জিজ্ঞাসা-১২৪৯০:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। বিজ্ঞজনের নিকট জানার বিষয়, খতমে তারাবির ইমামতি করে বিনিময় নেওয়া জায়েয কি না? খতমে তারাবির বিনিময় দেওয়া-নেওয়া দু’টোই নাজায়েজ। হাদিয়ার নামে দিলেও জায়েজ হবে না। এ মর্মে তারা নিম্নের হাদীস গুলো দলীল হিসেবে পেশ করেন।
১. হজরত আবদুর রহমান ইবনে শিবল (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, তোমরা কোরআন পড় তবে তাতে বাড়াবাড়ি করো না এবং তার প্রতি বিরূপ হয়ো না। কোরআনের বিনিময় ভক্ষণ করো না এবং এর দ্বারা সম্পদ কামনা করো না। -মুসনাদে আহমদ: ৩/৪২৮
২. হজরত ইমরান ইবনে হোসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, তোমরা কোরআন পড় এবং আল্লাহতায়ালার কাছে প্রার্থনা করো। তোমাদের পরে এমন জাতি আসবে, যারা কোরআন পড়ে মানুষের কাছে প্রার্থনা করবে। -মুসনাদে আহমদ: ৪/৪৩৭
৩. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাকিল থেকে বর্ণিত, তিনি এক রমজান মাসে লোকদের নিয়ে তারাবি পড়লেন। এরপর ঈদের দিন উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ (রহ.) তার কাছে এক জোড়া কাপড় এবং পাঁচশ দিরহাম পাঠালেন। তখন তিনি কাপড় জোড়া ও দিরহামগুলো এই বলে ফেরত দিলেন যে, আমরা কোরআনের বিনিময় গ্রহণ করি না। -মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা: ৫/২৩৭
তারিখ: ০৬/০৩/২৩ ঈসায়ি/ইংরেজি
মাওলানা ফারুক হুসাইন সিলেট থেকে
জবাব: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
نحمده ونصل على رسوله الكريم اما بعد بسم الله الرحمن الرحيم
তাসলিম ও হামদ-সানার পর প্রথম কথা হলো, এ বিষয়ে দুটি মতামত পাওয়া যায়,
প্রথম মত: নাজায়েজ, এটাই শক্তিশালী, প্রাধান্য মত।
দ্বিতীয় মত: জায়েজ। এটা দুর্বল মত।
প্রথম মতের দলিল: এ মতের দলিল যা আপনি উপরে তিনটি হাদিস শরিফ উল্লেখ করেছেন।
এবং
اجرة على الطاعة
(উজরত আলাত তাআত ) বা
ইবাদাতের বিনিময় জায়েজ। এ বিষয়ে ওলামায়ে মুতা’আখখীরীনরা জায়েজ কয়েকটি ক্ষেত্রে বলেছেন।
ফুকাহারা اجرة নেয়া জায়েজ বলেছেন কেবল ঐ সকল ইবাদতের ক্ষেত্রে,
ويفتى اليوم بالجواز أي بجواز أخذ الأجرة على الإمامة وتعليم القرآن والفقه والأذان كما في عامة المعتبرات وهذا على مذهب المتأخرين من مشايخ بلخي استحسنوا ذلك.
ويراجع أيضا :
إمداد الفتاوى : (1/484) و إمداد المفتين : (365)
অর্থাৎ যেগুলো ضروريات دين তথা দ্বীনের আবশ্যকীয় বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত। যেমন-দ্বীন শিখানো, ইমামতি, মুয়াজ্জিনী, ওয়াজ করা। এছাড়া আর কোন ইবাদতের বিনিময়ে اجرة নেয়া বৈধ নয়। সূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া-১/৪৮৪; ইমদাদুল মুফতিন-৩৬৫ পৃ
সারকথা হলো, তারাবি পড়ে বিনিময় নেওয়া أجرة علي الطلعة ইবাদাতের বিনিময় জায়েজ, এ অন্তর্ভুক্ত করেনি।
দ্বিতীয় মতের দলিল: এ মতের সরাসরি কোন দলিল নেই। হিলা করেছেন।
অর্থাৎ হাফেজদের দেওয়া বিনিময়কে জায়েয করার জন্য এই হীলা অবলম্বন করা যে, শুধু রমযান মাসের জন্য তার উপর দু এক ওয়াক্ত নামাযের ইমামতির দায়িত্ব দেওয়া হবে। এই হীলার অর্থ হল যে, এ বিনিময়টা তাকে ফরয নামাযের ইমামতির জন্য দেওয়া হচ্ছে। আর খতম তারাবী সে বিনিময়হীনভাবেই করে দিচ্ছে।
হিলার পর্যালোচনা: এ বিষয়ে হাকিমুল উম্মাহ হযরত মাওঃ আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন,
যদিও তাকে রমাযান মাসের জন্য ইমাম বানিয়ে নেওয়া হয়, তবুও তার মূল উদ্দেশ্য থাকে তারাবীহের নামায। কেননা- উক্ত হাফেয সাহেব যদি শুধু ওয়াক্তিয়া নামায পড়ান আর তারাবীহ না পড়ান, তাহলে তাকে ইমাম রাখা হবে না। তাই দ্বীনী ব্যাপারে এরূপ হীলা জায়িয নয়। সূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া- ১ঃ৪৮৫ পৃষ্ঠা
সারকথা হলো, উল্লেখ্য ফাতাওয়ার কিতাবে ঊলামাগনের ইখতিলাফ বর্ণনা করতে যেয়ে শক্তিশালী ও দুর্বল উভয় ধরনের কাওল উল্লেখ্য থাকে। শেষে নির্ভরযোগ্য ও বিশুদ্ধ মতটি বর্ণিত হয়, সেটার উপরই মুফতীয়ানে কিরাম ফাতওয়া দিয়ে থাকেন।
শেষ কথা হলো, ইমামতির বেতন ঠিক করা এবং তা আদায় করা যদিও পরবর্তী ফকীহগণের দৃষ্টিতে জায়েয। কিন্তু খতম তারাবীর বিনিময়টা ইমামতির জন্য হয় না। বরং তা মূলত কুরআন খতমের বিনিময়ে হয়ে থাকে। আর তেলাওয়াতের বিনিময় গ্রহণ করা সকল ফকীহের নিকট হারাম। অধিকন্তু পরবর্তী ফকীহগণ যে ইমামতির বেতন জায়েয বলেছেন সেটা হল ফরয নামাযের ইমামতি। সুন্নত নামাযের ইমামতি এর অন্তর্ভুক্ত নয়।
সুতরাং আপনার প্রশ্নে বর্ণিত মাসয়ালাটিই অধিক যুক্তিযুক্ত, প্রাধান্য মত।
- والله اعلم بالصواب
উত্তর প্রদানে, মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুর রাজ্জাক
0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন