জিজ্ঞাসা-১২৪২৭:
সুন্নাতে মুয়াক্কাদা তরক করলে/ছেড়ে দিলে কি গুনাহ হবে? দলিলসহ জানালে উপকৃত হতাম? তারিখ: ১৬/০১/২৩ ঈসায়ি/ইংরেজি
জনৈক মাওলানা সাভার থেকে।
জবাব: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
نحمده ونصل على رسوله الكريم اما بعد بسم الله الرحمن الرحيم
তাসলিম ও হামদ-সানার পর প্রথম কথা হলো, রাসূল (ﷺ) ও সাহাবিদের যুগে আহকামে
শরিয়তের স্তর/শ্রেণী বিন্যাস ছিল না অর্থাৎ ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাতে মুয়াক্কাদা-গয়রে
মুয়াক্কাদা,নফল, মুস্তাহাব, হারাম, মাকরুহে তাহরিমি-তানজিহ। প্রথম হিজরির পর
আইম্মায়ে মুজতাহিদ ও মুজতাহিদ ফিল মাজহাব গণের আবিষ্কৃত।
উম্মাহর আমল সহজ প্রকল্পে নসের (কুরআন-সুন্নাহর)
ভিত্তিতে ফরজ,ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফলের স্তর ভাগ করেছেন। যেরুপ চতুর্থ হিজরির
মাঝামাঝি সময়ে জাল হাদিসের কবল থেকে মুসলিম উম্মাহকে হিফাযত করার জন্য উসূলে
হাদিসের কিতাব রচনা করেন। মূলত উসূলে ফিকহ এবং উসূলে হাদিস প্রথম হিজরির পর আলেমদের
আবিষ্কৃত দুটি
শাস্ত্র। বড় পরিতাপের বিষয়, কিছু ভাই উসূলে হাদিস (ছহিহ, হাসান,জয়িফ, মাওজু, মারফু,
মাকতু, মাশহুর ইত্যাদি পরিভাষা) মানেন, কিন্তু উসূলে ফিকহ মানেন না। তারা বলে আমরা ইমামদের কথা মানি না, কুরআন হাদিস
মানি। তাদেরকে জিজ্ঞেস করি, আপনি যে হাদিসটি সহিহ বা দুর্বল বলছেন, এটা কে বলেছেন
আল্লাহ না তার রাসূল। যদি বলে থাকে, তাহলে আয়াত কিংবা হাদিস নাম্বার বলুন। যদি দেখাতে
না পারেন, তাহলে প্রমাণিত হলো আপনারাও আলেমদের/উসূলে হাদিসের ইমামদের কথা মানেন। যাইহোক
মূল কথাই ফিরে যাই। আপনার প্রশ্নকে সহজভাবে বুঝার জন্য কয়েক ভাগে ভাগ করছি:। ونسأل الله التوفيق وهو الموفق
والمعين
প্রশ্ন: ক। সুন্নাতে
মুয়াক্কাদা কাকে বলে?
উত্তর: ক। فإن السنة المؤكدة هي ما فعله النبي صلى الله عليه وسلم وداوم عليه
সুন্নতে মুআক্কাদা ওয়াজিবের মতই। অর্থাৎ ওয়াজিবের ব্যাপারে যেমন জবাবদিহী করতে হবে, তেমনি সুন্নতে মুআক্কাদার ক্ষেত্রে জবাবদিহী করতে হবে। তবে ওয়াজিব তরককারীর জন্য সুনিশ্চিত শাস্তি পেতে হবে, আর সুন্নতে মুআক্কাদা ছেড়ে দিলে কখনো মাফ পেয়েও যেতে পারে। তবে শাস্তিও পেতে পারে।
وحكمها كالواجب—- إلا أن تارك الواجب يعاقب وتاركها لا يعاقب- (التعريفات للجرجانى-138
ফরজ নামাযের আগে পরের সুন্নতে মুআক্কাদার অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত। এ কারণেই ফুক্বাহায়ে কেরাম লিখেন যে, যদি কেউ সুন্নতকে হক মনে না করে এটাকে ছেড়ে দেয়, তাহলে এ কর্ম তাকে কুফরী পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।
رجل ترك سنن الصلاة ان لم ير السنن حقا فقد كفر، لأنه تركها استخفافا (رد المحتار-2/492، بدائع الصنائع- 1/644
তবে কেউ যদি সুন্নতকে সহীহতো মনে করে, কিন্তু অলসতা করে ছেড়ে দেয়। তাহলে সে গোনাহগার হবে।
وان رآها حقا فالصحيح أنه يأثم، لأنه جاء الوعيد بالترك، كذا فى محيط السرخسى، (الفتاوى الهندية- 1/112
প্রশ্ন: খ। সুন্নাতে গয়রে মুয়াক্কাদা বা জায়েদা কাকে বলে?
উত্তর: খ। ويقول العلامة ابن نجيم الحنفي رحمه الله في "البحر الرائق" (1/ 18، ط. دار الكتاب الإسلامي) -بعدما نقل عدة أقوال لعلماء الحنفية في تعريف السنة ثم زيَّفها-: [والذي ظهر للعبد الضعيف أن السنة ما واظب عليه النبي صلى الله عليه وآله وسلم، لكن إن كانت لا مع الترك فهي دليل السنة المؤكَّدة، وإن كانت مع الترك أحيانًا فهي دليل غير المؤكِّدة] اهـ.
প্রশ্ন: গ। সুন্নাতে
মুয়াক্কাদার হুকুম কি, এর তরককারী কি গুনাহগার হবে?
উত্তর: গ। এ বিষয়ে ওলামাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ফুকাহায়ে আহনাফের মতে, ইচ্ছা করে বারবার ত্যাগ করলে গুনাহ হবে, অন্য ইমাম এবং বর্তমানে আহলে হাদিসের মতে গুনাহ হবে না।
ফুকাহায়ে আহনাফ বলেন,
সুন্নতে মুআক্কাদা ওয়াজিবের মতই। অর্থাৎ ওয়াজিবের ব্যাপারে যেমন জবাবদিহী করতে হবে, তেমনি সুন্নতে মুআক্কাদার ক্ষেত্রে জবাবদিহী করতে হবে। তবে ওয়াজিব তরককারীর জন্য সুনিশ্চিত শাস্তি পেতে হবে, আর সুন্নতে মুআক্কাদা ছেড়ে দিলে কখনো মাফ পেয়েও যেতে পারে। তবে শাস্তিও পেতে পারে।
وحكمها كالواجب—- إلا أن تارك الواجب يعاقب وتاركها لا يعاقب- (التعريفات للجرجانى-138
ফরজ নামাযের আগে পরের সুন্নতে মুআক্কাদার অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত। এ কারণেই ফুক্বাহায়ে কেরাম লিখেন যে, যদি কেউ সুন্নতকে হক মনে না করে এটাকে ছেড়ে দেয়, তাহলে এ কর্ম তাকে কুফরী পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।
رجل ترك سنن الصلاة ان لم ير السنن حقا فقد كفر، لأنه تركها استخفافا (رد المحتار-2/492، بدائع الصنائع- 1/644
তবে কেউ যদি সুন্নতকে সহীহ তো মনে করে, কিন্তু অলসতা করে ছেড়ে দেয়। তাহলে সে গোনাহগার হবে।
وان رآها حقا فالصحيح أنه يأثم، لأنه جاء الوعيد بالترك، كذا فى محيط السرخسى، (الفتاوى الهندية- 1/112
ফুকাহায়ে আহনাফের দলিল:
আয়াত নং-০১
Surah Al-Hashr, Verse 7:
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। সূরা হাশর-০৭
আয়াত নং-০২
Surah Muhammad, Verse 33:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ
হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রসূলের (সাঃ) আনুগত্য কর এবং নিজেদের কর্ম বিনষ্ট করো না। সূরা মুহাম্মাদ-৩৩
হাদিস নং-০১
مَن أطاعني فقد أطاع اللهَ ومَن عصاني فقد عصى اللهَ ومَن أطاع الأميرَ فقد أطاعني ومَن عصى الأميرَ فقد عصاني
الراوي : أبو هريرة | المحدث : ابن حبان | المصدر : صحيح ابن حبان | الصفحة أو الرقم : 4556 | خلاصة حكم المحدث : أخرجه في صحيحه من
অর্থ- হযরত আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো সে যেন আল্লাহরই আনুগত্য করলো আর যে আমার নাফরমানি করলো সত্যিকারে সে যেন আল্লাহরই নাফরমানি করলো৷ তাখরিজ: সহিহ ইবনে হিব্বান-৪৫৫৬
অর্থ: সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ ভাব পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। তাখরিজ: বুখারি-৫০৬৩
সারকথা হলো, হজরতে সাহাবায়ে কেরাম রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণের ক্ষেত্রে ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত নফল ভাগ করতেন না। তখন তখন এগুলো শ্রেণীবিন্যাসও ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ল করতে বলেছে কিনা সেটাই ছিল মূল বিষয়।
শেষ কথা: রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, যে আমার সুন্নাতকে ভালোবাসে, সে অবশ্যই আমাকে ভালোবাসে; আর যে আমাকে ভালোবাসে সে জান্নাতে আমার সঙ্গেই থাকবে। তাখরিজ: তিরমিজি-২৭২৬
আমরা প্রিয় রাসূল (ﷺ) কে মনের ভালবাসার সাথে আমলের ভালবাসাও প্রকাশ করবো। রুওয়াইম ইবনে আহমাদ আল বাগদাদী রাহ. মহব্বতকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন,
المحبة الموافقة في جميع الأحوال (كلمة الإخلاص للحافظ ابن رجب ص৩২)
অর্থাৎ, ভালোবাসা হল প্রেমাষ্পদের সাথে সর্বাবস্থায় একাত্ম থাকা। সূত্র: কালেমাতুল ইখলাস ৩২ পৃ.হাফেজ ইবনে রজব রহ.
হাকীম মাহমূদ ওয়াররাক রাহ. বলেছেন,
لو كان حبك صادقا لأطعته
إن المحب لمن يحب مطيع
অর্থাৎ, যদি তোমার প্রেম খাঁটি হতো তবে তো তুমি তার অনুগত হতে। কারণ প্রেমিক তো প্রেমাষ্পদের অনুগত থাকে। সূত্র: শরহুয যুরকানী আলাল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যাহ, পৃ. ১১৮
আমার ব্যক্তিগত মতামত:
মানুষ আল্লাহ ও তার রাসূল কে আনুগত্য করে মূলত দুটি কারণে, এক. ভালোবাসার কারণে দুই. শাস্তি বা আজাবের ভয়ে।
এ কারণেই পবিত্র কোরআনে প্রায় ১০০০ আয়াত রয়েছে জাহান্নামের বর্ণনা, যাতে মানুষ ভয়েও গুনাহ থেকে ফিরে থাকে।
গত কয়েক বছর আগে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক একটি জরিপ হয়েছিল তাতে বলা হয়েছে বাংলাদেশে ১৫% মানুষ নামাজী।
প্রিয় পাঠক! আজকে মুসলিম উম্মাহ ফরজের বিষয়ে গাফিলতি, সেখানে সুন্নত আরো করুন অবস্থা।
তাই সার্বিক বিবেচনায় উম্মার এই আমলের ঘাটতি জামানায় ফুকাহায়ে আহনাফের মতই অধিক যুক্তিযুক্ত। কেননা শাস্তির ভয়ে হলেও কিছু মানুষ সুন্নতকে অনুসরণ করবে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর প্রদানে, মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুর রাজ্জাক
0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন