ্যাত বাণী স্মরণ করিয়ে এ কিতাব লেখা শেষ করছি- তিনি বলেন, তুমি তোমার চেয়ে বড় কাউকে (মুমিনকে) দেখতে পেলে তাঁর সম্মান কর এবং এ বিশ্বাস পোষণ
কর যে, তিনি তোমার আগে ‘ঈমান’ গ্রহণ করেছেন এবং বহু নেক আমল করেছেন। অনুরূপ তোমার চেয়ে ছোট কাউকে দেখলে তারও সম্মান কর এবং এ বিশ্বাস পোষণ কর যে, তুমি তার পূর্ব থেকেই গুনাহ করতে শুরু করেছো(অর্থাৎ তোমার চেয়ে তার গুনাহ কম)। পক্ষান্তরে যদি কেউ তোমাকে তাজিম ও শ্রদ্ধা করে;
তবে তা আল্লাহ তাআলার মস্ত বড় রহমত জ্ঞান কর এবং এ বিশ্বাস রাখ যে,
তুমি এ সম্মানের আদৌ উপযুক্ত নও। আর যদি কেহ অপমান-অসম্মানের ব্যবহার করে, তবে মনে রাখ! সেটা তোমারই কোন গুনাহের পরিণতি, পাপের প্রায়শ্চিত্ত। তুমি যদি তোমার প্রতিবেশির কুকুরের প্রতি ঢিল ছুঁড়ে থাক, তাহলে তুমি তোমার প্রতিবেশিকেই কষ্ট দিয়েছো।[496]
আল্লাহ তাআলা লেখক, পাঠক ও সব মুসলমানকে উপরোক্ত কথাগুলোর
উপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন! ছুম্মা আমিন!!
[1] সূরা শুআরা-১০২
[3] সূরা তহা,৭২-৭৫
[4] তাফসিরে ইবনে কাসির ৪র্থ খণ্ড; ২৪৯ পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক
(রহ.) অনূদিত, ই.ফা.
[5] সূরা সাবা-৩১
[6] তাফসিরে জালালাইন-৫ম খণ্ড; ২৩৫পৃ., ইসলামিয়া
কুতুবখানা
[7] সূরা ইউনুস-৯০
[8] সূরা নুর-৫৫
[9] তাখরিজ : জামে তিরমিজি-১৬২১
[10] কাশফুল বারি শরহু সহিহিল বুখারি, ২য় খণ্ড; ২২পৃষ্ঠা
[11] কাশফুল বারি শরহু সহিহিল বুখারি, ২য় খণ্ড; ৩৭পৃষ্ঠা
[12] সূরা হুজুরাত-১৪
[13] সূরা জারিয়াত, ৩৫-৩৬
[14] উমদাহ- ১ম খণ্ড; ১০৯ পৃষ্ঠা
[15] কাশফুল বারি শরহু সহিহিল বুখারি-২য় খণ্ড;৩৭-৪০ পৃষ্ঠা
[16] সূরা মুনাফিকুন-০৮
[17]তাফসিরে ওসমানি-৭ম খণ্ড, ১৭৩পৃষ্ঠা; ই.ফা.; রূহুল কুরআন, তাফসিরে জালালাইন-৬ষ্ঠ খণ্ড; ৫৫৫পৃ.,
ইসলামিয়া কু.
[18] তাখরিজ : বুখারি-৪৯০০, কিতাবুত তাফসির; মুসলিম-২৭৭২
[19] তাখরিজ : মুসলিম-২৫৮৪; বুখারি-৩৫১৮,৪৯০৫; তিরমিজি-৩৩১৫; আহমদ-১৪৪৬৭
[20] সূরা ফাতির, ১৯-২২
[21] তাফসিরে ইবনে কাসির ৯ম খণ্ড; ২৮৭ পৃষ্ঠা; অধ্যাপক আখতার ফারূক (রহ.) অনূদিত, ই.ফা.
[22] সূরা আনআম -১২২
[23] সূত্র : তাফসিরে ইবনে কাসির-৪র্থ খণ্ড; ৪০পৃষ্ঠা; ইসলামিক ফা.
[24] সূরা রুম-০৭ সূত্র : তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন-৪০৮ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাও. মুহিউদ্দীন খান রহ.
[25] সূত্র : তাফসিরে আআরেফুল কুরআন-৪০৮ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন
খান (রহ.)
[26] সূরা সিজদা-১৮
[27] সূরা জাছিয়া-২১
[28] সূরা ছোয়াদ-২৮
[29] সূত্র : তাফসিরে ইবনে কাসির ৯ম খণ্ড;৫০০ পৃষ্ঠা;
অধ্যাপক আখতার ফারূক রহ. , ই.ফা.
[30] সূরা গাফির-৫৮
[31] তাফসিরে ইবনে কাসির ৯ম খণ্ড;৬৮২ পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক
(রহ.) অনূদিত, ই.ফা.
[32] সূরা বাকারা-২২১
[33] বুখারি-২৫১৭;
মুসলিম-১৫০৯; তিরমিজি-১৫৪১; আহমদ-৯১৫৪(১৩৫৯)
[34] মুসলিম-১৪৮, কিতাবুল ফিতান; সুনানে নাসায়ি-২২০৭; মুসনাদে আহমদ-১২০৪৩
[35] তাখরিজ : মুসলিম-১৪৮; মুসনাদে আহমদ-১২৬৬০
[36] তাখরিজ : মুসলিম-১১৭
[37] তাখরিজ : মুসলিম-২৯৪৯, কিতাবুল ফিতান অধ্যায়; বুখারি-৭০৬৬;
মুসনাদে আহমদ-৩৭৩৫
[38] তাখরিজ : মুসনাদে আহমদ-১০৭২৭
[39] তাখরিজ : তিরিমিজি-২০৩২; ছহিহ ইবনে হিব্বান-৫৭৬৩;
শরহুস সুন্নাহ-৩৫২৬
[40] তাখরিজ : মুজামুল আওসাত লিল তাবারানি-৬২৫০
[41] ইবনে মাজাহ-৩৯৪৭; বায়হাকি-১/১৩৭ ; মুসনাদে
আহমাদ ১০৭৩৮, হিলইয়াতুল আওলিয়া ১০/২০২,
[42] তাখরিজ : মাজমাউল জাওয়ায়েদ-১/৮৬
[43] তাফসিরে ইবনে কাসির, ১৬তম খণ্ড;৭৭০ পৃ. অনুবাদ: ড.মুহাম্মাদ মুজীবুর রহমান
[44] তাফসিরে বুরহানুল কুরআন-৩য় খণ্ড; ৩৮৫ পৃ.
[45] আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৭ম খণ্ড;২৫০পৃষ্ঠা, হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.), ই.ফা.
[46] তাখরিজ : বুখারি-৪২৬৯; মুসলিম-৯৬, আহমাদ
২১৭৪৫; আবু দাউদ-২৬৪৩
[47] তাখরিজ : মুসলিম-৯৭
[48] তাখরিজ : মুসলিম-৩৭
[49] সূরা নিসা-৯৪
[50] তাফসিরে ইবনে কাসির-৩য় খণ্ড;২২০পৃষ্ঠা; অধ্যাপক
মাওলানা আখতার ফারূক (রহ.) অনূদিত,ই.ফা.
[51] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-২৭৬পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[52] মুসলিম-৩৩৮; আবু
দাউদ-৪০১৮; তিরমিজি-২৭৯৩; ইবনে মাজাহ-৬৬১; আহমদ -১১৬০১
[53] তাখরিজ : আবু
দাউদ: ৩১৪০ ; ইবনে মাজাহ-১৪৬০; মুসনাদে আহমদ -১২৪৯
[54] সূরায়ে নিসা- ২২, রদ্দুল
মুহতার- ২/১৯৫, আহসানুল
ফাতাওয়া:৪/২১৯ মাহমুদিয়া-৩৯৮/২
[55] সূরা তওবা,১৭-২০
[56] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-৫৫৮পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[57] সূরা আহজাব-৫৭,৫৮
[58] তাফসিরে মাজহারি; তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-১০৯৫ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[59] তাফসিরে মাজহারি;তাফসিরে আআরেফুল কুরআন-১০৯৬ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন
খান (রহ.)
[60] তাখ.বুখারি-৮৫৪; মুসলিম-৫৬৪; তিরমিজি-১৮০৬; নাসায়ি-৭০৭; আবু দাউদ-৩৮২২; আহমদ-১৪৫৯৬
[61] তাখরিজ : বুখারি-১০,
৬৪৮৪;
মুসলিম ৪০; নাসায়ি- ৪৯৯৬; আবু দাউদ
২৪৮১; আহমদ
৬৪৫১
[62] তরজুমানুস সুন্নাহ-১পৃষ্ঠা; দ্বিতীয় খণ্ড-বদরে আলম মিরাঠি রহ.ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ।
[63] তাখরিজ : তারগিব-তারহিব-১/২২৮ পৃ. শরহে মানাভি-৬/৩২ পৃ.তাবারানি-৩৬০৭ (আউসাত),৪৬৮
[64] তরজুমানুস্ সুন্নাহ-৩ পৃ.দ্বিতীয় খণ্ড-বদরে আলম মিরাঠি রহ.
[65] সূরা বুরুজ-১০
[66] তাফসিরে কাবির; তাফসিরে জালালাইন-৭ম খণ্ড; ৪১৫
পৃ.ইসলামিয়া
কুতুবখানা
[67] তথ্যসূত্র : সূত্র : তাফসিরে কাবির; রূহুল মাআনি; তাফসিরে
জালালাইন-৭ম খণ্ড;৪১৫ পৃ. ইসলামিয়া কুতুবখানা তাফসিরে মাজহারি; তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-১৪৪৬ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.); আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২য় খণ্ড;২৫১পৃষ্ঠা,ই.ফা.
[68] সূরা বুরুজ, ৮-৯
[69] সূত্র : তাফসিরে জালালাইন-৭ম খণ্ড;৪১৪ পৃ.ইসলামিয়া কুতুবখানা
[70] তাখরিজ : জামে তিরমিজি-১৯৪১,শরহুল মাছাবিহ লিইবনে মালেক-৫/৩২৮
[71] তাখরিজ : বুখারি-৫৭; মুলিম-৫৬;
তিরমিজি-১৯২৫; নাসায়ি-৪১৫৬; আহমদ-১৯১৯১
[72] তাখরিজ : মুসলিম-৫৫; আবু দাউদ-৪৯৪৪; দারেমি-৪১৯৭; মুসনাদে আহমদ-১৬৯৪০
[73] সূত্র : তরজুমানুস সুন্নাহ-২/৩১-৩৩
[74] তাখরিজ : তাবারানি; মাজমাউল জাওয়াইদ-১/৮৭ পৃ.; তারগিব ও তারহিব-১/৫৪১ পৃ.
[75] তাখরিজ : মুসনাদে আহমদ-১৫৪৫৫
[76] তাখরিজ : বুখারি-২৫৫০; মুসলিম-১৬৬৪;
আবু দাউদ-৫১৬৯
[77] তরজুমানুস সুন্নাহ-২/৩৬
[78] তাখরিজ : মুসলিম-২১৬২
[79] নিদায়ে মিম্বার-২য় খণ্ড; ২৬৮ পৃষ্ঠা, ইত্তিহাদ প্রকাশনী
[80] তাখরিজ : সুনানে আবু দাউদ-৫২০০
[81]তাখরিজ
: বুখারি-৩২৯৪; হিসনে হাসিন-১৬৪
পৃষ্ঠা
[82] তাখরিজ : বুখারি-৬২২৪
[83] তাখরিজ : আবু দাউদ-৩১০৬; জামে তিরমিজি-৩০৮৩;
মুসনাদে আহমদ-২১৩৮(৯০৭)
[84] তাখরিজ : বুখারি-৩৬১৬,৫৬৬২(৯০৮)
[85] তাখরিজ : আবু দাউদ-৩২০১;
জামে তিরমিজি-১০২৪; নাসায়ি-১৯৮৬(৯৩৭)
[86] তাখরিজ : ইবনে মাজাহ-৩৬৮১; মুসলিম-২৬১৮: আহমদ -১৯৭৬৮
[87] তাখরিজ : মুসলিম-১৯১৪;আল জামি আস সগীর-৫৮৬৩; বুখারি-৬৫২,২৪৭২
[88] তাখরিজ : জামে তিরমিজি-১৯৫৬
[89] তাখরিজ : মুসলিম-১৭১৫; মুসনাদে আহমদ-৮১৩৪,৮৫৮১; মুওয়াত্তা ইমাম মালেক-১৮৬৩
[90] সূরা ইমরান-১০২,১০৩
[91] তাফসিরে আআরেফুল কুরআন-১৯১ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[92] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-১৯২ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[93] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-১৯৪ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[94] নিদায়ে মিম্বার-১ম খণ্ড; ১৮৩ পৃষ্ঠা; ইত্তিহাদ প্রকাশনী
[95] তাখরিজ : বুখারি-১৩; মুসলিম-৪৫; মুসনাদে আহমদ-১২৮০১, ১৩৮৭৫
[96] তরজুমানুস সুন্নাহ-৩৭ পৃষ্ঠা; দ্বিতীয় খণ্ড-বদরে আলম মিরাঠি রহ.ই.ফা.
[97] সূরা হাশর-০৯
[98] তাফসিরে ইবনে কাসির-১১তম খণ্ড; ৩৪পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক রহ.,ই.ফা.
[99] তাখরিজ : বুখারি-২৮৫, কিতাবুল গোসল
[100] তাফসিরে আআরেফুল
কু.-৫৬৫ পৃ.; তরজুমানুস সুন্নাহ-৮৪ পৃষ্ঠা; দ্বিতীয় খণ্ড-বদরে আলম মিরাঠি রহ.
[101] আদ্দারু কুতনি-২/৭০; হাকেম-১/৩৮৫
[102] মুসান্নেফে
আব্দুর রাজ্জাক-৬৬৪৮; কিতাবুল আছল-১/৩৩৯; তরজুমানুস সুন্নাহ-৮৪পৃষ্ঠা; দ্বিতীয় খণ্ড-বদরে আলম মিরাঠি রহ. ই.ফা.
[103] তাখরিজ : মুসনাদে আহমদ-৬৮৭২; কানযুল উম্মাল-১ম খণ্ড; ১৭৫ পৃ.
[104] তরজুমানুস সুন্নাহ-৯৫ পৃষ্ঠা; দ্বিতীয় খণ্ড-বদরে আলম মিরাঠি রহ. ই.ফা.
[105] তাখরিজ : বুখারি-২৮৯৬; মুসনাদে আহমদ -১৪৯৩
[106] তাখরিজ : নাসায়ি-৩১৭৮
[107]তা. মুসলিম-২৯৮২; নাসায়ি-২৫৭৭; তিরমিজ,
ইবনে মাজাহ-২১৪০; আহমদ-৮৫১৫; বুখারি-৫৩৫৩
[108] সূরা হুদ, ২৯-৩০
[109] সূরা শুআরা-১১৪
[110] তাফসিরে ইবনে কাসির ৫ম খণ্ড; ২৩৯ পৃষ্ঠা;; তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-৩৮১,৬২৮ পৃ.সংক্ষিপ্ত
[111] সূরা আনআম -৫২
[112] তা. আআরেফুল কুরআন-৩৮২ পৃ.-মাও. মুহিউদ্দীন খান রহ.; তা. বুরহানুল কুরআন-১/৫২১,
[113] তাখরিজ : বুখারি-৪৯১৮; মুসলিম-২৮৫৩;
তিরমিজি-২৭৮৮;আহমদ-১৮৭২৮; ইবনে মাজাহ-৪১১৬
[114] সূরা আনআম -৫৪
[115] তাফসিরে বুরহানুল কুরআন-১/৫২২; মাআরিফুল কুরআন ও সাবি-শরহে জালালাইন
[116] তাখরিজ : বুখারি-৪৯১৮; মুসলিম-২৮৫৩; তিরমিজি-২৭৮৮; আহমদ-১৮৭২৮; ইবনে মাজাহ-৪১১৬
[117] তাখরিজঃ বুখারি-৭৪০৫;মুসলিম-২৬৭৫;তিরমিজি-২৩৮৮;ইবনে মাজাহ-৩৭৯২;আহমদ-১০২২৪
[118] সূরা বাকারা-১৫২
[119] বুখারি-৬০৪০; মুসলিম-২৬৩৭
[120] তাখরিজ : মুসলিম-২৭০১; তিরমিজি-৩৩৭৯; নাসায়ি-৫৪২৬; আহমদ-১৬৩৯
[121] তাফসিরে ইবনে কাসির ২য় খণ্ড;৩৩০পৃষ্ঠা; অধ্যাপক আখতার ফারূক (রহ.) অনূদিত, ই.ফা.
[122] সূরা জারিয়াত, ৩১-৩৪
[123] আনকাবুত, ৩১-৩২
[124] সূরা জারিয়াত-৩৫
[125] .তাফসিরে
ইবনে কাসির ৮ম খণ্ড; ৫৫৫ পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক (রহ.) অনূদিত,ই.ফা
[126].মাসায়েলুস সুলুক; তাফসিরে বয়ানুল কুরআন;
বুরহানুল কুরআন, ২য় খণ্ড;৭১৯ পৃ.
[127] আবু দাউদ-৪২০২; তিরমিজি-২৮৭১; নাসায়ি-৫০৬৮; ইবনে মাজাহ-৩৭২১; আহমদ -৬৬৭২
[128] তাখরিজ : তিরমিজি-১৬৩৪; নাসায়ি-৩১৪৪;মুসনাদে আহমদ -১৮০৬৪; ছহিহ
ইবনে হিব্বান-২৯৮৩
[129] তাখরিজ : তিরমিজি-২০২২
[130] মুসলিম-৬৭৩; আবু দাউদ-৫৮২; তিরমিজি-২৩৫; নাসায়ি-৭৮০; ইবনে
মাজাহ-৯৮০; আহমদ -১৭০৬৩
[131] তাখরিজ : মুসলিম-৪৩২; আবু দাউদ-৬৭৪; নাসায়ি-৮০৭; দারেমি-১৩০২; আহমদ -১৭১০২
[132] তাখরিজ : মুসনাদে আহমদ-৪৬০; সহিহ ইবনে হিব্বান-৬২৬৯
[133] তাখরিজ : বুখারি-৩১৭৩; মুসলিম-১৬৬৯; আবু দাউদ-৪৫২০; তিরমিজি-১৪২২; নাসায়ি-৪৭১০
[134] তাখরিজ : সুনানে আবু দাউদ-৪৮৪৩; সুনানে বায়হাকি
[135] তরজুমানুস সুন্নাহ-১২২পৃষ্ঠা; দ্বিতীয় খণ্ড-বদরে আলম মিরাঠি রহ.ই.ফা.
[136] তাখরিজ : তিরমিজি-১৯১৯; মুসনাদে আহমদ-২২৮০৭; ছহিহ তারগিব-তারহিব-১০১, হাকেম-৪২১
[137] তাখরিজ : মুসলিম-২২৪৭; বুখারি-৬১৮৩
[138] তাখরিজ : বুখারি-৬৫০২, কিতাবুর রিফাক, বাবুল তাওয়াযু’
[139] সূরা বাকারা-২৭৯
[140] তাখরিজ : বুখারি-৭৫৫,৭৭০; মুসলিম-৪৫৩; তিরমিজি-২৩৬৫; নাসায়ি-১০০২; আবু দাউদ-৮০৩; ইবনে মাজাহ-১৩১; আহমদ-১৫১৩
[141] তাখরিজ : বুখারি-৩১৯৮;
মুসলিম-১৬১০; তিরমিজি-১৪১৮; আহমদ-১৬৩১; দারমি-২৬০৬
[142] তাখরিজ : বুখারি-১৯০৪; মুসলিম-১১৫১; তিরমিজি-৭৬৪; নাসায়ি-২২১৪
[143] সুরা আনফাল: আয়াত: ৭৫
[144] তাখরিজ: বুখারি, কিতাবু মানাকিবিল আনসার-৩৭৮০, ৩৭৮১
[145] সূরা তওবা-৭১
[146] তাফসিরে
ইবনে কাসির-৭৪৪পৃ.৮ম খণ্ড;,তাখরিজ : মুসলিম-২৫৮৫; ৬৩৪৯,বুখারি-৪৮১, তিরমিজি-১৯২৮
[147] তাখরিজ : বুখারি-৬০১১; মুসলিম-২৫৮৬;
মুসনাদে আহমদ-৪/২৭০
[148] তাখরিজ : বুখারি-২৬৯২;মুসলিম-২৬০৫; তিরমিজি-১৯৩৮; আবু দাউদ-৪৯২০; আহমদ-২৭২৭১
[149] সূরা আনফাল-৪৬
[150] বুখারি
সূত্র : তাফসিরে ইবনে কাসির-২৩৩পৃ.১৮তম খণ্ড; অনুবাদ ড.মুহাম্মাদ
মুজিবুর রহমান
[151] তাখরিজ : তিরমিজি-২৫০৯; আবু দাউদ-৪৯১৯; আহমদ-২৭৫০৮
[152] তিরমিজি-২৫০৯
[153] তাখরিজ আবু দাউদ-২১৭৫; আহমদ -৯১৫৭
[154] মুখতাছার কিতাবুল আযকার-১৬৬ পৃ
[155] তাখরিজ : সুনানে আবু দাউদ-৩২৫৬,২১১৯;মুসনাদে আহমদ-১৬৭৭২
[156] তরজুমানুস সুন্নাহ-বদরে আলম মিরাঠি (রহ.) ই.ফা.
[157] তাখরিজ : বুখারি-২৪৪৪,৬৯৫২; তিরমিজি-২২৫৫; আহমদ-১১৯৪৯
[158] তাখরিজ : মুসনাদে আহমদ – ৮৮৪৫; মুসলিম-২১৬২
[159] তাখরিজ : বুখারি-২১৪০; মুসলিম-১৪০৮; আবু
দাউদ-২০৮০; তিরমিজি-১১৩৪; নাসায়ি-৩২৩৯
[160] ফাতাওয়া শামি-৫/৩৩; আহসানুল ফাতাওয়া-৭/২৭২; ফাতাওয়ায়ে মাদানিয়া-১ম খণ্ড, ৪৪৩পৃষ্ঠা
[161] দৈনিক সমকাল; ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
[162] দৈনিক ইত্তেফাক; ০৬ নভেম্বর,২০১৯
[163] দৈনিক সমকাল; ২৫ জুন, ২০২০
[164] অনলাইন
বৈশাখী; ১৯জুন, ২০২০
[165] সূরা হাশর-১০
[166] তাফসিরে
ইবনে কাসির-৪০৬পৃ.১৭তম খণ্ড; মুসনাদ আহমদ-১২৬৯৭; নাসায়ি
[167] তাখরিজ : মুসলিম-৬৪৪১, ই.ফা. ৬৩১৪
[168] তাখরিজ : মুসলিম-২৬৯৯; তিরমিজি-১৪২৫,
আবু দাউদ-১৪৫৫; আহমদ-৭৩৭৯; দারেমি-৩৪৪
[169] তাখরিজ : আবু
দাউদ-৪৪৮০; আহমদ-১৯৭৭৬,১৯৮০১
[170] তরজুমানুস সুন্নাহ-১২৭পৃষ্ঠা; দ্বিতীয় খণ্ড-ই.ফা.;
তাফসিরে মা. কুরআন-১২৮৪ পৃ.সংক্ষিপ্ত
[171] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-১২৮৪ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[172] সূরা তওবা-১১
[173] তাফসিরে আনওয়ারুল কুরআন-২য় খণ্ড;৫৭৫ পৃষ্ঠা,ইসলামিয়া কুতুবখানা
[174] তাখরিজ : বুখারি-১৭৪২; মুসলিম-১২১৮; আবু দাউদ-১৯০৫; ইবনে মাজাহ-৩০৭৪; দারেমি-১৮৯৩
[175] তাখরিজ : মুসলিম-২৫৬৪;
ইবনে মাজাহ-৩৯৩৩; আহমদ-৭৭২৭
[176] তরজুমানুস সুন্নাহ-১২৪পৃষ্ঠা; দ্বিতীয় খণ্ড-বদরে আলম
মিরাঠি রহ. ই.ফা.
[177] তাখরিজ : মুসলিম-১৩৭;
নাসায়ি-৫৪১৯; ইবনে মাজাহ-২৩২৪; আহমদ-২১৩৬; মুয়াত্তা মালেক-১৪৩৫; দারেমি-২৬০৩
[178] সূরা ফাতাহ-২৫
[179] আইছারুত্তাফসির; তাফসিরে বুরহানুল কুরআন-৩/৩৯২
[180] তাখরিজ : সুনানে ইবনে মাজাহ-৩৯৩২; ছহিহুত তারগিব-২/৬৩০
[181] আল-বিদায়া ওয়ান
নিহায়া-৩২৭,৩৫৫ পৃষ্ঠা; ৭ম খণ্ড, হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.)
ই.ফা.
[182] বুখারি-৩৬২৯; আবুদাউদ-৪৬৬২;তিরমিজি-৩৭৭৩;নাসায়ি-১৪১০;আহমদ-২০৩৯
[183] আল-বিদায়া ওয়ান
নিহায়া-৮ম খণ্ড;৩৯-৫০ পৃষ্ঠা,হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.),ই.ফা.
[184] তাখরিজ : আবু দাউদ-৪৮৭৬; মুসনাদে আহমদ-১৬৫১,হাকেম-২/৩৭
[185] সূরা হুজুরাত-১১
[186] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-১২৮২ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)।
[187] তাখরিজ : তিরমিজি-২৫০৫
[188] সূরা ইউসুফ-৯২
[189] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-১২৮৩ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[190] তাখরিজ : মুসনাদে
আহমদ-২৭৫৩৬; তিরমিজি-১৯৩১;
শরহে সুন্নাহ
[191] তাখরিজ : তিরমিজি-২৫০৬; মিশকাতুল মাছাবিহ
[192] তাখরিজ : মুসলিম-২৫৬৮; তিরমিজি-৯৬৮,৯৬৭; মুসনাদে আহমদ-২২৩৮৯,২২৪৪৬
[193] তাখরিজ : আবু দাউদ-১৬৮২; তিরমিজি-২৪৪৯; আমহদ-১১১০১
[194] তাখরিজ : মুসলিম-২৫৮০; বুখারি-২৪৪২;
তিরমিজি-১৪২৬;নাসায়ি-৪৮৯৩; আহমদ -৫৩৩৪
[195] ফাতহুল বারি; ৫খণ্ড;০৭৯ পৃ.ইবনে হাজার
আসকালানি
[196] তাখরিজ : মুসলিম-২৬১৬; তিরমিজি-২১৬২; মুসনাদে আহমদ-৭৪৭৬,১০৫৫৮
[197] তাখরিজ : বুখারি-৭০৭১; মুসলিম-১০১
[198] তাখরিজ : বুখারি-৪৫২; মুসলিম-২৬১৫; আবু দাউদ-২৫৮৭; ইবনে মাজাহ-৩৭৭৮; আহমদ -১৯৪৮৮
[199] তাফসিরে ইবনে কাসির-৬ষ্ঠ খণ্ড;৩২২ পৃষ্ঠা, অধ্যাপক
মাও.আখতার ফারুক অনূদিত, ই.ফা.
[200] সূরা বাকারা-২৪৯
[201] ইব্রাহিম-৩৬
[202] সূরা হুদ-৪৬
[203] তরজুমানুস সুন্নাহ-২৮৮,২৮৯পৃষ্ঠা;দ্বিতীয় খণ্ড-বদরে আলম মিরাঠি রহ.ই.ফা.
[204] তাখরিজ : বুখারি-৬২৩৭; মুসলিম-২৫৬০, আহমাদ ২৩৫২৮; মুয়াত্তা ইমাম মালেক-২৬৩৮
[205] তাখরিজ : বুখারি-৬১৩৩; মুসলিম-২৯৯৮; আবু দাউদ-৪৮৬২; আহমাদ ৮৯২৮; ইবনে মাজাহ-৩৯৮২
[206] সূরা ইমরান-১৩৫
[207] তাফসিরে ইবনে কাসির-২য় খণ্ড;৬১২ পৃ.ই.ফা.
[208] তাখরিজ : জামে তিরমিজি-৩১২৭
[209] কুররাতুল আইনাইন-৪৪
[210] বায়হাকি-৬/৮১২৭;ছহিহ ইবনে হিব্বান
[211] তরজুমানুস সুন্নাহ-২/৮১
[212] সূরা নিসা-৯৩
[213] সূরা ফুরকান, ৬৮-৭০
[214] সূত্র : তাফসিরে ইবনে কাসির-৩য় খণ্ড;২১৫,২১৭পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক
(রহ.)
[215] তাখরিজ : বুখারি-৪৮,৬০৪৪; মুসলিম-৬৪; তিরমিজি-১৯৮৩; নাসায়ি-৪১০৫; ইবনে
মাজাহ-৪৬; আহমদ-৩৬৪৭
[216] তাখরিজ : বুখারি-৬১০৩
[217] তাখরিজ : বুখারি-৭১৫১; মুসলিম-১৪২;তিরমিজি-২৮৩৮; আহমদ -২০২৮৯
[218] তাখরিজ : বুখারি-৬৯৮৭; মুসলিম-২২৬৪;
আবু দাউদ-৫০১৮; দারেমি-২১৮৩;
আহমদ-১২৯৩০
[219] ফাতহুল বারি
[220] সূরা আল মুমিন : ৭-৯
[221] সূরা হাক্কাহ-১৭; ইবনে কাসির-১৬তম খণ্ড;৩৮৪পৃ.; মাআরেফুল কোরআন -১১৮৬
পৃ.
[222] সূরা শুরা-০৫
[223] তাখরিজ : আবু দাউদ-৩০৯৮;তিরমিজি-৯৬৯;ইবনে মাজাহ-১৪৪২;আহমদ-৬১২
[224] তাখরিজ : ইবনে
হিব্বান-১০৫১; তারগিব-৫৯৭; ফাতহুল
বারি-১১/১০৯; মুজামুল
আওসাত-৫০৮৭
[225]বুখারি-৪৪৫; মুসলিম-৬৪৯; আবু দাউদ-৪৬৯; তিরমিজি-৩৩০; মুয়াত্তা মালেক-৪৪১
[226] তাখরিজ : আবু দাউদ-৫৪৩; নাসায়ি-৮১১; ইবনে মাজাহ-৯৯৭; আহমদ-১৮৫০৬
[227] তাখরিজ : মুসনাদে আহমদ -২/১৭২,১৮৭
; ছহিহ ইবনে হিব্বান
[228] তাখরিজ :
বুখারি- ১৪৪২, মুসলিম-১০১০
[229] তাখরিজ : ছহিহ ইবনে হিব্বান-৩৪৬৭,
৮/২৪৬,
ছহিহ আত তারগিব
ওয়াত তারহিব-১০৬৬
[230] তাফসিরে
কুরতুবি- ১৫/২৯৪, তাফসিরে
বায়জাবি-৪/৩৩৫
[231] সূরা ইউনুস-৯৮
[232] (সূরা সফফাত,১৪৭-১৪৮)
[233] তাফসিরে ইবনে কাসির ৫ম খণ্ড;২০৬ পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক (রহ.) অনূদিত,ই.ফা.
[234] তাফসিরে আআরেফুল কুরআন-৬১৮ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[235] সূরা হুজুরাত-০৯
[236] তাখরিজ : বুখারি-৩৬২৯;আবু
দাউদ-৪৬৬২;তিরমিজি-৩৭৭৩;নাসায়ি-১৪১০;আহমদ-২০৩৯
[237] তাখরিজ : মিশকাতুল মাছাবিহ-কাবীরা
গোনাহ ও মুনাফিকীর নিদর্শন অধ্যায়
[238] তাখরিজ : আহমদ-৬৫৮৩;আল-মুজামুল কাবির-৪/২১৯
[239] তাখরিজ : তিরমিজি-২৬৩৯; ইবনে মাজাহ-৪৩০০
[240] তাখরিজ : মুসলিম-২১৩৭; মুসান্নেফে আবি শায়বা-২৯৮৬৬; ছহিহ ইবনে হিব্বান-৮৩৬
[241] তাখরিজ : মুসনাদে আহমদ-২১৪৮৭
[242] সূরা কাহাফ-১০৭
[243] তাখরিজ : মুসলিম-১১৪; তিরমিজি-১৫৭৪; দারেমি-২৫৩২; আহমদ -২০৩,৩২৮
[244] সূরা জিন-১৩
[245] সূরা ত্বহা-১১২ সূত্র : তাফসিরে
ইবনে কাসির ১১তম খণ্ড;২৯৬ পৃষ্ঠা; ই.ফা.
[246] সূরা আনফাল-৩৮
[247] তাফসিরে ইবনে কাসির ৪র্থ খণ্ড;৪৪৭ পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক
(রহ.) অনূদিত,ই.ফা.
[248] তাখরিজঃ বুখারি-৪১;নাসায়ি-৪৯৯৮
[249] সূরা হিজর-০২
[250] সূরা আনআম -২৭
[251] তাফসিরে ইবনে কাসির ৬(১)খণ্ড; ২০পৃষ্ঠা;
ইসলামিক ফা.
[252] সূরা ইমরান-৯১
[253] সূরা বাকারা-২৫৪
[254] সূরা মায়েদা-৩৬
[255] তাফসিরে ইবনে কাসির ২য় খণ্ড; ৫৩৭ পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক
(রহ.) অনূদিত,ই.ফা.
[256] বুখারি-২২; মুসলিম-১৮২; তিরমিজি-২৫৯৮; ইবনে
মাজাহ-৬০; নাসায়ি-১১৪০; দারেমি-২৮৫৯
[257] বুখারি-৪৪; মুসলিম-১৯৩; তিরমিজি-২৫৯৩; ইবনে মাজাহ-৪৩১২; দারেমি-৫৩; আহমদ -২৬৯২
[258] কাশফুল বারি শরহুল সহিহিল বুখারি-২/১৯৯
[259] তাখরিজ : মুসলিম-২৬৮৭; ইবনে মাজাহ-৩৮২১;
মুসনাদে আহমদ -২১৩৬০
[260] তাখরিজ : মুসলিম-১৭৩; তিরমিজি-৩২৭৬; নাসায়ি-৪৫১; আহমদ -৩৬২৫
[261] সূরা যুমার-৬১
[262] তাখরিজ :
বুখারি-৩২২২; মুসলিম-৯৪; তিরমিজি-২৬৪৪; আহমদ -২১৩৪৭
[263] তাখরিজ: আবু দাউদ-৩১১৬; ইবনে মাজাহ-৩৭৯৬;
আহমদ-২১৯৯৮
[264] তাখরিজ : বুখারি-৩৮৮৪
[265] তাখরিজ : মুসলিম-২৬,৪৩; মুসনাদে আহমদ-৪৯৮
[266] তাখরিজ : সহীহ মুসলিম-৪৭
[267] সূরা নিসা- ৪৮
[268] সূরা মুহাম্মাদ-৩৪
[269] সূরা মারইয়াম-৮৭
[270] তাফসিরে ইবনে কাসির ৭ম খণ্ড;১৩১ পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক
(রহ.) অনূদিত, ই.ফা.
[271] তাখরিজ
: বুখারি-৩৩২১; মুসলিম-২২৪৫; আহমদ -১০৬২১; শারহুস সুন্নাহ-১৬৬৬
[272] তাখরিজ : মুসলিম-২৬৩০; সুনানে ইবনে মাজাহ-৩৬৬৮;
আহমদ-২৪৬১১
[273] তাখরিজ : মুসলিম-৮০৪; আহমদ -২২১৪৬
[274] সূরা বাকারা-২৫৫
[275] সূরা তোহা-১০৯
[276] কুরতুবি-১৩/১৮৬
[277] তাফসিরে কাবির-৮/৩১৩; বুরহানুল কুরআন-৪/৩৯
[278] সূরা তওবা-৮০
[279] তাখরিজ :
মুসলিম- ৪৭২
[280] তাখরিজ :
বুখারি-৬৩০৫; মুসলিম-১৯৯
[281] তাখরিজ : বুখারি- ৯৯; মুসনাদে আহমদ-৮০৭০
[282] তাখরিজ : আবু দাউদ-৪৭৩৯; তিরমিজি-২৪৩৫; আহমদ -১৩২২২
[283] তাখরিজ : আবু দাউদ-২৫২২,আহমদ -১৭১৮২; তিরমিজি-১৬৬৩
[284] তাখরিজ : মুসনাদে আহমদ-১১৮৯৮
[285] বুখারি-২২ ; মুসলিম-১৮২; তিরমিজি-২৫৯৮; ইবনে
মাজাহ-৬০; নাসায়ি-১১৪০; আহমদ -৭৭১৭
[286] তাফসিরে মাজহারি-১০খণ্ড; ১৯২-১৯৩ পৃষ্ঠা,
তাফসিরে জালালাইন ৫ম খণ্ড; ৫৮৭পৃষ্ঠা; আইছারুত্তাফাসির; বুরহানুল কুরআন-৩/১২২
[287] তাখরিজ : বুখারি-২৮৫৬; মুসলিম-৩০; তিরমিজি-২৬৪৩; ইবনে মাজাহ-৪২৯৬; আহমদ –
২১৯৯১
[288] মাআরিফুল হাদিস-১ম খণ্ড; ৩১পৃষ্ঠা, আল্লামা
মনজুর নোমানি (রহ.)
[289] সূরা নামল-৫৭
[290] সূরা তাহরিম-১০
[291] তাফসিরে বুরহানুল কুরআন-২য় খণ্ড; ৬৭০ পৃষ্ঠা
[292] সূরা হুদ,৪৫-৪৬
[293] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-৯৮০; তাফসিরে ইবনে কাসির ১০ম খণ্ড;৪৮৮ পৃষ্ঠা;
ই.ফা.
[294] সূরা ইমরান-১১৬
[295] তাখরিজ : মুসলিম-২১৫; বুখারি -৫৯৯০; মুসনাদে আহমদ-১৭৮০৪
[296] তাখরিজ : তিরমিজি-২৩৯৫; আবু দাউদ-৪৮৩২
[297] তাখরিজ : তবারানি-৭৩২২;মাজমাউল যাওয়ায়েদ-৪/১৯২; মুসতাদরাকে
হাকেম, সুনানে বায়হাকি
[298] তাখরিজ : বুখারি-২৪৪২;মুসলিম-২৫৮০
[299] ফাতহুল বারি-৫খণ্ড; ৯৭পৃ.
[300] তাখরিজ : মুসলিম-২৭৩৩;
সুনানুল কুবরা লিল-বায়হাকি-৬৪৩১; মিশকাত-২২২৮
[301] তাখরিজ : তাবারানি-৩/২৩৪,২১৫৫; মাজমাউল যাওয়ায়েদ-১০/২১০
[302] সূরা মুহাম্মাদ-১৯
[303] সূরা ইব্রাহিম-৪১
[304] সূরা আল-হুজরাত-১১
[305] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-১২৮২ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[306] তাখরিজ : আবু দাউদ-৫০০৪; আহমদ-২৩১১৪; সহিহুত তারগিব ওয়াত তারহিব-২৮০৫
[307] সূরা আল-হুজরাত-১২
[308] তাখরিজ : বুখারি-৬০৬৬; মুসলিম-২৫৬৩
[309] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-১২৮৩পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[310] সূরা নুর-১৬
[311] জালালাইন ৪
খণ্ড;পৃষ্ঠা ৪৯৭, ইসলামিয়া লাইব্রেরি
[312] সূরা নুর-১৯
[313] তাফসিরে ইবনে কাসির-৮ম খণ্ড৭০পৃষ্ঠা
[314] তাখরিজ : মুসলিম-এর ভূমিকায়-১০ পৃষ্ঠা, আবু দাউদ-৪৯৯২
[315] সূরা হুজুরাত-০৬
[316] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-১২৭৯পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[317] আহকামে যিন্দেগি-৪০ পৃ.
[318] তাখরিজ : আবু দাউদ-৪৯১৮; বায়হাকি-৭২৩
[319] তাখরিজ : তিরমিজি-১৯২৯; মুসান্নেফে আবি শায়বা—২২৯পৃষ্ঠা
[320] তরজুমানুস সুন্নাহ-আল্লামা বদরে আলম মিরাঠি রহ.-২য় খণ্ড;১১৯ পৃষ্ঠা
[321] মুসনাদে রাওয়ানি-১/৬৪
[322] তাখরিজ : মুসলিম-৬৫৪৫
[323] সূরা আল-হুজরাত-১২
[324] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-১২৮৫পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[325] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-১২৮৫পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[326] সূরা বাকারা-২৮৫
[327] সূরা ফাতাহ-০৯
[328] তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন-১২৬৬পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[329] তাফসিরে ইবনে কাসির-১১তম খণ্ড;৫৩৭পৃ. ই.ফা; তাফসিরে মাআরেফুল কুরআন-১৪৬৩পৃ.
[330] সূরা সাবা-২৮
[331] তাফসিরে ইবনে কাসির-৯খণ্ড;২৪৯পৃষ্ঠা; মাওলানা
আখতার ফারূক (রহ.) অনূদিত,ই.ফা.
[332] মাআরিফুল হাদিস-৩য় খণ্ড;২২২ পৃষ্ঠা; আল্লামা মনজুর
নুমানি (রহ.); অনুবাদ: মাওলানা সাঈদুল হক
[333] তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন-৭৩১পৃ.; তাফসিরে ইবনে কাসির-৬(১) খণ্ড;৫২পৃষ্ঠা; ই.ফা.
[334] সূরা বালাদ-০১
[335] সূরা ইসরা-৭৯
[336] তাফসিরে ইবনে কাসির-৬(১) খণ্ড; ৩৫০পৃষ্ঠা; মাওলানা আখতার ফারূক (রহ.) অনূদিত,ই.ফা
[337] তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন-৭৮৭পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[338] সূরা আহজাব-৫৭
[339] তাফসিরে বুরহানুল কুরআন-৩/৮০
[340] সূরা ফুরকান-৫১
[341] তাফসিরে বুরহানুল কুরআন-২/৬১৭
[342] তাখরিজ : ইবনে মাজহ-৪৩০৮; মুসনাদে আহমদ -১০৯৮৭;তিরমিজি-৩৬৪০
[343] তাখরিজ : বুখারি-২৭৩১,২৭৩৩; আবু দাউদ-২৭৬৫; আহমদ-১৮৯১০
[344] তাফসিরে জালালাইন-৫/১৭৮,ইসলামিয়া কুতুবখানা
[345] সূরা আলে-ইমরান- ৮৪
[346] সূরা বাকারা-২৮৫
[347] বুখারি ৩৫৩৫; মুসলিম -২২৮৭
[348] নিবরায-২৮৪পৃ.
[349] তরজুমানুস সুন্নাহ, মাওলানা
বদরে আলম মিরাঠি (রহ.) ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৩১, উর্দু
[350] সূরা হিজর, ৩৯-৪০
[351] সূরা হিজর, ৪১-৪২
[352] তাখরিজ : মুসলিম-২৩৯৬; বুখারি-৩২৯৪; আহমদ -১৪৭২
[353] সূরা ইউসুফ-৩৮
[354] সূরা হুদ-৮৮
[355] তাফসিরে ইবনে কাসির ৫ম খণ্ড;২৮২পৃষ্ঠা;
অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক (রহ.) অনূদিত, ই.ফা.
[356] সূরা তাহরিম-০৬
[357] সূরা আরাফ-৬১
[358] তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন-৩১পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[359] আল-বাহরুর রায়েক -৫/১৩০
[360] সাফাদিয়্যা -১/২৬২
[361] আশ-শিফা বি তারিফিল মুস্তফা -২/২৮৪
[362] তাখরিজ : মুসলিম-৫৪১; মুসনাদে আহমদ-৭৯৬৯
[363] তাখরিজ মুসলিম-৫৪২;নাসায়ি-১২১৫
[364] আবু দাউদ-১০৪৭; নাসায়ি-১৩৭৪; সুনানে দারেমি-১৬১৩; ইবনে মাজাহ-১৬৩৬; আহমদ-১৬১৬২
[365] সূরা শুরা-২৩
[366] তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন-১২১৫পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[367] তাখরিজ
: মুসলিম-২৪০৮;
আহমদ-১৯২৬৫; দারেমি-৩৩৫৯
[368] তাফসিরে ইবনে কাসির-১০ খণ্ড;৪৬পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা
আখতার ফারূক (রহ.) অনূদিত,ই.ফা.
[369] তাখরিজ : বুখারি-১৪৯১; মিশকাত-১৮২২
[370] সূরা আনফাল-৪১
[371] বুখারি-৩১৪০
[372] তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন-১৩৩৪পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[373] আল-কমুসুল ওয়াহিদ, আল-মুফরাদাত, আল-কমুসুল মুহিত,
লিসানুল আরব
[374] আল-ইসাবা ফি তাময়িজিস সাহাবা
[375] সূরা তওবা-১০০
[376] তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন-৫৯১পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[377] সূরা হাদিদ-১০
[378] সূরা আম্বিয়া, ১০১-১০২
[379] তাফসিরে জালালাইন-৬/৩৭৮ ইসলামিয়া কুতুবখানা; তাফসিরে
মাআরেফুল কুরআন ১৩৩৪পৃ.সংক্ষিপ্ত
[380] তাখরিজ
: মুসলিম-২৫৪০,কিতাবু ফাজায়েলুছ ছাহাবা; সুনানে মাজাহ-১৬১;বুখারি-৩৬৭৩
[381] তাখরিজ : মুসলিম-৭৬; মুসনাদে আহমদ-৯৪৩৪
[382] তাখরিজ : তিরমিজি-২১৬৫; মুসনাদে আহমদ-১/১৭৭;ইবনে হিব্বান-২২৮২;
হাকেম-১/১১৪
[383] তিরমিজি-৩৮৫৮
[384] সুনানে আবু দাউদ,সূত্র : মাকামে সাহাবা, মুফতি মুহাম্মাদ
শফি রহ.
[385] সূরা হাশর, ৭-১০
[386] সূরা হুজুরাত-০৬
[387] মাআরিফুল কুরআন,বুরহানুল কুরআন-৩/৩৯৯
[388] তাফসিরে জালালাইন-৬/৩৭৯ ইসলামিয়া কুতুবখানা।
[389] কাশফুল বারি শরহুল সহিহুল বুখারি-১ম খণ্ড;
৫৩ পৃষ্ঠা, নিদায়ে মিম্বার-১/১৮৫; তারিখে দামেস্ক,৫৯/২১১
[390] তাখরিজ : বুখারি-৩২৪২; মুসলিম-২৩৯৫; ইবনে মাজাহ-১০৭; আহমদ-৮৪৭০
[391] মুসলিম-২৪০১; মুসনাদে আহমদ-৫১৪,২৪৩৩০
[392] সূরা কাহাফ-২৮
[393] তাফসিরে মাআরেফুল কুরআন ৮০৬পৃ.সংক্ষিপ্ত;তাফসিরে
ইবনে কাসির ৬ষ্ঠ খণ্ড;৪২৯পৃষ্ঠা; ই.ফা.
[394] তাফসিরে ইবনে কাসির ১১তম খণ্ড; ৪১৩ পৃষ্ঠা;
ই.ফা.; তাফসিরে
মাআরেফুল কুরআন ১৪৩৭পৃ.
[395] কুরতুবি-১৯/২১৩
[396] তাফসিরে তারাবি-৩০/৫২; বুরহানুল কুরআন-৪/১১৮
[397] বুরহানুল কুরআন-৪/১২৭
[398] তাখরিজ : আহমদ -১২৬৪৮, ইবনে হিব্বান-৫৭৯০; মুসনাদুল বাযযার-৬৯২২ শামায়েলে
তিরমিজি-১৭৮
[399] সূরা মুজাদালাহ-১১
[400] তাফসিরে জালালাইন-৬ষ্ঠ
খণ্ড;৪২৩ পৃ.ইসলামিয়া কুতুবখানা
[401] সূরা বাকারা-২৬৯
[402] তাফসিরে ইবনে কাসির ২য় খণ্ড;৩৮১পৃষ্ঠা;
অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক (রহ.)
অনূদিত,ই.ফা.
[403] সূরা হুজুরাত, ১-২
[404] মাআরিফুল কুরআন, বুরহানুল কুরআন-৩/৩৯৭
[405] তাখরিজ : আবু দাউদ- ৩৬৪১; দারেমি-৩৫৪; তিরমিজি-২৬৮২; ইবনে মাজাহ-২২৩;আহমদ -২১৭১৫
[406] তাখরিজ : আবু দাউদ-৩৬৪১;তিরমিজি-৪৬৮৪
[407] তাখরিজ : জামে তিরমিজি-২৩২২;
ইবনে মাজাহ-৪১১২(১৩৮৫)
[408] তাখরিজ : তিরমিজি-২৬৮৫; দারেমি-২৮৯;জামেউল
মাসানিদ ওয়াস সুনান-১১০৬২
[409] তাখরিজ : তিরমিজি-২৬৮১
[410] সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৮/৪০৮
[411] আররদ্দুল ওয়াফের : ১৯৭
[412] আল-বাহরুর রায়েক : ৫/১৩২
[413] সূরা বাকারা-২১২
[414] তাফসিরে ইবনে কাসির ২য় খণ্ড;১৮৮পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক
(রহ.),ই.ফা.
[415] সূরা আরাফ-৩২
[416] তাফসিরে মাজহারি-৪র্থ খণ্ড;৪৩৫পৃষ্ঠা
[417] তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন ১৪৫৫পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[418] সূরা সাবা, ৩৫-৩৭
[419] তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন ১১১২পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[420] সূরা হা-মিম সিজদা-৩০
[421] তাখরিজ
: আহমদ-১৮৫৩৪,আবু দাউদ-৪৭৫৩;
নাসায়ি-২০০১; ইবনে মাজাহ-১৫৪৮; হাকেম; ছহিহ ইবনে হিব্বান
[422] সূরা দুখান-২৯
[423] তাফসিরে ইবনে কাসির ১০ম খণ্ড;১৫৬পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক
(রহ.), ই.ফা
[424] তা. জামিউল কাবির-২খণ্ড ৩৯১ পৃ.; হাকেম;
ইবনে আছাকির; ইবনে আদি; কানযুল উম্মাল-২২৩৭৫
[425] তাখরিজ : জামিউল কাবির-৬ষ্ঠ খণ্ড,১৬০পৃ.;ইবনে আকাছির; শরহুছ-ছুদুর
[426] শওকে ওয়াতান(আখেরাতের প্রেরণা)-৪৬পৃ.; হজরত থানভি (রহ.), অনুবাদক,
আরিফ বিল্লাহ আব্দুল মতিন বিন হুসাইন দা.বা
[427] তাখরিজ : তিরমিজি-২৪৬০
[428] সূরা আহজাব-৪৪
[429] সূরা মারইয়াম-১৫
[430] তাফসিরে ইবনে কাসির ৭ম খণ্ড ৩৮পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক (রহ.) অনূদিত,ই.ফা.
[431] সূরা ফুরকান-৭৫
[432] তাফসিরে ইবনে কাসির ৮ম খণ্ড;২৫৪পৃষ্ঠা; তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন ৯৭৩পৃ. সংক্ষিপ্ত
[433] তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন ১০৮৭পৃ. সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[434] সূরা নাহল-৩২
[435] তাফসিরে ইবনে কাসির ৬ষ্ঠ খণ্ড;৯৮পৃষ্ঠা;
অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক (রহ.)
অনূদিত,ই.ফা.
[436] সূরা যুমার-৭৩
[437] ফাওয়ায়েদে উসমানি,তাফসিরে বুরহানুল কুরআন-৩/২২১
[438] সূরা মারইয়াম-৮৫
[439] তাফসিরে ইবনে কাসির ৭ম খণ্ড;১২৭ পৃষ্ঠা;
অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক (রহ.)
অনূদিত,ই.ফা.
[440] সূরা আম্বিয়া, ১০১-১০৩
[441] সূরা আবাসা,৩৮-৩৯
[442] তাফসিরে বুরহানুল কুরআন-৪/১৬৪-১৬৬
[443] সূরা হাদিদ-১৩
[444] সূরা ফাতাহ-২৯
[445] তাফসিরে বুরহানুল কুরআন-৪/১৬৭
[446] সূরা তোহা, ৭৫-৭৬
[447] তাফসিরে ইবনে কাসির-৭ম খণ্ড;২১৩ পৃ.ই.ফা.
[448] সূরা বাকারা-২৫৭
[449] সূরা জাছিয়া-১৯
[450] সূরা হা-মিম-সিজদা-১৮
[451] তাফসিরে বুরহানুল কুরআন-৩/২৬২
[452] তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন ৬১২পৃ. সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[453] তাফসিরে ইবনে কাসির ৫ম খণ্ড; ১৭০পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক
(রহ.) অনূদিত,ই.ফা.
[454] তাফসিরে ইবনে কাসির ৫ম খণ্ড; ১৭১পৃষ্ঠা;
অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক (রহ.)
অনূদিত,ই.ফা.
[455] সূরা ইমরান-৩১
[456] তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন ৬১৩পৃ. সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[457] সূরা আলে ইমরান-৩৭
[458] সুরা নামল-৩৭
[459] তাখরিজ : বুখারি-৩০৪৫; আবু দাউদ-২৬৬০; আহমদ-৭৮৬৯, ৮০৩৫
[460] তাখরিজ : বুখারি-৩০৪৫; আবু দাউদ-২৬৬০;আহমদ-৭৮৬৯;৮০৩৫
[461] তাখরিজ : মিশকাত- ৫৯৫৪; ইমাম বায়হাকি, দালায়েলুল নবুয়ত ৬/৩৭০পৃঃ; জামেউল কাবির-১৯২ পৃ.; কানযুল
উম্মাল-৩৫৭৮৮
[462] মোল্লা আলি কারি মেরকাত শরহে
মিশকাত : ৯/৩৮৪২পৃ., হাদিস- ৫৯৫৪
[463] আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, আল্লামা ইবনে কাসির (রহ)-
৭/১৩০-১৩৮
[464] তাফসিরে মাআরেফুল
কুরআন ৬১৩পৃ. সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[465] সূরা লুকমান-১৫
[466] তাফসিরে
মাজহারি-৯ খণ্ড;৩৪৫
পৃ.,তাফসিরে ইবনে কাসির ৮ম খণ্ড;৬৭০পৃষ্ঠা
[467] সূরা বাইয়িনাহ-০৭
[468] সূরা ফুরকান-৪৪ ফাওয়ায়েদে
উসমানি অবলম্বনে; বুরহানুল কুরআন-৪/৪৭৪
[469] সূরা নিসা-১৩৯
[470] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-২৮৯ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[471] তাফসিরে আআরেফুল
কুরআন-১৭২ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[472] সূরা ফতির-১০
[473] তাফসিরে
ইবনে কাসির ৯ম খণ্ড;২৮৫পৃষ্ঠা; অধ্যাপক
মাওলানা আখতার ফারূক (রহ.) অনূদিত,ই.ফা.
[474] তাফসিরে ইবনে কাসির ৯ম খণ্ড;৯৪পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক
(রহ.) অনূদিত,ই.ফা.
[475] তাফসিরে আআরেফুল
কু.-১০৮০ পৃ.সংক্ষিপ্ত-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)
[476] সূরা বাকারা-১৫৮
[477] তাফসিরে ইবনে কাসির ২য় খণ্ড;৪৮ পৃষ্ঠা; অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক
(রহ.) অনূদিত,ই.ফা.
[478] সূরা মরিয়ম, ৭৩-৭৫
[479] সূরা আহকাফ-১১
[480] তাফসিরে ইবনে কাসির ৭ম খণ্ড;১১৬ পৃষ্ঠা;
অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক (রহ.)
অনূদিত,ই.ফা.
[481] সূরা যুমার, ১১-১২
[482] সূরা আনআম-১৬৩
[483] তাফসিরে ইবনে কাসির ৮ম খণ্ড; ২৫০ পৃষ্ঠা;
অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারূক (রহ.)
অনূদিত,ই.ফা.
[484] তাখরিজ : তিরমিজি-২২৫৪, ইবনে মাজাহ-৪০১৬,
আহমদ-২৩৪৪৪
[485] বুখারি-২০৩৫; মুসলিম-২১৭৫; আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ-১৭৭৯; দারেমি-১৮২১; আহমদ-২৬৮৬৩
[486] মাজমাউল জাওয়ায়েদ-১৭৪১২; মুসনাদে বাজ্জার; মুসনাদুল ফিরদাউস আদ-দালাইমি-১/১৯১
[487] তাখরিজ : বুখারি-৩০৪৫; আবু দাউদ-২৬৬০; আহমদ-৭৮৬৯;৮০৩৫
[488] সূরা যুখরুফ-১৯
[489] সূরা ইমরান-১৮
[490] সূরা বাকারা-১৭৭
[491]সুরা বাকারা-৯৮
[492] তাখরিজ : আদদুররুল
মানছুর-৬/৩২৩;
মুসনাদে বাজ্জার
[493] তাখ. মুসান্নাফে
আব্দুর রাজ্জাক-১৬৮৬ আহমদ-১৩৫৬৭;
কানযুল উম্মাল-১৯৯৪১; আবু
দাউদ-৪৭৯
[494] সূরা ইব্রাহিম-০৭
[495] সূরা হাশর-১০
[496] সূত্র : সিরাতুল আওলিয়া -৯০ পৃষ্ঠা,আল্লামা শারনি(রহ.)-মাকতাবাহ হাকিমুল উম্মত
0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন