সাহায্যকারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা
১। ভূমিকা। দেশ রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী সেনা সদস্যদের ইস্পাত কঠিন সামগ্রিক দায়িত্ব পালনে যেমন তাদের প্রয়োজন একে অপরের সহযোগিতা, তেমনি অপরিহার্য গঠনমূলক স্বত:স্ফূর্ত মানসিকতা। ইহা সকলকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি সদা অবিচল ও অটুট রাখে। সকল কাজে সকলে সমান পারদর্শী না হওয়ার কারণে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে পরোপকারী হিসেবে একে অন্যের সহযোগী হতে হয়। এ ধরণের সাহায্যের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন ; "তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ব্যাপারে একে অন্যের সহযোগিতা কর,সীমালংঘন ও পাপাচারে একে অন্যকে সাহায্য করো না" (সূরা মায়েদা - ০২) আর ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের অধিকারীরা সাধারণত: চরিত্রবান ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন হয়ে থাকেন। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা:) বলেন, মমিনগণ আত্মমর্যাদা বোধ সম্পন্ন আর আল্লাহ তাদের চেয়েও বেশি আত্মমর্যাদা সম্পন্ন। (মুসলিম-২৭৬১) সমাজে আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তি সৎপথে পরিচালিত হন এবং সকলের নিকট তিনি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রূপে সমাদৃত হন। দেশ ও জাতি তাদের দ্বারা উপকৃত হয়। সেনাবাহিনীতে তারাই সম্মান প্রমোশন ও নেতৃত্ব লাভ করেন। তাদের কল্যাণেই অন্য সদস্যরা পেশাদারীতে অনুপ্রেরণা লাভ করেন। অতএব আজকের বিষয় "সাহায্যকারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা" অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জীবন ঘনিষ্ঠ।
২। উদ্দেশ্য । সাহায্যকারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করাই আজকের পাঠের মূল উদ্দেশ্য।
৩। পাঠ পূর্বাভাস। আজকের প্রাঠটি বুঝার সুবিধার্তে দুটি স্তরে বিন্যস্ত করে আমরা আলোচনা করব।
ক। সাহায্যকারী মনোভাব কি ও এর প্রয়োজনীয়তা।
খ। ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের পরিচয় ও এর প্রয়োজনীয়তা।
প্রথম স্তর
৪। সাহায্যকারী মনোভাব বলতে কি বুঝায়?
প্রথমে আমরা জানব মনোভাব কি? ক্ষুধা ও তৃষ্ণা যেমন প্রত্যেক মানুষের মধ্যে আছে, তেমনই প্রত্যেক মানুষেরই কোনো না কোনো মনোভাবও আছে। মনোভাবকে আমরা ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দ বলতে পারি।মনোভাব হল কোন ব্যক্তির মানসিক সক্রিয়তার একটি রুপ। অর্থাৎ কোন ব্যক্তির কোন কিছুর ব্যাপারে তার মানসিক সক্রিয়তার একটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রতিফলনই হল তার মনোভাব। এটি মনোবৈজ্ঞানিক আলোচ্য বিষয়বস্তু।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কোন ব্যক্তি বস্তু বা অবস্থার প্রতি কোন ব্যক্তির অনুকূল বা ইতিবাচক প্রতিকূল বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার প্রবণতাকে মনোভাব বলে।
উদাহরণস্বরূপ: যদি এমন একটি গ্লাস থাকে যার অর্ধেকটা পানি দিয়ে ভর্তি আর অর্ধেকটা শূন্য তাহলে এটাকে দু’ভাবে মূল্যায়ন করা যাবে।
এক. ইতিবাচক মূল্যায়ন। অর্থাৎ বলা হবে যে, গ্লাসটি অর্ধেকটা পূর্ণ। গ্লাসটি খালী নয়। আর এ অর্ধগ্লাস পানি মানুষের জন্য উপকারী।
দুই. নেতিবাচক মূল্যায়ন। যেমন বলা হবে গ্লাসটির অর্ধেকই খালি, অপূর্ণাঙ্গ আর এ অর্ধগ্লাস পানি দিয়ে কি-ই বা হবে।
বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী 'কে ডেভিস' এর মতে, মনোভাব হচ্ছে কর্মীদের অনুভূতি ও বিশ্বাস যা তাদের নির্দিষ্ট পরিবেশে নির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদনের বিষয়ে তথা নির্দিষ্ট আচরণ করতে প্রভাবিত করে।
এস.পি. রবিনস এর মতে, কোন ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি কোন ব্যক্তির অনুকূল বা ইতিবাচক প্রতিকূল বা নেতিবাচক মূল্যায়ন মূলক বিবরণীকে মনোভাব বলে।
এক কথায় মনোভাব হল ব্যাক্তির মানসিক অনুভূতির একটি বিশেষ প্রতিফলন যা তার কর্ম ও আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
সুতরাং সাহায্যকারী মনোভাব বলতে বোঝায় একজন ব্যক্তি কারো উপকারে আসে এমন কাজে সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসা উপকার করতে না পারলেও তার ক্ষতি সাধন না করার মানসিকতাকে বুঝায়।
৫। সাহায্যকারী মনোভাবের প্রয়োজনীয়তা:
১। আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালন ও তার সাহায্যপ্রাপ্তি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনুল কারীমেএক ভাই অপর ভাইকে পরস্পর সাহায্য সহযোগিতার আদেশ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা সৎ কর্ম ও তাকওয়ার ব্যাপারে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য সহযোগিতা কর। (সূরা মায়েদা আয়াত ০২)
অন্যত্র আল্লাহতালা স্বয়ং তাকেও সাহায্য করার আদেশ করেছেন, তিনি বলেন
يا ايها الذين امنوا كونوا انصار الله
হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হও। (সূরা সাফ আয়াত ১৪)
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র আরও বলেছেন,
يا ايها الذين امنوا ان تنصروا الله ينصركم
হে মুমিনগণ ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো তাহলে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন। (সূরা মুহাম্মদ আয়াত ০৭) আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সাহায্য করার অর্থ হচ্ছে তারই কোন বান্দাকে সাহায্য করা । যেমনটি আমরা সহিহ মুসলিম শরীফের ঘটনার আলোকে জানতে পারি ।
রাসূল (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাকে জিজ্ঞেস করবেন, আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে আহার্য দাওনি। আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে পানি দাওনি। আমি অসুখে ভুগছিলাম, তুমি আমার সেবা করনি। (কেন?)
বান্দা তখন অবাক হয়ে বলবে, হে আমার প্রতিপালক, তুমি যে অভাবমুক্ত, তুমি তো খাও না, পান কর না, তুমি কীভাবে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ও অসুস্থ হতে পার?
আল্লাহ তায়ালা তখন প্রতিউত্তরে বলবেন, আমার অমুক বান্দা যে ক্ষুধার্ত হয়ে তোমার দুয়ারে হাজির হয়েছিল, তুমি তো তাকে খাবার দাওনি, তাকে দিলে আমাকে দেয়া হতো। পিপাসার্তকে তুমি পানি পান করাওনি, তাকে পানি দিলে আমাকে দেয়া হতো।
রোগশোকে ভোগা ব্যক্তি কষ্টে ছটফট করত, তার সেবা করলে আমাকে সেবা করা হতো, তুমি কী এটা জানতে না? (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন,
والله في عون العبد ما كان العبد في عون اخيه
‘আল্লাহতায়ালা বান্দার সাহায্যে ততক্ষণ থাকেন, যতক্ষণ সে অপর ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৩১৪)।
২। পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন: সাহায্যকারী মনোভাব পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন কে দৃঢ় করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
انما المؤمنون اخوه
নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। (সূরা হুজরাত আয়াত ১০)
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে মুমিনের পারস্পরিক সম্পর্ক হলো- একটি দেহের ন্যায়।দেহের একটি অঙ্গ যেকোনো ধরনের বিপদে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অঙ্গ তাকে সাহায্যের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে। উদাহরণ স্বরূপ- কারো চোখে কোনো কিছু পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেহের অন্য সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আপন কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা সবাই কিভাবে চোখকে তার বিপদ থেকে রক্ষা করবে সেদিকে নিমগ্ন হয়ে পড়ে। প্রয়োজনে অন্যেরও শরণাপন্ন হয়। অনুরূপ কোনো মুসলমান ভাই যখন কোনো প্রকার বিপদে পড়ে, তখন অপর মুসলমান ভাইয়ের কর্তব্য হলো- তাকে সাহায্য করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘মুমিনদের পরস্পরের ভালোবাসা, অনুগ্রহ, হৃদ্যতা ও আন্তরিকতার উদাহরণ হচ্ছে একটি দেহ বা শরীরের মতো। যখন দেহের কোনো একটি অঙ্গ আহত বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন সারা দেহের সবগুলো অঙ্গই নিদ্রাহীন হয়ে পড়ে এবং কষ্ট-যন্ত্রণায় জরাগ্রস্ত ও কাতর হয়ে পড়ে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
৩। সহযোদ্ধাদের প্রতি সহমর্মিতা: সহকর্মী বা সহযোদ্ধাদের প্রতি সহমর্মিতার জন্য সাহায্যকারী মনোভাব অত্যন্ত জরুরি। পারস্পরিক সহানুভূতি, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা ছাড়া কোনো মানুষ সুখী-সমৃদ্ধ হতে পারে না। ইসলামের প্রথম যুগে মুসলমানদের ( আনসার ও মুহাজির সাহাবীদের ) মাঝে যে পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতা ছিল বর্তমান মুসলিম সমাজে তা অনেকাংশেই অনুপস্থিত। সাহাবায়ে কিরামের পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতা ছিল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। যেমন -
ইয়ার মুকের যুদ্ধে পানি পানের ঘটনা,
ইয়ার মুকের যুদ্ধের সময় হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আহতদের মধ্যে তাঁর চাচাত ভাইকে খুঁজতে শুরু করলেন। তাঁর সাথে ছিলো সামান্য পানি। হুযায়ফার চাচাত ভাইয়ের শরীর দিয়ে অবিরত ধারায় রক্ত ঝরছিল। তার অবস্থা ছিলো আশঙ্কাজনক।
হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বললেন-
“তুমি কী পানি পান করবে?”
সে তাঁর কথার কোনো উত্তর দিতে সক্ষম না হওয়ায় হ্যা সূচক ইঙ্গিত করল। আহত ব্যক্তি হুযায়ফা রা. এর কাছ থেকে পানি পান করার জন্য হাতে নিতেই তাঁর পাশে এক সৈনিককে ‘পানি পানি’ বলে চিৎকার করতে শুনল। পিপাসার্ত ঐ সৈনিকের বুকফাটা আর্তনাদ শুনে তাঁর পূর্বে তাকে পানি করানোর জন্য হুযায়ফাকে ইঙ্গিত দিলেন।
হুযায়ফা তাঁর নিকট গিয়ে বললেন-
.আপনি কী পানি পান করতে চান?”
তিনি বললেন- “হ্যা!”
তিনি পানি পান করার জন্য পাত্র উপরে তুলে ধরতেই পানির জন্য অন্য একজন সৈনিকের চিৎকার শুনতে পেলেন। তিনি পানি পান না করে হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন,
“তাঁর দিকে দ্রুত ছুটে যাও এবং সে পানি পান করার পর কিছু অবশিষ্ট থাকলে আমাকে দিয়ো।
হুযায়ফা আহত সৈন্যটির কাছে গিয়ে দেখলেন- সে মারা গেছে। অতঃপর দ্বিতীয়জনের কাছে ফিরে এসে দেখলেন- সেও মারা গেছে। অতঃপর চাচাত ভাইয়ের কাছে ফিরে আসলে দেখেন তিনিও শাহাদাতের অমিয় শুধা পান করে জান্নাতবাসী হয়েছেন।
পানির পাত্রটি তখনও হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাতে। এতটুকু পানি। অথচ তা পান করার মতো এখন আর কেউ বেঁচে নেই। যাদের পানির প্রয়োজন ছিলো তারা আরেকজনের পানির পিপাসা মেটাবার জন্য এতই পাগলপারা ছিলেন যে, অবশেষে কেউই সে পানি পান করতে পারেন নি। অথচ সবারই প্রাণ ছিলো ওষ্ঠাগত।
:সুবহানাল্লাহ.. !!
সুবহানাল্লাহ.. !
রাসূল (সঃ) আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি জিহাদ করেনি, কোনো গাযীকে জিহাদের সরঞ্জামও সংগ্রহ করে দেয়নি এবং কোন গাযীর অনুপস্থিতিতে তার পরিবার-পরিজনের দেখাশুনাও করেনি, আল্লাহ কিয়ামতের পূর্বে তাকে কঠিন বিপদে ফেলবেন। (আবু দাউদ)
৪। মানবসেবার উদ্দেশ্যে: গরীব, এতিম ও মিসকীনদেরকে ,প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, শীতার্ত, অভাবী, বিপদগ্রস্ত ,বন্যা দুর্গত বান - বাসি, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, পাহাড় ধ্বস ও ভূমিকম্পে আক্রান্তসহ নানান বিপদে আক্রান্ত ,ক্ষতিগ্রস্ত, মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। মানব সেবা মূলত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সেবা করা এবং আল্লাহ তায়ালা তাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الخلق عيال الله فأحبهم إلى الله أنفعهم لعياله.
‘সব সৃষ্টি-প্রাণীকূল আল্লাহর পরিবার-পরিজন। অতএব আল্লাহ তাআলার কাছে তার সৃষ্টজীবের মাঝে সে-ই প্রিয়ভাজন যে তার অধীনস্ত ও সৃষ্টজীবের সঙ্গে দয়ার্দ্র আচরণ করে এবং তাদের প্রয়োজনের প্রতি যত্নবান থাকে।’ (মিশকাত)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় অপরের একটি প্রয়োজন মিটিয়ে দেবে, পরকালে আল্লাহ তার ১০০ প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন এবং বান্দার দুঃখ-দুর্দশায় কেউ সহযোগিতার হাত বাড়ালে আল্লাহ তার প্রতি করুণার দৃষ্টি দেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৬)।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন যে ব্যক্তি নিজের ভাইয়ের কোনো কাজ করা বা প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করবে, তা তার জন্য দশ বছর ইতেকাফ করার চেয়ে বেশি সওয়াব লাভের কারণ হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য এক দিন ইতেকাফ করে, আল্লাহ পাক তার ও জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক পরিমাণ দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন। যার দূরত্ব আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের চেয়ে আরো অনেক বেশি। তাখরিজ : তবারানি-৭৩২২;মাজমাউল যাওয়ায়েদ-৪/১৯২; মুসতাদরাকে হাকেম, সুনানে বায়হাকি
৫। আল্লাহর রহমতের দ্বার উন্মোচন : আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে রহমত ও দয়া প্রাপ্তির জন্য সাহায্যকারী মনোভাব অত্যন্ত জরুরী।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
ارحموا من في الأرض يرحمكم من في السماء
‘আল্লাহ তাআলা দয়ালুদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা জমিনে যারা বসবাস করছে তাদের প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৯৪১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন,
من لا يرحم الناس لا يرحمه الله
‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করে না, আল্লাহ তার প্রতি অনুগ্রহ করেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৩)
খ। দ্বিতীয় স্তর
৬। ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের পরিচয়:
পজিটিভ মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে স্বাস্থ্যবান থাকেন। তার গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। তিনি কথা বলার পূর্বে চিন্তা করেন, তর্ক না করে সবকিছু ইতিবাচক দিক দিয়ে ভাবেন,
অন্যের প্রশংসা করেন, নিয়মিত ব্যায়াম করেন এবং নেতিবাচক সংবাদ দেখাশোনা থেকে বিরত থাকেন। আর শুধু ব্যক্তিত্ব বলতে পরিবেশগত ও শারীরিক উপাদানের প্রভাবে বিকশিত চারিত্রিক উদাহরণ আচরণবিধি ও আবেগকে বুঝায়।
বিজ্ঞানী ওয়ালেন হিস্টিং (১৭৩২-১৮১৮) (প্রথম ইংরেজ শাসক- ভারতবর্ষে) এর মতে, "ব্যক্তিত্ব হল কোন ব্যক্তির চিন্তা, অনুভূতি, ইচ্ছা ও শারীরিক অনুভূতি সমূহের সমন্বিত সংগঠন যা এক ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তি থেকে পৃথক করে।
৭। ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা: ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব গঠন ধারণ ও লালন করতে হবে আমাদের প্রিয় সেনাবাহিনীর কর্ম প্রণালীর অনুকূলে। পারস্পরিক ঐক্য ভ্রাতৃত্ব সহমর্মিতা ও কাঙ্খিত গুণাবলী সৃষ্টিতে ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব অপরিহার্য । নিম্নে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো:
১। চারিত্রিক গুণাবলী সৃষ্টিতে ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রভাব
ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের অধিকারী কখনো হারাম বা অন্যায় কাজে লিপ্ত হয় না। তাদের চারিত্রিক মাধুর্য হয় অতুলনীয়। রাসূল সা: বলেছেন,
আল্লাহ তালার আত্মমর্যাদা বোধ আছে এবং আল্লাহর আত্ম মর্যাদা বোধ এই যে, যেন কোন মুমিন বান্দা হারাম বা অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়ে না পড়ে।
(সহীহ বুখারী-৫২২৩) আল কোরআনেও মুমিনদেরকে আল্লাহর রং ধারণ করতে বলা হয়েছে তাই ঈমানের দাবী হল, মুমিনগণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হবেন ।মহান প্রভু বলেন,
صِبْغَةَ ٱللَّهِ ۖ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ ٱللَّهِ صِبْغَةً ۖ وَنَحْنُ لَهُۥ عَٰبِدُونَ
আমরা আল্লাহর রং (চারিত্রিক মাধুর্য) ধারণ করলাম আর আল্লাহর রঙের চেয়ে কার রং উত্তম হতে পারে (সূরা বাকারা আয়াত - ১৩৮ )
২। ধৈর্যের মনোভাব গঠন: ধৈর্য একটি অতীন্দ্রিয় মানসিক শক্তি। ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব বানরাই এ শক্তিতে বলিয়ান। কারণ তারা কথা বলে ভেবেচিন্তে, সিদ্ধান্ত নেয় ধীরে সুস্থে, অবস্থা পর্যালোচনা করে পূর্বাপর লক্ষ্য করে। আল্লাহ তাআলা মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী মহানবীকে এ কারণে কাফিরদের সৃষ্টি পরিস্থিতির প্রতিবিধানে অত্যন্ত ধৈর্যশীলতার পরিচয় প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন । আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَٱصْبِرْ عَلَىٰ مَا يَقُولُونَ وَٱهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيلًا
আর লোকেরা যা বলে তাতে আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং সৌজন্যের সাথে তাদের পরিহার করে চলুন (সূরা মুজাম্মিল আয়াত -১০)
রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন,
সবর বা ধৈর্য এমন একটি নেয়ামত যার চাইতে বিস্তৃত আর কোন নেয়ামত কেউ পায়নি। (আবু দাউদ)
আল্লাহ তাআলা আরওবলেন,
إِن يَكُن مِّنكُمْ عِشْرُونَ صَٰبِرُونَ يَغْلِبُواْ مِاْئَتَيْنِ ۚ وَإِن يَكُن مِّنكُم مِّاْئَةٌ يَغْلِبُوٓاْ أَلْفًا مِّنَ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا
তোমাদের মধ্যে ১০০ জন ধৈর্যশীল মুজাহিদ থাকলে তারা২০০ জনের উপর বিজয়ী হবে আর তোমাদের মধ্যে ১০০০ থাকলে আল্লাহর অনুগ্রহে তারা ২০০০ এর উপর বিজয়ী হবে (সূরা আনফাল আয়াত- ৬৬)
৩। সেনাবাহিনীর স্ফীত লক্ষ্য অর্জন: দেশ রক্ষা বাহিনী হিসেবে সততা নিষ্ঠা আন্তরিকতা প্রশিক্ষণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন একতা ও দৃঢ়তা। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلَّذِينَ يُقَٰتِلُونَ فِى سَبِيلِهِۦ صَفًّا كَأَنَّهُم بُنْيَٰنٌ مَّرْصُوصٌ
নিশ্চয়ই আল্লাহতালা ঐ সকল সৈনিককে ভালবাসেন যারা সীসা-ঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম করে। (সূরা সফ আয়াত - ০৪)
আর লক্ষ্য অর্জনে কঠোর প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَأَعِدُّواْ لَهُم مَّا ٱسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍۢ
আর তোমরা শত্রুর মোকাবেলায় যথাসাধ্য শক্তি সঞ্চয় কর। (সূরা আনফাল আয়াত - ৬০)
আর এ কথা দিবালোকের ন্যায় সত্য যে এই একতা প্রশিক্ষণ ও দৃঢ় মনোভাব ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের পরিস্ফুটের মাধ্যমে সম্ভব।
৪। আদর্শ নেতৃত্ব গঠণ: সর্বস্তরের নেতাগণ তাদের অধীনস্থদের কে প্রেষণার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে থাকেন। এ প্রেষণাকে অনুপ্রেরণামূলক করার জন্য নেতাদেরকে বাস্তব উদাহরণ পেশ করতে হয়। যখন একজন অধীনস্থ অনুভব করে তার নেতা শুধু আদেশই দেন না নিজেই এর উপর বাস্তব উপমা এবং তিনি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও বটে। তখন তাকে নির্দ্বিধায় অনুসরণ করেন এবং শ্রদ্ধা করেন। নবীজি (সা:) শুধু যুদ্ধের আদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি স্বয়ং যুদ্ধে স্বশরীরে নেতৃত্ব দিয়ে সাহসিকতার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাই আদর্শ নেতৃত্ব গঠনে ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
আর মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ
كَبُر مَقْتًا عِندَ ٱللَّهِ أَن تَقُولُواْ مَا لَا تَفْعَلُو
তোমরা সেই কথা কেন বল যা তোমরা কাজে পরিণত করো না কাজ না করে যদি কথাই বলো তবে এতে আল্লাহর খুবই রাগের উদ্রেক হয়। (সূরা সফ আয়াত- ২ ও ৩)
৫। ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের লালন: দেশের নানান প্রান্ত হতে ভিন্ন ভিন্ন পরিবার ও পরিবেশ থেকে আমরা দেশ রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হয়ে একই স্থানে একত্রিত হয়েছি প্রত্যেকের রুচি চাহিদা ও প্রকৃতি ভিন্ন কিন্তু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ও ভিন্ন এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের অনুকূলে ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের যথেষ্ঠ প্রয়োজনিয়তা রয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন،
وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَلَا تَنَٰزَعُواْ فَتَفْشَلُواْ وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ ۖ وَٱصْبِرُوٓاْ
তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হইও না যদি তোমরা তা করো তাহলে তোমাদের শক্তি ও সাহস কমে যাবে (সূরা আনফাল আয়াত ৪৬)।
৮। ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রভাব:
১। ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব মানুষকে উৎসাহ যোগায়, উদ্দীপনা দেয় এবং সামনে এগোতে সাহস যোগায়।
২। যা মানুষকে উপকার করে তা অর্জন করতে শেখায়।
৩। মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতা ও আবিষ্কারের মানসিকতা সৃষ্টি করে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও অন্যকে ভালবাসতে উদ্ভূত করে,সঙ্ঘবদ্ধভাবে কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে।
৪। সমস্যার সমাধানে সাহায্য করে, কাজের উৎকর্ষ বাড়ায় এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ আবহাওয়ায় সৃষ্টি করে।
৫। আনুগত্যের মনোভাব তৈরি করে, মানসিক চাপ কমায় এবং প্রতিষ্ঠানের সহায়ক সদস্য হতে সাহায্য করে।
৬। একটি প্রসন্ন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে সাহায্য করে।
৯। উপসংহার: জাগতিক জীবনে সকল কাজের সফলতা নির্ভর করে মানুষের মানবিক গুণাবলীর উপর। তাই সাহায্য কারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব সফলতা অর্জনের অন্যতম সোপান। সাহায্য কারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব ছাড়া কোন কাজে সফল হওয়া অসম্ভব।
সাহায্যকারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা
১। ভূমিকা। দেশ রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী সেনা সদস্যদের ইস্পাত কঠিন সামগ্রিক দায়িত্ব পালনে যেমন তাদের প্রয়োজন একে অপরের সহযোগিতা, তেমনি অপরিহার্য গঠনমূলক স্বত:স্ফূর্ত মানসিকতা। ইহা সকলকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি সদা অবিচল ও অটুট রাখে। সকল কাজে সকলে সমান পারদর্শী না হওয়ার কারণে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে পরোপকারী হিসেবে একে অন্যের সহযোগী হতে হয়। এ ধরণের সাহায্যের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন ; "তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ব্যাপারে একে অন্যের সহযোগিতা কর,সীমালংঘন ও পাপাচারে একে অন্যকে সাহায্য করো না" (সূরা মায়েদা - ০২) আর ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের অধিকারীরা সাধারণত: চরিত্রবান ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন হয়ে থাকেন। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা:) বলেন, মমিনগণ আত্মমর্যাদা বোধ সম্পন্ন আর আল্লাহ তাদের চেয়েও বেশি আত্মমর্যাদা সম্পন্ন। (মুসলিম-২৭৬১) সমাজে আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তি সৎপথে পরিচালিত হন এবং সকলের নিকট তিনি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রূপে সমাদৃত হন। দেশ ও জাতি তাদের দ্বারা উপকৃত হয়। সেনাবাহিনীতে তারাই সম্মান প্রমোশন ও নেতৃত্ব লাভ করেন। তাদের কল্যাণেই অন্য সদস্যরা পেশাদারীতে অনুপ্রেরণা লাভ করেন। অতএব আজকের বিষয় "সাহায্যকারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা" অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জীবন ঘনিষ্ঠ।
২। উদ্দেশ্য । সাহায্যকারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করাই আজকের পাঠের মূল উদ্দেশ্য।
৩। পাঠ পূর্বাভাস। আজকের প্রাঠটি বুঝার সুবিধার্তে দুটি স্তরে বিন্যস্ত করে আমরা আলোচনা করব।
ক। সাহায্যকারী মনোভাব কি ও এর প্রয়োজনীয়তা।
খ। ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের পরিচয় ও এর প্রয়োজনীয়তা।
প্রথম স্তর
৪। সাহায্যকারী মনোভাব বলতে কি বুঝায়?
প্রথমে আমরা জানব মনোভাব কি? ক্ষুধা ও তৃষ্ণা যেমন প্রত্যেক মানুষের মধ্যে আছে, তেমনই প্রত্যেক মানুষেরই কোনো না কোনো মনোভাবও আছে। মনোভাবকে আমরা ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দ বলতে পারি।মনোভাব হল কোন ব্যক্তির মানসিক সক্রিয়তার একটি রুপ। অর্থাৎ কোন ব্যক্তির কোন কিছুর ব্যাপারে তার মানসিক সক্রিয়তার একটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রতিফলনই হল তার মনোভাব। এটি মনোবৈজ্ঞানিক আলোচ্য বিষয়বস্তু।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কোন ব্যক্তি বস্তু বা অবস্থার প্রতি কোন ব্যক্তির অনুকূল বা ইতিবাচক প্রতিকূল বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার প্রবণতাকে মনোভাব বলে।
উদাহরণস্বরূপ: যদি এমন একটি গ্লাস থাকে যার অর্ধেকটা পানি দিয়ে ভর্তি আর অর্ধেকটা শূন্য তাহলে এটাকে দু’ভাবে মূল্যায়ন করা যাবে।
এক. ইতিবাচক মূল্যায়ন। অর্থাৎ বলা হবে যে, গ্লাসটি অর্ধেকটা পূর্ণ। গ্লাসটি খালী নয়। আর এ অর্ধগ্লাস পানি মানুষের জন্য উপকারী।
দুই. নেতিবাচক মূল্যায়ন। যেমন বলা হবে গ্লাসটির অর্ধেকই খালি, অপূর্ণাঙ্গ আর এ অর্ধগ্লাস পানি দিয়ে কি-ই বা হবে।
বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী 'কে ডেভিস' এর মতে, মনোভাব হচ্ছে কর্মীদের অনুভূতি ও বিশ্বাস যা তাদের নির্দিষ্ট পরিবেশে নির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদনের বিষয়ে তথা নির্দিষ্ট আচরণ করতে প্রভাবিত করে।
এস.পি. রবিনস এর মতে, কোন ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি কোন ব্যক্তির অনুকূল বা ইতিবাচক প্রতিকূল বা নেতিবাচক মূল্যায়ন মূলক বিবরণীকে মনোভাব বলে।
এক কথায় মনোভাব হল ব্যাক্তির মানসিক অনুভূতির একটি বিশেষ প্রতিফলন যা তার কর্ম ও আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
সুতরাং সাহায্যকারী মনোভাব বলতে বোঝায় একজন ব্যক্তি কারো উপকারে আসে এমন কাজে সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসা উপকার করতে না পারলেও তার ক্ষতি সাধন না করার মানসিকতাকে বুঝায়।
৫। সাহায্যকারী মনোভাবের প্রয়োজনীয়তা:
১। আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালন ও তার সাহায্যপ্রাপ্তি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনুল কারীমেএক ভাই অপর ভাইকে পরস্পর সাহায্য সহযোগিতার আদেশ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা সৎ কর্ম ও তাকওয়ার ব্যাপারে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য সহযোগিতা কর। (সূরা মায়েদা আয়াত ০২)
অন্যত্র আল্লাহতালা স্বয়ং তাকেও সাহায্য করার আদেশ করেছেন, তিনি বলেন
يا ايها الذين امنوا كونوا انصار الله
হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হও। (সূরা সাফ আয়াত ১৪)
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র আরও বলেছেন,
يا ايها الذين امنوا ان تنصروا الله ينصركم
হে মুমিনগণ ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো তাহলে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন। (সূরা মুহাম্মদ আয়াত ০৭) আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সাহায্য করার অর্থ হচ্ছে তারই কোন বান্দাকে সাহায্য করা । যেমনটি আমরা সহিহ মুসলিম শরীফের ঘটনার আলোকে জানতে পারি ।
রাসূল (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাকে জিজ্ঞেস করবেন, আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে আহার্য দাওনি। আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে পানি দাওনি। আমি অসুখে ভুগছিলাম, তুমি আমার সেবা করনি। (কেন?)
বান্দা তখন অবাক হয়ে বলবে, হে আমার প্রতিপালক, তুমি যে অভাবমুক্ত, তুমি তো খাও না, পান কর না, তুমি কীভাবে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ও অসুস্থ হতে পার?
আল্লাহ তায়ালা তখন প্রতিউত্তরে বলবেন, আমার অমুক বান্দা যে ক্ষুধার্ত হয়ে তোমার দুয়ারে হাজির হয়েছিল, তুমি তো তাকে খাবার দাওনি, তাকে দিলে আমাকে দেয়া হতো। পিপাসার্তকে তুমি পানি পান করাওনি, তাকে পানি দিলে আমাকে দেয়া হতো।
রোগশোকে ভোগা ব্যক্তি কষ্টে ছটফট করত, তার সেবা করলে আমাকে সেবা করা হতো, তুমি কী এটা জানতে না? (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন,
والله في عون العبد ما كان العبد في عون اخيه
‘আল্লাহতায়ালা বান্দার সাহায্যে ততক্ষণ থাকেন, যতক্ষণ সে অপর ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৩১৪)।
২। পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন: সাহায্যকারী মনোভাব পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন কে দৃঢ় করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
انما المؤمنون اخوه
নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। (সূরা হুজরাত আয়াত ১০)
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে মুমিনের পারস্পরিক সম্পর্ক হলো- একটি দেহের ন্যায়।দেহের একটি অঙ্গ যেকোনো ধরনের বিপদে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অঙ্গ তাকে সাহায্যের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে। উদাহরণ স্বরূপ- কারো চোখে কোনো কিছু পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেহের অন্য সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আপন কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা সবাই কিভাবে চোখকে তার বিপদ থেকে রক্ষা করবে সেদিকে নিমগ্ন হয়ে পড়ে। প্রয়োজনে অন্যেরও শরণাপন্ন হয়। অনুরূপ কোনো মুসলমান ভাই যখন কোনো প্রকার বিপদে পড়ে, তখন অপর মুসলমান ভাইয়ের কর্তব্য হলো- তাকে সাহায্য করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘মুমিনদের পরস্পরের ভালোবাসা, অনুগ্রহ, হৃদ্যতা ও আন্তরিকতার উদাহরণ হচ্ছে একটি দেহ বা শরীরের মতো। যখন দেহের কোনো একটি অঙ্গ আহত বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন সারা দেহের সবগুলো অঙ্গই নিদ্রাহীন হয়ে পড়ে এবং কষ্ট-যন্ত্রণায় জরাগ্রস্ত ও কাতর হয়ে পড়ে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
৩। সহযোদ্ধাদের প্রতি সহমর্মিতা: সহকর্মী বা সহযোদ্ধাদের প্রতি সহমর্মিতার জন্য সাহায্যকারী মনোভাব অত্যন্ত জরুরি। পারস্পরিক সহানুভূতি, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা ছাড়া কোনো মানুষ সুখী-সমৃদ্ধ হতে পারে না। ইসলামের প্রথম যুগে মুসলমানদের ( আনসার ও মুহাজির সাহাবীদের ) মাঝে যে পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতা ছিল বর্তমান মুসলিম সমাজে তা অনেকাংশেই অনুপস্থিত। সাহাবায়ে কিরামের পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতা ছিল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। যেমন -
ইয়ার মুকের যুদ্ধে পানি পানের ঘটনা,
ইয়ার মুকের যুদ্ধের সময় হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আহতদের মধ্যে তাঁর চাচাত ভাইকে খুঁজতে শুরু করলেন। তাঁর সাথে ছিলো সামান্য পানি। হুযায়ফার চাচাত ভাইয়ের শরীর দিয়ে অবিরত ধারায় রক্ত ঝরছিল। তার অবস্থা ছিলো আশঙ্কাজনক।
হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বললেন-
“তুমি কী পানি পান করবে?”
সে তাঁর কথার কোনো উত্তর দিতে সক্ষম না হওয়ায় হ্যা সূচক ইঙ্গিত করল। আহত ব্যক্তি হুযায়ফা রা. এর কাছ থেকে পানি পান করার জন্য হাতে নিতেই তাঁর পাশে এক সৈনিককে ‘পানি পানি’ বলে চিৎকার করতে শুনল। পিপাসার্ত ঐ সৈনিকের বুকফাটা আর্তনাদ শুনে তাঁর পূর্বে তাকে পানি করানোর জন্য হুযায়ফাকে ইঙ্গিত দিলেন।
হুযায়ফা তাঁর নিকট গিয়ে বললেন-
.আপনি কী পানি পান করতে চান?”
তিনি বললেন- “হ্যা!”
তিনি পানি পান করার জন্য পাত্র উপরে তুলে ধরতেই পানির জন্য অন্য একজন সৈনিকের চিৎকার শুনতে পেলেন। তিনি পানি পান না করে হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন,
“তাঁর দিকে দ্রুত ছুটে যাও এবং সে পানি পান করার পর কিছু অবশিষ্ট থাকলে আমাকে দিয়ো।
হুযায়ফা আহত সৈন্যটির কাছে গিয়ে দেখলেন- সে মারা গেছে। অতঃপর দ্বিতীয়জনের কাছে ফিরে এসে দেখলেন- সেও মারা গেছে। অতঃপর চাচাত ভাইয়ের কাছে ফিরে আসলে দেখেন তিনিও শাহাদাতের অমিয় শুধা পান করে জান্নাতবাসী হয়েছেন।
পানির পাত্রটি তখনও হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাতে। এতটুকু পানি। অথচ তা পান করার মতো এখন আর কেউ বেঁচে নেই। যাদের পানির প্রয়োজন ছিলো তারা আরেকজনের পানির পিপাসা মেটাবার জন্য এতই পাগলপারা ছিলেন যে, অবশেষে কেউই সে পানি পান করতে পারেন নি। অথচ সবারই প্রাণ ছিলো ওষ্ঠাগত।
:সুবহানাল্লাহ.. !!
সুবহানাল্লাহ.. !
রাসূল (সঃ) আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি জিহাদ করেনি, কোনো গাযীকে জিহাদের সরঞ্জামও সংগ্রহ করে দেয়নি এবং কোন গাযীর অনুপস্থিতিতে তার পরিবার-পরিজনের দেখাশুনাও করেনি, আল্লাহ কিয়ামতের পূর্বে তাকে কঠিন বিপদে ফেলবেন। (আবু দাউদ)
৪। মানবসেবার উদ্দেশ্যে: গরীব, এতিম ও মিসকীনদেরকে ,প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, শীতার্ত, অভাবী, বিপদগ্রস্ত ,বন্যা দুর্গত বান - বাসি, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, পাহাড় ধ্বস ও ভূমিকম্পে আক্রান্তসহ নানান বিপদে আক্রান্ত ,ক্ষতিগ্রস্ত, মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। মানব সেবা মূলত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সেবা করা এবং আল্লাহ তায়ালা তাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الخلق عيال الله فأحبهم إلى الله أنفعهم لعياله.
‘সব সৃষ্টি-প্রাণীকূল আল্লাহর পরিবার-পরিজন। অতএব আল্লাহ তাআলার কাছে তার সৃষ্টজীবের মাঝে সে-ই প্রিয়ভাজন যে তার অধীনস্ত ও সৃষ্টজীবের সঙ্গে দয়ার্দ্র আচরণ করে এবং তাদের প্রয়োজনের প্রতি যত্নবান থাকে।’ (মিশকাত)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় অপরের একটি প্রয়োজন মিটিয়ে দেবে, পরকালে আল্লাহ তার ১০০ প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন এবং বান্দার দুঃখ-দুর্দশায় কেউ সহযোগিতার হাত বাড়ালে আল্লাহ তার প্রতি করুণার দৃষ্টি দেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৬)।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন যে ব্যক্তি নিজের ভাইয়ের কোনো কাজ করা বা প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করবে, তা তার জন্য দশ বছর ইতেকাফ করার চেয়ে বেশি সওয়াব লাভের কারণ হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য এক দিন ইতেকাফ করে, আল্লাহ পাক তার ও জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক পরিমাণ দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন। যার দূরত্ব আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের চেয়ে আরো অনেক বেশি। তাখরিজ : তবারানি-৭৩২২;মাজমাউল যাওয়ায়েদ-৪/১৯২; মুসতাদরাকে হাকেম, সুনানে বায়হাকি
৫। আল্লাহর রহমতের দ্বার উন্মোচন : আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে রহমত ও দয়া প্রাপ্তির জন্য সাহায্যকারী মনোভাব অত্যন্ত জরুরী।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
ارحموا من في الأرض يرحمكم من في السماء
‘আল্লাহ তাআলা দয়ালুদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা জমিনে যারা বসবাস করছে তাদের প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৯৪১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন,
من لا يرحم الناس لا يرحمه الله
‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করে না, আল্লাহ তার প্রতি অনুগ্রহ করেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৩)
খ। দ্বিতীয় স্তর
৬। ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের পরিচয়:
পজিটিভ মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে স্বাস্থ্যবান থাকেন। তার গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। তিনি কথা বলার পূর্বে চিন্তা করেন, তর্ক না করে সবকিছু ইতিবাচক দিক দিয়ে ভাবেন,
অন্যের প্রশংসা করেন, নিয়মিত ব্যায়াম করেন এবং নেতিবাচক সংবাদ দেখাশোনা থেকে বিরত থাকেন। আর শুধু ব্যক্তিত্ব বলতে পরিবেশগত ও শারীরিক উপাদানের প্রভাবে বিকশিত চারিত্রিক উদাহরণ আচরণবিধি ও আবেগকে বুঝায়।
বিজ্ঞানী ওয়ালেন হিস্টিং (১৭৩২-১৮১৮) (প্রথম ইংরেজ শাসক- ভারতবর্ষে) এর মতে, "ব্যক্তিত্ব হল কোন ব্যক্তির চিন্তা, অনুভূতি, ইচ্ছা ও শারীরিক অনুভূতি সমূহের সমন্বিত সংগঠন যা এক ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তি থেকে পৃথক করে।
৭। ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা: ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব গঠন ধারণ ও লালন করতে হবে আমাদের প্রিয় সেনাবাহিনীর কর্ম প্রণালীর অনুকূলে। পারস্পরিক ঐক্য ভ্রাতৃত্ব সহমর্মিতা ও কাঙ্খিত গুণাবলী সৃষ্টিতে ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব অপরিহার্য । নিম্নে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো:
১। চারিত্রিক গুণাবলী সৃষ্টিতে ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রভাব
ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের অধিকারী কখনো হারাম বা অন্যায় কাজে লিপ্ত হয় না। তাদের চারিত্রিক মাধুর্য হয় অতুলনীয়। রাসূল সা: বলেছেন,
আল্লাহ তালার আত্মমর্যাদা বোধ আছে এবং আল্লাহর আত্ম মর্যাদা বোধ এই যে, যেন কোন মুমিন বান্দা হারাম বা অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়ে না পড়ে।
(সহীহ বুখারী-৫২২৩) আল কোরআনেও মুমিনদেরকে আল্লাহর রং ধারণ করতে বলা হয়েছে তাই ঈমানের দাবী হল, মুমিনগণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হবেন ।মহান প্রভু বলেন,
صِبْغَةَ ٱللَّهِ ۖ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ ٱللَّهِ صِبْغَةً ۖ وَنَحْنُ لَهُۥ عَٰبِدُونَ
আমরা আল্লাহর রং (চারিত্রিক মাধুর্য) ধারণ করলাম আর আল্লাহর রঙের চেয়ে কার রং উত্তম হতে পারে (সূরা বাকারা আয়াত - ১৩৮ )
২। ধৈর্যের মনোভাব গঠন: ধৈর্য একটি অতীন্দ্রিয় মানসিক শক্তি। ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব বানরাই এ শক্তিতে বলিয়ান। কারণ তারা কথা বলে ভেবেচিন্তে, সিদ্ধান্ত নেয় ধীরে সুস্থে, অবস্থা পর্যালোচনা করে পূর্বাপর লক্ষ্য করে। আল্লাহ তাআলা মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী মহানবীকে এ কারণে কাফিরদের সৃষ্টি পরিস্থিতির প্রতিবিধানে অত্যন্ত ধৈর্যশীলতার পরিচয় প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন । আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَٱصْبِرْ عَلَىٰ مَا يَقُولُونَ وَٱهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيلًا
আর লোকেরা যা বলে তাতে আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং সৌজন্যের সাথে তাদের পরিহার করে চলুন (সূরা মুজাম্মিল আয়াত -১০)
রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন,
সবর বা ধৈর্য এমন একটি নেয়ামত যার চাইতে বিস্তৃত আর কোন নেয়ামত কেউ পায়নি। (আবু দাউদ)
আল্লাহ তাআলা আরওবলেন,
إِن يَكُن مِّنكُمْ عِشْرُونَ صَٰبِرُونَ يَغْلِبُواْ مِاْئَتَيْنِ ۚ وَإِن يَكُن مِّنكُم مِّاْئَةٌ يَغْلِبُوٓاْ أَلْفًا مِّنَ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا
তোমাদের মধ্যে ১০০ জন ধৈর্যশীল মুজাহিদ থাকলে তারা২০০ জনের উপর বিজয়ী হবে আর তোমাদের মধ্যে ১০০০ থাকলে আল্লাহর অনুগ্রহে তারা ২০০০ এর উপর বিজয়ী হবে (সূরা আনফাল আয়াত- ৬৬)
৩। সেনাবাহিনীর স্ফীত লক্ষ্য অর্জন: দেশ রক্ষা বাহিনী হিসেবে সততা নিষ্ঠা আন্তরিকতা প্রশিক্ষণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন একতা ও দৃঢ়তা। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلَّذِينَ يُقَٰتِلُونَ فِى سَبِيلِهِۦ صَفًّا كَأَنَّهُم بُنْيَٰنٌ مَّرْصُوصٌ
নিশ্চয়ই আল্লাহতালা ঐ সকল সৈনিককে ভালবাসেন যারা সীসা-ঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম করে। (সূরা সফ আয়াত - ০৪)
আর লক্ষ্য অর্জনে কঠোর প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَأَعِدُّواْ لَهُم مَّا ٱسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍۢ
আর তোমরা শত্রুর মোকাবেলায় যথাসাধ্য শক্তি সঞ্চয় কর। (সূরা আনফাল আয়াত - ৬০)
আর এ কথা দিবালোকের ন্যায় সত্য যে এই একতা প্রশিক্ষণ ও দৃঢ় মনোভাব ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের পরিস্ফুটের মাধ্যমে সম্ভব।
৪। আদর্শ নেতৃত্ব গঠণ: সর্বস্তরের নেতাগণ তাদের অধীনস্থদের কে প্রেষণার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে থাকেন। এ প্রেষণাকে অনুপ্রেরণামূলক করার জন্য নেতাদেরকে বাস্তব উদাহরণ পেশ করতে হয়। যখন একজন অধীনস্থ অনুভব করে তার নেতা শুধু আদেশই দেন না নিজেই এর উপর বাস্তব উপমা এবং তিনি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও বটে। তখন তাকে নির্দ্বিধায় অনুসরণ করেন এবং শ্রদ্ধা করেন। নবীজি (সা:) শুধু যুদ্ধের আদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি স্বয়ং যুদ্ধে স্বশরীরে নেতৃত্ব দিয়ে সাহসিকতার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাই আদর্শ নেতৃত্ব গঠনে ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
আর মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ
كَبُر مَقْتًا عِندَ ٱللَّهِ أَن تَقُولُواْ مَا لَا تَفْعَلُو
তোমরা সেই কথা কেন বল যা তোমরা কাজে পরিণত করো না কাজ না করে যদি কথাই বলো তবে এতে আল্লাহর খুবই রাগের উদ্রেক হয়। (সূরা সফ আয়াত- ২ ও ৩)
৫। ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের লালন: দেশের নানান প্রান্ত হতে ভিন্ন ভিন্ন পরিবার ও পরিবেশ থেকে আমরা দেশ রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হয়ে একই স্থানে একত্রিত হয়েছি প্রত্যেকের রুচি চাহিদা ও প্রকৃতি ভিন্ন কিন্তু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ও ভিন্ন এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের অনুকূলে ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের যথেষ্ঠ প্রয়োজনিয়তা রয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন،
وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَلَا تَنَٰزَعُواْ فَتَفْشَلُواْ وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ ۖ وَٱصْبِرُوٓاْ
তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হইও না যদি তোমরা তা করো তাহলে তোমাদের শক্তি ও সাহস কমে যাবে (সূরা আনফাল আয়াত ৪৬)।
৮। ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রভাব:
১। ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব মানুষকে উৎসাহ যোগায়, উদ্দীপনা দেয় এবং সামনে এগোতে সাহস যোগায়।
২। যা মানুষকে উপকার করে তা অর্জন করতে শেখায়।
৩। মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতা ও আবিষ্কারের মানসিকতা সৃষ্টি করে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও অন্যকে ভালবাসতে উদ্ভূত করে,সঙ্ঘবদ্ধভাবে কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে।
৪। সমস্যার সমাধানে সাহায্য করে, কাজের উৎকর্ষ বাড়ায় এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ আবহাওয়ায় সৃষ্টি করে।
৫। আনুগত্যের মনোভাব তৈরি করে, মানসিক চাপ কমায় এবং প্রতিষ্ঠানের সহায়ক সদস্য হতে সাহায্য করে।
৬। একটি প্রসন্ন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে সাহায্য করে।
৯। উপসংহার: জাগতিক জীবনে সকল কাজের সফলতা নির্ভর করে মানুষের মানবিক গুণাবলীর উপর। তাই সাহায্য কারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব সফলতা অর্জনের অন্যতম সোপান। সাহায্য কারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব ছাড়া কোন কাজে সফল হওয়া অসম্ভব।
সাহায্যকারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা
১। ভূমিকা। দেশ রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী সেনা সদস্যদের ইস্পাত কঠিন সামগ্রিক দায়িত্ব পালনে যেমন তাদের প্রয়োজন একে অপরের সহযোগিতা, তেমনি অপরিহার্য গঠনমূলক স্বত:স্ফূর্ত মানসিকতা। ইহা সকলকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি সদা অবিচল ও অটুট রাখে। সকল কাজে সকলে সমান পারদর্শী না হওয়ার কারণে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে পরোপকারী হিসেবে একে অন্যের সহযোগী হতে হয়। এ ধরণের সাহায্যের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন ; "তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ব্যাপারে একে অন্যের সহযোগিতা কর,সীমালংঘন ও পাপাচারে একে অন্যকে সাহায্য করো না" (সূরা মায়েদা - ০২) আর ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের অধিকারীরা সাধারণত: চরিত্রবান ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন হয়ে থাকেন। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা:) বলেন, মমিনগণ আত্মমর্যাদা বোধ সম্পন্ন আর আল্লাহ তাদের চেয়েও বেশি আত্মমর্যাদা সম্পন্ন। (মুসলিম-২৭৬১) সমাজে আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তি সৎপথে পরিচালিত হন এবং সকলের নিকট তিনি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রূপে সমাদৃত হন। দেশ ও জাতি তাদের দ্বারা উপকৃত হয়। সেনাবাহিনীতে তারাই সম্মান প্রমোশন ও নেতৃত্ব লাভ করেন। তাদের কল্যাণেই অন্য সদস্যরা পেশাদারীতে অনুপ্রেরণা লাভ করেন। অতএব আজকের বিষয় "সাহায্যকারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা" অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জীবন ঘনিষ্ঠ।
২। উদ্দেশ্য । সাহায্যকারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করাই আজকের পাঠের মূল উদ্দেশ্য।
৩। পাঠ পূর্বাভাস। আজকের প্রাঠটি বুঝার সুবিধার্তে দুটি স্তরে বিন্যস্ত করে আমরা আলোচনা করব।
ক। সাহায্যকারী মনোভাব কি ও এর প্রয়োজনীয়তা।
খ। ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের পরিচয় ও এর প্রয়োজনীয়তা।
প্রথম স্তর
৪। সাহায্যকারী মনোভাব বলতে কি বুঝায়?
প্রথমে আমরা জানব মনোভাব কি? ক্ষুধা ও তৃষ্ণা যেমন প্রত্যেক মানুষের মধ্যে আছে, তেমনই প্রত্যেক মানুষেরই কোনো না কোনো মনোভাবও আছে। মনোভাবকে আমরা ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দ বলতে পারি।মনোভাব হল কোন ব্যক্তির মানসিক সক্রিয়তার একটি রুপ। অর্থাৎ কোন ব্যক্তির কোন কিছুর ব্যাপারে তার মানসিক সক্রিয়তার একটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রতিফলনই হল তার মনোভাব। এটি মনোবৈজ্ঞানিক আলোচ্য বিষয়বস্তু।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কোন ব্যক্তি বস্তু বা অবস্থার প্রতি কোন ব্যক্তির অনুকূল বা ইতিবাচক প্রতিকূল বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার প্রবণতাকে মনোভাব বলে।
উদাহরণস্বরূপ: যদি এমন একটি গ্লাস থাকে যার অর্ধেকটা পানি দিয়ে ভর্তি আর অর্ধেকটা শূন্য তাহলে এটাকে দু’ভাবে মূল্যায়ন করা যাবে।
এক. ইতিবাচক মূল্যায়ন। অর্থাৎ বলা হবে যে, গ্লাসটি অর্ধেকটা পূর্ণ। গ্লাসটি খালী নয়। আর এ অর্ধগ্লাস পানি মানুষের জন্য উপকারী।
দুই. নেতিবাচক মূল্যায়ন। যেমন বলা হবে গ্লাসটির অর্ধেকই খালি, অপূর্ণাঙ্গ আর এ অর্ধগ্লাস পানি দিয়ে কি-ই বা হবে।
বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী 'কে ডেভিস' এর মতে, মনোভাব হচ্ছে কর্মীদের অনুভূতি ও বিশ্বাস যা তাদের নির্দিষ্ট পরিবেশে নির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদনের বিষয়ে তথা নির্দিষ্ট আচরণ করতে প্রভাবিত করে।
এস.পি. রবিনস এর মতে, কোন ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি কোন ব্যক্তির অনুকূল বা ইতিবাচক প্রতিকূল বা নেতিবাচক মূল্যায়ন মূলক বিবরণীকে মনোভাব বলে।
এক কথায় মনোভাব হল ব্যাক্তির মানসিক অনুভূতির একটি বিশেষ প্রতিফলন যা তার কর্ম ও আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
সুতরাং সাহায্যকারী মনোভাব বলতে বোঝায় একজন ব্যক্তি কারো উপকারে আসে এমন কাজে সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসা উপকার করতে না পারলেও তার ক্ষতি সাধন না করার মানসিকতাকে বুঝায়।
৫। সাহায্যকারী মনোভাবের প্রয়োজনীয়তা:
১। আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালন ও তার সাহায্যপ্রাপ্তি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনুল কারীমেএক ভাই অপর ভাইকে পরস্পর সাহায্য সহযোগিতার আদেশ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা সৎ কর্ম ও তাকওয়ার ব্যাপারে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য সহযোগিতা কর। (সূরা মায়েদা আয়াত ০২)
অন্যত্র আল্লাহতালা স্বয়ং তাকেও সাহায্য করার আদেশ করেছেন, তিনি বলেন
يا ايها الذين امنوا كونوا انصار الله
হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হও। (সূরা সাফ আয়াত ১৪)
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র আরও বলেছেন,
يا ايها الذين امنوا ان تنصروا الله ينصركم
হে মুমিনগণ ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো তাহলে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন। (সূরা মুহাম্মদ আয়াত ০৭) আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সাহায্য করার অর্থ হচ্ছে তারই কোন বান্দাকে সাহায্য করা । যেমনটি আমরা সহিহ মুসলিম শরীফের ঘটনার আলোকে জানতে পারি ।
রাসূল (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাকে জিজ্ঞেস করবেন, আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে আহার্য দাওনি। আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে পানি দাওনি। আমি অসুখে ভুগছিলাম, তুমি আমার সেবা করনি। (কেন?)
বান্দা তখন অবাক হয়ে বলবে, হে আমার প্রতিপালক, তুমি যে অভাবমুক্ত, তুমি তো খাও না, পান কর না, তুমি কীভাবে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ও অসুস্থ হতে পার?
আল্লাহ তায়ালা তখন প্রতিউত্তরে বলবেন, আমার অমুক বান্দা যে ক্ষুধার্ত হয়ে তোমার দুয়ারে হাজির হয়েছিল, তুমি তো তাকে খাবার দাওনি, তাকে দিলে আমাকে দেয়া হতো। পিপাসার্তকে তুমি পানি পান করাওনি, তাকে পানি দিলে আমাকে দেয়া হতো।
রোগশোকে ভোগা ব্যক্তি কষ্টে ছটফট করত, তার সেবা করলে আমাকে সেবা করা হতো, তুমি কী এটা জানতে না? (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন,
والله في عون العبد ما كان العبد في عون اخيه
‘আল্লাহতায়ালা বান্দার সাহায্যে ততক্ষণ থাকেন, যতক্ষণ সে অপর ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৩১৪)।
২। পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন: সাহায্যকারী মনোভাব পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন কে দৃঢ় করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
انما المؤمنون اخوه
নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। (সূরা হুজরাত আয়াত ১০)
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে মুমিনের পারস্পরিক সম্পর্ক হলো- একটি দেহের ন্যায়।দেহের একটি অঙ্গ যেকোনো ধরনের বিপদে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অঙ্গ তাকে সাহায্যের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে। উদাহরণ স্বরূপ- কারো চোখে কোনো কিছু পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেহের অন্য সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আপন কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা সবাই কিভাবে চোখকে তার বিপদ থেকে রক্ষা করবে সেদিকে নিমগ্ন হয়ে পড়ে। প্রয়োজনে অন্যেরও শরণাপন্ন হয়। অনুরূপ কোনো মুসলমান ভাই যখন কোনো প্রকার বিপদে পড়ে, তখন অপর মুসলমান ভাইয়ের কর্তব্য হলো- তাকে সাহায্য করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘মুমিনদের পরস্পরের ভালোবাসা, অনুগ্রহ, হৃদ্যতা ও আন্তরিকতার উদাহরণ হচ্ছে একটি দেহ বা শরীরের মতো। যখন দেহের কোনো একটি অঙ্গ আহত বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন সারা দেহের সবগুলো অঙ্গই নিদ্রাহীন হয়ে পড়ে এবং কষ্ট-যন্ত্রণায় জরাগ্রস্ত ও কাতর হয়ে পড়ে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
৩। সহযোদ্ধাদের প্রতি সহমর্মিতা: সহকর্মী বা সহযোদ্ধাদের প্রতি সহমর্মিতার জন্য সাহায্যকারী মনোভাব অত্যন্ত জরুরি। পারস্পরিক সহানুভূতি, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা ছাড়া কোনো মানুষ সুখী-সমৃদ্ধ হতে পারে না। ইসলামের প্রথম যুগে মুসলমানদের ( আনসার ও মুহাজির সাহাবীদের ) মাঝে যে পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতা ছিল বর্তমান মুসলিম সমাজে তা অনেকাংশেই অনুপস্থিত। সাহাবায়ে কিরামের পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতা ছিল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। যেমন -
ইয়ার মুকের যুদ্ধে পানি পানের ঘটনা,
ইয়ার মুকের যুদ্ধের সময় হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আহতদের মধ্যে তাঁর চাচাত ভাইকে খুঁজতে শুরু করলেন। তাঁর সাথে ছিলো সামান্য পানি। হুযায়ফার চাচাত ভাইয়ের শরীর দিয়ে অবিরত ধারায় রক্ত ঝরছিল। তার অবস্থা ছিলো আশঙ্কাজনক।
হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বললেন-
“তুমি কী পানি পান করবে?”
সে তাঁর কথার কোনো উত্তর দিতে সক্ষম না হওয়ায় হ্যা সূচক ইঙ্গিত করল। আহত ব্যক্তি হুযায়ফা রা. এর কাছ থেকে পানি পান করার জন্য হাতে নিতেই তাঁর পাশে এক সৈনিককে ‘পানি পানি’ বলে চিৎকার করতে শুনল। পিপাসার্ত ঐ সৈনিকের বুকফাটা আর্তনাদ শুনে তাঁর পূর্বে তাকে পানি করানোর জন্য হুযায়ফাকে ইঙ্গিত দিলেন।
হুযায়ফা তাঁর নিকট গিয়ে বললেন-
.আপনি কী পানি পান করতে চান?”
তিনি বললেন- “হ্যা!”
তিনি পানি পান করার জন্য পাত্র উপরে তুলে ধরতেই পানির জন্য অন্য একজন সৈনিকের চিৎকার শুনতে পেলেন। তিনি পানি পান না করে হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন,
“তাঁর দিকে দ্রুত ছুটে যাও এবং সে পানি পান করার পর কিছু অবশিষ্ট থাকলে আমাকে দিয়ো।
হুযায়ফা আহত সৈন্যটির কাছে গিয়ে দেখলেন- সে মারা গেছে। অতঃপর দ্বিতীয়জনের কাছে ফিরে এসে দেখলেন- সেও মারা গেছে। অতঃপর চাচাত ভাইয়ের কাছে ফিরে আসলে দেখেন তিনিও শাহাদাতের অমিয় শুধা পান করে জান্নাতবাসী হয়েছেন।
পানির পাত্রটি তখনও হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাতে। এতটুকু পানি। অথচ তা পান করার মতো এখন আর কেউ বেঁচে নেই। যাদের পানির প্রয়োজন ছিলো তারা আরেকজনের পানির পিপাসা মেটাবার জন্য এতই পাগলপারা ছিলেন যে, অবশেষে কেউই সে পানি পান করতে পারেন নি। অথচ সবারই প্রাণ ছিলো ওষ্ঠাগত।
:সুবহানাল্লাহ.. !!
সুবহানাল্লাহ.. !
রাসূল (সঃ) আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি জিহাদ করেনি, কোনো গাযীকে জিহাদের সরঞ্জামও সংগ্রহ করে দেয়নি এবং কোন গাযীর অনুপস্থিতিতে তার পরিবার-পরিজনের দেখাশুনাও করেনি, আল্লাহ কিয়ামতের পূর্বে তাকে কঠিন বিপদে ফেলবেন। (আবু দাউদ)
৪। মানবসেবার উদ্দেশ্যে: গরীব, এতিম ও মিসকীনদেরকে ,প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, শীতার্ত, অভাবী, বিপদগ্রস্ত ,বন্যা দুর্গত বান - বাসি, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, পাহাড় ধ্বস ও ভূমিকম্পে আক্রান্তসহ নানান বিপদে আক্রান্ত ,ক্ষতিগ্রস্ত, মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। মানব সেবা মূলত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সেবা করা এবং আল্লাহ তায়ালা তাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الخلق عيال الله فأحبهم إلى الله أنفعهم لعياله.
‘সব সৃষ্টি-প্রাণীকূল আল্লাহর পরিবার-পরিজন। অতএব আল্লাহ তাআলার কাছে তার সৃষ্টজীবের মাঝে সে-ই প্রিয়ভাজন যে তার অধীনস্ত ও সৃষ্টজীবের সঙ্গে দয়ার্দ্র আচরণ করে এবং তাদের প্রয়োজনের প্রতি যত্নবান থাকে।’ (মিশকাত)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় অপরের একটি প্রয়োজন মিটিয়ে দেবে, পরকালে আল্লাহ তার ১০০ প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন এবং বান্দার দুঃখ-দুর্দশায় কেউ সহযোগিতার হাত বাড়ালে আল্লাহ তার প্রতি করুণার দৃষ্টি দেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৬)।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন যে ব্যক্তি নিজের ভাইয়ের কোনো কাজ করা বা প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করবে, তা তার জন্য দশ বছর ইতেকাফ করার চেয়ে বেশি সওয়াব লাভের কারণ হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য এক দিন ইতেকাফ করে, আল্লাহ পাক তার ও জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক পরিমাণ দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন। যার দূরত্ব আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের চেয়ে আরো অনেক বেশি। তাখরিজ : তবারানি-৭৩২২;মাজমাউল যাওয়ায়েদ-৪/১৯২; মুসতাদরাকে হাকেম, সুনানে বায়হাকি
৫। আল্লাহর রহমতের দ্বার উন্মোচন : আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে রহমত ও দয়া প্রাপ্তির জন্য সাহায্যকারী মনোভাব অত্যন্ত জরুরী।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
ارحموا من في الأرض يرحمكم من في السماء
‘আল্লাহ তাআলা দয়ালুদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা জমিনে যারা বসবাস করছে তাদের প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৯৪১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন,
من لا يرحم الناس لا يرحمه الله
‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করে না, আল্লাহ তার প্রতি অনুগ্রহ করেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৩)
খ। দ্বিতীয় স্তর
৬। ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের পরিচয়:
পজিটিভ মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে স্বাস্থ্যবান থাকেন। তার গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। তিনি কথা বলার পূর্বে চিন্তা করেন, তর্ক না করে সবকিছু ইতিবাচক দিক দিয়ে ভাবেন,
অন্যের প্রশংসা করেন, নিয়মিত ব্যায়াম করেন এবং নেতিবাচক সংবাদ দেখাশোনা থেকে বিরত থাকেন। আর শুধু ব্যক্তিত্ব বলতে পরিবেশগত ও শারীরিক উপাদানের প্রভাবে বিকশিত চারিত্রিক উদাহরণ আচরণবিধি ও আবেগকে বুঝায়।
বিজ্ঞানী ওয়ালেন হিস্টিং (১৭৩২-১৮১৮) (প্রথম ইংরেজ শাসক- ভারতবর্ষে) এর মতে, "ব্যক্তিত্ব হল কোন ব্যক্তির চিন্তা, অনুভূতি, ইচ্ছা ও শারীরিক অনুভূতি সমূহের সমন্বিত সংগঠন যা এক ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তি থেকে পৃথক করে।
৭। ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা: ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব গঠন ধারণ ও লালন করতে হবে আমাদের প্রিয় সেনাবাহিনীর কর্ম প্রণালীর অনুকূলে। পারস্পরিক ঐক্য ভ্রাতৃত্ব সহমর্মিতা ও কাঙ্খিত গুণাবলী সৃষ্টিতে ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব অপরিহার্য । নিম্নে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো:
১। চারিত্রিক গুণাবলী সৃষ্টিতে ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রভাব
ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের অধিকারী কখনো হারাম বা অন্যায় কাজে লিপ্ত হয় না। তাদের চারিত্রিক মাধুর্য হয় অতুলনীয়। রাসূল সা: বলেছেন,
আল্লাহ তালার আত্মমর্যাদা বোধ আছে এবং আল্লাহর আত্ম মর্যাদা বোধ এই যে, যেন কোন মুমিন বান্দা হারাম বা অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়ে না পড়ে।
(সহীহ বুখারী-৫২২৩) আল কোরআনেও মুমিনদেরকে আল্লাহর রং ধারণ করতে বলা হয়েছে তাই ঈমানের দাবী হল, মুমিনগণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হবেন ।মহান প্রভু বলেন,
صِبْغَةَ ٱللَّهِ ۖ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ ٱللَّهِ صِبْغَةً ۖ وَنَحْنُ لَهُۥ عَٰبِدُونَ
আমরা আল্লাহর রং (চারিত্রিক মাধুর্য) ধারণ করলাম আর আল্লাহর রঙের চেয়ে কার রং উত্তম হতে পারে (সূরা বাকারা আয়াত - ১৩৮ )
২। ধৈর্যের মনোভাব গঠন: ধৈর্য একটি অতীন্দ্রিয় মানসিক শক্তি। ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব বানরাই এ শক্তিতে বলিয়ান। কারণ তারা কথা বলে ভেবেচিন্তে, সিদ্ধান্ত নেয় ধীরে সুস্থে, অবস্থা পর্যালোচনা করে পূর্বাপর লক্ষ্য করে। আল্লাহ তাআলা মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী মহানবীকে এ কারণে কাফিরদের সৃষ্টি পরিস্থিতির প্রতিবিধানে অত্যন্ত ধৈর্যশীলতার পরিচয় প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন । আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَٱصْبِرْ عَلَىٰ مَا يَقُولُونَ وَٱهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيلًا
আর লোকেরা যা বলে তাতে আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং সৌজন্যের সাথে তাদের পরিহার করে চলুন (সূরা মুজাম্মিল আয়াত -১০)
রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন,
সবর বা ধৈর্য এমন একটি নেয়ামত যার চাইতে বিস্তৃত আর কোন নেয়ামত কেউ পায়নি। (আবু দাউদ)
আল্লাহ তাআলা আরওবলেন,
إِن يَكُن مِّنكُمْ عِشْرُونَ صَٰبِرُونَ يَغْلِبُواْ مِاْئَتَيْنِ ۚ وَإِن يَكُن مِّنكُم مِّاْئَةٌ يَغْلِبُوٓاْ أَلْفًا مِّنَ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا
তোমাদের মধ্যে ১০০ জন ধৈর্যশীল মুজাহিদ থাকলে তারা২০০ জনের উপর বিজয়ী হবে আর তোমাদের মধ্যে ১০০০ থাকলে আল্লাহর অনুগ্রহে তারা ২০০০ এর উপর বিজয়ী হবে (সূরা আনফাল আয়াত- ৬৬)
৩। সেনাবাহিনীর স্ফীত লক্ষ্য অর্জন: দেশ রক্ষা বাহিনী হিসেবে সততা নিষ্ঠা আন্তরিকতা প্রশিক্ষণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন একতা ও দৃঢ়তা। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلَّذِينَ يُقَٰتِلُونَ فِى سَبِيلِهِۦ صَفًّا كَأَنَّهُم بُنْيَٰنٌ مَّرْصُوصٌ
নিশ্চয়ই আল্লাহতালা ঐ সকল সৈনিককে ভালবাসেন যারা সীসা-ঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম করে। (সূরা সফ আয়াত - ০৪)
আর লক্ষ্য অর্জনে কঠোর প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَأَعِدُّواْ لَهُم مَّا ٱسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍۢ
আর তোমরা শত্রুর মোকাবেলায় যথাসাধ্য শক্তি সঞ্চয় কর। (সূরা আনফাল আয়াত - ৬০)
আর এ কথা দিবালোকের ন্যায় সত্য যে এই একতা প্রশিক্ষণ ও দৃঢ় মনোভাব ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের পরিস্ফুটের মাধ্যমে সম্ভব।
৪। আদর্শ নেতৃত্ব গঠণ: সর্বস্তরের নেতাগণ তাদের অধীনস্থদের কে প্রেষণার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে থাকেন। এ প্রেষণাকে অনুপ্রেরণামূলক করার জন্য নেতাদেরকে বাস্তব উদাহরণ পেশ করতে হয়। যখন একজন অধীনস্থ অনুভব করে তার নেতা শুধু আদেশই দেন না নিজেই এর উপর বাস্তব উপমা এবং তিনি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও বটে। তখন তাকে নির্দ্বিধায় অনুসরণ করেন এবং শ্রদ্ধা করেন। নবীজি (সা:) শুধু যুদ্ধের আদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি স্বয়ং যুদ্ধে স্বশরীরে নেতৃত্ব দিয়ে সাহসিকতার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাই আদর্শ নেতৃত্ব গঠনে ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
আর মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ
كَبُر مَقْتًا عِندَ ٱللَّهِ أَن تَقُولُواْ مَا لَا تَفْعَلُو
তোমরা সেই কথা কেন বল যা তোমরা কাজে পরিণত করো না কাজ না করে যদি কথাই বলো তবে এতে আল্লাহর খুবই রাগের উদ্রেক হয়। (সূরা সফ আয়াত- ২ ও ৩)
৫। ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের লালন: দেশের নানান প্রান্ত হতে ভিন্ন ভিন্ন পরিবার ও পরিবেশ থেকে আমরা দেশ রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হয়ে একই স্থানে একত্রিত হয়েছি প্রত্যেকের রুচি চাহিদা ও প্রকৃতি ভিন্ন কিন্তু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ও ভিন্ন এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের অনুকূলে ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের যথেষ্ঠ প্রয়োজনিয়তা রয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন،
وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَلَا تَنَٰزَعُواْ فَتَفْشَلُواْ وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ ۖ وَٱصْبِرُوٓاْ
তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হইও না যদি তোমরা তা করো তাহলে তোমাদের শক্তি ও সাহস কমে যাবে (সূরা আনফাল আয়াত ৪৬)।
৮। ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের প্রভাব:
১। ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব মানুষকে উৎসাহ যোগায়, উদ্দীপনা দেয় এবং সামনে এগোতে সাহস যোগায়।
২। যা মানুষকে উপকার করে তা অর্জন করতে শেখায়।
৩। মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতা ও আবিষ্কারের মানসিকতা সৃষ্টি করে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও অন্যকে ভালবাসতে উদ্ভূত করে,সঙ্ঘবদ্ধভাবে কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে।
৪। সমস্যার সমাধানে সাহায্য করে, কাজের উৎকর্ষ বাড়ায় এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ আবহাওয়ায় সৃষ্টি করে।
৫। আনুগত্যের মনোভাব তৈরি করে, মানসিক চাপ কমায় এবং প্রতিষ্ঠানের সহায়ক সদস্য হতে সাহায্য করে।
৬। একটি প্রসন্ন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে সাহায্য করে।
৯। উপসংহার: জাগতিক জীবনে সকল কাজের সফলতা নির্ভর করে মানুষের মানবিক গুণাবলীর উপর। তাই সাহায্য কারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব সফলতা অর্জনের অন্যতম সোপান। সাহায্য কারী মনোভাব ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব ছাড়া কোন কাজে সফল হওয়া অসম্ভব।
লেখক, মাওলানা ফারুক হুসাইন
0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন